• ই-পেপার

তুরস্কের বাংলাদেশ নীতি : মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানপন্থী, পরবর্তীতে জামায়াতকে সমর্থন

নতুন ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতা : তিস্তা ও নদী ব্যবস্থাপনায় বাংলাদেশ-চীন ঐকমত্য

সিরাজুল ইসলাম
নতুন ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতা : তিস্তা ও নদী ব্যবস্থাপনায় বাংলাদেশ-চীন ঐকমত্য

বাংলাদেশের উন্নয়ন ভাবনায় পানি সবসময়ই একটি কেন্দ্রীয় বা মৌলিক উপাদান। বিশেষ করে নদীমাতৃক এই দেশে নদীর সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক কেবল অর্থনৈতিক নয়, বরং সামাজিক, সাংস্কৃতিক এবং রাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। সেই বাস্তবতায় তিস্তা নদী একদিকে যেমন উত্তরাঞ্চলের জীবনরেখা, অন্যদিকে তেমনি দীর্ঘদিনের একটি অমীমাংসিত সংকটের প্রতীক।

সাম্প্রতিক সময়ে বেইজিংয়ে বাংলাদেশ ও চীনের উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে তিস্তা এবং অন্যান্য নদী ব্যবস্থাপনায় সহযোগিতার যে ঐকমত্য তৈরি হয়েছে, তা এই দীর্ঘস্থায়ী সমস্যার সমাধানের নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও চীনের পানিসম্পদমন্ত্রী লি কিয়াংয়ের মধ্যে অনুষ্ঠিত বৈঠকে তিস্তা মহাপরিকল্পনা, বন্যা নিয়ন্ত্রণ, নদীভাঙন রোধ, সেচ ব্যবস্থার আধুনিকায়ন এবং নৌ-নেভিগেশন উন্নয়নের বিষয়ে বিস্তৃত আলোচনা হয়।

এই আলোচনাকে কেবল একটি উন্নয়ন সহযোগিতা হিসেবে দেখা হলে বিষয়টির গভীরতা অনেকাংশেই কমে যাবে। কারণ এটি একই সঙ্গে একটি প্রযুক্তিগত প্রকল্প, অর্থনৈতিক পরিকল্পনা এবং কৌশলগত ভূরাজনৈতিক সমীকরণের অংশ।

তিস্তা : এক নদী, বহু সংকট

তিস্তা নদী বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের কৃষি অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এই নদী বছরে দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন রূপ ধারণ করে। বর্ষাকালে অতিরিক্ত পানির কারণে ভয়াবহ বন্যা সৃষ্টি হয় যা ফসল, ঘরবাড়ি এবং অবকাঠামোর ব্যাপক ক্ষতি করে। অন্যদিকে শুষ্ক মৌসুমে পানির প্রবাহ প্রায় বন্ধ হয়ে যাওয়ায় কৃষিকাজ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়।

এই দ্বৈত সংকটের কারণে তিস্তা অঞ্চলে দারিদ্র্য, অভিবাসন এবং অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা দীর্ঘদিন ধরে চলমান। ফলে তিস্তা সমস্যা কেবল পানি বণ্টনের বিষয় নয়, বরং এটি একটি সামাজিক-অর্থনৈতিক সংকট।

দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে তিস্তা পানিবণ্টন চুক্তি ঝুলে থাকায় এই সমস্যা সমাধানের বিকল্প পথ অনুসন্ধানও জরুরি হয়ে উঠেছে। সেই প্রেক্ষাপটে চীনের সঙ্গে সহযোগিতার উদ্যোগ নতুন মাত্রা যোগ করেছে।

চীনের সম্পৃক্ততা : প্রযুক্তি, অভিজ্ঞতা ও কৌশল

চীন বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রযুক্তির অধিকারী দেশ। বড় নদী নিয়ন্ত্রণ, বন্যা প্রতিরোধ, বাঁধ নির্মাণ এবং সেচ ব্যবস্থার আধুনিকায়নে তাদের অভিজ্ঞতা বৈশ্বিকভাবে স্বীকৃত।

