• ই-পেপার

বিসিবি নির্বাচন

সর্বোচ্চ ভোট পেয়ে পরিচালক হলেন তামিম ইকবাল

বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বিসিবির সভাপতি তামিম ইকবাল

ক্রীড়া প্রতিবেদক
বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বিসিবির সভাপতি তামিম ইকবাল
তামিম ইকবাল। ছবি: কালের কণ্ঠ

অ্যাডহক কমিটির সভাপতি হিসেবে দুই মাস দায়িত্ব পালনের পর এবার বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) নির্বাচিত সভাপতি হলেন তামিম ইকবাল। 

আজ রবিবার (৭ জুন) মিরপুর শের-ই-বাংলা স্টেডিয়াম সংলগ্ন বিসিবি কার্যালয়ে বোর্ড পরিচালনা পর্ষদের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। সন্ধ্যায় ভোট গণনা শেষে জানা যায়, তামিম সর্বোচ্চ ৭৩ ভোট পেয়েছেন।

এখন পর্যন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে ফল ঘোষণা করা হয়নি। তবে একটি সূত্র থেকে জানা গেছে, বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বিসিবির সভাপতি নির্বাচিত হয়েছেন তামিম। বোর্ডের শীর্ষ পদে ১৭তম ব্যক্তি হিসাবে দায়িত্ব নিতে যাচ্ছেন সাবেক এই অধিনায়ক। নির্বাচিত সভাপতি হিসেবে বিসিবিতে তিনি ষষ্ঠ। 

সহ-সভাপতি পদে নির্বাচিত হয়েছেন ফাহিম সিনহা। তিনিও বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছেন।

৫৬৪ রানে ইনিংস ঘোষণা ভারতের, মানব সুতারের ঘূর্ণিতে ধুঁকল আফগানিস্তান

ক্রীড়া ডেস্ক
৫৬৪ রানে ইনিংস ঘোষণা ভারতের, মানব সুতারের ঘূর্ণিতে ধুঁকল আফগানিস্তান
ছবি : পিটিআই

টেস্টের প্রথম দিন চালকের আসনে থেকে দিনে দিনে ব্যাটিংয়ে নামে ভারতীয় দল। দ্বিতীয় দিনেও গিল ও পন্থের সাবলীল শুরুতে ভারতের দাপুট অব্যাহত থাকে। গিল-পন্থ-সুন্দরের ব্যাটিংয়ে ৫৬৪ রানের বড় সংগ্রহে ইনিংস ঘোষণা করে ভারত। জবাবে আফগানিস্তানের রান দ্বিতীয় দিনের শেষে ৫ উইকেটে ১১৩। ভারতের থেকে এখনো ৪৫১ রানে পিছিয়ে আফগানিস্তান।

মুল্লানপুরে টেস্টের দ্বিতীয় দিন শুরুতে গিলকে ফেরানো সুযোগ পেয়েছিল আফগানরা। প্রথম দিনের পর দ্বিতীয় দিনেও আফগানিস্তানের দুটি ভুল ভারতকে বড় সংগ্রহে সাহায্য করে। 

ইনিংসের ৮৯ ওভারে আজমাতুল্লার বলে গিলের প্যাডে লাগলে এলবিডব্লিউয়ের আবেদন করে আফগান ক্রিকেটারেরা। আম্পায়ার আউট দেননি। আফগানিস্তানের অধিনায়ক হাসমাতুল্লা শাহিদি উইকেটরক্ষক জাজাইকে জিজ্ঞাসা করেন, রিভিউ নেবেন কি না? তাতে জাজাই সাড়া না দিলে রিভিউ নেওয়া থেকে বিরত থাকে আফগান অধিনায়ক।

পরে রিপ্লেতে দেখা যায়, বল গিয়ে অফ ও লেগ স্টাম্পে লাগছিল।  রিভিউ নিলে গিল নিশ্চিত আউট হতেন। তখন ১০৮ রানে খেলছিলেন শুভমন। পরে করেন ১২৬ রান সালিমের বলে জাজাইয়ের তালুবন্দি হন।

