• ই-পেপার

মন্ত্রীর মর্যাদা ভারতে, বাংলাদেশে নিছক রাষ্ট্রদূত

তিস্তায় স্বস্তি : চীন সফরে বাংলাদেশের নদী ব্যবস্থাপনার খুঁটি গাড়লেন প্রধানমন্ত্রী

মোস্তফা কামাল
তিস্তায় স্বস্তি : চীন সফরে বাংলাদেশের নদী ব্যবস্থাপনার খুঁটি গাড়লেন প্রধানমন্ত্রী

সবে ঐতিহাসিক কারবালার ইতিহাস ও দর্শনের আলোকে পবিত্র আশুরা পালন হয়েছে। সে পানি বড় প্রাসঙ্গিক। অন্যতম প্রধান বিষয়ও। পানির জন্য হাহাকার কারবালার ট্র্যাজেডিকে এক চরম রূপ দেয়। কারবালার যুদ্ধের মূল শিক্ষা হলো—সব মানুষের পানির ওপর সমান অধিকার রয়েছে এবং অন্যায়ভাবে কাউকে পানির হক থেকে বঞ্চিত করা যাবে না। প্রতিবেশীর ভূমিকায় বাংলাদেশ পানি প্রশ্নে বড় অভাগা। মারা কেবল ভাতে বা হাতে হয় না, পানিতেও যে হতে পারে, তা দেখিয়ে চলছে ভারত। আগ্রাসন বা আধিপত্য বিশ্বসভ্যতার ক্রমোন্নতির সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িয়ে আছে পানির সহজলভ্যতা ও নদ-নদীর প্রবাহ। নীলনদের তীরে গড়ে ওঠা মিসরীয় সভ্যতা, টাইগ্রিস-ইউফ্রেটিস বা দজলা-ফোরাতের তীরে গড়ে ওঠা মেসোপটোমিয়া সভ্যতা, সিন্ধুর তীরে সিন্ধু সভ্যতা এবং গঙ্গার তীরে গড়ে ওঠা প্রাচীন ভারতীয় ও বাংলার সভ্যতার বাইরে এশিয়া-আফ্রিকার ঐতিহাসিক বিবর্তনকে কল্পনা করা যায় না। ঠিক একইভাবে টেম্স, ভলগা, দানিউব ও রাইন নদীকে ঘিরেই তৈরি হয়েছিল ইউরোপের গড়ে ওঠার ইতিহাস।

কারবালার পানি নিয়ে যে দুঃখজনক ও নির্মম রাজনীতির সূচনা এর পরিণতিও ভোগ করতে হবে বিশ্ব মানবকে। তাই আজ পানি বিভিন্ন দেশের মধ্যে বিরোধের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। ফলে উদ্বিগ্ন হয়ে উঠছে অন্য দেশগুলো। নানান ঘটনা ও ঐতিহাসিক তথ্য সামনে এনে তাই কারো কারো মতে, পৃথিবীতে পানি নিয়ে যত যুদ্ধ বিগ্রহ হয়েছে অন্য কিছু নিয়ে এত হয়নি। পানি এবং এর হিস্যার কেওয়াজ পৃথিবীতে আজও বিদ্যমান। হাজার হাজার বছর ধরে দেশে দেশে প্রবাহমান এসব নদ-নদী এখনো যথারীতি প্রবাহিত। নদী উপত্যকা ও অববাহিকার কোটি কোটি মানুষের জীবন-জীবিকা, ভূ-প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্য এসব নদীর পানি ও নাব্যতার ওপর একচ্ছত্রভাবে নির্ভরশীল। নদ-নদীর পানি প্রবাহ অবারিত রাখা রাষ্ট্রের রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্বের চেয়ে কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। নগর সভ্যতা ও শিল্প-বিজ্ঞানের অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সংঘাত বেড়ে যাওয়ার প্রেক্ষাপটে জাতিসংঘের মতো আন্তর্জাতিক ফোরাম গঠনে ট্রান্সবাউন্ডারি বা যৌথনদীর পানিকেন্দ্রিক আঞ্চলিক বিরোধ মীমাংসা একটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু।

যৌথনদীর পানিকে রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করার কৌশল গ্রহণ করায় আগামী দশকগুলোতে অনেক দেশই পানি সংকটে বড় ধরনের বিপর্যয়ের সম্মুখীন। বিশ্বের মধ্যে যৌথনদীর উজানে পানি প্রত্যাহার ও বাঁধ নির্মাণের সবচেয়ে বড় বঞ্চনার শিকার বাংলাদেশ। গঙ্গা ও তিস্তার মতো আন্তর্জাতিক নদীতে বাঁধ নির্মাণ করে ভারত বাংলাদেশের নদ-নদী ও পানি ব্যবস্থাপনার ওপর বড় ধরনের আগ্রাসন সৃষ্টি করেছে। নদীবাহিত পলি দিয়ে গড়ে ওঠা বাংলাদেশ মূলত মানবসৃষ্ট ভূ-প্রাকৃতিক ভাগাড়ে পরিণত হবে। বাংলাদেশ বিশ্বের বৃহত্তম ব-দ্বীপ। উজানের হিমালয় থেকে নেমে আসা নদীগুলো বঙ্গোপসাগরে মিলে যাওয়ার আগে গঙ্গা বেসিনে লাখ লাখ টন পলিমাটি জমা করে তিলে তিলে হাজার হাজার বছরে এ দেশটিকে গড়ে তুলেছিল। উর্বর মাটি এবং অসংখ্য নদীর সুপেয় পানিই এ দেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ। উজান থেকে নদীর পানি প্রবাহ রুদ্ধ করা মানে ঠাণ্ডা মাথায় বাংলাদেশকে হত্যা করা। এমনিতেই আন্তর্জাতিক নদীর ওপর কোনো দেশের এককভাবে বাঁধ নির্মাণ বা পানি প্রত্যাহারের সুযোগ নেই।