বৈঠকে চীনের পক্ষ থেকে বাংলাদেশের পানি ব্যবস্থাপনায় কারিগরি সহায়তা, প্রশিক্ষণ এবং যৌথ গবেষণার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে যৌথ ফিজিবিলিটি স্টাডি পরিচালনার বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ কোনো বড় অবকাঠামো প্রকল্প সফলভাবে বাস্তবায়নের আগে বৈজ্ঞানিক পরিকল্পনা এবং বাস্তবভিত্তিক মূল্যায়ন অপরিহার্য।

এছাড়া, চীনের পক্ষ থেকে বাংলাদেশের পানি বিশেষজ্ঞদের প্রশিক্ষণের জন্য আমন্ত্রণ জানানো এবং টোটাল ওয়াটার রিসোর্স ম্যানেজমেন্টে সহযোগিতার আগ্রহ প্রকাশ করা হয়েছে। এর মাধ্যমে দুই দেশের মধ্যে প্রযুক্তি বিনিময় এবং দক্ষতা উন্নয়নের একটি নতুন প্ল্যাটফর্ম তৈরি হতে পারে।

উন্নয়ন সহযোগিতা থেকে কৌশলগত অংশীদারি

বাংলাদেশ-চীন সম্পর্ক দীর্ঘদিন ধরেই অর্থনৈতিক সহযোগিতার ভিত্তিতে গড়ে উঠেছে। অবকাঠামো উন্নয়ন, সড়ক, সেতু, বিদ্যুৎ এবং শিল্পখাতে চীনের বিনিয়োগ বাংলাদেশের উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

তবে তিস্তা প্রকল্পের মাধ্যমে এই সম্পর্ক আরো একটি নতুন স্তরে প্রবেশ করছে- যেখানে পানি ব্যবস্থাপনা এখন কেবল উন্নয়ন ইস্যু নয়, বরং কৌশলগত অংশীদারির অংশ।

কারণ পানিসম্পদ দক্ষিণ এশিয়ায় একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল ভূ-রাজনৈতিক ইস্যু। আন্তঃসীমান্ত নদীগুলোর নিয়ন্ত্রণ, প্রবাহ এবং ব্যবহার শুধু অর্থনৈতিক নয়, রাজনৈতিক প্রভাবও তৈরি করে।

আঞ্চলিক ভূ-রাজনীতির নতুন সমীকরণ

তিস্তা প্রকল্পে চীনের সম্ভাব্য সম্পৃক্ততা দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক ভূ-রাজনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিতে পারে। এই অঞ্চলে ভারত দীর্ঘদিন ধরে নদী ব্যবস্থাপনা ও পানি কূটনীতিতে প্রধান ভূমিকা পালন করে আসছে।

এখন চীনের সক্রিয় উপস্থিতি একটি নতুন ভারসাম্যের প্রশ্ন তৈরি করছে। তবে এটিকে সরাসরি প্রতিযোগিতা হিসেবে না দেখে বরং বহুপক্ষীয় সহযোগিতার অংশ হিসেবে দেখা হলে বাংলাদেশের জন্য কৌশলগত সুবিধা তৈরি হতে পারে।

বাংলাদেশের অবস্থান এখানে অত্যন্ত সূক্ষ্ম। একদিকে বৃহৎ প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক রক্ষা, অন্যদিকে জাতীয় স্বার্থ সংরক্ষণ—এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

তিস্তা মহাপরিকল্পনা : সম্ভাবনা ও বাস্তব চ্যালেঞ্জ

তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন হলে এটি বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের অর্থনীতিতে বড় পরিবর্তন আনতে পারে। কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, বন্যা নিয়ন্ত্রণ, নদীভাঙন হ্রাস এবং সেচ ব্যবস্থার উন্নয়ন- সবই এই প্রকল্পের সম্ভাব্য ফলাফল।

তবে বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জও কম নয়। বড় অবকাঠামো প্রকল্পে অর্থনৈতিক স্বচ্ছতা, প্রশাসনিক দক্ষতা এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অতীত অভিজ্ঞতা বলে, অনেক বড় প্রকল্প যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ ও পরিকল্পনার অভাবে প্রত্যাশিত ফল দিতে ব্যর্থ হয়েছে। এছাড়া, প্রকল্পের জন্য বরাদ্দ অর্থের সদ্ব্যবহার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। অতীত সরকারের সময় বহু বড় প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছিল কিন্তু অর্থ লুটপাটের ঘটনাও ঘটেছে হরহামেশা।