একই ওভারে পন্থের উইকেটও পেতে পারতেন আজমাতুল্লা। কিন্তু তার বল খেলতে গিয়ে ব্যাট ঘেঁষে উইকেটরক্ষকের কাছে যায়। আবার আউটের আবেদন করেন আফগান ক্রিকেটাররা। আম্পায়ার আউট দেননি। সবাইকে অবাক করে দিয়ে আবার রিভিউ নেননি শাহিদি। পরে দেখা যায়, পন্থ খোঁচা মেরেছিলেন। সেই সময় ৬৩ রানে খেলছিলেন তিনি। পরে সেই রান বাড়িয়ে পন্থ ৮১ রানে শাহিদির করা ১০২তম ওভারে আউট হন।

 পর পর দুবার ভুল সিদ্ধান্ত মানতে পারেননি রহমানুল্লা গুরবাজ। তিনি প্রকাশ্যে অধিনাককে প্রশ্ন করেন, কেন তিনি রিভিউ নিলেন না। 

ওই দিন রান পেয়েছেন ওয়াশিংটন সুন্দরও। আইপিএলে ভাল ব্যাট করেছেন তিনি। সেই ফর্ম টেস্ট ম্যাচেও দেখা গেল তার। দ্বিতীয় দিনে ৫২ রানে অপরাজিত থাকলেন তিনি। সুন্দরের হাফ সেঞ্চুরির পরেই ইনিংস ঘোষনা করেন অধিনায়ক গিল।

ভারতের বড় সংগ্রহে আফগান বোলিংয়ে নজর কাড়েন সালিম সাফি। এই আফগান পেসার ভারতের ৮ উইকেটের মধ্যে ৬টিই নিয়েছেন। ২৭ ওভার বল করে দিয়েছেন ১৪০ রান। বাকিদের তাঁকে দেখে শেখা উচিত ছিল। সারা ক্ষণ আক্রমণাত্মক বল করেছেন তিনি। তাতে রান হলেও উইকেটের সুযোগ তৈরি করতে পেরেছেন।

এরপর ব্যাটিংয়ে নেমে দ্রুত উইকেট তুলে আফগানদের চেপে ধরে ভারত। ষষ্ঠ ওভারে অভিষেক টেস্টে বল করতে এসে চতুর্থ বলে ওপেনার আব্দুল মালিককে আউট করে জুটি ভাঙ্গেন মানব সুতার।

ব্যাটিংয়ে থিতু হওয়ার আগে নবম ওভারে প্রসিদ্ধরে শিকার হন সেদিকুল্লা অটল। ৪০ রানে ২ উইকেট হারিয়ে চাপে পড়ে যায় সফরকারীরা। স্কোর বোর্ডে ২২ রান যোগ করতেই আরেক ইউকেট হারান আফগানরা। অভিষেক্ত সুতারের দ্বিতীয় শিকার হন গুররবাজ।

অভিষেকে নিজের জাত চেনান সুতার। বলে যেমন ঘুরছিলো তেমন গতি ছিল চোখ ধাঁধানো। চতুর্থ উইকেটে রহমত শাহ ও অধিনায়ক শাহিদির মধ্যে জুটি কিছুটা বিপর্যয় সামাল দেওয়ার চেষ্টা করে। 

৩৩ ওভারে ২০ রান করা অধিনায়ক শাহিদিকে ফিরিয়ে জুটি ভাঙেন প্রসিদ্ধ। দিনের শেষে জাজাইকে আউট করেন আফগানদের ব্যাকফুটে ঢেলে দেন সুতার। সেই উইকেট পড়ার পরেই দিনের খেলা শেষ হয়। সুতার ১৫.৫ ওভারে ২১ রান দিয়ে ৩ উইকেট নিয়েছেন।

