• ই-পেপার

মেসি-পেলে বিতর্কে আগুয়েরো, ‘তখন গোলরক্ষকেরা গ্লাভসও পরতেন না’

রক্তাক্ত পতাকায় অমরত্ব

১৯৯৮ সালের ক্রোয়েশিয়া এবং ফুটবলের চেয়েও বড় এক সত্য

ফুয়াদ হাসান
১৯৯৮ সালের ক্রোয়েশিয়া এবং ফুটবলের চেয়েও বড় এক সত্য
ছবি : রয়টার্স

বিশ্বকাপ ফুটবলের শতবর্ষী ইতিহাসে খুব কম গল্পই আছে যা ১৯৯৮ সালের ক্রোয়েশিয়ার মতো এতটা আবেগঘন এবং ভারী। সেই বিশ্বকাপে ব্রাজিলের ছিলেন রোনালদো। ফ্রান্সের ছিল জিনেদিন জিদান আর স্বাগতিক হিসেবে নিজেদের বিশ্বমঞ্চে চেনানোর এক তীব্র তাড়না। কিন্তু ক্রোয়েশিয়ার যা ছিল, তা কেবল ফুটবলীয় উচ্চাকাঙ্ক্ষা দিয়ে মাপা যাবে না। তাদের ছিল স্মৃতি, তাদের ছিল স্বজন হারানোর গভীর শোক। তাদের ছিল এক সদ্য স্বাধীন হওয়া লাল-সাদা চেকআউট পতাকা, যার গায়ে তখনও লেগে ছিল তাজা রক্তের দাগ। মাঠের এগারোজন খেলোয়াড় কেবল একটা মেডেলের পেছনে ছুটছিলেন না, তারা আসলে বয়ে বেড়াচ্ছিলেন যুদ্ধে প্রাণ হারানো হাজারো শহীদের স্মৃতি! 

১৯৯৮ সালে ফ্রান্সের মাটিতে যখন ক্রোয়েশিয়া বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে পৌঁছায়, ওটা কেবল কোনো ক্রীড়াজগতের রূপকথা বা মিরাকল ছিল না। ওটা ছিল যুদ্ধবিধ্বস্ত এক নতুন দেশের বিশ্বমঞ্চে সগর্বে দাঁড়িয়ে যাওয়ার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা। ক্রোয়েশিয়ার স্বাধীনতা যুদ্ধের শেষ কামানের গর্জন স্তব্ধ হওয়ার মাত্র তিন বছর পর, চল্লিশ লাখ মানুষের একটা দেশ বিশ্বকাপের ফাইনাল খেলার হাতছোঁয়া দূরত্বে এসে দাঁড়িয়েছিল।

ইগর স্তিমাচ, স্লাভেন বিলিচ, জভোনিমির বোবান, রবার্ট প্রোসিনেস্কি, আলিওসা আসানোভিচ আর ডেভর সুকারের কাছে ফুটবল তখন আর কেবল কোনো পেশা ছিল না। ওটা ছিল প্রতিরোধ আর বিশ্বকে চিৎকার করে বলার এক অকাট্য মাধ্যম যে, ক্রোয়েশিয়া টিকে আছে, ক্রোয়েশিয়া বেঁচে আছে এবং তারা বিশ্বের পরাশক্তিদের চোখের চোখ রেখে লড়াই করতে পারে।

রক্ষণভাগের প্রাচীর স্লাভেন বিলিচ পরবর্তীতে সেই আবেগ প্রকাশ করেছিলেন এক বিধ্বংসী সহজ সরল উক্তিতে, ‘আমরা কেবল নিজেদের জন্য বা ক্রোয়েশিয়ার জন্য খেলছিলাম না। আমরা খেলছিলাম সেই মানুষদের জন্য, যারা যুদ্ধে মারা গেছেন।’

একটি স্বাধীন ফুটবল জাতি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করার আগে, এই সোনালী প্রজন্মের বেশিরভাগ খেলোয়াড়ই ছিলেন যুগোস্লাভিয়ার পরিচয়ে। বিলিচ আর স্তিমাচ বড় হয়েছেন স্প্লিট শহরে। এটি ছিল সমুদ্র, খেলাধুলা আর শ্রমিক শ্রেণীর আবেগে ঠাসা এক শহর। তাদের শৈশব কেটেছে গলির ফুটবল, গান আর এক নিরাপদ আবহে, যা রাজনীতি তখনও বিষিয়ে দিতে পারেনি।

কমিউনিস্ট একনায়ক জোসিপ ব্রোজ টিটোর আমলের যুগোস্লাভিয়া ছিল পূর্ব ইউরোপের অন্যান্য কঠোর সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলোর চেয়ে আলাদা। এটি ছিল অনেক বেশি উন্মুক্ত, পশ্চিমা সংস্কৃতির দিকে ঝুঁকে থাকা এক দেশ। তরুণরা ইংলিশ ফুটবল দেখতে পারত, রক মিউজিক শুনতে পারত এবং ঘরোয়া লিগে খেলে বড় তারকা হওয়ার স্বপ্ন দেখত। কারণ, নিয়ম অনুযায়ী ২৮ বছর বয়সের আগে কোনো যুগোস্লাভ খেলোয়াড়ের বিদেশে যাওয়ার অনুমতি ছিল না।