এছাড়া, পরিবেশগত ভারসাম্য, নদীর প্রাকৃতিক প্রবাহ এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জীবিকা- এই বিষয়গুলোও পরিকল্পনায় গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে।

বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সম্পর্কের বিস্তার

এই বৈঠকের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা। চীন বর্তমানে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বাণিজ্য অংশীদার। তবে দুই দেশের বাণিজ্য ভারসাম্য এখনো চীনের পক্ষে বেশি ঝুঁকে আছে।

বৈঠকে বাংলাদেশ চীনে রপ্তানি বৃদ্ধির সুযোগ এবং বাজার সম্প্রসারণের বিষয়টি তুলে ধরেছে। একই সঙ্গে চীনা বিনিয়োগ ও প্রযুক্তি সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়ে আলোচনা হয়েছে।

এই অর্থনৈতিক সহযোগিতা যদি কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন হয়, তাহলে তা শুধু নদী ব্যবস্থাপনায় নয়, সামগ্রিক অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক তাৎপর্য

চীনের প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াংয়ের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক এবং শি জিনপিংয়ের সঙ্গে উচ্চপর্যায়ের সাক্ষাত এই সফরকে কূটনৈতিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। দুটি চুক্তি ও ১৩টি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর দুই দেশের সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে।

এই ধরনের সমঝোতা সাধারণত দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত সম্পর্কের ভিত্তি তৈরি করে, যা ভবিষ্যতে বিভিন্ন খাতে সহযোগিতার সুযোগ সৃষ্টি করে।

সম্ভাবনা ও সতর্কতার ভারসাম্য

সব মিলিয়ে বলা যায়, তিস্তা ও নদী ব্যবস্থাপনায় বাংলাদেশ-চীন ঐকমত্য কেবল একটি অবকাঠামোগত প্রকল্প নয়; এটি একই সঙ্গে উন্নয়ন, প্রযুক্তি, অর্থনীতি এবং ভূ-রাজনীতির সমন্বিত একটি প্রক্রিয়া।

এই উদ্যোগ সফল হলে এটি বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের অর্থনীতিতে যুগান্তকারী পরিবর্তন আনতে পারে। তবে এর সফলতা নির্ভর করবে পরিকল্পনার স্বচ্ছতা, বাস্তবায়নের দক্ষতা এবং আঞ্চলিক কূটনৈতিক ভারসাম্য রক্ষার ওপর।

কারণ বড় প্রকল্প যতটা সম্ভাবনা তৈরি করে, ততটাই ঝুঁকিও বহন করে। তাই এই নতুন সমীকরণকে শুধু আশাবাদের চোখে নয়, বরং বাস্তববাদী দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে বিশ্লেষণ করাই হবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

