বিশ্বকাপ ফুটবলের উন্মাদনায় যখন বুঁদ গোটা বিশ্ব, তখনও ক্রিকেট বিশ্বের লাইমলাইটের অনেকটাই কেড়ে নিয়েছিলেন— এক ভারতীয় কিশোর এবং সেটা মাঠে না খেলেই। গত আইপিএলে অতিমানবীয় পারফরম্যান্সের পর নির্বাচকরা দলে ডাকতে বাধ্য হয়েছিলেন ১৫ বছর বয়সী বিস্ময়বালক বৈভব সূর্যবংশীকে। কিন্তু আয়ারল্যান্ড সফরের দুই টি-২০ কিংবা ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে সিরিজের প্রথম ম্যাচ—কোথাওই একাদশে জায়গা মেলেনি তার।
বৈভবের মতো বিস্ফোরক ব্যাটারকে বেঞ্চে বসিয়ে রাখা নিয়ে রীতিমতো হৈচৈ পড়ে যায় ক্রিকেট বিশ্বে। ভারত তো বটেই, বিভিন্ন দেশের কিংবদন্তিদের মনেও ছিল এক প্রশ্ন—বৈভব সূর্যবংশী কবে মাঠে নামবেন? যারা গত আইপিএল দেখেননি, তাদের কাছে এই প্রশ্ন বাড়াবাড়ি মনে হতে পারে; কিন্তু যারা দেখেছেন, তারা অবাক—কেন মাঠে নামানো হচ্ছে না তাকে?
অবশেষে সব প্রশ্নের অবসান ঘটলো শনিবার ম্যানচেস্টারের ওল্ড ট্র্যাফোর্ডে। সিরিজের দ্বিতীয় টি-২০ ম্যাচে ভারতের সর্বকনিষ্ঠ আন্তর্জাতিক ক্রিকেটার হিসেবে অভিষেক হলো ১৫ বছর ৯৯ দিন বয়সী বৈভবের। এই অভিষেকের মাধ্যমে তিনি সিংহাসনচ্যুত করলেন ভারতের ‘ক্রিকেট ঈশ্বর’ শচীন রমেশ টেন্ডুলকারকে। ১৯৮৯ সালে শচীন যখন প্রথম আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলতে নেমেছিলেন, তখন তার বয়স ছিল ১৬ বছর ২০৫ দিন। ওল্ড ট্রাফোর্ডে ভারতের সহ-অধিনায়ক তিলক ভার্মা বৈভবের হাতে তুলে দেন সেই ঐতিহাসিক ক্যাপ।
সিদ্ধান্তটা ভারতের টিম ব্যবস্থাপনা বা ম্যানেজমেন্টের জন্য যে কতটা কঠিন ছিল, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। বৈভবকে খেলাতে গেলে বাদ পড়বেন কে? ভারতের তিন টপ অর্ডার ব্যাটারই যে আছেন ফর্মের তুঙ্গে। ওপেনার অভিষেক শর্মা টি-২০ র্যাঙ্কিংয়ের ২ নম্বরে, তিনে খেলা ঈশান কিশান আছেন ১ নম্বরে। আর অপর ওপেনার সঞ্জু স্যামসন মাত্র তিন মাস আগে ৫ ইনিংসে ৮০.২৫ গড় এবং ১৯৯.৩৭ স্ট্রাইক রেটে ৩২১ রান করে ভারতকে টি-২০ বিশ্বকাপ জিতিয়েছিলেন।
এমন তিনজনকে বাদ দেওয়া যেমন কঠিন, তেমনি সূর্যবংশীকে বেঞ্চে বসিয়ে রাখাও ছিল অসম্ভব। শেষ পর্যন্ত হেড কোচ গৌতম গম্ভীর আর অধিনায়ক শ্রেয়াস আইয়ারকে কঠিন সিদ্ধান্তটাই নিতে হলো। কপাল পুড়ল বেচারা স্যামসনের। সর্বশেষ তিন ইনিংসে ৫, ০ ও ১ রান করার খেসারত দিয়ে বৈভবের জন্য জায়গা ছেড়ে দিতে হলো তাকে।
গত কয়েকদিন ধরে বৈভবকে না খেলানোয় তীব্র সমালোচনার মুখে ছিল ভারতীয় টিম ম্যানেজমেন্ট। যদিও তারা হুট করে পরীক্ষিত পারফরমারদের বাদ দিতে চাননি। ভারতের সহকারী কোচ রায়ান টেন ডেসকাটে তো ‘অন্য সবার মতো বৈভবকেও প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে আসতে হবে’ বলে রীতিমতো খলনায়ক বনে গিয়েছিলেন।