এই নিয়মটি কিছুটা শৃঙ্খল মনে হলেও, যুগোস্লাভিয়ার ফুটবলকে শক্তিশালী করতে তা দারুণ ভূমিকা রেখেছিল। দেশের সেরা প্রতিভারা লিগেই থেকে যেত। তাদের জাতীয় দলের খেলার মধ্যে ছিল এক সহজাত শৈল্পিক ছোঁয়া, সৃজনশীলতা আর চোখধাঁধানো সৌন্দর্য। ফুটবল বিশ্বে তাদের ডাকা হতো ‘ইউরোপের ব্রাজিল’ নামে।

১৯৮০ সালে টিটোর মৃত্যুর পর এক বিশাল রাজনৈতিক শূন্যতা তৈরি হয়। এত বছর যে জাতীয়তাবাদকে কঠোর হস্তে দমন করে রাখা হয়েছিল, তা আবার মাথা চাড়া দিয়ে ওঠে। ক্রোয়েশিয়ায় যেসব গান, প্রতীক বা রাজনৈতিক স্মৃতি একসময় নিষিদ্ধ ছিল, তা হয়ে ওঠে নতুন জাতীয় চেতনার অংশ। ফুটবলাররা তখনও রাজনীতির সৈনিক হয়ে ওঠেননি, কিন্তু ইতিহাস দ্রুত গতিতে তাদের দিকেই এগিয়ে আসছিল।

ক্রোয়েশিয়া ভবিষ্যতে ফুটবলে কী করতে পারে, তার প্রথম ঝলক দেখা গিয়েছিল ১৯৮৭ সালে। সে বছর চিলিতে অনুষ্ঠিত ফিফা বিশ্ব যুব চ্যাম্পিয়নশিপ (অনূর্ধ্ব-২০ বিশ্বকাপ) জিতেছিল যুগোস্লাভিয়া। স্তিমাচ ছিলেন সেই দলের অন্যতম সদস্য। বোবান আর প্রোসিনেস্কি ছিলেন টুর্নামেন্টের সবচেয়ে বড় তারকা। ফাইনালের শুরুর একাদশে ছয়জনই ছিলেন ক্রোয়াট ফুটবলার!

তারা চিলি, ব্রাজিল এবং ফাইনালে পশ্চিম জার্মানিকে হারিয়ে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়েছিল। তবে ট্রফি জেতার চেয়েও বড় কথা, তারা নিজেদের মধ্যে এমন এক নিটোল বন্ধন তৈরি করেছিলেন, যা পরবর্তীতে আস্ত একটা দেশ ভেঙে যাওয়ার পরও টিকে ছিল।

চিলিতে থাকাকালীন এক রাতে স্তিমাচ আর বোবানের হোটেল থেকে লুকিয়ে দুই স্থানীয় মডেলের সঙ্গে দেখা করতে যাওয়ার গল্পটা আজ বেশ কৌতুককর শোনায়। কিন্তু এর ভেতরে লুকিয়ে ছিল এক গভীর সত্য। কোচ যখন জানতে পেরে এই দুজনকে দেশে ফেরত পাঠানোর হুমকি দেন, তখন পুরো দল এককাট্টা হয়ে কোচের সামনে গিয়ে দাঁড়িয়েছিল। সবার এক কথা—স্তিমাচ আর বোবানকে বের করে দিলে আমরা কেউই এই টুর্নামেন্টে খেলব না, সবাই একসঙ্গে দেশে ফিরব!

এই যে একে অপরের জন্য মরতে পারার মানসিকতা, এটাই পরবর্তীতে ক্রোয়েশিয়ার ফুটবলের মূল চালিকাশক্তি হয়ে উঠেছিল। তারা বড় মাপের খেলোয়াড় ছিলেন, অহংকারও কম ছিল না; কিন্তু তারা বন্ধুত্বের শক্তিটা বুঝতেন। ক্রোয়েশিয়া যখন বিশ্বমঞ্চে পা রাখল, এই একতাই তাদের প্রতিভার চেয়েও বড় শক্তি হয়ে দেখা দিল।

১৩ মে ১৯৯০, ডিনামো জাগ্রেব বনাম রেড স্টার বেলগ্রেড। ফুটবল ইতিহাসের এই ম্যাচটি যুগোস্লাভিয়া গৃহযুদ্ধের অন্যতম এক প্রতীকী ভূমিকা হিসেবে গণ্য করা হয়।

ডিনামো জাগ্রেব ছিল ক্রোয়াট জাতীয়তাবাদের প্রতীক, আর রেড স্টার বেলগ্রেড ছিল সার্বিয়ান শক্তির অহংকার। ম্যাচের শুরু থেকেই গ্যালারিতে শুরু হয় ভয়াবহ দাঙ্গা। রেড স্টারের উগ্র আল্ট্রাস সমর্থকেরা (যাদের অনেকের সঙ্গে সার্বিয়ান প্যারামিলিটারি বা আধা-সামরিক বাহিনীর যোগাযোগ ছিল) ক্রোয়াট সমর্থকদের ওপর চড়াও হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশের পক্ষপাতমূলক আচরণ ক্রোয়াটদের ক্ষোভ আরো বাড়িয়ে দেয়।