লেখক : সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক

বাংলাদেশের এগিয়ে যাওয়ার প্রধান বাধা আইনশৃঙ্খলা

অদিতি করিম
বাংলাদেশের এগিয়ে যাওয়ার প্রধান বাধা আইনশৃঙ্খলা

আধুনিক মালয়েশিয়ার প্রতিষ্ঠাতা মাহাথির মোহাম্মদ দেশটির উন্নয়ন পরিকল্পনায় সবার আগে স্থান দিয়েছিলেন আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন। তিনি দায়িত্ব গ্রহণের পর বলেছিলেন, ‘আমরা যদি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি করতে না পারি, তাহলে আমাদের কোনো স্বপ্ন পূরণ হবে না।’ আইনশৃঙ্খলার উন্নতি করতে মাহাথির কঠোর হয়েছিলেন। এজন্য তিনি পশ্চিমা দেশগুলোর কাছে সমালোচিতও হন। কিন্তু সব চাপ উপেক্ষা করে তিনি অপরাধ দমন করতে পেরেছিলেন বলেই মালয়েশিয়া আজ বিশ্বের অন্যতম অর্থনৈতিক শক্তি। শুধু মালয়েশিয়া কেন, বিশ্বের বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানো সব দেশের ইতিহাস একই। তারা দেশের অপরাধ দমন করেছে। জনগণের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি করেছে। ফলে দেশিবিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থা বেড়েছে। মানুষ ভয়হীন পরিবেশে কাজ করতে পেরেছে। তাই আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে রাখা একটি রাষ্ট্রের এগিয়ে যাওয়ার চাবিকাঠি। বাংলাদেশের জন্য এ উদাহরণ এখন অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। ২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লবের পর এ দেশের মানুষ স্বপ্ন দেখেছিল এগিয়ে যাওয়ার। বিশ্বের বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর। মানুষ প্রত্যাশা করেছিল তারা শান্তিতে ও নিরাপদে বসবাস করবে। শিক্ষার্থীরা স্বপ্ন দেখেছিল শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশের, ব্যবসায়ীরা ভয়হীন নিরাপদে ব্যবসা করার আশা করেছিলেন। সাধারণ মানুষ ভেবেছিল এখন তারা নিরাপদে সবকিছু উপভোগ করতে পারবে। কিন্তু ইউনূস সরকার ক্ষমতায় আসার পর স্বপ্নভঙ্গ হতে বেশি সময় লাগেনি। ’২৪-এর ৫ আগস্টের পর থেকেই বাংলাদেশ যেন এক নৈরাজ্যের যুগে প্রবেশ করে। মুষ্টিমেয় কিছু লোক ইউনূস সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় দেশে এক ভীতিকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করে। সর্বত্র শুরু হয় মব সন্ত্রাস। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে বিচারালয়, শিল্পপ্রতিষ্ঠান থেকে সচিবালয়, ধর্মীয় উপাসনালয় থেকে সাংস্কৃতিক অঙ্গন সব জায়গায় শুরু হয় মবের রাজত্ব। বাংলাদেশ যেন ফিরে যায় জোর যার মুলুক তার নীতিতে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ভয়াবহ অবনতি ঘটে। সাধারণ মানুষ নিজেদের ঘরবাড়িতেও অনিরাপদ বোধ করতে শুরু করে। একটা দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হলে দেশটা কোন অন্ধকারে নিমজ্জিত হয় তার সবচেয়ে বড় উদাহরণ ইউনূস আমলের বাংলাদেশ। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির কারণে দেশের শিক্ষার পরিবেশ নষ্ট হয়ে যায়। সামাজিক নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়ে। ব্যবসাবাণিজ্য বন্ধ হয়ে যায়। দেশিবিদেশি বিনিয়োগ বন্ধ হয়ে যায়। ফলে দেশে চরম অর্থনৈতিক সংকট সৃষ্টি হয়। বেকারত্ব বাড়ে, বাড়ে দারিদ্র্য। ইউনূস আমলে দেশের অবস্থা এমন পর্যায়ে পৌঁছে যে নিরাপদে চলাফেরা করাও অসম্ভব হয়ে পড়ে।

এ রকম একটা পরিস্থিতিতে জনগণের চাপে ইউনূস সরকার নির্বাচন দিতে বাধ্য হয়। ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে দেশের মানুষ শুধু বিএনপিকে ভোট দেয়নি, তারা ভোট দিয়েছে শান্তির আশায়, নিরাপত্তার পক্ষে। বিএনপির অন্যতম প্রধান নির্বাচনি অঙ্গীকার ছিল দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি। নির্বাচিত হওয়ার পর বিএনপি সরকার আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে আনাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছে, এ নিয়ে কারও কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু সরকার এখন পর্যন্ত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পারেনি। তবে এটা ঠিক, ইউনূস আমলের চেয়ে গত তিন মাসে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছে। কিন্তু এটুকুই যথেষ্ট নয়। সাম্প্রতিক সময়ে আবারও আইনশৃঙ্খলা নিয়ে জনমনে উদ্বেগ বাড়ছে।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সরকারের প্রথম ১০০ দিনে অপরাধের গ্রাফ উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। মার্চ ও এপ্রিল এ দুই মাসে দেশে ৬০৫টি খুন, ২৯৪টি ছিনতাই, ৯০টি ডাকাতি এবং ১৯৬টি অপহরণের ঘটনা ঘটেছে। একই সময়ে পুলিশের ওপর হামলার ঘটনা ঘটেছে ১২৯টি এবং চুরি ঘটেছে ২ হাজার ২১৪টি।

