অনেকদিন ধরেই চলচ্চিত্র আমদানি-রপ্তানি কমিটির কার্যত কোনো কার্যক্রম না থাকায় বিদেশি সিনেমা আমদানি ও রপ্তানির আবেদনগুলো ঝুলে আছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এতে একদিকে যেমন প্রযোজনা ও আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলো ক্ষতির মুখে পড়ছে, অন্যদিকে নতুন সিনেমার অভাবে বিপাকে পড়েছেন সিনেমাহল মালিকরাও।
বছরদুয়েক আগে চলচ্চিত্র সার্টিফিকেশন বোর্ড গঠনের পর আমদানি-রপ্তানি কমিটি পুনর্গঠন করা হয়। এরপর সাফটা চুক্তির আওতায় পাঁচ শর্তসাপেক্ষে বিদেশি চলচ্চিত্র আমদানির অনুমোদন দেয় তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়।
তবে সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, গত নির্বাচনের পর থেকে কমিটির কার্যক্রম প্রায় স্থবির হয়ে পড়ে। কয়েক মাস ধরে কোনো সভাও অনুষ্ঠিত হয়নি।
এ অবস্থায় একাধিক প্রযোজনা ও আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান বিদেশি সিনেমা আমদানি ও রপ্তানির আবেদন করলেও সেগুলোর অনুমোদন মিলছে না বলে অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্টরা। চলচ্চিত্র অঙ্গনের কেউ কেউ বলছেন, কমিটি ভেঙে গেছে। আবার অনেকে মনে করছেন, কমিটি থাকলেও সেটি সক্রিয় নয়।
এরই মধ্যে আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান ইন-উইন এন্টারপ্রাইজ প্রায় দুই মাস আগে পাঁচটি থাই সিনেমা আমদানির আবেদন করলেও এখন পর্যন্ত অনুমোদন পায়নি।
প্রতিষ্ঠানটির কর্ণধার এবং সাবেক হল মালিক সভাপতি ইফতেখার উদ্দিন নওশাদ জানান, দীর্ঘ অপেক্ষার কারণে ব্যবসায়িক ক্ষতির মুখে পড়েছেন তারা।
কালের কণ্ঠকে তিনি বলেন, ‘এমনিতেই দেশি সিনেমা নেই। সিনেমা চালাতে পারছি না। আমাদের তো সিনেমাহল চালাতে হবে। বিদেশি ছবি আমদানির জন্য আবেদন করে রাখলেও মুক্তির জন্য এখনো পর্যন্ত অনুমোদন পাইনি।’
তিনি আরো বলেন, ‘অনেক দিন ধরে কমিটির কোনো সভাও পাইনি। এখন সিনেমাহল বন্ধ রাখতে হয়েছে। বিদেশি ছবিগুলোর অনুমোদন পেলে এখন সেগুলো চালাতে পারতাম। থাই ছবি এনে সেগুলো পয়সা খরচ করে ডাবিং করে রেখেছি কিন্তু অনুমোদন না পাওয়ায় এখন আমাদের বসে থাকতে হচ্ছে। দুই মাস আগে আবেদন করেছি কিন্তু এখনো কোনো সাড়া পাইনি। মন্ত্রণালয়ের উচিত বিষয়গুলো বিবেচনায় নিয়ে সেগুলো অনুমোদনের ব্যবস্থা করা। তাহলে আমরা হল মালিকরা তাদের হলগুলো রানিং রাখতে পারি।’
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন প্রযোজক জানান, দেশীয় সিনেমার স্বল্পতার সময়ে বিদেশি ছবি প্রদর্শন সিনেমাহল সচল রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। কিন্তু তিনি নিজেও কয়েকটি চলচ্চিত্র আমদানির আবেদন করে রাখলেও তা নিয়ে কোনো সাড়া পাননি।
তবে চলচ্চিত্র আমদানি ও রপ্তানি কমিটি ভেঙে দেওয়া হয়েছে—এমন ধারণা সঠিক নয় বলে জানিয়েছেন কমিটির সদস্য ও চলচ্চিত্র পরিচালক সমিতির সভাপতি শাহীন সুমন। ২০২৪ সালের অক্টোবরে পুনর্গঠিত এই কমিটিতে সদস্য হিসেবে যুক্ত হন তিনি।
শাহীন সুমন বলেন, ‘কমিটি তো ভাঙেনি, এখনো বহাল আছে। এখন চলচ্চিত্র আমদানি রপ্তানির অনুমোদনের বিষয়টি তো মন্ত্রণালয় দেখে। কেন ছবিগুলো অনুমোদন পাচ্ছে না সেটি মন্ত্রণালয় ভালো বলতে পারবে।’
তার মতে, রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্কের অনিশ্চয়তার কারণে দীর্ঘদিন আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রমে স্থবিরতা তৈরি হয়েছিল। তবে বর্তমানে দুই দেশের সম্পর্ক স্বাভাবিক হওয়ায় অনুমোদন-সংক্রান্ত জটিলতাও শিগগির কাটতে পারে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
এদিকে চলচ্চিত্র আমদানি-রপ্তানি কমিটির বর্তমান অবস্থা এবং অনুমোদনের অপেক্ষায় থাকা আবেদনগুলোর বিষয়ে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের উপসচিবের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে জানানো হয়, কমিটি এখনও বহাল রয়েছে এবং শিগগিরই এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের উপসচিব (চলচ্চিত্র-২) শারমীন আখতার কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘নতুন কমিটি গঠনের আগ পর্যন্ত এই কমিটিই বহাল রয়েছে। যেসব আবেদন জমা পড়েছে সেসব নিষ্পত্তির জন্য ইতিমধ্যেই আগামী সপ্তাহে তথ্য মন্ত্রণালয়ে সভা ডাকা হয়েছে।’ এর বেশি তিনি আর কিছু বলতে চাননি।
জানা গেছে, জমা পড়া আবেদনের প্রেক্ষিতে তা নিষ্পত্তির লক্ষ্যে আগামী ৭ জুলাই তথ্য মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে দুপুর আড়াইটায় এক সভা ডাকা হয়েছে।
দীর্ঘদিন ধরে আটকে থাকা এসব আবেদন নিষ্পত্তি হলে বিদেশি সিনেমা আমদানির পথ আবারও সচল হবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, এতে একদিকে যেমন সিনেমাহলগুলো যেমন উজ্জীবিত হবে, অন্যদিকে দর্শকদেরও প্রেক্ষাগৃহমুখী করার সুযোগ তৈরি হবে।