ইরাকের স্ট্রাইকারকে যুক্তরাষ্ট্রের বিমানবন্দরে ৭ ঘণ্টা জিজ্ঞাসাবাদ

ক্রীড়া ডেস্ক
ইরাকের স্ট্রাইকারকে যুক্তরাষ্ট্রের বিমানবন্দরে ৭ ঘণ্টা জিজ্ঞাসাবাদ
ইরাকের স্ট্রাইকার আয়মেন হুসেন। ছবি : ফিফা

বাছাই পর্বের প্লে-অফে আয়মেন হুসেনের জয়সূচক গোলে ৪০ বছর পর বিশ্বকাপের টিকিট পেয়েছে ইরাক। সেই আয়মেনই কি না যুক্তরাষ্ট্রে বিশ্বকাপ খেলতে গিয়ে এক প্রকার হয়রানির শিকার হলেন!

শিকাগোর ও’হেয়ার বিমানবন্দরে আয়মেনকে ৭ ঘণ্টা আটকে রেখে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে মার্কিন কর্তৃপক্ষ। এমনকি ৩০ বছর বয়সী এই স্ট্রাইকারের মুঠোফোন কেড়ে নিয়ে পরীক্ষাও করা হয়েছে। বার্তা সংস্থা রয়টার্স এই তথ্য জানিয়েছে। 

শেষ পর্যন্ত অবশ্য আয়মেনকে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। তবে ইরাক দলের আলোকচিত্রী তালাল সালাহকে ১০ ঘণ্টা আটকে রাখার পরও দেশটিতে ঢুকতে দেওয়া হয়নি। 

মার্কিন কর্তৃপক্ষের এমন কঠোরতায় ইরাকিদের মধ্যে ক্ষোভ ও শঙ্কা দেখা দিয়েছে। ইরাকের সংবাদমাধ্যমগুলোর দাবি, বিশ্বকাপ খেলতে ইরাক দল যুক্তরাষ্ট্রের পৌঁছানোর পর তাদের সঙ্গে অপরাধীর মতো আচরণ করা হয়েছে। 

তবে যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক ও সীমান্ত সুরক্ষা বিভাগের দাবি, ইরাক দল বিমানবন্দরে পৌঁছানোর পরপরই স্ট্রাইকার আয়মেন হুসেনকে অতিরিক্ত স্ক্রিনিং বা বিশেষ পরীক্ষার জন্য আলাদা করা হয়। এটা আইনি কোনো জটিলতা বা গ্রেপ্তার নয়। বরং তাকে জিজ্ঞাসাবাদ এবং গভীর নিরাপত্তা যাচাইকরণের মুখোমুখি হতে হয়েছিল। পরিস্থিতি সামাল দিতে স্থানীয় কর্মকর্তারা সার্বক্ষণিক কাজ করেছেন। 

একই পরিস্থিতিতে পড়তে হয়েছে আলোকচিত্রী তালাল সালাহকেও। তার মুঠোফোন, ল্যাপটপ ও অন্যান্য ইলেকট্রনিক ডিভাইস পরীক্ষা করে ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষ। এরপর তাকে দেশে ফিরে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। 

যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন ও শুল্ক আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কাছে এ ব্যাপারে জানতে চাওয়া হলেও তারা এখনো কোনো সাড়া দেয়নি। ইরাক ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনও আনুষ্ঠানিক বিবৃতি দেয়নি। 