আন্তর্জাতিক নদী আইনে এ সুযোগ নেই। নদীর স্বাভাবিক প্রবাহকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার প্রকল্প সবসময়ই অববাহিকা অঞ্চলের জন্য বিপর্যয় ডেকে আনে। ভাটির অববাহিকার দেশ বাংলাদেশের সঙ্গে কোনো চুক্তি বা সমঝোতা ছাড়াই ভারত একতরফভাবে ফারাক্কা ব্যারাজ নির্মাণ করে। ভারতের সহযোগিতায় মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ফারাক্কা প্রকল্পের সমাপ্তি ও চালু করতে ভারতকে কোনো বেগ পেতে হয়নি। ১৯৭৫ সালের ২১ এপ্রিল থেকে ১ মে পর্যন্ত মাত্র ১০ দিনের জন্য পরীক্ষামূলকভাবে ফারাক্কা ব্যারাজ চালুর অনুমতি দেয়। কার্যত বাংলাদেশের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক কোনো চুক্তি ছাড়াই এদেশের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নদীর পানি আটকে দিয়ে ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের কৃষি, পানি ব্যবস্থাপনা, প্রাণীবৈচিত্র্য, নৌ-যোগাযোগ ব্যবস্থা ও পরিবেশগত বিপর্যয়ের ছাড়পত্র নিশ্চিত করে দেয়। একতরফাভাবে ফারাক্কা ব্যারাজ চালুর ৭ বছরের মাথায় গজলডোবা (তিস্তা) ব্যারাজ দিয়ে ফিডার ক্যানেলের মাধ্যমে তিস্তার পানি প্রত্যাহার শুরু করে।

ডাইভারশন ক্যানেলের মাধ্যমে মহানন্দা নদীতে পানি সরিয়ে নেয়ার কারণে তিস্তা এখন একটি মৃতপ্রায় নদীতে পরিণত হয়েছে। এ নিয়ে কান্নাকাটি, অনুনয়-বিনয় কিছুই ভারতের মন গলাতে পারেনি। সেখানে এখন আশার আলো। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফরে বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে নদী ব্যবস্থাপনায় সহযোগিতার বিষয়টি এসেছে সবিশেষ গুরুত্বে। আর সেখানে অন্যতম তিস্তা। প্রকল্পটি দীর্ঘদিন ধরেই বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ অগ্রাধিকার প্রকল্পগুলোর একটি। নানা রাজনীতি-কূটনীতির এক পর্যায়ে ২০১১ সালের সেপ্টেম্বরে ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের ঢাকা সফরের আগে দুই দেশের পানিসম্পদমন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকে তিস্তার পানিবণ্টন চুক্তির বিষয়ে দুইপক্ষ একমত হয়েছিল। মনমোহন সিংয়ের সফরেই বহু প্রতীক্ষিত তিস্তার পানিবণ্টন চুক্তি হওয়ার কথা থাকলেও পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরোধিতায় তা আটকে যায়। নরেন্দ্র মোদির বিজেপি সরকার ভারতের ক্ষমতায় আসার পর তিস্তা চুক্তি নিয়ে আশার কথা শোনা গেলেও মমতার মত বদলায়নি। সেই সঙ্গে মমতার দোহাই দিয়ে আরো বাড়তি ঝামেলা পাকায় বিজেপি সরকার। ২০২৪ সালের মে মাসে ঢাকা সফরে এসে তিস্তা প্রকল্পে অর্থায়নে ভারতের আগ্রহের কথা জানান দেশটির তখনকার পররাষ্ট্র সচিব বিনয় কোয়াত্রা। এরপর জুনে শেখ হাসিনার ভারত সফরের সময় তিস্তা মহাপরিকল্পনায় দেশটি যুক্ত হওয়ার আগ্রহ দেখায়।

এর অংশ হিসেবে ভারতের একটি কারিগরি দল দ্রুত বাংলাদেশ সফর করবে বলে শেখ হাসিনার সঙ্গে যৌথ সংবাদ সম্মেলনে বলেছিলেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। সেই আলোচনার মাসখানেকের মাথায় ৫ অগাস্ট ঢাকায় ছাত্র-জনতার আন্দোলনে পতন হয় শেখ হাসিনা সরকারের; দেশ ছেড়ে পালিয়ে ভারতে যান তিনি। ২০২৪ সালের অগাস্টে গণ-অভ্যুত্থানে সরকার পরিবর্তনের পর মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার পুনরায় চীনের অর্থায়নেই প্রকল্পটি বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয়। ২০২৯ সালের মধ্যে প্রকল্পের প্রথম ধাপ বাস্তবায়নের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়। এ সময়ে এসে চীনের সহায়তায় তিস্তার দীর্ঘদিনের পানি সংকট ও নদী ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত অনিশ্চয়তা কাটার দিশা দেখা যাচ্ছে। বেইজিংয়ে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং এবং বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মধ্যকার বৈঠকে তিস্তা প্রকল্পসহ নদী ব্যবস্থাপনায় চীনের সমর্থন পুনর্ব্যক্ত এ সময়ের আশা জাগানিয়া বড় খবর। নদী খনন, সেচ ব্যবস্থার উন্নয়ন, ভাঙন রোধ এবং নৌ চলাচল ব্যবস্থার আধুনিকায়নে চীন পূর্ণ সহায়তার আশ্বাস দিয়েছে। এ সহযোগিতার আওতায় ‘তিস্তা নদীর সমন্বিত ব্যবস্থাপনা ও পুনরুদ্ধার প্রকল্প’ও অন্তর্ভুক্ত। পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনা, বন্যা নিয়ন্ত্রণ এবং পরিবেশ সুরক্ষায় চীনের আরো বড় পরিসরের সহায়তা চেয়ে রেখেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ক্ষমতা গ্রহণের সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশে তার নদী খনন কর্মসূচি চীন অবহিত।

