দীর্ঘ ৬০ বছরের শিরোপা খরা কাটানোর লক্ষ্য নিয়ে মাঠে নামবে ইংল্যান্ড। ৯৬৬ সালে ঘরের মাঠে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপ জয়ের পর তারা আর কোনো বড় আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টের ট্রফি জিততে পারেনি ফুটবলের জনকরা।
জার্মান ট্যাকটিশিয়ান টমাস টুখেল দায়িত্ব নেওয়ার আগে কোচ গ্যারেথ সাউথগেট আক্রমণাত্মক ও মধ্যভাগ সাজাতে বেশ হিমশিম খেতেন। কিন্তু দায়িত্ব নেওয়ার পর অফফর্মে থাকা তারকা খেলোয়াড়দেরও বাদ দিতে ছাড়েনি। লক্ষ্য পূরণে অবস্থানে এই জার্মান ট্যাকটিশিয়ান।
বিশ্বকাপে স্কোয়াড়ে তারকা আক্রমণাত্মক মিডফিল্ডার এবং ফরোয়ার্ড মরগান গিবস-হোয়াইট, কোল পামার ও ফিল ফোডেনকে ফর্মহীনতা বাদ দিতে কোন সংকোচ করেনি কোচ টুখেল। কিন্তু জুড বেলিংহ্যামের বাদ পড়ার বিষয়টি ক্রীড়া বোদ্ধাদের কাছে এখনো প্রশ্ন উঠে।
এরা না থাকার পরও দলের আক্রমণভাগের নেতৃত্বে রয়েছে হ্যারি কেইন। তার সেরা দিনে যেকোন প্রতিপক্ষ ঘায়েল হতে বাধ্য। তাছাড়া রয়েছে গতির তারকা মার্কাস রাশফোর্ড, অ্যান্থনি গর্ডন, রজার্স ও বুকায়ো সাকাররা।
এতে নি:সন্দেহে আক্রমণভাগ ইংল্যান্ডের যথেষ্ট শক্তিশালী, কিন্তু লের দখল নিয়ন্ত্রণে রাখার দায়িত্ব থাকবে ডেক্লান রাইস এবং অনভিজ্ঞ এলিয়ট অ্যান্ডারসনের ওপর, যা বড় দলগুলোর বিপক্ষে ইংল্যান্ডকে এগিয়ে রাখবে।
তবে আসল পরীক্ষা দিতে হবে গোলরক্ষক জর্ডান পিকফোর্ডকে। কারণ দলের গুরুত্বপূর্ণ ডিফেন্ডারদের ইনজুরি ও অভিজ্ঞতা ভাবিয়ে তুলছে দলকে। তিনটি আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলা নিকো ও'রাইলি সম্ভবত শুরুর একাদশের লেফট-ব্যাক হবেন, অন্যদিকে রিস জেমস সাম্প্রতিক বছরগুলোতে চোটের সাথে লড়াই করছেন। রক্ষণভাগের সবচেয়ে অভিজ্ঞ সেন্টার-ব্যাক জন স্টোনস চোটের সাথে লড়াই করেছে সারাবছর।
এসব ছাপিয়ে বড় প্রশ্ন তৈরি হয়েছে স্বল্প বিরতি ম্যাচ এবং সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে উচ্চতায় খেলা ও গরম আবহাওয়া কতটা সামাল দিবে—শিরোপা দাবিদার দলটির সত্যিকার পরীক্ষার সম্মুখিন হবে।
সবকিছু ছাপিয়ে থ্রি লায়ন্সরা পারবে নিজেদের সব উজার করে দিয়ে শিরোপা খরা ঘোচাতে। আগামী ১৭ জুন ক্রোশিয়ার সাথে ম্যাচ দিয়ে ষাট বছরের বিশ্বকাপ খরা ঘোচানোর মিশনে নামবেন তারা।
আন্তর্জাতিক ক্রিকেটকে বিদায় জানালেন কেইন উইলিয়ামসন
ক্রীড়া ডেস্ক
ছবি : বয়টার্স
