ক্রীড়াঙ্গনে পেনাল্টি শুটআউট মানেই চরম উত্তেজনা, বুক ধড়ফড়ানি আর শেষ মুহূর্তের স্নায়ুযুদ্ধ। ১৯৭৮ বিশ্বকাপে প্রথম টাইব্রেকার নিয়ম চালু হলেও মাঠের লড়াইয়ে এর দেখা মেলে ১৯৮২ সালে। এর পর থেকে বিশ্বমঞ্চে ফুটবলারদের ভাগ্য নির্ধারণে বড় এক নিয়ামক হয়ে দাঁড়িয়েছে এই পেনাল্টি শুটআউট।
আসন্ন মেগা আসরকে সামনে রেখে একনজরে দেখে নেওয়া যাক বিশ্বকাপের টাইব্রেকার ইতিহাসের কিছু অবিশ্বাস্য ও রোমাঞ্চকর পরিসংখ্যান—
৩৫টি শুটআউটের রোমাঞ্চকর ইতিহাস
বিশ্বকাপের ইতিহাসে এখন পর্যন্ত মোট ৩৫টি ম্যাচ গড়িয়েছে পেনাল্টি শুটআউটে। যার সূচনা হয়েছিল ১৯৮২ সালের ৮ জুন, জার্মানি ও ফ্রান্সের মধ্যকার সেই বিখ্যাত সেমিফাইনাল দিয়ে। নির্ধারিত ও অতিরিক্ত সময়ের খেলা ৩-৩ গোলে ড্র হওয়ার পর টাইব্রেকারে ফ্রান্সকে ৫-৪ ব্যবধানে বিদায় করে ফাইনালে উঠেছিল তৎকালীন পশ্চিম জার্মানি।
ইতিহাসের সবচেয়ে বেশি শুটআউট দেখার রেকর্ডটি একদম টাটকা। ২০২২ কাতার বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ ৫টি ম্যাচ টাইব্রেকারে গড়ায়, যার মধ্যে ছিল আর্জেন্টিনা ও ফ্রান্সের মধ্যকার মহাকাব্যিক ফাইনালটিও। এর আগে ১৯৯০, ২০০৬, ২০১৪ এবং ২০১৮ বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ ৪টি করে ম্যাচ শুটআউটে গড়িয়েছিল। মজার ব্যাপার হলো, ১৯৭৮ সালে নিয়ম চালুর পর কেবল ওই বিশ্বকাপেই কোনো ম্যাচ টাইব্রেকারে যায়নি!
সফলতার চূড়ায় জার্মানি-ক্রোয়েশিয়া, ট্র্যাজেডির নায়ক স্পেন
বিশ্বকাপের টাইব্রেকারে সবচেয়ে ‘ভীতিকর’ এবং অপরাজেয় দুটি দল হলো জার্মানি ও ক্রোয়েশিয়া। দুই দলই এখন পর্যন্ত ৪টি করে শুটআউটে অংশ নিয়ে প্রতিটিতেই জয়ের শতভাগ রেকর্ড ধরে রেখেছে। জার্মানি তাদের চার জয় পায় ১৯৮২, ১৯৮৬, ১৯৯০ এবং ২০০৬ সালে। অন্যদিকে, ক্রোয়েশিয়া ২০১৮ ও ২০২২ বিশ্বকাপে ব্যাক-টু-ব্যাক দুটি করে শুটআউট জিতে এই এলিট ক্লাবে জায়গা করে নেয়।
সবচেয়ে বেশি ৭ বার শুটআউটের মুখোমুখি হয়ে ৬ বারই জিতে রেকর্ড গড়েছে আলবিসেলেস্তেরা। ২০০৬ সালে জার্মানির কাছে হার ছাড়া প্রতিটি টাইব্রেকারেই শেষ হাসি হেসেছে আর্জেন্টিনা।
বিপরীতে, পেনাল্টি শুটআউট মানেই স্পেনের জন্য এক দুঃস্বপ্ন। ৫ বার টাইব্রেকারের মুখোমুখি হয়ে ৪ বারই হেরেছে তারা। ২০২২ বিশ্বকাপে মরক্কোর কাছে স্প্যানিশদের ৩-০ ব্যবধানের হারটি ছিল সবচেয়ে লজ্জাজনক, যেখানে একটি শটও জালে জড়াতে পারেনি তারা। এ ছাড়া ইংল্যান্ড, ইতালি, ফ্রান্স ও নেদারল্যান্ডস—এই চার পরাশক্তিই সর্বোচ্চ ৩টি করে শুটআউট হেরে ট্র্যাজেডির শিকার হয়েছে।
দীর্ঘতম ও সংক্ষিপ্ততম শুটআউট
বিশ্বকাপ ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘতম শুটআউটে শট নেওয়া হয়েছে ১২টি করে। এমনটি ঘটেছে মাত্র দুইবার—১৯৮২ সালে জার্মানি বনাম ফ্রান্স এবং ১৯৯৪ সালে সুইডেন বনাম রোমানিয়া ম্যাচে। দুই ম্যাচেই টাইব্রেকারের ফল আসে ৫-৪ ব্যবধানে।
অন্যদিকে, সবচেয়ে কম ৭টি শটেই ফয়সালা হওয়া শুটআউট রয়েছে ৩টি। ১৯৮৬ সালে মেক্সিকোর বিপক্ষে জার্মানি, ২০০৬ সালে সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে ইউক্রেন এবং ২০২২ সালে স্পেনের বিপক্ষে মরক্কো। শেষ দুটি ম্যাচে সুইজারল্যান্ড ও স্পেন তাদের নেওয়া ৩টি শটের একটিও গোল করতে পারেনি!
