ফুটবল বিশ্বকাপের মঞ্চে একদিকে যেমন থাকে গোল করার মরিয়া উন্মাদনা, অন্যদিকে তেমনই থাকে রক্ষণভাগকে ইস্পাতকঠিন দেয়ালে পরিণত করার সুনিপুণ কৌশল। কিন্তু মাঠের গনগনে উত্তেজনা, ট্যাকটিক্যাল ভুল কিংবা দুই দলের শক্তির আকাশ-পাতাল ব্যবধান মিলিয়ে মাঝেমধ্যেই সবুজ গালিচায় এমন কিছু ম্যাচের জন্ম হয়, যা রূপ নেয় অবিশ্বাস্য গোলবন্যা।
বিশ্বকাপের সুদীর্ঘ ইতিহাসে এমন কিছু অবিস্মরণীয় ম্যাচ রয়েছে, যেখানে প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগকে খড়কুটোর মতো উড়িয়ে দিয়ে গোলের মহোৎসব মেতেছিল আক্রমণভাগ। কখনো দুই দলের শক্তির বিশাল ফারাক, আবার কখনো অল-আউট অ্যাটাকিং ফুটবলের পসরা সাজিয়ে তৈরি হয়েছে এই ঐতিহাসিক ম্যাচগুলো।
বিশ্বকাপের ইতিহাসে এক ম্যাচে এককভাবে সর্বোচ্চ গোল করার অনন্য ও অক্ষুণ্ন রেকর্ডটি এখনো নিজেদের করে রেখেছে হাঙ্গেরি। ১৯৮২ সালের বিশ্বকাপে এল সালভাদরের রক্ষণভাগকে গুঁড়িয়ে দিয়ে ১০-১ গোলের বিশাল ব্যবধানে জয় পেয়েছিল তারা। বিশ্বকাপের মঞ্চে কোনো দলের এক ম্যাচে ১০ গোল করার কীর্তি এটাই প্রথম ও শেষ।
শুধু ১০ গোলই নয়, বিশ্বকাপের ইতিহাসে ৯ গোলের জয়ের রেকর্ডও রয়েছে হাঙ্গেরির ঝুলিতে। ১৯৫৪ সালের বিশ্বকাপে দক্ষিণ কোরিয়াকে ৯-০ গোলে ভাসিয়ে দিয়েছিল তারা। একই আসরের গ্রুপ পর্বে শক্তিশালী পশ্চিম জার্মানিকে ৮-৩ ব্যবধানে হারিয়ে নিজেদের শক্তিমত্তার জানান দিয়েছিল হাঙ্গেরির তৎকালীন 'ম্যাজিকাল ম্যাগিয়ার্স' দলটি।
১৯৭৪ সালের বিশ্বকাপে জাইরের (বর্তমান কঙ্গো) মুখোমুখি হয়েছিল যুগোস্লাভিয়া। গ্রুপ পর্বের সেই ম্যাচে জাইরকে ৯-০ গোলে বিধ্বস্ত করে বিশ্বকাপ ইতিহাসের অন্যতম বড় ব্যবধানের জয়টি তুলে নেয় তারা।
বিশ্বকাপের ইতিহাসে এক ম্যাচে দুই দল মিলিয়ে সর্বোচ্চ গোলের রোমাঞ্চকর রেকর্ডটি হয়েছিল ১৯৫৪ আসরে। কোয়ার্টার ফাইনালে সুইজারল্যান্ডের মুখোমুখি হয়েছিল অস্ট্রিয়া। রক্ষণ ভুলে আক্রমণ আর প্রতি-আক্রমণের সেই রুদ্ধশ্বাস ম্যাচে সুইজারল্যান্ডকে ৭-৫ গোলে হারায় অস্ট্রিয়া। ‘ব্যাটল অব লসান’ নামে খ্যাত এই ম্যাচে মোট ১২টি গোল হয়েছিল, যা আজ পর্যন্ত ভাঙতে পারেনি কেউ।
১৯৫৪ সালে পশ্চিম জার্মানি বনাম তুরস্কের প্লে-অফ ম্যাচে তুর্কিদের ৭-২ গোলে উড়িয়ে দিয়েছিল জার্মানরা। ১৯৫৮ সালের বিশ্বকাপে প্যারাগুয়ের বিপক্ষে আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলে ৭-৩ ব্যবধানের বড় জয় পায় ফ্রান্স।
সাম্প্রতিক ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ধাক্কা এবং রোমাঞ্চকর ম্যাচটি এসেছিল ২০১৪ সালে। ব্রাজিলের মাটিতে অনুষ্ঠিত সেই বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে স্বাগতিক সেলেসাওদের ৭-১ গোলে স্তব্ধ করে দেয় জার্মানি। ঘরের মাঠে ব্রাজিলের ফুটবল ইতিহাসের এই চিরকালের ক্ষতটি আধুনিক বিশ্বকাপের অন্যতম বড় ব্যবধানের জয়-পরাজয় হিসেবে টিকে থাকবে।
সামনে কড়া নাড়ছে ২০২৬ বিশ্বকাপ। ফুটবলপ্রেমীদের উন্মাদনা আর আগ্রহ এখন তুঙ্গে। নতুন নিয়মে বড় পরিসরে আয়োজিত হতে যাওয়া আসন্ন এই আসরে গোলবন্যার এমন কোনো নতুন রেকর্ড যুক্ত হয় কি না, এখন সেদিকেই চোখ বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি ফুটবল সমর্থকের!