ঠিক তখনই ক্যামেরায় ধরা পড়ে সেই দৃশ্য, যা ক্রোয়াট জাতির ইতিহাসে অমর হয়ে আছে।

ডিনামো জাগ্রেবের তরুণ অধিনায়ক জভোনিমির বোবান দেখলেন, এক পুলিশ কর্মকর্তা এক ক্রোয়াট সমর্থককে নির্মমভাবে পেটাচ্ছেন। বোবান ক্ষোভে ফেটে পড়ে এক দৌড়ে এসে উগ্র ফ্লাইং কিক বসিয়ে দিলেন সেই পুলিশ কর্মকর্তার বুকে! আইনের চোখে ওটা ছিল চরম শৃঙ্খলাভঙ্গ, কিন্তু ক্রোয়াটদের চোখে ওটা ছিল এক অত্যাচারী ব্যবস্থার বিরুদ্ধে প্রথম প্রকাশ্য বিদ্রোহ। বোবান রাতারাতি হয়ে উঠলেন এক পরাধীন জাতির মুক্তির প্রতীক।

এই ঘটনার জেরে বোবান নিষিদ্ধ হন এবং ১৯৯০ সালের বিশ্বকাপে যুগোস্লাভিয়ার হয়ে খেলতে পারেননি। সেই বিশ্বকাপটিই ছিল অখণ্ড যুগোস্লাভিয়ার শেষ বড় টুর্নামেন্ট। কোয়ার্টার ফাইনালে আর্জেন্টিনার কাছে পেনাল্টিতে তাদের হারটি ছিল আসলে একটি ফুটবলীয় সভ্যতার চিরতরে হারিয়ে যাওয়ার শেষ অধ্যায়। এর পরপরই দেশটা টুকরো টুকরো হয়ে যায়, শুরু হয় রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ।

ক্রোয়েশিয়ার স্বাধীনতা যুদ্ধে প্রায় ২০ হাজার মানুষ প্রাণ হারান। বলকান অঞ্চলের এই ভয়াবহ ক্যাটাস্ট্রফিতে লাখো পরিবার বাস্তুচ্যুত হয়, শহরগুলো ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়। ১৯৯১ সালের ভুকোভার শহরের গণহত্যা ক্রোয়েশিয়ার বুকে সবচেয়ে গভীর ও রক্তাক্ত ক্ষত সৃষ্টি করেছিল।

এমন এক বিভীষিকাময় পরিস্থিতিতে ক্রোয়াট ফুটবলারদের বলা হয়েছিল—তোমাদের খেলা চালিয়ে যেতে হবে। তোমাদের রাইফেল হাতে সীমান্তে যুদ্ধ করতে হবে না, তোমাদের কাজ হলো বিশ্বমঞ্চে দেশের অস্তিত্বকে টিকিয়ে রাখা। একদিকে যখন গ্রেনেড আর বারুদের গন্ধ, অন্যদিকে মাঠের সবুজ ঘাসে তখন চলছিল আরেক যুদ্ধ।

ফুটবল হয়ে উঠল এক আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক ভাষা। প্রতিটি ম্যাচ ছিল এক একটি প্রকাশ্য বিবৃতি: ক্রোয়েশিয়া কোনো কাল্পনিক ধারণা নয়, কোনো সাময়িক বিদ্রোহ নয়, ক্রোয়েশিয়া একটি স্বাধীন রাষ্ট্র!

১৯৯১ সালের ৮ মে, অখণ্ড যুগোস্লাভিয়ার শেষ কাপ ফাইনাল। ইউরোপের তৎকালীন পরাশক্তি রেড স্টার বেলগ্রেডের মুখোমুখি হয়েছিল বিলিচ-স্তিমাচদের হাইদুক স্প্লিট।

ম্যাচের পরিবেশ ছিল পরাবাস্তব এবং চরম শত্রুতামূলক। মাঠে নামা প্রতিটি খেলোয়াড় জানতেন যুগোস্লাভিয়ার ফুটবল শেষ হয়ে গেছে, রাজনীতি ফুটন্ত লাভার মতো ফুটছে। তাও ম্যাচটি মাঠে গড়িয়েছিল। রেড স্টারকে হারিয়ে ট্রফি জিতে নেয় হাইদুক স্প্লিট।

বিলিচ আর স্তিমাচের কাছে ওটা স্রেফ কোনো ঘরোয়া কাপ ফাইনাল ছিল না। ওটা ছিল সার্বিয়ার বিরুদ্ধে ক্রোয়েশিয়ার এক প্রতীকী যুদ্ধ। স্তিমাচ পরবর্তীতে সেই ট্রফিটাকে বর্ণনা করেছিলেন যুদ্ধের ময়দান থেকে ছিনিয়ে আনা কোনো ‘যুদ্ধ ট্রফি’ হিসেবে!