গোলপোস্টের নিচে যারাই ত্রাতা
টাইব্রেকারে গোলরক্ষকদের বীরত্ব সবসময়ই আলাদা মাত্রা যোগ করে। বিশ্বকাপের এক শুটআউটে সর্বোচ্চ ৩টি পেনাল্টি সেভ করার কীর্তি আছে তিনজনের। ২০০৬ সালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে পর্তুগালের রিকার্ডো প্রথম এই কীর্তি গড়েন। এরপর ২০১৮ সালে ডেনমার্কের বিপক্ষে ক্রোয়েশিয়ার দানিয়েল সুবাসিচ এবং ২০২২ সালে জাপানের বিপক্ষে একই দেশের ডমিনিক লিভাকোভিচ ৩টি করে শট ঠেকিয়ে দেন।
আবার শুটআউটে একটি গোলও হজম না করার অনন্য রেকর্ড রয়েছে দুজনের। ২০০৬ সালে সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে ইউক্রেনের ওলেক্সান্দর শভকোভস্কি এবং ২০২২ সালে স্পেনের বিপক্ষে মরক্কোর ইয়াসিন বুনু নিজেদের জাল অক্ষত রেখে দলকে জিতিয়েছিলেন।
খেলোয়াড়দের ব্যক্তিগত রেকর্ড
বিশ্বকাপের ইতিহাসে মাত্র তিনজন ফুটবলার তিনটি ভিন্ন ভিন্ন পেনাল্টি শুটআউটে শট নেওয়ার সুযোগ পেয়েছেন—রবার্তো ব্যাজিও, লিওনেল মেসি এবং লুকা মদরিচ। এর মধ্যে মেসি ও মদরিচ তাদের নেওয়া ৩টি শটেই গোল করেছেন এবং দলও জিতেছে। অন্যদিকে, ১৯৯৪ বিশ্বকাপের ফাইনালে ব্রাজিলের বিপক্ষে ব্যাজিওর সেই বিখ্যাত পেনাল্টি মিস ইতালিকে কাঁদিয়েছিল।
এ ছাড়া ক্রোয়েশিয়ার ইভান রাকিতিচ একমাত্র খেলোয়াড়, যিনি ২০১৮ বিশ্বকাপে ডেনমার্ক ও রাশিয়া—দুই ম্যাচেই দলের হয়ে জয়সূচক শেষ পেনাল্টিটি স্কোর করেছিলেন।
মনস্তাত্ত্বিক খেলা ও গোল করার কৌশল
পরিসংখ্যান বলছে, টাইব্রেকারে অষ্টম পেনাল্টি শটটি নেওয়া খেলোয়াড়দের ওপর সবচেয়ে বেশি চাপ থাকে। এই পজিশনে গোল করার হার মাত্র ৫৯.৪ শতাংশ। প্রথম তিনটি শটের ক্ষেত্রে সাফল্যের হার ৭১ শতাংশের ওপরে থাকলেও, চতুর্থ ও পঞ্চম শটে তা কমে দাঁড়ায় ৬৪ শতাংশে।
ঐতিহাসিক তথ্য বলছে, গোলপোস্টের ওপরের এক-তৃতীয়াংশ বা টপ কর্নার লক্ষ্য করে নেওয়া ৩৯টি শটের একটিও গোলরক্ষকরা ঠেকাতে পারেননি! অর্থাৎ, ওপরের দিকে নিখুঁত শট নিলে গোল হওয়ার সম্ভাবনা শতভাগ। তবে এতে বল পোস্টের ওপর দিয়ে চলে যাওয়ার আকাশচুম্বী ঝুঁকিও থাকে, যার সবচেয়ে বড় উদাহরণ ১৯৯৪ ফাইনালে ব্যাজিওর সেই হৃদয়ভঙ্গ করা শট।