যে কর্মসূচির মূল উদ্দেশ্য ভারতের পানি আগ্রাসনের কাছে অসহায় না থেকে বন্যার ঝুঁকি হ্রাস করা, পরিবেশ সংরক্ষণ করা এবং পানিসম্পদের টেকসই ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা। নিজস্ব পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনার এ সক্ষমতায় চীন সহায়তা বাড়ালে বাংলাদেশকে আর পেছনে তাকাতে হবে না। সেখানে ‘তিস্তা নদীর সমন্বিত ব্যবস্থাপনা ও পুনরুদ্ধার প্রকল্প’ বাস্তবায়নে চীনের কারিগরি সহায়তা মিললে তা হবে সোনায় সোহাগার মতো। চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের এ সংক্রান্ত সমঝোতা হয়েই আছে সেই ২০০৫ সালে। ২০০৫ সালে সই হওয়া ওই সমঝোতা স্মারকের কথা মনে করিয়ে দিয়েছেন তারেক রহমান। তিনি এও বলেছেন, পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনায় বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে বিদ্যমান দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতা বাস্তবভিত্তিক ও অত্যন্ত গবেষণানির্ভর। পানিসম্পদ খাতে সহযোগিতা সম্প্রসারণ এবং টেকসই উন্নয়নকে এগিয়ে নিতে নতুন নতুন অংশীদারত্বের ক্ষেত্র অনুসন্ধানে দুই দেশের অঙ্গীকার এবার বৈঠকের মাধ্যমে আরো স্পষ্ট হয়েছে। তিস্তায় চীনের সম্পৃক্ততা নিয়ে ভারতের উদ্বেগ ছিল-আছে এবং থাকবেও। চীনের তরফে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের সঙ্গে এই সহযোগিতার তৃতীয় কোনো পক্ষকে ‘লক্ষ্য করে নয়’। তৃতীয় কোনো পক্ষের ‘হস্তক্ষেপও চায় না’ তারা। মানে বার্তা পরিষ্কার।

চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র গুও জিয়াকুন এর ব্যাখ্যায় বলেছেন, এ নিয়ে ভারতের উদ্বেগ থাকা স্বাভাবিক। কারণ তিস্তা সীমান্তের খুব কাছ দিয়ে প্রবাহিত। ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সঙ্গেও এর সম্পর্ক রয়েছে। আবার জীবিকার সঙ্গে সমপৃক্ত বিধায় তিস্তা নদীর সমন্বিত ব্যবস্থাপনা ও পুনরুদ্ধার প্রকল্প বাংলাদেশের জন্যও জরুরি। এমন শক্ত-পোক্ত কথার ফাঁকে আর কোনো ‘যদি-কিন্তু’র অবকাশ থাকতে পারে না। চীনের প্রধানমন্ত্রী লি ছিয়াংয়ের সমান্তরালে পানিসম্পদমন্ত্রী লি কুওইংও পাকা কথা দিয়েছেন। কেবল তিস্তা নয়, বাংলাদেশের বিভিন্ন নদীর ব্যবস্থাপনায়ও নতুন চিত্র দেখার অধীর অপেক্ষায় দেশের মানুষ। তাদের চোখের সামনে ভাসছে নদীর দুই তীর সংরক্ষণ, খনন ও প্রশস্তকরণ, জলাধার ও ব্যারেজ উন্নয়ন। দৃশ্যপটে পাশেই আধুনিক সেচব্যবস্থা। নদী ব্যবস্থাপনা প্রযুক্তিতে চীনের অগ্রগতি ও ম্যাজিক বাংলাদেশের মানুষকে এমন স্বপ্নের রাজ্যে নেয়াই স্বাভাবিক।

লেখক : সাংবাদিক-কলামিস্ট; ডেপুটি হেড অব নিউজ, বাংলাভিশন

অন্তর্বর্তী সরকারের বস্তুনিষ্ঠ মূল্যায়ন ও জবাবদিহির আহ্বান

রাজনৈতিক বিশ্লেষক
অন্তর্বর্তী সরকারের বস্তুনিষ্ঠ মূল্যায়ন ও জবাবদিহির আহ্বান
সংগৃহীত ছবি

স্বৈরাচার আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অভূতপূর্ব জনপ্রত্যাশার মধ্যে ড. মোহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় আসে। অনেক বাংলাদেশি এই পরিবর্তনকে দেশের রাজনৈতিক গতিপথ নতুন করে সাজানোর একটি সুযোগ হিসেবে দেখেছিলেন। নাগরিকরা প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার, আইনের শাসন পুনঃপ্রতিষ্ঠা, বৃহত্তর জবাবদিহি, স্বচ্ছতা ও ন্যায়বিচারের ভিত্তিতে গণতান্ত্রিক শাসনে প্রত্যাবর্তনের আশা করেছিলেন। 

তবে অন্তর্বর্তী সরকারের আঠারো মাসের কর্মকাণ্ড নিয়ে গভীর বিতর্ক রয়ে গেছে। তাদের সমর্থকরা ফেব্রুয়ারির সাধারণ নির্বাচনের পর শান্তিপূর্ণ ক্ষমতা হস্তান্তর এবং কিছু প্রশাসনিক পরিবর্তনের কথা বললেও, সমালোচকদের মতে অন্তর্বর্তী সরকার প্রত্যাশা পূরণে উল্লেখযোগ্যভাবে ব্যর্থ হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের অন্যতম প্রধান প্রতিশ্রুতি ছিল রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যাপক সংস্কার।

কিন্তু সমালোচকদের মতে, শাসনব্যবস্থা ক্রমশ অনির্বাচিত সুশীল সমাজের ব্যক্তিত্বদের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়েছে। যাদের অনেকেই বিদেশি নাগরিক। এ ছাড়া সক্রিয় ছিল একটি প্রভাবশালী ‘কিচেন ক্যাবিনেট’। সেইসঙ্গে একটি স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী যারা গণতান্ত্রিক জবাবদিহি ছাড়াই ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করেছিল। সংস্কারের পরিবর্তে অন্তর্বর্তী সরকার বিভিন্ন আইনজীবী, রাজনীতিবিদ, সাংবাদিক, শিক্ষাবিদ এবং রাজনৈতিক কর্মীদের ব্যাপকহারে গ্রেপ্তার ও দীর্ঘ আটকাদেশের মাধ্যমে প্রতিশোধের রাজনীতির বাস্তবায়ন করেছে। তারা ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় কতজন ব্যক্তিকে গ্রেফতার করা হয়েছে, আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযুক্ত করা হয়েছে বা শেষ পর্যন্ত বিচার করা হয়েছে, তার বিস্তারিত বিবরণসহ জনসমক্ষে উত্থাপন না হওয়ায় প্রশ্ন উঠছে।