নিউজিল্যান্ড ক্রিকেটের সর্বকালের অন্যতম সেরা ব্যাটসম্যান কেইন উইলিয়ামসন আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে অবসরের ঘোষণা দিয়েছেন। দেশটির ইতিহাসে সব ফরম্যাট মিলিয়ে সর্বাধিক রান সংগ্রাহক আচমকা ক্রিকেটকে বিদায় বলে দিলেন। ৩৫ বছর বয়সী এই তারকা ব্যাটার ১৬ বছরের বর্ণাঢ্য আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের ইতি টানার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
নিউজিল্যান্ডের হয়ে সব ফরম্যাট মিলিয়ে ৩৭৮টি ম্যাচ খেলেছেন এই কিইউ তারকা। নিউজিল্যান্ডের হয়ে সব ফরম্যাট মিলিয়ে সর্বোচ্চ ১৯হাজার৩শ৪৯ রানের রেকর্ড নিয়ে আন্তর্জাতিক মঞ্চ থেকে বিদায় নিচ্ছেন। যার মধ্যে আছে ৪৮টি শতক ও ছয়টি ডাবল শতক রয়েছে।
২০১০ সালে ব্লাকক্যাপসের হয়ে অভিষেক হয় উইলিয়ামসনের। গেল বছরের নভেম্বরে আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টি থেকে অবসরের পর পুরোপুরি আন্তর্জাতিক ক্রিকেট সরে দাড়ানোর ঘোষনায় বর্ণাঢ্য এক ক্যারিয়ারের সমাপ্তি ঘটল। নিউজিল্যান্ড ক্রিকেট বোর্ড থেকে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে উইলিয়ামসন জানিয়েছেন, আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে পুরোপুরি সরে দাঁড়ানোর সময় এসে গেছে।
অবসরের সিদ্ধান্ত নিয়ে বেশ কিছুদিন ধরেই ভাবছিলাম, কিন্তু গত কয়েকদিনে এটা স্পষ্ট হয়ে গেছে যে এখনই সঠিক সময়। অবসরের সিদ্ধান্ত নিয়ে বেশ কিছুদিন ধরেই ভাবছিলাম, কিন্তু গত কয়েকদিনে এটা স্পষ্ট হয়ে গেছে যে এখনই সঠিক সময়। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের প্রতি আমার সবসময় তীব্র ক্ষুধা ও একাগ্রতা ছিল। নিউজিল্যান্ডের হয়ে খেলা প্রতিটি ম্যাচে আমি আমার সর্বোচ্চটা দিয়েছি বলে যোগ করে তিনি।
এই ডানহাতি ব্যাটসম্যান তিন ফরম্যাটেই নিউজিল্যান্ডের অধিনায়ক হিসেবে অত্যন্ত সফল সময় কাটিয়েছেন।
তিনি ব্ল্যাকক্যাপসকে ৪০টি টেস্টে নেতৃত্ব দিয়েছেন, যেখানে তিনি ২২টি জয়, ১০টি পরাজয় এবং আটটি ড্র অর্জন করেন। এর ফলে তিনি স্টিফেন ফ্লেমিংয়ের ২৮টি জয়ের পর দেশের দ্বিতীয় সফলতম টেস্ট অধিনায়ক হিসেবে স্থান করে নেন। ওয়ানডেতে, উইলিয়ামসন নিউজিল্যান্ডকে ৯১টি ম্যাচে নেতৃত্ব দিয়ে ৪৬টিতে জয়লাভ করেন। অন্যদিকে ৭৫টি টি-টোয়েন্টি ম্যাচে তার ৩৯টি জয় যেকোনো নিউজিল্যান্ড অধিনায়কের মধ্যে সর্বোচ্চ।
উইলিয়ামসনের নেতৃত্বে নিউজিল্যান্ড ২০২১ সালে ভারতের বিপক্ষে আইসিসি ওয়ার্ল্ড টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপ জয় করে। তার নেতৃত্বেই ব্ল্যাকক্যাপসরা ২০২১ সালের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের ফাইনালে এবং ২০১৬ ও ২০২২ আসরের সেমিফাইনালে খেলেছিল।
২০১৯ সালের আইসিসি ক্রিকেট বিশ্বকাপে দলকে শিরোপা জেতাতে না পারলেও টুর্নামেন্ট সেরা খেলোয়াড় হন তিনি। একই বছর আইসিসি বর্ষসেরা টেস্ট খেলোয়াড় নির্বাচিত হন ।