টানা তিন ম্যাচ ধরে এই প্রশ্নের জবাব দিতে দিতে ক্লান্ত অধিনায়ক শ্রেয়াস আইয়ারকে কাল টসের পর কথা বলতে হলো বৈভবের অন্তর্ভুক্তি নিয়ে। শ্রেয়াস বলেন, ‘গত কয়েক মাসে আপনারা ওকে ব্যাট করতে দেখেছেন। আমার মনে হয় দলে থাকার যোগ্যতা ওর পুরোপুরি আছে। ও এমন একজন যে একেবারেই চাপ নেয় না; ও একরোখা ও অবিচল স্বভাবের। আগামী ম্যাচগুলোতে কী হতে চলেছে সে সম্পর্কে ও খুব ভালো করেই জানে। নেটে ও যেভাবে ব্যাটিং করে এবং বোলারদের মোকাবেলা করে, তা থেকেই বোঝা যায় ও কেমন মানের খেলোয়াড়। ভারত যে পরিমাণ প্রতিভা তৈরি করছে তা সত্যিই চোখ জুড়ানো। এটা আমাদের সবসময় সতর্ক ও প্রস্তুত রাখে। আমার মনে হয় চাপ পাওয়াটা একটা সৌভাগ্যের বিষয়।’
১৫ বছর বয়সী এক কিশোরকে নিয়ে ক্রিকেট বিশ্বের এত মাতামাতি কেন? আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে পা রাখার আগেই সূর্যবংশী ভেঙে চুরমার করেছেন একের পর এক রেকর্ড। সবশেষ আইপিএলে ২৩৭.৩০ স্ট্রাইক রেটে ৭২টি ছাক্কায় তিনি করেছিলেন ৭৭৬ রান। বিশ্বের বাঘা বাঘা বোলারদের অবলীলায় গ্যালারিতে পাঠিয়ে জিতে নিয়েছেন টুর্নামেন্টের মোস্ট ভ্যালুয়েবল প্লেয়ার, অরেঞ্জ ক্যাপ, ইমার্জিং প্লেয়ার, সুপার স্ট্রাইকার ও সুপার সিক্সেস পুরস্কার। ১৫ বছর বয়সে ছক্কা মারার রেকর্ডে পেছনে ফেলেছেন ক্রিস গেইলকেও।
আইপিএল শেষে ভারত ‘এ’ দলের হয়ে শ্রীলঙ্কা সফরে গিয়ে ত্রিদেশীয় সিরিজে ৫ ইনিংসে করেছেন ২১১ রান। ফাইনালে খেলেন ৯৪ রানের ঝড়ো ইনিংস। সেখানে শ্রীলঙ্কা ‘এ’ দলের বিপক্ষে মাত্র ১১ বলে ফিফটি করে লিস্ট ‘এ’ ক্রিকেটের দ্রুততম ফিফটির রেকর্ড গড়েন বৈভব।
তাছাড়া বৈভব ৮টি প্রথম শ্রেণির ম্যাচে ১২ ইনিংসে করেছেন ২০৭ রান। যুব টেস্টে ৬ ম্যাচের ১০ ইনিংসে করেছেন ৩৩১ রান। লিস্ট ‘এ’ ক্রিকেটে ১৩ ম্যাচে করেছেন ৫৬৪ রান, যার মধ্যে রয়েছে ১৯০ রানের একটি ইনিংসও। যুব ওয়ানডেতে ২৫ ম্যাচে ৫৬.৪৮ গড়ে করেছেন ১৪১২ রান, স্ট্রাইক রেট ছিল ১৬৫.৭২। অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপে ৭ ম্যাচে টুর্নামেন্ট সর্বোচ্চ ৪৩৯ রান করে দলকে শিরোপাও জিতিয়েছেন তিনি। চাইলে এই পরিসংখ্যান আরও লম্বা করা যাবে।
আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে পা রাখার আগেই বৈভব প্রমাণ করেছেন তিনি শুধু ধুম-ধাড়াক্কা টি-২০ ব্যাটার নন; টেস্ট, ওয়ানডে সব ফরম্যাটেই তার ব্যাট কথা বলে। তবে এখন লড়াইটা সর্বোচ্চ পর্যায়ে নিজের প্রতিভার প্রমাণ দেওয়ার।
বহুল আলোচিত তার অভিষেক ইনিংসটি অবশ্য প্রতিভার সঙ্গে পুরোপুরি সুবিচার করতে পারেনি। ১০ বলে ২ ছক্কায় করেছেন মাত্র ১৪ রান। তবে রান যা-ই হোক, ওল্ড ট্রাফোর্ডে বিশ্ব ক্রিকেটের এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়ে গেল। যে মাঠে শচীন টেন্ডুলকার তার ক্যারিয়ারের প্রথম টেস্ট সেঞ্চুরি করেছিলেন, সেই মাঠেই তাকে সরিয়ে সর্বকনিষ্ঠ ভারতীয় ক্রিকেটার বনে গেলেন বৈভব।
তবে শুধু বয়সে শচীনকে ছাড়িয়ে গেলেই দায়িত্ব শেষ হবে না, মাথায় রাখতে হবে—২৪ বছরের দীর্ঘ ক্যারিয়ারে শচীন ৬৬৪টি আন্তর্জাতিক ম্যাচে করেছিলেন ৩৪ হাজার ৩৫৭ রান এবং ১০০টি সেঞ্চুরি। এখন দেখার বিষয়, বৈভব সূর্যবংশী কতদূর যেতে পারেন? এই নতুন সূর্যের আলো কতটা আলোকিত করতে পারে ক্রিকেট বিশ্বকে?