আরেকটি বড় সমালোচনা হলো রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর কথিত রাজনৈতিকীকরণকে কেন্দ্র করে। সমালোচকদের মতে, অন্তর্বর্তীকালীন সময়ে জামায়াতে ইসলামী এবং জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) আমলাতন্ত্র ও অন্যান্য রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন অংশে তাদের প্রভাব বিস্তারের সুযোগ পেয়েছে। সুশাসন শক্তিশালী করার পরিবর্তে এই সময়ে উল্টো আত্ম-অহংকার, স্বজনপ্রীতি এবং দুর্নীতি বৃদ্ধি পেয়েছে।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ’র (টিআইবি) সাম্প্রতিক অনুসন্ধানে এই উদ্বেগগুলো আরো জোরদার হয়েছে। সেখানে অন্তর্বর্তীকালীন প্রশাসনের সময় দুর্নীতির সূচক আরো খারাপ হওয়ার কথা বলা হয়।

সমালোচকরা যুক্তি দেন যে, স্বচ্ছ শাসনের প্রতিশ্রুতি সত্ত্বেও অন্তর্বর্তীকালীন সরকার কার্যত জবাবদিহির কোনো ব্যবস্থা ছাড়াই পরিচালিত হয়। নির্বাচিত সরকারের মতো এর উপদেষ্টারা অর্থপূর্ণ সংসদীয় তদারকি বা জনসমীক্ষার আওতাধীন ছিলেন না। প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের ভূমিকাও ব্যাপক বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। যদিও তিনি আন্তর্জাতিকভাবে ব্যাপকভাবে সম্মানিত এবং পশ্চিমা সরকার, বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে শক্তিশালী সমর্থন পেয়েছেন।

সমালোচকদের মতে, তার প্রশাসন সরকারি পদকে ব্যক্তিগত স্বার্থ থেকে পৃথক করতে ব্যর্থ হয়েছে। ইউনূস ও তার সহযোগী সংস্থাগুলোর বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও কর-সংক্রান্ত মামলা প্রত্যাহার এবং তার ব্যবসায়িক স্বার্থের সঙ্গে যুক্ত সংস্থাগুলোকে জনশক্তি রপ্তানির লাইসেন্স প্রদানের মতো বিষয়গুলোকে বৃহত্তর জনসমীক্ষার দাবিদার উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরেন। একইভাবে, যুক্তরাষ্ট্র-বাংলাদেশ পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষরও বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। অনেকে এই চুক্তিকে দ্বিপাক্ষিক অর্থনৈতিক সম্পর্ক শক্তিশালী করার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বর্ণনা করেন।

তবে সমালোচকদের মতে, এই চুক্তি অসামঞ্জস্যপূর্ণ। এর কারণে আমেরিকার কৌশলগত ও বাণিজ্যিক স্বার্থ রক্ষা পাবে। একই সঙ্গে বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্বকে সীমিত করার ঝুঁকি তৈরি করেছে।

সাধারণ নাগরিকদের জন্য সম্ভবত সবচেয়ে দৃশ্যমান হতাশার কারণটি হলো আইন-শৃঙ্খলার অবনতি। ‘মব’ যেন ছিল নিত্যদিনের সঙ্গী। অন্যদিকে ‘তাওহিদি জনতা’ নামে পরিচিত গোষ্ঠীগুলো ক্রমবর্ধমান আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করেছে। সমালোচকদের অভিযোগ, অন্তর্বর্তী সরকার এই ধরনের গোষ্ঠীগুলোকে দৃঢ়ভাবে মোকাবেলা করতে ব্যর্থ হয়েছে। যার ফলে এমন একটি পরিবেশ তৈরি হয়েছে যেখানে আইনবহির্ভূত কর্মকাণ্ড ক্রমশ স্বাভাবিক হয়ে উঠে। এতে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার ওপর জনগণের আস্থা ক্রমাগত হ্রাস পায়।

অনেক পর্যবেক্ষকের মতে, বুদ্ধিবৃত্তিক ও সাংস্কৃতিক মত প্রকাশের পরিসর সংকুচিত হওয়াটাও সমানভাবে উদ্বেগজনক ছিল। পরিস্থিতি এমন ছিল যে, শিল্পী, শিক্ষাবিদ, লেখক এবং সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলো নিজেদেরকে ক্রমশ কোণঠাসা অবস্থায় দেখতে পান। ভিন্নমত প্রকাশে তারা অনিচ্ছুক হয়ে পড়েন।

সমালোচকদের যুক্তি, বহুত্ববাদকে উৎসাহিত করার পরিবর্তে প্রশাসন প্রায়ই রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে হেয় প্রতিপন্ন করতে এবং ন্যায্য সমালোচনাকে স্তব্ধ করতে ‘ফ্যাসিস্ট’-এর মতো তকমা ব্যবহার করেছে। তারা আরও দাবি করেন যে, অন্তর্বর্তী সরকারের সমর্থকরা, জামায়াত ও এনসিপির পাশাপাশি, সমসাময়িক রাজনীতিতে একই ধরনের বাগাড়ম্বর ব্যবহার করে চলেছে। বিশেষ করে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলকে (বিএনপি) রাজনৈতিকভাবে বিচ্ছিন্ন করার প্রচেষ্টা ছিল চোখে পড়ার মতো।

বিএনপি-নেতৃত্বাধীন সরকারের বিরুদ্ধে জামায়াতের নেতৃত্বাধীন এগারো-দলীয় জোটের সাম্প্রতিক গণবিক্ষোভ শুরুর ঘোষণা এই উদ্বেগগুলোকে আরো তীব্র করেছে।
সমালোচকরা এই বিক্ষোভগুলোকে কেবল গণতান্ত্রিক বিরোধিতা হিসেবেই দেখছেন না, বরং স্বাভাবিক সাংবিধানিক প্রক্রিয়ার বাইরে গিয়ে শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের উদ্দেশ্যে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার আরেকটি চক্র তৈরির প্রচেষ্টা হিসেবে দেখছেন।