সর্বকনিষ্ঠ খেলোয়াড় হিসেবে ২০১৬ গড়েন এক অনন্য রেকর্ড। দ্রুততম সময়ে সব টেস্টে খেলুড়ে দেশের বিপক্ষে শতক হাঁকান।
চেক প্রজাতন্ত্র নাকি চেকিয়া—বিশ্বকাপের এই দলের কোন নাম সঠিক
সাহিদ রহমান অরিন
বিশ্বকাপে আজ এই একাদশ নিয়ে খেলতে নেমেছিল চেক প্রজাতন্ত্র বা চেকিয়া। ছবি: সংগৃহীত
ফিফা বিশ্বকাপে আজ সকালে দলটি দক্ষিণ কোরিয়ার বিপক্ষে এগিয়ে গিয়েও ২-১ ব্যবধানে হেরে গেছে। হেরে যাওয়া এই দলকে কয়েক বছর আগে সবাই চেক প্রজাতন্ত্র (Czech Republic) নামে চিনতেন। কিন্তু আজ টিভি স্ক্রিনে দেখানো হলো চেকিয়া (Czechia)।
তাই অনেকের মনে প্রশ্ন জেগেছে, মধ্য ইউরোপের এই দেশের আসল নাম কোনটি? উত্তর—চেক প্রজাতন্ত্র-চেকিয়া দুটি নামই সঠিক। তবে এদের ব্যবহার ও ইতিহাস ভিন্ন।
এখন প্রশ্নের পিঠে প্রশ্ন জাগতে পারে, একটি স্বাধীন-সার্বভৌম দেশের দুটি নাম কেন? এ জন্য ফিরে যেতে হবে শতাব্দী প্রাচীন ইতিহাসে।
আজকের চেকিয়া এক সময় ছিল চেকোস্লোভাকিয়ার (Czechoslovakia) অংশ। ১৯১৮ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর অস্ট্রো-হাঙ্গেরিয়ান সাম্রাজ্যের পতন হয়। তখন চেক ও স্লোভাক জনগোষ্ঠী মিলে চেকোস্লোভাকিয়া রাষ্ট্র গঠন করে।
১৯৯৩ সালে শান্তিপূর্ণভাবে আলাদা হয়ে যায় চেক প্রজাতন্ত্র ও স্লোভাকিয়া। ছবি: সংগৃহীত
কয়েক দশক একসঙ্গে থাকার পর ১৯৯৩ সালের ১ জানুয়ারি শান্তিপূর্ণভাবে চেক ও স্লোভাক জনগোষ্ঠী বিভক্ত হয়ে চেক প্রজাতন্ত্র ও স্লোভাকিয়া নামে দুটি স্বাধীন রাষ্ট্র গঠন করে। এই ঘটনাকে চেকোস্লোভাকিয়ার বিলুপ্তি বা ভেলভেট ডিভোর্স বলা হয়।
কেন এই দ্বৈত নাম?
আন্তর্জাতিকভাবে বেশিরভাগ দেশের দুটি নাম থাকে—একটি দাপ্তরিক, সাংবিধানিক বা দীর্ঘ নাম, আরেকটি ভৌগোলিক বা সংক্ষিপ্ত নাম। যেমন: বাংলাদেশের সাংবিধানিক নাম গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ। জার্মানির আনুষ্ঠানিক নাম ফেডারেল রিপাবলিক অব জার্মানি। এ ধরনের সংক্ষিপ্ত নাম আমরা প্রতিনিয়ত বলে থাকি।
কিন্তু চেক প্রজাতন্ত্রের ক্ষেত্রে বিষয়টি ছিল ব্যতিক্রম। ১৯৯৩ সালে আলাদা হওয়ার পর চেক প্রজাতন্ত্রের সংক্ষিপ্ত ইংরেজি নাম ছিল না। শুধু চেক ভাষায় সংক্ষিপ্ত নাম ছিল চেসকো। কিন্তু ইংরেজিতে এর গ্রহণযোগ্য নাম কী হবে, তা নিয়ে কয়েক বছর ধরে বিতর্ক চলেছে। ফলে তারা বাধ্য হয়ে দীর্ঘ নাম চেক প্রজাতন্ত্র ব্যবহার করে আসছিল।
বছরের পর বছর ধরে দেশটির নীতি নির্ধারকরা অনুভব করছিলেন যে, বাণিজ্যিক ব্র্যান্ডিং বা খেলাধুলার মতো আন্তর্জাতিক ইভেন্টে চেক প্রজাতন্ত্র নামটি দীর্ঘ ও খাপছাড়া মনে হয়। এর সমাধান হিসাবে তারা চেকিয়া নামকরণের প্রস্তাব দেন।