১৯৮৬ বিশ্বকাপ

ফুটবলের জাদুকর ম্যারাডোনার একচ্ছত্র আধিপত্যের মহাকাব্য

ফুয়াদ হাসান
ফুটবলের জাদুকর ম্যারাডোনার একচ্ছত্র আধিপত্যের মহাকাব্য
সংগৃহীত ছবি

১৯৮৬ সালের মেক্সিকো ফিফা বিশ্বকাপ কেবল ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা আসরই ছিল না, ওটা ছিল এমন এক মহাজাগতিক মঞ্চ, যেখানে জন্ম নিয়েছিল এক অমর উপাখ্যান। বিগত ৬০ বছরের ফুটবল ইতিহাসে বিশ্বমঞ্চে আর কোনো একক ফুটবলার ডিয়েগো আরমান্দো ম্যারাডোনার মতো এতটা একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করতে পারেননি। ‘এল ডিয়েগো’ সেবার আর্জেন্টিনাকে যেভাবে টেনে নিয়ে গিয়েছিলেন, তা ফুটবলীয় ব্যাকরণ ছাপিয়ে ছুঁয়েছিল ঈশ্বরের স্বর্গীয় সীমানা!

ম্যারাডোনা মেক্সিকোর মাটিতে পা রেখেছিলেন যেন এক ‘বিধাতার মনোনীত পুরুষ’ হিসেবে। ইতালিয়ান সেরি-আ লিগে তিনি ততদিনে বড় তারকা, কিন্তু কার্লোস বিলার্দোর অধীনে আর্জেন্টিনা দল মেক্সিকো এসেছিল একরাশ সমালোচনা আর সন্দেহ সঙ্গী করে। 

বিশ্বকাপের আগের প্রস্তুতিটা ছিল তুমুল অশান্ত। ফ্রান্স আর নরওয়ের কাছে হার, দলের ভেতরের থমথমে পরিবেশ। কিন্তু ইসরাইলের বিরুদ্ধে শেষ প্রীতি ম্যাচে ডিয়েগোর জোড়া গোল যেন সব মেঘ কেটে যাওয়ার এক পূর্বাভাস ছিল। ওটা ছিল বিশেষ কিছু একটা আসতে চলেছে এমন এক অবিনাশী সংকেত!

এস্তাদিও অলিম্পিকো ইউনিভার্সিটারিও স্টেডিয়ামের তপ্ত রোদে দক্ষিণ কোরিয়ার বিরুদ্ধে শুরু হলো আর্জেন্টিনার শিরোপার মিশন। ওটা ফুটবল ম্যাচ ছিল না, ছিল আক্ষরিক অর্থেই এক পৈশাচিক যুদ্ধ। সেই ম্যাচে ম্যারাডোনাকে ফাউল করা হয়েছিল ১২ বার... হ্যাঁ, গুনে গুনে বারো বার! প্রতিপক্ষের ডিফেন্ডারদের কাছে ডিয়েগোকে থামানোর আর কোনো উপায়ই জানা ছিল না। আর্জেন্টিনা ম্যাচটি ৩-১ ব্যবধানে জিতলেও, স্কোরের চেয়ে বড় সত্য ছিল, মাঠের সবকিছুই আবর্তিত হচ্ছিল ম্যারাডোনাকে কেন্দ্র করে। দলের তিনটি গোলের তিনটি অ্যাসিস্টই এসেছিল তার পা থেকে। এক খাঁটি মাস্টারক্লাস!

এরপর সামনে এলো বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ইতালি। তাদের সেই দুর্ভেদ্য ‘কাতেনাচিও’ ডিফেন্স, কড়া ট্যাকল আর সাপের মতো পেঁচিয়ে ধরা ম্যান-মার্কিং। ম্যাচে শুরুতে পিছিয়ে পড়েছিল আর্জেন্টিনা। কিন্তু ৩৪তম মিনিটে দেখা মিললো সেই জাদুকরের। প্রায় শূন্য কোণ থেকে, কোনো ফাঁকা জায়গা না থাকা সত্ত্বেও এক অনবদ্য ভলিতে ইতালির জাল কাঁপিয়ে সমতা ফেরান ম্যারাডোনা। ওটা যেন অন্য কোনো গ্রহের গোল!

