সবে ঐতিহাসিক কারবালার ইতিহাস ও দর্শনের আলোকে পবিত্র আশুরা পালন হয়েছে। সে পানি বড় প্রাসঙ্গিক। অন্যতম প্রধান বিষয়ও। পানির জন্য হাহাকার কারবালার ট্র্যাজেডিকে এক চরম রূপ দেয়। কারবালার যুদ্ধের মূল শিক্ষা হলো—সব মানুষের পানির ওপর সমান অধিকার রয়েছে এবং অন্যায়ভাবে কাউকে পানির হক থেকে বঞ্চিত করা যাবে না। প্রতিবেশীর ভূমিকায় বাংলাদেশ পানি প্রশ্নে বড় অভাগা। মারা কেবল ভাতে বা হাতে হয় না, পানিতেও যে হতে পারে, তা দেখিয়ে চলছে ভারত। আগ্রাসন বা আধিপত্য বিশ্বসভ্যতার ক্রমোন্নতির সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িয়ে আছে পানির সহজলভ্যতা ও নদ-নদীর প্রবাহ। নীলনদের তীরে গড়ে ওঠা মিসরীয় সভ্যতা, টাইগ্রিস-ইউফ্রেটিস বা দজলা-ফোরাতের তীরে গড়ে ওঠা মেসোপটোমিয়া সভ্যতা, সিন্ধুর তীরে সিন্ধু সভ্যতা এবং গঙ্গার তীরে গড়ে ওঠা প্রাচীন ভারতীয় ও বাংলার সভ্যতার বাইরে এশিয়া-আফ্রিকার ঐতিহাসিক বিবর্তনকে কল্পনা করা যায় না। ঠিক একইভাবে টেম্স, ভলগা, দানিউব ও রাইন নদীকে ঘিরেই তৈরি হয়েছিল ইউরোপের গড়ে ওঠার ইতিহাস।
কারবালার পানি নিয়ে যে দুঃখজনক ও নির্মম রাজনীতির সূচনা এর পরিণতিও ভোগ করতে হবে বিশ্ব মানবকে। তাই আজ পানি বিভিন্ন দেশের মধ্যে বিরোধের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। ফলে উদ্বিগ্ন হয়ে উঠছে অন্য দেশগুলো। নানান ঘটনা ও ঐতিহাসিক তথ্য সামনে এনে তাই কারো কারো মতে, পৃথিবীতে পানি নিয়ে যত যুদ্ধ বিগ্রহ হয়েছে অন্য কিছু নিয়ে এত হয়নি। পানি এবং এর হিস্যার কেওয়াজ পৃথিবীতে আজও বিদ্যমান। হাজার হাজার বছর ধরে দেশে দেশে প্রবাহমান এসব নদ-নদী এখনো যথারীতি প্রবাহিত। নদী উপত্যকা ও অববাহিকার কোটি কোটি মানুষের জীবন-জীবিকা, ভূ-প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্য এসব নদীর পানি ও নাব্যতার ওপর একচ্ছত্রভাবে নির্ভরশীল। নদ-নদীর পানি প্রবাহ অবারিত রাখা রাষ্ট্রের রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্বের চেয়ে কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। নগর সভ্যতা ও শিল্প-বিজ্ঞানের অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সংঘাত বেড়ে যাওয়ার প্রেক্ষাপটে জাতিসংঘের মতো আন্তর্জাতিক ফোরাম গঠনে ট্রান্সবাউন্ডারি বা যৌথনদীর পানিকেন্দ্রিক আঞ্চলিক বিরোধ মীমাংসা একটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু।
যৌথনদীর পানিকে রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করার কৌশল গ্রহণ করায় আগামী দশকগুলোতে অনেক দেশই পানি সংকটে বড় ধরনের বিপর্যয়ের সম্মুখীন। বিশ্বের মধ্যে যৌথনদীর উজানে পানি প্রত্যাহার ও বাঁধ নির্মাণের সবচেয়ে বড় বঞ্চনার শিকার বাংলাদেশ। গঙ্গা ও তিস্তার মতো আন্তর্জাতিক নদীতে বাঁধ নির্মাণ করে ভারত বাংলাদেশের নদ-নদী ও পানি ব্যবস্থাপনার ওপর বড় ধরনের আগ্রাসন সৃষ্টি করেছে। নদীবাহিত পলি দিয়ে গড়ে ওঠা বাংলাদেশ মূলত মানবসৃষ্ট ভূ-প্রাকৃতিক ভাগাড়ে পরিণত হবে। বাংলাদেশ বিশ্বের বৃহত্তম ব-দ্বীপ। উজানের হিমালয় থেকে নেমে আসা নদীগুলো বঙ্গোপসাগরে মিলে যাওয়ার আগে গঙ্গা বেসিনে লাখ লাখ টন পলিমাটি জমা করে তিলে তিলে হাজার হাজার বছরে এ দেশটিকে গড়ে তুলেছিল। উর্বর মাটি এবং অসংখ্য নদীর সুপেয় পানিই এ দেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ। উজান থেকে নদীর পানি প্রবাহ রুদ্ধ করা মানে ঠাণ্ডা মাথায় বাংলাদেশকে হত্যা করা। এমনিতেই আন্তর্জাতিক নদীর ওপর কোনো দেশের এককভাবে বাঁধ নির্মাণ বা পানি প্রত্যাহারের সুযোগ নেই।