এইসব ঘটনাপ্রবাহের পরিপ্রেক্ষিতে, এটা যুক্তিযুক্ত যে অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে সম্পর্কিত ত্রুটিগুলোর জন্য জামায়াত এবং এনসিপির রাজনৈতিক দায়ভার বহন করা উচিত। উভয় দলই এই আঠারো মাসের সময়কালে সৃষ্ট রাজনৈতিক পরিবেশ থেকে উল্লেখযোগ্যভাবে লাভবান হয়েছে। এর ফলস্বরূপ তারা তাদের প্রাতিষ্ঠানিক প্রভাব বিস্তার করেছে।

একইভাবে, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় নির্বাহী ক্ষমতা প্রয়োগকারী উপদেষ্টারাও তদন্তের আওতার বাইরে থাকতে পারেন না। ক্ষমতার অপব্যবহার, বেআইনি আটক, পক্ষপাতমূলক বিচার, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহার বা স্বার্থের সংঘাতের যেকোনো অভিযোগ যথাযথ প্রক্রিয়ার অধীনে স্বাধীন তদন্তের দাবি রাখে। জবাবদিহিতা গণতান্ত্রিক শাসনের একটি মূল ভিত্তি এবং এটি নির্বাচিত ও অনির্বাচিত উভয় প্রশাসনের ক্ষেত্রেই সমানভাবে প্রযোজ্য হওয়া উচিত।

পরিশেষে, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের বিচার হবে তার প্রতিশ্রুতির নিরিখে নয়, বরং তার রেখে যাওয়া কীর্তির নিরিখে। প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার, ন্যায়বিচার, স্বচ্ছতা এবং গণতান্ত্রিক নবায়নের জন্য লাখো বাংলাদেশির আকাঙ্ক্ষা কেবল আংশিকভাবেই পূরণ হয়েছে।

বাংলাদেশকে যদি সামনে এগিয়ে যেতে হয়, তবে রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা বা আন্তর্জাতিক সমর্থন নির্বিশেষে অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যতের প্রতিটি প্রশাসনকে জবাবদিহিতার একই মানদণ্ডে বিচার করতে হবে। টেকসই গণতন্ত্র কোনো ব্যক্তির ওপর নির্ভর করে না, বরং শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান, আইনের সমান প্রয়োগ এবং গণতান্ত্রিক নীতির প্রতি শ্রদ্ধার ওপর নির্ভর করে। 

নতুন ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতা : তিস্তা ও নদী ব্যবস্থাপনায় বাংলাদেশ-চীন ঐকমত্য

সিরাজুল ইসলাম
নতুন ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতা : তিস্তা ও নদী ব্যবস্থাপনায় বাংলাদেশ-চীন ঐকমত্য

বাংলাদেশের উন্নয়ন ভাবনায় পানি সবসময়ই একটি কেন্দ্রীয় বা মৌলিক উপাদান। বিশেষ করে নদীমাতৃক এই দেশে নদীর সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক কেবল অর্থনৈতিক নয়, বরং সামাজিক, সাংস্কৃতিক এবং রাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। সেই বাস্তবতায় তিস্তা নদী একদিকে যেমন উত্তরাঞ্চলের জীবনরেখা, অন্যদিকে তেমনি দীর্ঘদিনের একটি অমীমাংসিত সংকটের প্রতীক।

সাম্প্রতিক সময়ে বেইজিংয়ে বাংলাদেশ ও চীনের উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে তিস্তা এবং অন্যান্য নদী ব্যবস্থাপনায় সহযোগিতার যে ঐকমত্য তৈরি হয়েছে, তা এই দীর্ঘস্থায়ী সমস্যার সমাধানের নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও চীনের পানিসম্পদমন্ত্রী লি কিয়াংয়ের মধ্যে অনুষ্ঠিত বৈঠকে তিস্তা মহাপরিকল্পনা, বন্যা নিয়ন্ত্রণ, নদীভাঙন রোধ, সেচ ব্যবস্থার আধুনিকায়ন এবং নৌ-নেভিগেশন উন্নয়নের বিষয়ে বিস্তৃত আলোচনা হয়।

এই আলোচনাকে কেবল একটি উন্নয়ন সহযোগিতা হিসেবে দেখা হলে বিষয়টির গভীরতা অনেকাংশেই কমে যাবে। কারণ এটি একই সঙ্গে একটি প্রযুক্তিগত প্রকল্প, অর্থনৈতিক পরিকল্পনা এবং কৌশলগত ভূরাজনৈতিক সমীকরণের অংশ।

তিস্তা : এক নদী, বহু সংকট

তিস্তা নদী বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের কৃষি অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এই নদী বছরে দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন রূপ ধারণ করে। বর্ষাকালে অতিরিক্ত পানির কারণে ভয়াবহ বন্যা সৃষ্টি হয় যা ফসল, ঘরবাড়ি এবং অবকাঠামোর ব্যাপক ক্ষতি করে। অন্যদিকে শুষ্ক মৌসুমে পানির প্রবাহ প্রায় বন্ধ হয়ে যাওয়ায় কৃষিকাজ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়।

এই দ্বৈত সংকটের কারণে তিস্তা অঞ্চলে দারিদ্র্য, অভিবাসন এবং অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা দীর্ঘদিন ধরে চলমান। ফলে তিস্তা সমস্যা কেবল পানি বণ্টনের বিষয় নয়, বরং এটি একটি সামাজিক-অর্থনৈতিক সংকট।

দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে তিস্তা পানিবণ্টন চুক্তি ঝুলে থাকায় এই সমস্যা সমাধানের বিকল্প পথ অনুসন্ধানও জরুরি হয়ে উঠেছে। সেই প্রেক্ষাপটে চীনের সঙ্গে সহযোগিতার উদ্যোগ নতুন মাত্রা যোগ করেছে।

