রাস্তাঘাটে চলতেফিরতে মনে হবে আমেরিকায়ই আছি তো, নাকি লাতিন কোনো শহরে! প্রায় সবাই স্প্যানিশ বলছে। উবার ড্রাইভারও বলছেন যে তিনি ইংরেজি জানেন না।
বিমানবন্দরে দুই ভাষারই সমান আধিক্য দেখে সেটি আন্দাজ করা গিয়েছিল। রাস্তায় নামার পর পেরুভিয়ান, কলম্বিয়ান ও আর্জেন্টাইনদের দেখা মিলছে অহরহ। উত্তর আমেরিকার একেবারে দক্ষিণ-পূর্বের শহরটাকে লাতিনের দরজাও বলা হয়ে থাকে। বলা হয়, লাতিন মাদকসম্রাটদের অর্থেই গড়ে উঠেছে মায়ামির বিলাস-ব্যসন আর স্কাইলাইন।
সেখানেই এখন এক ফুটবলসম্রাটের বাস—লিওনেল মেসি। স্প্যানিশভাষীদের শহর ফুটবলেরও শহর হবে, এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। তবে মেসি আসার পর মায়ামি নতুন করেই ‘সকার সিটি’র খ্যাতি পাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রে। ‘নিজের শহরে’ সেই মেসি পা রাখছেন এবার নতুন করে।
মেসির শহরে জাদুর অপেক্ষায়কানসাস, ডালাস ঘুরে বিশ্বকাপে প্রথম ম্যাচ খেলতে নামছেন তিনি মায়ামিতে। বিভিন্ন মাধ্যমের খবর, প্রায় ৫০ হাজার আর্জেন্টাইন শহরে এসেছে কোনো টিকিট ছাড়াই। আর্জেন্টিনা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ক্লদিও তাপিয়াকে এখন আরো বেশি টিকিটের জন্য ধর্না দিতে হচ্ছে ফিফার কাছে। তাতে এই ম্যাচ ঘিরে উন্মাদনাটাও আন্দাজ করা যাচ্ছে সহজেই। ব্রাজিলে খেলা হলে যেমন কোপাকাবানা সৈকতে উৎসব হয়, মায়ামির সৈকতও এখন উৎসবমুখর হয়ে উঠতে যাচ্ছে আর্জেন্টাইনদের ভিড়ে।
মেসি ক্রিস্তিয়ানো রোনালদোর মতো সৌদি আরব বা মধ্যপ্রাচ্যে না গিয়ে মায়ামিতে কেন এলেন, তা নিয়ে অনেক আলোচনা হয়েছে। এবারের বিশ্বকাপে তাঁর পারফরম্যান্স দেখে এখন বলা হচ্ছে, সেটিই সেরা সিদ্ধান্ত ছিল। মায়ামিতে থাকা নিয়ে মেসি নিজে বলেছিলেন, ‘এখানে আমাদের দিনগুলো খুবই ভালো যাচ্ছে। আমি বার্সেলোনায় বেড়ে উঠেছি, সেটি আমার জন্য বিশেষ শহর। কিন্তু মায়ামির সবকিছু আমার ভালো লাগে, এখানে জীবনটা উপভোগ করছি। ছেলেরা নিজেদের মতো বড় হচ্ছে, অনেক শান্তিতে আছি এখানে।’
মেসির মানসিক সেই স্থিরতার ছাপও আছে এখন তাঁর খেলায়। বার্সেলোনা থেকে প্যারিস সেন্ত জার্মেইতে যাওয়াটা সহজ ছিল না। প্যারিসে সময়টাও ভালো যায়নি। রৌদ্রোজ্জ্বল মায়ামিতে এসে আর্জেন্টাইন তারকার মুখেও হাসি ফিরেছে। বার্সার পুরনো বন্ধুদের নিয়ে এসেছেন এখানে, আর্জেন্টাইন প্রিয় সঙ্গী রদ্রিগো দি পল আছেন। বিশ্বকাপের আগে মায়ামির শেষ ৫ ম্যাচে ১২ গোলে তাঁর অবদান, পাঁচটি নিজে করেছেন, সাতটি অ্যাসিস্ট। এরই মধ্যে মেজর লিগ সকারে দ্রুততম ১০০ গোলে অবদানেরও রেকর্ড হয়ে গেছে তাঁর। মেসি এখন আগের মতো দৌড়াচ্ছেন না ঠিক, কিন্তু ছোট যে স্প্রিন্টটুকু দিচ্ছেন, তা যেন চিতার গতি ও শক্তির যুগলবন্দি।
এটা ঠিক যে নিজের মাঠে তিনি নামছেন না। আমেরিকার ‘সকার’ স্টেডিয়ামগুলো এখনো ২০ থেকে ২৫ হাজার দর্শক ধারণক্ষমতার। মায়ামিতেও বিশ্বকাপের ম্যাচ হচ্ছে, তাই এখানকার আমেরিকান ফুটবলের দল ‘মায়ামি ডলফিনস’-এর হোম ভেন্যু হার্ডরক স্টেডিয়ামে। নাম শুনে গান, কনসার্টের কথা সবার আগে মনে এসে থাকলে ভুল নয় সেটিও। টেইলর সুইফট ও শাকিরা থেকে শুরু করে কোল্ডপ্লে, ইউটু, পিংক ফ্লয়েড—জগদ্বিখ্যাত সব ব্যান্ড আর শিল্পীই এখানে পারফরম করেছেন। কাতার বিশ্বকাপের পর মেসির ২০২৪ সালের কোপা জয়ও এখানে।
মেসির বাঁ পায়ে এখনো যে জাদু আছে, জাদুর শহর মায়ামি বিশ্বকাপে তাঁকে নতুন করে ধারণের অপেক্ষায়। ১ জুলাই সকাল পর্যন্ত আর্জেন্টিনা অবশ্য কানসাস সিটিতেই তাদের প্রস্তুতি চালিয়ে গেছে। বিকেলে মেসিদের মায়ামিতে আসার কথা। শেষ বত্রিশে তাদের প্রতিপক্ষ কেপ ভার্দে অবশ্য ফ্লোরিডায়ই আছে। এখানকার জল-হাওয়ার সঙ্গে তারা কিছুটা মানিয়েও নিয়েছে হয়তো বা। চ্যাম্পিয়নদের অবশ্য তেমন সমস্যা হওয়ার কথা নয়। মায়ামিতে সারা বছর গ্রীষ্মমণ্ডলীয় আবহাওয়া, গরমও বেশ। এই জুলাইয়ে আমেরিকার মধ্য-পশ্চিমের শহর কানসাসেও প্রায় একই তাপমাত্রা। আর্জেন্টাইনদের তাই মানিয়ে নেওয়ার কথা। আর মেসির তো নিজের শহর, যেখান থেকে ফের সতেজ হয়ে এই বিশ্বকাপ মাতাচ্ছেন তিনি ৩৯ বছর বয়সে।