২০১৬ সালে দেশটির সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে জাতিসংঘে চেকিয়াকে তাদের সংক্ষিপ্ত নাম হিসাবে নিবন্ধিত করে। পরবর্তীতে জাতিসংঘ ভৌগোলিক নামের তথ্যভাণ্ডারে চেকিয়াকে অন্তর্ভুক্ত করে।
কিন্তু এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর দেশটিতে তীব্র বিতর্কের সৃষ্টি হয়। এমনকি চেক প্রবাসীরাও প্রতিবাদ জানান। অনেকে তখন দাবি করেন, চেকিয়া নামটি শ্রুতিমধুর নয়।
তবে বিপরীত পক্ষ দাবি করে, বহির্বিশ্বে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক পরিচয় সহজ করার জন্য সংক্ষিপ্ত নাম থাকা অপরিহার্য। যৌক্তিক দাবি হিসাবে তারা সামনে আনে এক সময় একত্র হয়ে থাকা স্লোভাকিয়াকে। স্লোভাকদের দেশ স্লোভাকিয়া আর চেকদের দেশ চেকিয়া।
তবু দেশটির সাধারণ নাগরিক থেকে শুধু করে অনেক রাজনীতিবিদ চেকিয়া নাম গ্রহণ করতে অনীহা দেখান। আপত্তির কারণ হিসাবে সামনে আনা হয় কয়েকটি বিষয়—
》প্রায় ২৩ বছর ধরে মানুষ চেক প্রজাতন্ত্র নামটির সঙ্গে পরিচিত ছিল। হঠাৎ চেকিয়া নামের ব্যবহার অনেকের কাছে অস্বাভাবিক লাগতে পারে। যেমনটা আজ ফুটবলপ্রেমীদের মনে হয়েছে।
》ইংরেজি ভাষাভাষীর অনেকে চেকিয়ার উচ্চারণ নিয়ে অনিশ্চিত ছিলেন। কেউ চেচিয়া, কেউ চেজিয়া আবার কেউ অন্যভাবে উচ্চারণ করতেন।
》অনেকের ধারণা ছিল, চেক প্রজাতন্ত্র নামটি বিশ্বব্যাপী পরিচিত। নতুন নাম চেকিয়া ব্যবহার করলেই বরং আন্তর্জাতিক পরিচিতি দুর্বল হতে পারে।
এত দ্বিধা সৃষ্টি হওয়ায় শেষ পর্যন্ত দুটিকেই স্বীকৃতি দেওয়া হয়। দাপ্তরিক নাম চেক প্রজাতন্ত্র, সংক্ষিপ্ত নাম চেকিয়া। ঐতিহাসিকভাবে দেশটি বোহেমিয়া নামেও পরিচিত।
দেশটির পাসপোর্টে এখনো চেক প্রজাতন্ত্র নাম ব্যবহার করা হয়। ছবি: সংগৃহীত
তবে রাষ্ট্রীয় নথিপত্র, আইনি দলিল, চুক্তি বা পাসপোর্টে এখনো পূর্ণাঙ্গ নাম চেক প্রজাতন্ত্র ব্যবহার করা হয়। খেলাধুলার ক্ষেত্রে একটি দেশের সংক্ষিপ্ত নাম ব্যবহার করাই আন্তর্জাতিক রীতি। তাই কয়েক বছর ধরে চেকিয়া নামটি ব্যবহার করা হচ্ছে।
মজার ব্যাপার হলো, এই নামকরণ করার পর দেশটি এবারই প্রথম ফিফা বিশ্বকাপের মূল পর্বে খেলছে। তাই অনেকে আজ স্কোরলাইনে চেক প্রজাতন্ত্রের পরিবর্তে চেকিয়া দেখে দ্বিধায় পড়ে গিয়েছিলেন। চেক প্রজাতন্ত্র নাম থাকতেও দেশটি একবারই বিশ্বকাপে জায়গা করে নিয়েছে; ২০০৬ সালে।
তবে চেক ও স্লোভাকরা একত্র হয়ে চেকোস্লোভাকিয়া থাকা অবস্থায় তারা দুবার বিশ্বকাপ ফাইনালে খেলেছে—১৯৩৪ ও ১৯৬২ সালে। দুবারই রানার্সআপ হয়ে সন্তুষ্ট থাকতে হয়েছে।