নব্বইয়ের দশকের ক্রোয়েশিয়ার ফুটবলকে বুঝতে হলে এই মানসিকতা জানা জরুরি। কোনো ম্যাচই তখন স্রেফ ম্যাচ ছিল না, কোনো গোলই স্রেফ গোল ছিল না; প্রতিটি পারফরম্যান্সের পিঠে চেপে বসত একটা রক্তাক্ত ইতিহাসের চাপ।

যুদ্ধ শেষের পর, ক্রোয়েশিয়া তাদের প্রথম সোনালী প্রজন্মের জন্য খুঁজে পায় এক পারফেক্ট জাদুকর—কোচ মিরোস্লাভ ‘চিরো’ ব্লাজেভিচ।

চিরো ছিলেন নাটুকে, আবেগপ্রবণ এবং দারুণ ক্যারিশম্যাটিক। গলায় রেশমি স্কার্ফ জড়াতেন কোনো সেনাপতির মেডেলের মতো। তিনি খেলোয়াড়দের ট্যাকটিক্সের জটিল ছকে বন্দি করতেন না। তিনি জানতেন তার দলে বড় বড় তারকা, শিল্পী আর যোদ্ধারা আছেন। তার আসল জাদুটা ছিল মনস্তাত্ত্বিক।

তিনি ড্রেসিংরুমে গিয়ে খেলোয়াড়দের চোখে চোখ রেখে বলতেন—‘তোমরাই পৃথিবীর সেরা দল!’

প্রথমে খেলোয়াড়েরা হেসে উড়িয়ে দিতেন। কিন্তু ধীরে ধীরে এই বিশ্বাস তাদের মজ্জায় ঢুকে গেল। বোবানের নেতৃত্ব, প্রোসিনেস্কির নান্দনিক পাসিং, আসানোভিচের বাম পায়ের বুদ্ধিমত্তা, ডেভর সুকারের খুনে ফিনিশিং আর বিলিচ-স্তিমাচের রক্ষণভাগের দেয়াল, সব মিলিয়ে ক্রোয়েশিয়া আর কোনো করুণা পাওয়া আন্ডারডগ দল ছিল না। তারা ছিল এক রক্তাক্ত ইতিহাস থেকে উঠে আসা এক অপ্রতিরোধ্য শক্তি।

ক্রোয়েশিয়ার প্রথম বড় টুর্নামেন্ট ছিল ইংল্যান্ডের ইউরো ৯৬। ডেবিউতেই কোয়ার্টার ফাইনালে পৌঁছে তারা মুখোমুখি হয় জার্মানির।

সেই ম্যাচটি ক্রোয়াট ফুটবলে এক স্থায়ী ক্ষত হয়ে আছে। বেশ কিছু বিতর্কিত রেফারিংয়ের সিদ্ধান্তে ম্যাচটি ২-১ গোলে হেরে যায় ক্রোয়েশিয়া, লাল কার্ড দেখেন স্তিমাচ। বিলিচ পরবর্তীতে স্বীকার করেছিলেন, ম্যাচ শেষে তিনি শিশুর মতো কেঁদেছিলেন কারণ ক্রোয়েশিয়া সেদিন জার্মানির চেয়ে ভালো ফুটবল খেলেছিল।

বিদায়ের কষ্ট তো ছিলই, তবে তার চেয়ে বেশি কষ্ট ছিল এই ভাবনায় যে—তাদের হাত থেকে একটা নিশ্চিত জয় ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছে। তবে ইউরো ৯৬ বিশ্বকে একটা বার্তা দিয়ে দিয়েছিল— এরা কোনো সাধারণ নবাগত দল নয়। এদের গর্ব আছে, টেকনিক আছে এবং ট্যাকটিক্যাল পরিপক্বতা আছে। ফুটবলের মানচিত্রে এক নতুন পরাশক্তির জন্ম হয়ে গেছে।

দুই বছর পর, ফ্রান্সের মাটিতে তারা ফিরেছিল সেই হারের প্রতিশোধের আগুন বুকে নিয়ে।

১৯৯৮ সালের বিশ্বকাপে ক্রোয়েশিয়া যখন পা রাখে, তারা খাতায়-কলমে নবাগত হলেও মানসিকভাবে ছিল ভীষণ পরিপক্ব।

জামাইকার বিপক্ষে প্রথম ম্যাচেই মারিও স্তানিচের গোলে এগিয়ে যায় ক্রোয়েশিয়া। জামাইকা সমতা ফেরালেও প্রোসিনেস্কি আর ডেভর সুকারের গোলে ৩-১ ব্যবধানের সহজ জয় নিয়ে মাঠ ছাড়ে ক্রোয়াটরা। জাপানের বিরুদ্ধে পরের ম্যাচেও সুকারের শিকারি সুলভ গোলে জয় নিশ্চিত করে এক ম্যাচ বাকি থাকতেই নকআউটের টিকিট কাটে তারা।

১৯৯৮ বিশ্বকাপের গোল্ডেন ব্লেড বা ধারালো তলোয়ার ছিলেন ডেভর সুকার। রোনালদোর মতো বিধ্বংসী গতি বা জিদানের মতো রাজকীয় ড্রিবলিং হয়তো তার ছিল না। তার ক্ষমতা ছিল অন্য জায়গায়। তিনি ছিলেন পেনাল্টি বক্সের এক চতুর শিকারি, যিনি প্রতিপক্ষের ডিফেন্ডাররা বিপদ টের পাওয়ার আগেই ফাঁকা জায়গা খুঁজে নিতেন। তার বাম পা থেকে বের হওয়া শটগুলো ছিল শীতল অথচ নিখুঁত। 