আন্তর্জাতিক নদী আইনে এ সুযোগ নেই। নদীর স্বাভাবিক প্রবাহকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার প্রকল্প সবসময়ই অববাহিকা অঞ্চলের জন্য বিপর্যয় ডেকে আনে। ভাটির অববাহিকার দেশ বাংলাদেশের সঙ্গে কোনো চুক্তি বা সমঝোতা ছাড়াই ভারত একতরফভাবে ফারাক্কা ব্যারাজ নির্মাণ করে। ভারতের সহযোগিতায় মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ফারাক্কা প্রকল্পের সমাপ্তি ও চালু করতে ভারতকে কোনো বেগ পেতে হয়নি। ১৯৭৫ সালের ২১ এপ্রিল থেকে ১ মে পর্যন্ত মাত্র ১০ দিনের জন্য পরীক্ষামূলকভাবে ফারাক্কা ব্যারাজ চালুর অনুমতি দেয়। কার্যত বাংলাদেশের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক কোনো চুক্তি ছাড়াই এদেশের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নদীর পানি আটকে দিয়ে ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের কৃষি, পানি ব্যবস্থাপনা, প্রাণীবৈচিত্র্য, নৌ-যোগাযোগ ব্যবস্থা ও পরিবেশগত বিপর্যয়ের ছাড়পত্র নিশ্চিত করে দেয়। একতরফাভাবে ফারাক্কা ব্যারাজ চালুর ৭ বছরের মাথায় গজলডোবা (তিস্তা) ব্যারাজ দিয়ে ফিডার ক্যানেলের মাধ্যমে তিস্তার পানি প্রত্যাহার শুরু করে।
ডাইভারশন ক্যানেলের মাধ্যমে মহানন্দা নদীতে পানি সরিয়ে নেয়ার কারণে তিস্তা এখন একটি মৃতপ্রায় নদীতে পরিণত হয়েছে। এ নিয়ে কান্নাকাটি, অনুনয়-বিনয় কিছুই ভারতের মন গলাতে পারেনি। সেখানে এখন আশার আলো। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফরে বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে নদী ব্যবস্থাপনায় সহযোগিতার বিষয়টি এসেছে সবিশেষ গুরুত্বে। আর সেখানে অন্যতম তিস্তা। প্রকল্পটি দীর্ঘদিন ধরেই বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ অগ্রাধিকার প্রকল্পগুলোর একটি। নানা রাজনীতি-কূটনীতির এক পর্যায়ে ২০১১ সালের সেপ্টেম্বরে ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের ঢাকা সফরের আগে দুই দেশের পানিসম্পদমন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকে তিস্তার পানিবণ্টন চুক্তির বিষয়ে দুইপক্ষ একমত হয়েছিল। মনমোহন সিংয়ের সফরেই বহু প্রতীক্ষিত তিস্তার পানিবণ্টন চুক্তি হওয়ার কথা থাকলেও পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরোধিতায় তা আটকে যায়। নরেন্দ্র মোদির বিজেপি সরকার ভারতের ক্ষমতায় আসার পর তিস্তা চুক্তি নিয়ে আশার কথা শোনা গেলেও মমতার মত বদলায়নি। সেই সঙ্গে মমতার দোহাই দিয়ে আরো বাড়তি ঝামেলা পাকায় বিজেপি সরকার। ২০২৪ সালের মে মাসে ঢাকা সফরে এসে তিস্তা প্রকল্পে অর্থায়নে ভারতের আগ্রহের কথা জানান দেশটির তখনকার পররাষ্ট্র সচিব বিনয় কোয়াত্রা। এরপর জুনে শেখ হাসিনার ভারত সফরের সময় তিস্তা মহাপরিকল্পনায় দেশটি যুক্ত হওয়ার আগ্রহ দেখায়।
এর অংশ হিসেবে ভারতের একটি কারিগরি দল দ্রুত বাংলাদেশ সফর করবে বলে শেখ হাসিনার সঙ্গে যৌথ সংবাদ সম্মেলনে বলেছিলেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। সেই আলোচনার মাসখানেকের মাথায় ৫ অগাস্ট ঢাকায় ছাত্র-জনতার আন্দোলনে পতন হয় শেখ হাসিনা সরকারের; দেশ ছেড়ে পালিয়ে ভারতে যান তিনি। ২০২৪ সালের অগাস্টে গণ-অভ্যুত্থানে সরকার পরিবর্তনের পর মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার পুনরায় চীনের অর্থায়নেই প্রকল্পটি বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয়। ২০২৯ সালের মধ্যে প্রকল্পের প্রথম ধাপ বাস্তবায়নের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়। এ সময়ে এসে চীনের সহায়তায় তিস্তার দীর্ঘদিনের পানি সংকট ও নদী ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত অনিশ্চয়তা কাটার দিশা দেখা যাচ্ছে। বেইজিংয়ে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং এবং বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মধ্যকার বৈঠকে তিস্তা প্রকল্পসহ নদী ব্যবস্থাপনায় চীনের সমর্থন পুনর্ব্যক্ত এ সময়ের আশা জাগানিয়া বড় খবর। নদী খনন, সেচ ব্যবস্থার উন্নয়ন, ভাঙন রোধ এবং নৌ চলাচল ব্যবস্থার আধুনিকায়নে চীন পূর্ণ সহায়তার আশ্বাস দিয়েছে। এ সহযোগিতার আওতায় ‘তিস্তা নদীর সমন্বিত ব্যবস্থাপনা ও পুনরুদ্ধার প্রকল্প’ও অন্তর্ভুক্ত। পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনা, বন্যা নিয়ন্ত্রণ এবং পরিবেশ সুরক্ষায় চীনের আরো বড় পরিসরের সহায়তা চেয়ে রেখেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ক্ষমতা গ্রহণের সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশে তার নদী খনন কর্মসূচি চীন অবহিত।
যে কর্মসূচির মূল উদ্দেশ্য ভারতের পানি আগ্রাসনের কাছে অসহায় না থেকে বন্যার ঝুঁকি হ্রাস করা, পরিবেশ সংরক্ষণ করা এবং পানিসম্পদের টেকসই ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা। নিজস্ব পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনার এ সক্ষমতায় চীন সহায়তা বাড়ালে বাংলাদেশকে আর পেছনে তাকাতে হবে না। সেখানে ‘তিস্তা নদীর সমন্বিত ব্যবস্থাপনা ও পুনরুদ্ধার প্রকল্প’ বাস্তবায়নে চীনের কারিগরি সহায়তা মিললে তা হবে সোনায় সোহাগার মতো। চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের এ সংক্রান্ত সমঝোতা হয়েই আছে সেই ২০০৫ সালে। ২০০৫ সালে সই হওয়া ওই সমঝোতা স্মারকের কথা মনে করিয়ে দিয়েছেন তারেক রহমান। তিনি এও বলেছেন, পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনায় বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে বিদ্যমান দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতা বাস্তবভিত্তিক ও অত্যন্ত গবেষণানির্ভর। পানিসম্পদ খাতে সহযোগিতা সম্প্রসারণ এবং টেকসই উন্নয়নকে এগিয়ে নিতে নতুন নতুন অংশীদারত্বের ক্ষেত্র অনুসন্ধানে দুই দেশের অঙ্গীকার এবার বৈঠকের মাধ্যমে আরো স্পষ্ট হয়েছে। তিস্তায় চীনের সম্পৃক্ততা নিয়ে ভারতের উদ্বেগ ছিল-আছে এবং থাকবেও। চীনের তরফে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের সঙ্গে এই সহযোগিতার তৃতীয় কোনো পক্ষকে ‘লক্ষ্য করে নয়’। তৃতীয় কোনো পক্ষের ‘হস্তক্ষেপও চায় না’ তারা। মানে বার্তা পরিষ্কার।
চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র গুও জিয়াকুন এর ব্যাখ্যায় বলেছেন, এ নিয়ে ভারতের উদ্বেগ থাকা স্বাভাবিক। কারণ তিস্তা সীমান্তের খুব কাছ দিয়ে প্রবাহিত। ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সঙ্গেও এর সম্পর্ক রয়েছে। আবার জীবিকার সঙ্গে সমপৃক্ত বিধায় তিস্তা নদীর সমন্বিত ব্যবস্থাপনা ও পুনরুদ্ধার প্রকল্প বাংলাদেশের জন্যও জরুরি। এমন শক্ত-পোক্ত কথার ফাঁকে আর কোনো ‘যদি-কিন্তু’র অবকাশ থাকতে পারে না। চীনের প্রধানমন্ত্রী লি ছিয়াংয়ের সমান্তরালে পানিসম্পদমন্ত্রী লি কুওইংও পাকা কথা দিয়েছেন। কেবল তিস্তা নয়, বাংলাদেশের বিভিন্ন নদীর ব্যবস্থাপনায়ও নতুন চিত্র দেখার অধীর অপেক্ষায় দেশের মানুষ। তাদের চোখের সামনে ভাসছে নদীর দুই তীর সংরক্ষণ, খনন ও প্রশস্তকরণ, জলাধার ও ব্যারেজ উন্নয়ন। দৃশ্যপটে পাশেই আধুনিক সেচব্যবস্থা। নদী ব্যবস্থাপনা প্রযুক্তিতে চীনের অগ্রগতি ও ম্যাজিক বাংলাদেশের মানুষকে এমন স্বপ্নের রাজ্যে নেয়াই স্বাভাবিক।
লেখক : সাংবাদিক-কলামিস্ট; ডেপুটি হেড অব নিউজ, বাংলাভিশন