বুলগেরিয়ার বিরুদ্ধে ম্যাচে আর্জেন্টিনা তাদের চেনা ছন্দ পুরোপুরি খুঁজে পায়। ডিয়েগো মাঠের ভেতর খেলছিলেন একজন অর্কেস্ট্রা কন্ডাক্টরের মতো, যার ইশারায় কাঁপছিল প্রতিপক্ষের রক্ষণ। ভালদানোকে দেওয়া তার এক নিখুঁত অ্যাসিস্ট ভুলবশত অফসাইডের কারণে বাতিল হলেও, একটু পরেই তিনি উপহার দেন আরেক মাস্টারপিস। তার এক চোখধাঁধানো ক্রস থেকে বুরুচাগা গোল করে দলের ২-০ ব্যবধানের জয় নিশ্চিত করেন।

শেষ ১৬-তে অপেক্ষা করছিল উরুগুয়ে। রিও দে লা প্লাতার এক ঐতিহাসিক ক্লাসিক লড়াই। বৃষ্টি, উত্তেজনা আর বুটের নিচে হাড় ভাঙা সব ট্যাকলের এক রণক্ষেত্র। এই ম্যাচেও ম্যারাডোনা হজম করলেন আরও ১০টি ফাউল। ম্যাচের একপর্যায়ে তার নেওয়া এক ফ্রি-কিক রক্ষণ দেয়াল ফাঁকি দিয়ে পোস্টের কোণায় লেগে ফিরে আসে, স্টেডিয়ামের হাজারো দর্শক তখন স্তব্ধ! শেষ পর্যন্ত উরুগুয়েকে ১-০ গোলে হারিয়ে কোয়ার্টারে পৌঁছায় আলবিসেলেস্তেরা।

কিন্তু নিয়তি আসলে ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে মহাকাব্যিক আর অমর ম্যাচটির মঞ্চ তৈরি করে রেখেছিল ২২ জুনের জন্য।

২২ জুন, ১৯৮৬; এস্তাদিও অ্যাজটেকা স্টেডিয়াম। আর্জেন্টিনা বনাম ইংল্যান্ড। ওটা স্রেফ কোনো ফুটবল ম্যাচ ছিল না। কয়েক বছর আগের ফকল্যান্ডস বা মালভিনাস যুদ্ধের ক্ষত তখনও দুই দেশের মানুষের বুকে দগদগে টাটকা, ফলে মাঠের ভেতরের বাতাসও ছিল প্রচণ্ড বারুদে ঠাসা।

ঠিক তখনই মেক্সিকোর সবুজ ঘাস নিজের নিয়ন্ত্রণে নিলেন ডিয়েগো। প্রথমে এলো সেই বিতর্কিত ‘হ্যান্ড অব গড’ বা ঈশ্বরের হাত। ইংল্যান্ডের ডিফেন্ডারের পা লেগে বল যখন পেনাল্টি বক্সের ওপরে ভাসছিল, ইংলিশ গোলরক্ষক পিটার শিলটন ওপরে লাফিয়ে উঠলেন বল পাঞ্চ করতে। কিন্তু শিলটনকে বোকা বানিয়ে ম্যারাডোনা নিজের বাম হাত দিয়ে বল ঠেলে দিলেন জালের ভেতরে। 

পুরো ইংল্যান্ড দল প্রতিবাদ করল, গ্যালারির দর্শক থেকে শুরু করে টিভির কোটি কোটি মানুষ সেই ফাউল দেখল—দেখলেন না কেবল মাঠের রেফারি! অ্যাজটেকা স্টেডিয়াম তখন উল্লাসের এক জীবন্ত আগ্নেয়গিরি।

কিন্তু এর ঠিক চার মিনিট পর যা ঘটেছিল, তা সব বিতর্ককে এক নিমেষে রূপ দিল অমরত্বে!