চীনের সম্পৃক্ততা : প্রযুক্তি, অভিজ্ঞতা ও কৌশল

চীন বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রযুক্তির অধিকারী দেশ। বড় নদী নিয়ন্ত্রণ, বন্যা প্রতিরোধ, বাঁধ নির্মাণ এবং সেচ ব্যবস্থার আধুনিকায়নে তাদের অভিজ্ঞতা বৈশ্বিকভাবে স্বীকৃত।

বৈঠকে চীনের পক্ষ থেকে বাংলাদেশের পানি ব্যবস্থাপনায় কারিগরি সহায়তা, প্রশিক্ষণ এবং যৌথ গবেষণার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে যৌথ ফিজিবিলিটি স্টাডি পরিচালনার বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ কোনো বড় অবকাঠামো প্রকল্প সফলভাবে বাস্তবায়নের আগে বৈজ্ঞানিক পরিকল্পনা এবং বাস্তবভিত্তিক মূল্যায়ন অপরিহার্য।

এছাড়া, চীনের পক্ষ থেকে বাংলাদেশের পানি বিশেষজ্ঞদের প্রশিক্ষণের জন্য আমন্ত্রণ জানানো এবং টোটাল ওয়াটার রিসোর্স ম্যানেজমেন্টে সহযোগিতার আগ্রহ প্রকাশ করা হয়েছে। এর মাধ্যমে দুই দেশের মধ্যে প্রযুক্তি বিনিময় এবং দক্ষতা উন্নয়নের একটি নতুন প্ল্যাটফর্ম তৈরি হতে পারে।

উন্নয়ন সহযোগিতা থেকে কৌশলগত অংশীদারি

বাংলাদেশ-চীন সম্পর্ক দীর্ঘদিন ধরেই অর্থনৈতিক সহযোগিতার ভিত্তিতে গড়ে উঠেছে। অবকাঠামো উন্নয়ন, সড়ক, সেতু, বিদ্যুৎ এবং শিল্পখাতে চীনের বিনিয়োগ বাংলাদেশের উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

তবে তিস্তা প্রকল্পের মাধ্যমে এই সম্পর্ক আরো একটি নতুন স্তরে প্রবেশ করছে- যেখানে পানি ব্যবস্থাপনা এখন কেবল উন্নয়ন ইস্যু নয়, বরং কৌশলগত অংশীদারির অংশ।

কারণ পানিসম্পদ দক্ষিণ এশিয়ায় একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল ভূ-রাজনৈতিক ইস্যু। আন্তঃসীমান্ত নদীগুলোর নিয়ন্ত্রণ, প্রবাহ এবং ব্যবহার শুধু অর্থনৈতিক নয়, রাজনৈতিক প্রভাবও তৈরি করে।

আঞ্চলিক ভূ-রাজনীতির নতুন সমীকরণ

তিস্তা প্রকল্পে চীনের সম্ভাব্য সম্পৃক্ততা দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক ভূ-রাজনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিতে পারে। এই অঞ্চলে ভারত দীর্ঘদিন ধরে নদী ব্যবস্থাপনা ও পানি কূটনীতিতে প্রধান ভূমিকা পালন করে আসছে।

এখন চীনের সক্রিয় উপস্থিতি একটি নতুন ভারসাম্যের প্রশ্ন তৈরি করছে। তবে এটিকে সরাসরি প্রতিযোগিতা হিসেবে না দেখে বরং বহুপক্ষীয় সহযোগিতার অংশ হিসেবে দেখা হলে বাংলাদেশের জন্য কৌশলগত সুবিধা তৈরি হতে পারে।

বাংলাদেশের অবস্থান এখানে অত্যন্ত সূক্ষ্ম। একদিকে বৃহৎ প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক রক্ষা, অন্যদিকে জাতীয় স্বার্থ সংরক্ষণ—এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

তিস্তা মহাপরিকল্পনা : সম্ভাবনা ও বাস্তব চ্যালেঞ্জ

তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন হলে এটি বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের অর্থনীতিতে বড় পরিবর্তন আনতে পারে। কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, বন্যা নিয়ন্ত্রণ, নদীভাঙন হ্রাস এবং সেচ ব্যবস্থার উন্নয়ন- সবই এই প্রকল্পের সম্ভাব্য ফলাফল।

তবে বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জও কম নয়। বড় অবকাঠামো প্রকল্পে অর্থনৈতিক স্বচ্ছতা, প্রশাসনিক দক্ষতা এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অতীত অভিজ্ঞতা বলে, অনেক বড় প্রকল্প যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ ও পরিকল্পনার অভাবে প্রত্যাশিত ফল দিতে ব্যর্থ হয়েছে। এছাড়া, প্রকল্পের জন্য বরাদ্দ অর্থের সদ্ব্যবহার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। অতীত সরকারের সময় বহু বড় প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছিল কিন্তু অর্থ লুটপাটের ঘটনাও ঘটেছে হরহামেশা।

এছাড়া, পরিবেশগত ভারসাম্য, নদীর প্রাকৃতিক প্রবাহ এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জীবিকা- এই বিষয়গুলোও পরিকল্পনায় গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে।

বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সম্পর্কের বিস্তার

এই বৈঠকের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা। চীন বর্তমানে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বাণিজ্য অংশীদার। তবে দুই দেশের বাণিজ্য ভারসাম্য এখনো চীনের পক্ষে বেশি ঝুঁকে আছে।

বৈঠকে বাংলাদেশ চীনে রপ্তানি বৃদ্ধির সুযোগ এবং বাজার সম্প্রসারণের বিষয়টি তুলে ধরেছে। একই সঙ্গে চীনা বিনিয়োগ ও প্রযুক্তি সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়ে আলোচনা হয়েছে।

এই অর্থনৈতিক সহযোগিতা যদি কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন হয়, তাহলে তা শুধু নদী ব্যবস্থাপনায় নয়, সামগ্রিক অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক তাৎপর্য

চীনের প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াংয়ের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক এবং শি জিনপিংয়ের সঙ্গে উচ্চপর্যায়ের সাক্ষাত এই সফরকে কূটনৈতিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। দুটি চুক্তি ও ১৩টি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর দুই দেশের সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে।