রাউন্ড অব ১৬-এ রোমানিয়ার বিরুদ্ধে পেনাল্টি থেকে গোল করেন সুকার। কিন্তু বোবান আগেই ডি-বক্সে ঢুকে পড়ায় রেফারি আবার পেনাল্টি নেওয়ার নির্দেশ দেন। একই চাপ, একই পরিস্থিতি—কিন্তু সুকারের স্নায়ু ইস্পাতের মতো শক্ত। দ্বিতীয়বারও একই ঠাণ্ডা মাথায় বল জালে জড়িয়ে ক্রোয়েশিয়াকে নিয়ে যান কোয়ার্টার ফাইনালে।

সুকার তখন কেবল গোল্ডেন বুটের পেছনে ছুটছিলেন না, তিনি আসলে বিশ্বমঞ্চে ক্রোয়েশিয়ার অস্তিত্বের সিলমোহর এঁকে দিচ্ছিলেন প্রতিটা গোলে।

কোয়ার্টার ফাইনালের মঞ্চটা ছিল এক আবেগঘন প্রতিশোধের মঞ্চ। প্রতিপক্ষ সেই জার্মানি, যারা দুই বছর আগে ইউরো থেকে তাদের বিদায় করেছিল। স্তিমাচ পরবর্তীতে বলেছিলেন, ম্যাচের আগে তিনি জানতেন ক্রোয়েশিয়া কোনোভাবেই হারবে না, কারণ ইউরোর সেই হারের কষ্টটা তাদের ভেতরে বারুদের মতো জ্বলছিল।

সুকারকে ফাউল করে ক্রিশ্চিয়ান ওয়ার্নস লাল কার্ড দেখলে ১০ জনের দলে পরিণত হয় জার্মানি। এরপর শুরু হয় ক্রোয়াটদের তাণ্ডব। রবার্ট জার্নির বুলেট গতির শটে প্রথম গোল, এরপর গোরান ভ্লাওভিচের দূরপাল্লার শটে আরেক গোল। আর ম্যাচের শেষলগ্নে ডিফেন্ডারদের নাচিয়ে নিজের দুর্বল ডান পা দিয়ে সুকার যখন জার্মানির কফিনে শেষ পেরেকটি ঠুকলেন, স্কোরবোর্ড বলছিল— ক্রোয়েশিয়া ৩ - ০ জার্মানি।

বিশ্বকাপের ইতিহাসের অন্যতম স্তব্ধ করে দেওয়া এক ফলাফল! ইউরোপের অন্যতম সেরা পরাশক্তিকে স্রেফ খড়কুটোর মতো উড়িয়ে দিল এক নবাগত দেশ! সুকার পরবর্তীতে একে তার ক্যারিয়ারের সেরা গোল বলে আখ্যা দেন। কিছু গোল কেবল ম্যাচের ভাগ্য বদলায়, আর কিছু গোল বদলে দেয় একটা দেশের প্রতি পুরো পৃথিবীর দেখার দৃষ্টিভঙ্গি। সেই রাতে ক্রোয়েশিয়াকে অবজ্ঞা করার ক্ষমতা আর কারো ছিল না।
সেমিফাইনালে স্তাদ দে ফ্রান্সে স্বাগতিক ফ্রান্সের মুখোমুখি ক্রোয়েশিয়া। দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতেই ফরাসি ডিফেন্স ভেঙে ফ্যাবিয়ান বার্থেজকে পরাস্ত করে বল জালে জড়ান ডেভর সুকার। ক্রোয়েশিয়া ১-০ গোলে এগিয়ে! পুরো প্যারিস শহর এক মুহূর্তের জন্য যেন কবরস্থানের মতো স্তব্ধ হয়ে গেল। জিদান, দেশমদের ফ্রান্স তখন ঘরের মাঠে বিদায়ের শঙ্কায়। ক্রোয়েশিয়া তখন বিশ্বকাপের ফাইনাল থেকে মাত্র ৪৫ মিনিট দূরে!

বিলিচ পরবর্তীতে সেই নীরবতার কথা স্মরণ করে বলেছিলেন, তারা যদি আর ১০টা মিনিট ফ্রান্সকে আটকে রাখতে পারতেন, তবে সুকার কাউন্টার অ্যাটাকে আরেকটা গোল করে ম্যাচটা ওখানেই শেষ করে দিতে পারতেন। কিন্তু ফুটবল বড় নিষ্ঠুর।

গোলের মাত্র এক মিনিটের মাথায় ফরাসি রাইট-ব্যাক লিলিঁ থুরাম সমতা ফেরান। আর ম্যাচের শেষ দিকে সেই থুরামই দূরপাল্লার এক বাঁকানো শটে ফ্রান্সকে ২-১ গোলে এগিয়ে নেন—যা ছিল তার পুরো আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের একমাত্র জোড়া গোলের রেকর্ড! এক ডিফেন্ডারের অবিশ্বাস্য জাদুতে ভেঙে চূর্ণ হয়ে গেল ক্রোয়েশিয়ার রূপকথা।

