পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত কম্পানিগুলোর ত্রৈমাসিক আর্থিক প্রতিবেদন প্রস্তুতের বর্তমান পদ্ধতিতে বড় পরিবর্তনের উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ করে এখন থেকে পূর্ণাঙ্গ ত্রৈমাসিক প্রতিবেদনের পরিবর্তে সংক্ষিপ্ত বা কনডেন্সড আর্থিক প্রতিবেদন চালুর পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন সংস্থাটির চেয়ারম্যান মাসুদ খান। একই সঙ্গে আইপিও প্রক্রিয়া সহজ করা, কাগজনির্ভর কার্যক্রম কমিয়ে সম্পূর্ণ ডিজিটাল ব্যবস্থায় যাওয়ারও ঘোষণা দিয়েছেন তিনি।
বৃহস্পতিবার (২ জুলাই) ঢাকা ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশন (ডিবিএ) আয়োজিত পরিচিতি ও মতবিনিময় অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে বিএসইসি চেয়ারম্যান মাসুদ খান এসব কথা বলেন।
তিনি বলেন, কমিশনের দায়িত্ব শুধু নিয়ন্ত্রণ করা নয়, বাজারের বিকাশে সহায়ক ভূমিকা পালন করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। স্টেকহোল্ডারদের সমস্যার সুনির্দিষ্ট সমাধান খুঁজে বের করাই নতুন কমিশনের প্রধান লক্ষ্য। তাই আমরা একটি ‘সল্যুশন মাইন্ডসেট’ নিয়ে কাজ করছি।
নিজের করপোরেট জীবনের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে তিনি জানান, লাফার্জের প্রধান আর্থিক কর্মকর্তা (সিএফও) হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময় তিনি নিজেও নিয়ন্ত্রক সংস্থার অসংখ্য প্রশ্নের মুখোমুখি হয়েছেন। ফলে বাজারসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর বাস্তব সমস্যা ও দুর্ভোগগুলো তিনি ভালোভাবেই বোঝেন।
মাসুদ খান বলেন, বর্তমানে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোকে পূর্ণাঙ্গ ত্রৈমাসিক আর্থিক প্রতিবেদন জমা দিতে হয়। তবে আন্তর্জাতিক হিসাবমান ‘আইএএস-৩৪’ অনুসরণ করে সংক্ষিপ্ত আর্থিক প্রতিবেদন চালুর ঘোষণা দিয়ে তিনি বলেন, আমরা আর পূর্ণাঙ্গ তিন মাসের রিপোর্ট চাইবো না। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী কনডেন্সড রিপোর্টিং চাই।
দেশে অনেক ভালো প্রতিষ্ঠান জটিল ও দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়ার কারণে শেয়ারবাজারে আসতে চায় না উল্লেখ করে বিএসইসি চেয়ারম্যান জানান, আগামী সপ্তাহ থেকেই আইপিও বিধিমালা পর্যালোচনার কাজ শুরু হবে। এ জন্য ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই), আইসিএবি এবং মার্চেন্ট ব্যাংকারদের সঙ্গে যৌথ বৈঠক করবে কমিশন।
কমিশনের কার্যক্রম এখনো অনেকাংশে কাগজনির্ভর মন্তব্য করে তিনি জানান, সব রেগুলেটরি রিপোর্টিং ধীরে ধীরে ডিজিটাল করা হবে। এক্সবিআরএল, এক্সএমএলভিত্তিক রিপোর্টিং এবং ডকুমেন্ট ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম চালু করে তথ্য বিশ্লেষণও স্বয়ংক্রিয় করা হবে। এছাড়া গ্রাহকের স্বাক্ষরের অপব্যবহার রোধে ডিজিটাল ট্রেডিং ব্যবস্থার ওপর জোর দেন তিনি।
বাজারে ‘টি+১’ সেটেলমেন্ট চালুর বিষয়ে ইতিবাচক অবস্থান জানিয়ে মাসুদ খান বলেন, এটি সময়ের দাবি। তবে শর্ট সেলিং বা স্ক্রিপ্ট নেটিংয়ের মতো বিষয়গুলোতে বাজারের পরিপক্কতা বিবেচনা করে এগোতে হবে। পাশাপাশি আইপিও অনুমোদন ও সার্ভেইলেন্সের ক্ষেত্রে স্টক এক্সচেঞ্জের সক্ষমতা বাড়ানোর কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, কমিশন সব বিষয়ে হস্তক্ষেপ করতে চায় না; স্টক এক্সচেঞ্জের দায়িত্ব তাদেরই পালন করতে হবে।
মাসুদ খান আরো বলেন, বাংলাদেশের পুঁজিবাজার এখনো খুচরা বিনিয়োগকারীনির্ভর। দীর্ঘমেয়াদে বাজারকে শক্তিশালী করতে মিউচুয়াল ফান্ড শিল্পের বিকাশ অত্যন্ত জরুরি। অতীতে কয়েকটি বড় ফান্ডের অনিয়মের কারণে পুরো শিল্প ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে উল্লেখ করে তিনি জানান, অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে সিকিউরিটিজ ট্রাইব্যুনালকে কার্যকর করা এবং প্রয়োজনে বিশেষায়িত আদালত গঠনের বিষয়েও কাজ করছে কমিশন।
এছাড়া বিদেশি বিনিয়োগকারীদের মূলধন বা মুনাফা ফেরত নেওয়ার জটিলতা দূর করা এবং মূলধনী মুনাফা (ক্যাপিটাল গেইন) কর নির্ধারণের বর্তমান পদ্ধতি সহজ করতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সঙ্গে কাজ করা হবে বলে তিনি জানান। পরিশেষে, বাজারকে দীর্ঘমেয়াদে টেকসই করতে বিনিয়োগকারীদের আর্থিক শিক্ষা বাড়ানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেন বিএসইসি চেয়ারম্যান।