এই ধরনের সমঝোতা সাধারণত দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত সম্পর্কের ভিত্তি তৈরি করে, যা ভবিষ্যতে বিভিন্ন খাতে সহযোগিতার সুযোগ সৃষ্টি করে।

সম্ভাবনা ও সতর্কতার ভারসাম্য

সব মিলিয়ে বলা যায়, তিস্তা ও নদী ব্যবস্থাপনায় বাংলাদেশ-চীন ঐকমত্য কেবল একটি অবকাঠামোগত প্রকল্প নয়; এটি একই সঙ্গে উন্নয়ন, প্রযুক্তি, অর্থনীতি এবং ভূ-রাজনীতির সমন্বিত একটি প্রক্রিয়া।

এই উদ্যোগ সফল হলে এটি বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের অর্থনীতিতে যুগান্তকারী পরিবর্তন আনতে পারে। তবে এর সফলতা নির্ভর করবে পরিকল্পনার স্বচ্ছতা, বাস্তবায়নের দক্ষতা এবং আঞ্চলিক কূটনৈতিক ভারসাম্য রক্ষার ওপর।

কারণ বড় প্রকল্প যতটা সম্ভাবনা তৈরি করে, ততটাই ঝুঁকিও বহন করে। তাই এই নতুন সমীকরণকে শুধু আশাবাদের চোখে নয়, বরং বাস্তববাদী দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে বিশ্লেষণ করাই হবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

লেখক : সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক

তুরস্কের বাংলাদেশ নীতি : মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানপন্থী, পরবর্তীতে জামায়াতকে সমর্থন

রাজনৈতিক বিশ্লেষক
তুরস্কের বাংলাদেশ নীতি : মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানপন্থী, পরবর্তীতে জামায়াতকে সমর্থন
সংগৃহীত ছবি

তুরস্ক প্রায়শই নিজেকে ন্যায়বিচার, গণতন্ত্র এবং মুসলিম সংহতির প্রবক্তা হিসেবে উপস্থাপন করে। তবে বাংলাদেশের সঙ্গে দেশটির ঐতিহাসিক সম্পর্ক বেশ জটিল বাস্তবতার ইঙ্গিত দেয়। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধিতা করা, বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ফোরামে বাংলাদেশের জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের বিরুদ্ধে পাকিস্তানকে সমর্থন দেওয়া এবং কয়েক দশক পরও যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের সমালোচনা করা—এমন একাধিক পদক্ষেপ নিয়েছে দেশটি। ফলে আঙ্কারার নীতিগত অবস্থান বহু বাংলাদেশির অনুভূতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক হয়ে উঠেছে। কারণ, বাংলাদেশের মানুষের কাছে মহান মুক্তিযুদ্ধই জাতীয় পরিচয় ও রাষ্ট্রের ভিত্তি।

মুক্তিযুদ্ধের সময় তুরস্কের অবস্থান

১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় তুরস্ক বাঙালি জনগণের পক্ষে দাঁড়ায়নি। শুধু তা-ই নয়, দেশটি পাকিস্তানকে সমর্থন দেয়। মুক্তিযুদ্ধকে পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ বিষয় হিসেবে আখ্যায়িত করে তৎকালীন পাকিস্তানের ভৌগোলিক অখণ্ডতার ওপর জোর দেয়। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে কিংবা ১৯৭১ সালের ডিসেম্বরে বাংলাদেশের বিজয়ের পরপরই তুরস্ক বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়নি। পাকিস্তান বাংলাদেশকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার পর এবং বাংলাদেশকে ইসলামিক সহযোগিতা সংস্থা (ওআইসি)-এর সদস্যপদ দেওয়ার প্রাক্কালে, ১৯৭৪ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি তুরস্ক আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়।

এই বিলম্ব তুরস্কের কৌশলগত অগ্রাধিকারের দিকেই ইঙ্গিত করে। স্নায়ুযুদ্ধের সময়কার নিরাপত্তা জোট এবং মুসলিম বিশ্বের বিস্তৃত রাজনৈতিক সম্পর্কের কারণে পাকিস্তান ছিল তুরস্কের দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ মিত্র। ফলে আঙ্কারার কাছে বাংলাদেশের স্বাধীনতার সংগ্রামকে সমর্থনের চেয়ে ইসলামাবাদের সঙ্গে সম্পর্ক অটুট রাখাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল।

ওআইসি এবং বাংলাদেশের সদস্যপদ

ইসলামিক সহযোগিতা সংস্থা (ওআইসি)-তে বাংলাদেশের সদস্যপদ অর্জনের ক্ষেত্রে তুরস্ক বাংলাদেশের পক্ষে কোনো সক্রিয় ভূমিকা রাখেনি। বরং পাকিস্তান তাদের অবস্থান পরিবর্তন করার পরই আঙ্কারা বাংলাদেশের সদস্যপদ মেনে নেয়। বাংলাদেশের ওআইসিতে সদস্যপদ অর্জনের কূটনৈতিক অগ্রগতির মূল কারণ ছিল পাকিস্তান কর্তৃক বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেওয়ার সিদ্ধান্ত। এটি মুসলিম বিশ্বের বৃহত্তর কূটনৈতিক উদ্যোগের ফল ছিল। তুরস্ক শেষ পর্যন্ত এই সিদ্ধান্ত মেনে নিলেও বাংলাদেশকে ওআইসিতে অন্তর্ভুক্ত করার পক্ষে সক্রিয় ছিল না।

অনেক বাংলাদেশির কাছে এই ঐতিহাসিক ঘটনাক্রম আজও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, মুক্তিযুদ্ধের সময় যেসব দেশ সক্রিয়ভাবে বাংলাদেশের পাশে দাঁড়িয়েছিল, জাতীয় স্মৃতিতে স্বাভাবিকভাবেই তারা ভিন্ন অবস্থানে রয়েছে। তাদের তুলনায় যারা ভূরাজনৈতিক বাস্তবতা অনিবার্য হয়ে ওঠার পর বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিয়েছিল, তাদের অবস্থান আলাদা।