পরাজয়ে কোনো লজ্জা ছিল না, কিন্তু বুকে ছিল তীব্র কষ্ট। ট্রফিটা এত কাছে ছিল যে, ছোঁয়া যাচ্ছিল প্রায়! ফ্রান্স পরবর্তীতে ব্রাজিলকে ফাইনালে গুঁড়িয়ে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়, কিন্তু ফুটবলপ্রেমীদের মনের মণিকোঠায় জমা ছিল ক্রোয়াটদের বীরত্বগাথা। 

ক্রোয়েশিয়ার তখনও একটা ম্যাচ বাকি ছিল—নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচ।

অনেক দলই এই ম্যাচটিকে স্রেফ একটা আনুষ্ঠানিকতা মনে করে গা-ছাড়া ভাব দেখায়। কিন্তু ক্রোয়েশিয়ার কাছে এই ম্যাচের গুরুত্ব ছিল ফাইনালের মতোই। প্রথম বিশ্বকাপেই পোডিয়ামে দাঁড়িয়ে মেডেল নেওয়াটা তাদের দেশের ইতিহাসের জন্য ছিল ভীষণ জরুরি।

প্রোসিনেস্কির গোলে ক্রোয়েশিয়া এগিয়ে যাওয়ার পর জেন্দেন ডাচদের সমতায় ফেরান। কিন্তু প্রথমার্ধ শেষ হওয়ার আগেই সুকারের সেই ট্রেডমার্ক ফিনিশিংয়ে ২-১ গোলের জয় নিয়ে মাঠ ছাড়ে ক্রোয়েশিয়া।

এই এক গোল ক্রোয়েশিয়াকে এনে দেয় বিশ্বকাপের তৃতীয় স্থান (ব্রোঞ্জ মেডেল) আর সুকার জেতেন টুর্নামেন্টের সর্বোচ্চ গোলদাতার পুরস্কার ‘গোল্ডেন বুট’ (৬ গোল)। সেই সঙ্গে সিলভার বল জিতে আসরের অন্যতম সেরা তারকা হিসেবে নিজের নাম অমর করে রাখেন তিনি। যুদ্ধবিধ্বস্ত, সদ্য স্বাধীন আর গর্বিত একটা দেশের জন্য এই ব্রোঞ্জ মেডেলটাই ছিল আস্ত একটা ইতিহাস!

১৯৯৮ সালের ক্রোয়েশিয়ার লিগ্যাসি কেবল সুকারের গোল কিংবা বোবানের লিডারশিপেই শেষ হয়ে যায়নি। ওটা ছিল আসলে এক মজবুত ভিত্তিপ্রস্তর।

দীর্ঘ ২০ বছর পর, ২০১৮ সালে রাশিয়া বিশ্বকাপের ফাইনালে উঠেছিল ক্রোয়েশিয়া। লুকা মদ্রিচ, ইভান রাকিটিচ, মারিও মানজুকিচরা ছিলেন এক নতুন ক্রোয়েশিয়ার প্রতিনিধি, যারা আধুনিক ফুটবলের গতি আর গ্ল্যামারে বেড়ে উঠেছেন। কিন্তু প্রতিটি ম্যাচ জয়ের পর মদ্রিচরা বারবার ফিরে যেতেন ১৯৯৬ আর ১৯৯৮ সালের সেই অগ্রজদের কাছে। 

মদ্রিচ-রাকিটিচদের হাঁটার জন্য সেই রাজপথটা তৈরি করে দিয়েছিলেন সুকার-বোবানরাই।

পরবর্তীতে স্তিমাচ আর বিলিচ দুজনেই ক্রোয়েশিয়ার কোচের দায়িত্ব পালন করেছেন এবং মদ্রিচদের গড়ে তুলেছেন। তরুণদের চোখে তারা সেই প্রথম প্রজন্মের বীরদের জন্য গভীর শ্রদ্ধা দেখতেন। লুকা মদ্রিচ যখন ২০১৮ সালে ব্যালন ডি’অর জেতেন, তিনি মঞ্চে দাঁড়িয়ে তার এই পুরস্কার উৎসর্গ করেছিলেন ১৯৯৮ সালের সেই নায়কদের প্রতি।

একটি ফুটবল জাতি এভাবেই গড়ে ওঠে। কেবল একাডেমি আর আধুনিক ট্যাকটিক্স দিয়ে নয়, বরং স্মৃতির কোলাজ দিয়ে। এক প্রজন্ম রক্ত ঝরায়, কষ্ট সহ্য করে দরোজাটা খুলে দেয়; আর পরের প্রজন্ম সেই দরোজা দিয়ে রাজকীয় ভঙ্গিতে ভেতরে প্রবেশ করে।

১৯৯৮ সালে ফ্রান্স হয়তো বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়েছিল, কিন্তু ফুটবল রোমান্টিকতার ইতিহাসে ক্রোয়েশিয়া হয়ে গিয়েছিল চিরকালের জন্য ‘অমর’! 