মাঝমাঠের একটু ভেতরে বল পেলেন ম্যারাডোনা। নিজের অক্ষের ওপর ঝটকা টার্ন নিলেন, গতি বাড়ালেন এবং একে একে পাঁচজন ইংলিশ ডিফেন্ডারকে ড্রিবলিংয়ের মায়াজালে বোকা বানিয়ে বক্সে ঢুকে পড়লেন। বলের ওপর নিখুঁত নিয়ন্ত্রণ, অবিশ্বাস্য শারীরিক ভারসাম্য, অতিপ্রাকৃতিক গতি আর শেষে শিলটনকে ডজ দিয়ে এক ক্লিনিকাল ফিনিশ! ফুটবল ইতিহাসের সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ গোল বলা ছাড়া আর কোন বিশেষণে একে বন্দি করা যায় না। 

সেমিফাইনালে বেলজিয়ামের বিরুদ্ধেও তিনি প্রতিপক্ষের ডিফেন্সকে স্রেফ ছেলেখেলা বানিয়েছিলেন। দলের ২-০ ব্যবধানের জয়ের দুটি গোলই এসেছিল তার একক নৈপুণ্যে। বেলজিয়ামের চারজন ডিফেন্ডারকে পরাস্ত করে করা তার দ্বিতীয় গোলটি দেখে মনে হচ্ছিল—ডিয়েগো আসলে অন্য সবার চেয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন কোনো খেলা খেলছেন!

পশ্চিম জার্মানির বিরুদ্ধে ফাইনাল ম্যাচটি ছিল চরম স্নায়ুচাপের। আর্জেন্টিনা ২-০ গোলে এগিয়ে যাওয়ার পরও জার্মানরা অবিশ্বাস্যভাবে ঘুরে দাঁড়িয়ে ২-২ সমতা ফিরিয়ে আনে। ম্যাচ যখন অতিরিক্ত সময়ে গড়ানোর অপেক্ষায়, তখনই আবার জ্বলে উঠলেন সেই ফুটবলের বার্তাবাহক। জার্মানির তিন ডিফেন্ডারের পায়ের ফাঁক গলে এক চিলতে আলো দেখে ম্যারাডোনা বাড়িয়ে দিলেন এক নিখুঁত থ্রু পাস। বল পেয়ে বুলেটের গতিতে বক্সে ঢুকে গোল করলেন বুরুচাগা। আর্জেন্টিনা হয়ে গেল বিশ্বচ্যাম্পিয়ন!

বিশ্বকাপের অফিশিয়াল পরিসংখ্যান ম্যারাডোনার এই রূপকথাকে এক অকাট্য সত্যে রূপ দেয়। মাত্র ৭ ম্যাচে ৫টি গোলের পাশাপাশি ৫টি অ্যাসিস্ট। 

বিশ্বকাপের ইতিহাসে ম্যারাডোনা আজও একমাত্র খেলোয়াড়, যিনি একটি একক আসরে একই সাথে ৫টি গোল এবং ৫টি অ্যাসিস্ট করার এই অবিশ্বাস্য কীর্তি গড়েছেন। সেবার বিশ্বকাপের মঞ্চে আর্জেন্টিনার করা মোট গোলের ৭১ শতাংশই গোলই এসেছিল সরাসরি ম্যারাডোনার পা থেকে অথবা তার অ্যাসিস্ট থেকে! পুরো টুর্নামেন্টে তিনি একাই প্রতিপক্ষের ডিফেন্স ভেঙে তৈরি করেছিলেন প্রায় ১৮টি নিশ্চিত গোলের সুযোগ।

মেক্সিকো ৮৬ স্রেফ কোনো বিশ্বকাপ ছিল না। ওটা ছিল ফিফা বিশ্বকাপের ইতিহাসে কোনো একজন একক ফুটবলারের সবচেয়ে একচ্ছত্র, প্রভাবশালী ও জাদুকরী পারফরম্যান্সের এক জীবন্ত দলিল। 

ওটা ছিল ডিয়েগো আরমান্দো ম্যারাডোনার এক পায়ে বল, পুরো টুর্নামেন্ট এবং... শেষ পর্যন্ত ফুটবল ইতিহাসকে চিরকালের জন্য নিজের পকেটে পুরে নেওয়ার এক নান্দনিক গল্প!