জামায়াতে ইসলামী এবং তুরস্ক

১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী স্বাধীনতার বিরোধিতা করে এবং পাকিস্তানের পক্ষ নেয়। দলটির শীর্ষ নেতারা পাকিস্তানের সামরিক সরকারের সঙ্গে রাজনৈতিকভাবে সহযোগিতা করেন। পরবর্তীকালে তাদের কয়েকজনকে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে বাংলাদেশের আদালত দোষী সাব্যস্ত করেন।

১৯৭১ সালে তুরস্ক সরাসরি জামায়াতে ইসলামীর প্রতি সমর্থন জানিয়েছিল—এমন বিশ্বাসযোগ্য ঐতিহাসিক প্রমাণ নেই। তবে পাকিস্তানের অবস্থানকে সমর্থন করায় কার্যত তুরস্কও সেই একই পক্ষের সঙ্গে অবস্থান নিয়েছিল, যে পক্ষের সঙ্গে জামায়াতে ইসলামী ছিল।

এরদোয়ানের তুরস্ক ও জামায়াতে ইসলামী

তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ানের আমলে তুরস্ক-বাংলাদেশ সম্পর্কের এই অধ্যায় নতুন মাত্রা পায়। ২০১০-এর দশক থেকে তুরস্ক বারবার বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের (আইসিটি) কার্যক্রমের সমালোচনা করে। পাশাপাশি যুদ্ধাপরাধে দণ্ডিত জামায়াতে ইসলামীর একাধিক নেতার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর না করার আহ্বান জানায়। তুর্কি কর্মকর্তারা এসব বিচারকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে মন্তব্য করেন। একই সঙ্গে তারা দণ্ডপ্রাপ্তদের প্রতি দয়া প্রদর্শনের আহ্বান জানান।

অন্যদিকে, বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ভিন্ন। সরকারের মতে, মুক্তিযুদ্ধের সময় সংঘটিত নৃশংস মানবতাবিরোধী অপরাধের জন্য বহু প্রতীক্ষিত বিচার নিশ্চিত করতেই আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে এসব বিচার সম্পন্ন করা হয়েছে।

তুরস্ক, মুসলিম ব্রাদারহুড এবং জামায়াতে ইসলামী

প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ানের নেতৃত্বাধীন জাস্টিস অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টি (একেপি) সরকার সাধারণত ‘রাজনৈতিক ইসলাম’-সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন আন্দোলনের প্রতি সহানুভূতিশীল অবস্থান নিয়েছে। বিশেষ করে মুসলিম ব্রাদারহুড দ্বারা প্রভাবিত সংগঠনগুলোর প্রতি তাদের এই অনুকম্পা আরো প্রকট।

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী এবং মুসলিম ব্রাদারহুড দু’টি পৃথক সংগঠন। তাদের ইতিহাস, উৎপত্তি ও জাতীয় প্রেক্ষাপটও ভিন্ন। জামায়াতে ইসলামীর আদর্শিক ভিত্তি গড়ে উঠেছে আবুল আ'লা মওদুদীর চিন্তাধারার ওপর। অন্যদিকে মুসলিম ব্রাদারহুডের জন্ম মিশরে হাসান আল-বান্নার নেতৃত্বে।

তবে গবেষকরা দু’টি সংগঠনের মধ্যে কিছু গুরুত্বপূর্ণ আদর্শিক মিলের কথা উল্লেখ করেন। এর মধ্যে রয়েছে—ইসলাম ও রাজনীতির সমন্বয়, ইসলামী নীতিমালাভিত্তিক রাষ্ট্র পরিচালনার পক্ষে অবস্থান, তৃণমূলভিত্তিক সামাজিক সংগঠন গড়ে তোলার ওপর গুরুত্বারোপ এবং বিভিন্ন দেশের ইসলামপন্থী রাজনৈতিক শক্তির মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতার ধারণা।

এসব আদর্শিক সাদৃশ্যের কারণে তুরস্কের ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক মহলের কিছু ব্যক্তিত্ব এবং জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নেতাদের মধ্যে সৌহার্দ্যপূর্ণ রাজনৈতিক সম্পর্ক গড়ে উঠেছে বলে বিভিন্ন আলোচনায় উল্লেখ করা হয়েছে।

২০২৬ নির্বাচনের প্রেক্ষাপট

কিছু বিশ্লেষক মনে করেন যে, তুরস্ক বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে জামায়াতের প্রতি সংযত রাজনৈতিক সহানুভূতি প্রকাশ করেছে। যদিও সরাসরি নির্বাচনী সহায়তার প্রমাণ নেই। তবে বিশ্লেষকদের মতে কিছু তুর্কি প্রতিষ্ঠান সোশ্যাল মিডিয়া প্রচার এবং নির্বাচনি তহবিল সরবরাহে জামায়াতকে সাহায্য করেছে।

তবে, তুর্কি সরকারের সরাসরি সম্পৃক্ততার দাবিগুলো যথাযথ তথ্য-উপাত্ত ও প্রমাণাদির মাধ্যমে সমর্থন করা প্রয়োজন।

ইতিহাসের প্রভাব

বাংলাদেশে তুরস্কের নীতিগত অবস্থান ইতিহাসের স্মৃতিকে প্রভাবিত করে। মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানপন্থী অবস্থান এবং পরবর্তীতে জামায়াত নেতাদের সমর্থন আজও বাংলাদেশের জনগণের কাছে বিতর্কিত।

একই সময়ে, দুই দেশ নিজেদের মধ্যে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, প্রতিরক্ষা, শিক্ষা এবং মানবিক খাতে সহযোগিতা প্রসারিত করেছে। সুতরাং, অমীমাংসিত ঐতিহাসিক মতবিরোধের পাশাপাশি আধুনিক দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কও  বিদ্যমান আছে।

বাংলাদেশ ও তুরস্কের জন্য চ্যালেঞ্জ হলো—কিভাবে কার্যকর সহযোগিতা বাড়ানো যায় এবং একই সঙ্গে ইতিহাসের বাস্তবতা স্বীকার করা যায়। প্রকৃত বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে ইতিহাসকে উপেক্ষা না করে, বরং তা স্বচ্ছ ও সম্মানজনকভাবে মোকাবেলা করে।