বিশ্বকাপ শুরুর আগে মেক্সিকোতে বিক্ষোভ

ক্রীড়া ডেস্ক
বিশ্বকাপ শুরুর আগে মেক্সিকোতে বিক্ষোভ
ছবি : রয়টার্স

বিশ্বকাপ শুরুর আর মাত্র এক দিন বাকি। এর মধ্যেই অন্যতম আয়োজক দেশ মেক্সিকোতে বিক্ষোভের ঘটনা নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

স্থানীয় সংবাদমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যায়, বিপুল সংখ্যক বিক্ষোভকারী রাজধানী মেক্সিকো সিটির ঐতিহাসিক অ্যাজতেকা স্টেডিয়ামের প্রধান প্রবেশপথের সড়ক অবরোধ করে অবস্থান নিয়েছেন। ফলে ওই এলাকায় যান চলাচল ব্যাহত হয় এবং নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

জানা গেছে, চলমান বিক্ষোভের পেছনে রয়েছে মূলত দুটি বড় ইস্যু।

প্রথমত, দেশের শিক্ষকদের দীর্ঘদিনের দাবি। তারা বেতন বৃদ্ধি, পেনশন ব্যবস্থার সংস্কার এবং উন্নত কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করার দাবিতে আন্দোলন করছেন। শিক্ষক সংগঠনগুলোর অভিযোগ, জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে গেলেও তাদের বেতন ও সুযোগ-সুবিধা সেই হারে বাড়েনি।

দ্বিতীয়ত, মেক্সিকোতে নিখোঁজ হাজারো মানুষের সন্ধান এবং এ বিষয়ে সরকারের ভূমিকা নিয়ে ক্ষোভ। আন্দোলনকারীদের দাবি, বিশ্বকাপের মতো বড় আয়োজনকে সামনে রেখে সরকার দেশের সামাজিক ও মানবিক সংকটগুলো আড়াল করার চেষ্টা করছে। বিশেষ করে নিখোঁজ ব্যক্তিদের পরিবারের সদস্যরা অভিযোগ করছেন, তাদের ন্যায়বিচার ও উত্তর পাওয়ার দাবিগুলো যথাযথ গুরুত্ব পাচ্ছে না।

তবে এখনো পর্যন্ত বিক্ষোভের কারণ সম্পর্কে আনুষ্ঠানিকভাবে বিস্তারিত কিছু জানায়নি মেক্সিকো। তবে স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে কাজ করছে বলে জানা গেছে।

বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ম্যাচে দক্ষিণ আফ্রিকার মুখোমুখি হবে স্বাগতিক মেক্সিকো। সেই ম্যাচ আয়োজনের প্রস্তুতি যখন চূড়ান্ত পর্যায়ে, ঠিক তখনই এই বিক্ষোভ আয়োজকদের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ হয়ে দেখা দিয়েছে।

বিশ্বকাপ উপলক্ষে মেক্সিকো সিটিতে ইতোমধ্যেই বাড়তি নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। আয়োজকরা আশা করছেন, দ্রুত পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে এবং টুর্নামেন্ট আয়োজনের ওপর এর কোনো প্রভাব পড়বে না।

২০২৬ বিশ্বকাপ যৌথভাবে আয়োজন করছে যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকো। 

রিয়াল-বার্সা দ্বন্দ্বে আর্জেন্টাইন তারকার দাম উঠল ১৫০ মিলিয়ন, অ্যাতলেতিকোর না

ক্রীড়া ডেস্ক
রিয়াল-বার্সা দ্বন্দ্বে আর্জেন্টাইন তারকার দাম উঠল ১৫০ মিলিয়ন, অ্যাতলেতিকোর না
ছবি : রয়টার্স

স্প্যানিশ ফুটবলের দুই পরাশক্তি রিয়াল মাদ্রিদ ও বার্সেলোনা এবার দলবদলের বাজারে মুখোমুখি সংঘাতে। অ্যাতলেতিকো মাদ্রিদের আর্জেন্টাইন ফরোয়ার্ড হুলিয়ান আলভারেজকে দলে ভেড়াতে চেয়েছিল বার্সেলোনা। এবার তার জন্যই ১৫০ মিলিয়ন ইউরোর এক বিশাল প্রস্তাব দিয়ে সরাসরি প্রত্যাখ্যাত হয়েছে রিয়াল মাদ্রিদ। আর এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে লা লিগার দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ক্লাবের মধ্যকার সম্পর্ক এখন তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে। 

রবিবার ২০৩০ সাল পর্যন্ত পুনরায় সভাপতি নির্বাচিত হওয়ার পর রিয়াল মাদ্রিদ বস ফ্লোরেন্তিনো পেরেজ ঘোষণা দিয়েছিলেন, চলতি সপ্তাহেই বড় কোনো খেলোয়াড়ের জন্য বড় অঙ্কের প্রস্তাব নিয়ে মাঠে নামবেন তিনি। মঙ্গলবার বোর্ডের জরুরি সভা শেষে ‘লস ব্লাঙ্কোস’রা নিশ্চিত করে, আর্জেন্টাইন তারকা আলভারেজের জন্যই সেই ১৫০ মিলিয়ন ইউরোর প্রস্তাবটি পাঠানো হয়েছিল।

তবে অ্যাতলেতিকো মাদ্রিদ সেই প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়ে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, রিলিজ ক্লজের পুরো অর্থ ছাড়া আলভারেজকে ছাড়ার কোনো প্রশ্নই ওঠে না। ২০৩০ সাল পর্যন্ত চুক্তিবদ্ধ এই ফরোয়ার্ডের রিলিজ ক্লজ ধরা হয়েছে ৫০০ মিলিয়ন ইউরো।

শুধু রিয়াল মাদ্রিদই নয়, আলভারেজকে দলে ভেড়াতে বার্সেলোনা, আর্সেনাল এবং পিএসজির মতো জায়ান্টরাও মুখিয়ে আছে। ইএসপিএন-এর খবর অনুযায়ী, রবার্ট লেভানডভস্কির বিকল্প হিসেবে আলভারেজকে পেতে ১০০ মিলিয়ন ইউরোর প্রস্তাব দিয়েছিল বার্সা। তবে বার্সেলোনার সেই চেষ্টা মোটেও ভালোভাবে নেয়নি অ্যাতলেতিকো। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কাতালান ক্লাবটিকে ‘ভুয়া খবর এবং ক্রমাগত অসম্মান করার’ দায়ে রীতিমতো ধুয়ে দিয়েছিল তারা। 

রিয়াল মাদ্রিদের প্রস্তাব ফিরিয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রেও অ্যাতলেতিকোর সুর ছিল একই রকম ঝাঁজালো। মাদ্রিদের প্রস্তাবের জবাবে সামাজিক মাধ্যমে তারা লেখে, ‘আপনারা সম্ভবত ভদ্রতাকে কৃতজ্ঞতা ভেবে ভুল করেছেন। কোনো দ্বিধা না রেখেই বলছি, আমরা আপনাদের ধন্যবাদ দিচ্ছি না। হুলিয়ানের জন্য কোনো প্রস্তাব খতিয়ে দেখার প্রশ্নই আসে না। আপনাদের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক খারাপ হবে কেন, আপনারা তো আমাদের বার্সার চেয়েও বেশি হাসান!’ 

বিশ্বকাপে ১২ গোলের একটিও পেনাল্টি থেকে করেননি পেলে

ক্রীড়া ডেস্ক
বিশ্বকাপে ১২ গোলের একটিও পেনাল্টি থেকে করেননি পেলে
তিন বিশ্বকাপ হাতে পেলে। ছবি : সংগৃহীত

ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা কিংবদন্তি পেলে বিশ্বকাপে অসংখ্য স্মরণীয় মুহূর্ত উপহার দিয়েছেন। চারটি বিশ্বকাপ খেলে ১৪ ম্যাচে ১২ গোল করা এই ব্রাজিলিয়ান মহাতারকার একটি অনন্য কীর্তি হলো, তার বিশ্বকাপের ১২ গোলের একটিও পেনাল্টি থেকে আসেনি।

১৯৫৮, ১৯৬২, ১৯৬৬ ও ১৯৭০ বিশ্বকাপে অংশ নেওয়া পেলে তার সবগুলো গোলই করেছেন ওপেন প্লে কিংবা ফ্রি-কিক থেকে। বিশ্বকাপ ইতিহাসের অন্যতম সেরা গোলদাতাদের তালিকায় থাকলেও তিনি কখনো স্পটকিকের সাহায্যে গোলের সংখ্যা বাড়াননি।

১৯৫৮ সালের বিশ্বকাপে মাত্র ১৭ বছর বয়সে ছয় গোল করে ব্রাজিলকে শিরোপা জেতাতে বড় ভূমিকা রাখেন পেলে। ওয়েলসের বিপক্ষে কোয়ার্টার ফাইনালে জয়সূচক গোল, ফ্রান্সের বিপক্ষে সেমিফাইনালে হ্যাটট্রিক এবং স্বাগতিক সুইডেনের বিপক্ষে ফাইনালে জোড়া গোল—সবই ছিল ওপেন প্লে থেকে।

১৯৬২ বিশ্বকাপে মেক্সিকোর বিপক্ষে দুর্দান্ত একক প্রচেষ্টায় গোল করার পর চোটে পড়েন তিনি। ১৯৬৬ বিশ্বকাপে বুলগেরিয়ার বিপক্ষে একটি ফ্রি-কিক থেকে গোল করেন। আর ১৯৭০ বিশ্বকাপে চেকোস্লোভাকিয়া ও রোমানিয়ার বিপক্ষে চার গোল করে ব্রাজিলের তৃতীয় বিশ্বকাপ জয়ে অবদান রাখেন।

বর্তমান ফুটবলে যেখানে অনেক তারকা ফুটবলারের গোলসংখ্যার বড় অংশই পেনাল্টি থেকে আসে, সেখানে পেলের বিশ্বকাপের ১২ গোলের সবকটিই এসেছে ওপেন প্লে থেকেই। এ কারণেই তার গোলগুলোকে অনেক ফুটবল বিশ্লেষক বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে থাকেন।

বিশ্বকাপ ইতিহাসে সর্বাধিক গোলদাতাদের তালিকায় পেলে বর্তমানে শীর্ষ পাঁচের মধ্যে রয়েছেন। তার সামনে আছেন শুধু মিরোস্লাভ ক্লোজা, (১৬), রোনালদো নাজারিও (১৫) এবং গার্ড মুলার ও জাস্ট ফন্টেইন (১৪)। ১৩ গোল নিয়ে আছেন চতুর্থ মেসি। ১২ গোল নিয়ে পরের অবস্থানে পেলে ও এমবাপ্পে।