আলোচিত সময়ে নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে ৩ হাজার ৪৯৬টি। এর মধ্যে ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ৭৮ থেকে ১০২ জন, দলবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ৩০ থেকে ৩৬ জন এবং ধর্ষণের শিকার শিশুর সংখ্যা ৪৯ থেকে ৭১। এ পরিসংখ্যানই স্পষ্ট করে দেয় যে বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবস্থা এখনো নাজুক।

চলতি বছরের গত পাঁচ মাসে দেশে খুন, অপহরণ, ছিনতাই, ডাকাতি ও নারী-শিশু নির্যাতন বাড়ার ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ সিভিল রাইটস সোসাইটি (বিসিআরএস)। সংগঠনটির প্রতিবেদনে বলা হয়, জানুয়ারি থেকে এপ্রিল ২০২৬ পর্যন্ত দেশে ১ হাজার ১৪২টি খুন হয়েছে। একই সময়ে ৩৪৭টি অপহরণ, ১৮৪টি ছিনতাই ও ৫৯১টি ডাকাতির ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। নারী ও শিশু নির্যাতনের মামলা ছিল ৫ হাজার ৯৯৮টি।

এসব পরিসংখ্যান বলে দিচ্ছে আমরা এখনো প্রত্যাশিত জায়গায় পৌঁছাতে পারিনি।

তবে এ কথা অস্বীকার করার কোনো কারণ নেই যে সরকার আন্তরিকভাবে চেষ্টা করছে। কিন্তু ইউনূস সরকারের ১৮ মাসের ভয়াবহতা থেকে এখনো বেরিয়ে আসতে পারেনি। কেন পারেনি? এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজলেই আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি উন্নতির পথনকশা খুঁজে পাওয়া যাবে।

বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার তিন মাস পেরিয়ে গেলেও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী পুরোপুরি ঢেলে সাজাতে পারেনি। ইউনূস সরকারের আমলে পুলিশ ও র‌্যাবের ভিতরে বিএনপিবিরোধী যেসব কর্মকর্তাকে বসানো হয়েছিল তারা অনেকেই এখনো বহাল তবিয়তে আছেন। এসব কর্মকর্তা ও লোকজন দিয়ে বিএনপি আইনশৃঙ্খলার উন্নতি খুব একটা করতে পারবে না। কারণ এরা সব সময় বিএনপিকে ব্যর্থ করতে চাইবে। শুধু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে নয়, প্রশাসনের ভিতরেও ঘাপটি মেরে আছে বিএনপিবিরোধী অনেক লোক। এরা এখন বিএনপির মুখোশ পরে আছে। কিন্তু এদের লক্ষ্য বিএনপিকে ব্যর্থ করা।

আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি অনেকখানি নির্ভর করে বিচার বিভাগের ওপর। পুলিশ অপরাধীদের গ্রেপ্তার করতে পারে, কিন্তু তার সঠিক ও যথাযথ বিচার নিশ্চিত করার দায়িত্ব বিচার বিভাগের। ইউনূস সরকারের আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল বিচার বিভাগ প্রায় ধ্বংস করে গেছেন। বিশেষ করে সরকারি আইনজীবী নিয়োগের ক্ষেত্রে হয়েছে চরম অনিয়ম ও স্বেচ্ছাচারিতা। আসিফ নজরুলের নিয়োগকৃত এসব সরকারি কৌঁসুলির একটি বড় অংশ প্রচণ্ড বিএনপিবিরোধী। সাড়ে তিন মাসের সরকার এসব সরকারি আইনজীবীকে পরিবর্তন করতে পারেনি। এরা যেকোনো সময় যে সরকারকে বিব্রত করতে পারে তার প্রমাণ পাওয়া গেল ২৩ জুন। অন্তর্র্বর্তী সরকারের সময় নিয়োগ পাওয়া অ্যাটর্নি জেনারেল কার্যালয়ের ১৮ জন আইন কর্মকর্তা পদত্যাগ করেছেন। সুপ্রিম কোর্টে (আপিল ও হাই কোর্ট বিভাগ) রাষ্ট্র বা সরকারের পক্ষে মামলা পরিচালনার জন্য তাঁরা নিয়োগ পেয়েছিলেন। তাঁদের মধ্যে সাতজন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল, বাকি ১১ জন সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল। পদত্যাগকারীরা জামায়াতপন্থি আইনজীবী হিসেবে পরিচিত। পদত্যাগপত্রে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন না করা, সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ এবং সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ অধ্যাদেশ বাতিলকে পদত্যাগের কারণ উল্লেখ করা হয়েছে। এ পদত্যাগের ঘটনা কি সরকারের জন্য ভালো খবর? সরকার কেন এতদিনেও আসিফ নজরুল আমলের আইন কর্মকর্তাদের যাচাইবাছাই করতে পারেনি? শুধু অ্যাটর্নি জেনারেল অফিসে নয়, সারা দেশে জিপি, পিপিদের ক্ষেত্রেও একই অবস্থা হয়েছে। এঁরাও সরকারকে যেকোনো সময় বিব্রতকর পরিস্থিতিতে ফেলতে পারেন। সরকার একদিকে যেমন ইউনূস সরকারের পাতানো ফাঁদে পা দিচ্ছে, অন্যদিকে আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে চেষ্টা চালাচ্ছে। দুটো একসঙ্গে চলতে পারে না।

আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি করতে হলে দরকার আইনের শাসন ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা। আওয়ামী লীগ আমলে সংঘটিত অপরাধের যেমন বিচার করতে হবে, তেমন বিচার করতে হবে ইউনূস আমলে সংঘটিত মব সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, লুটপাট, অগ্নিসংযোগ, নারী নির্যাতন ও সব হত্যাকাণ্ডের। ইউনূস সরকারের ছায়ায় থেকে যারা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে লুটপাট করেছে, যারা বিভিন্ন সংবাদপত্র অফিসে হামলা ও অগ্নিসংযোগ করেছে, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে সরকার কেন দ্বিধান্বিত? ইউনূসের ঘনিষ্ঠরা যারা প্রকাশ্যে চাঁদাবাজি করেছে, মব করেছে কিংবা মবের পক্ষে সাফাই গেয়েছে, সরকার তাদের বিরুদ্ধে এখনো কঠোর হতে পারেনি।

সরকার অর্থনৈতিক সংকট উত্তরণে বিনিয়োগ বৃদ্ধিকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে, কিন্তু ইউনূস আমলে বিনিয়োগবিনাশী তৎপরতার বিচার করছে না। কারা বিভিন্ন শিল্পকারখানায় আগুন দিয়েছিল, কারা চাঁদাবাজির জন্য ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দিয়ে বিনিয়োগ পরিবেশ ধ্বংস করেছিল সবাই জানে। বিগত সাড়ে তিন মাসেও কেন তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি? দেশের অর্থনীতি সচল করতে হলে ব্যবসা পরিবেশ নষ্টকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতেই হবে। ব্যবসায়ী ও শিল্পোদ্যোক্তারা এখনো আতঙ্কে। এ আতঙ্ক দূর করতে না পারলে যতই প্রণোদনা দেওয়া হোক, অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াবে না।

আইনশৃঙ্খলা স্বাভাবিক করতে হলে অবশ্যই আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে হবে। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার জন্য সরকারকে নির্মোহভাবে কাজ করতে হবে। অপরাধী যে-ই হোক, যত ক্ষমতাবান হোক তাদের আইনের আওতায় আনতে হবে। জনগণের চেয়ে অপরাধীরা ক্ষমতাবান হতে পারে না। বিএনপি সরকার যদি ইউনূস আমলে সংবাদপত্র অফিসে হামলাকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিত, তাহলে ২৩ জুন ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের সামনে সাংবাদিক পেটানোর অনাকাক্সিক্ষত ঘটনা ঘটত না। এ ঘটনার পরও সরকার এখন পর্যন্ত কোনো ব্যবস্থা নেয়নি কেন?

এ সরকার জনগণের বিপুল সমর্থনে দেশ পরিচালনার দায়িত্ব নিয়েছে। কাজেই কাউকে সরকারের ভয় পাওয়ার কিছু নেই। অপরাধীদের একটাই পরিচয়, তারা অপরাধী। সরকার যদি কার লোক দেখে আইন প্রয়োগ করে, তাহলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির কাক্সিক্ষত উন্নতি হবে না। আর আইনশৃঙ্খলার উন্নতি না হলে সরকারের সব স্বপ্ন ও উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন কঠিন হবে।

অদিতি করিম, লেখক ও নাট্যকার
ই-মেইল : [email protected]

বাংলাদেশ-চীন সম্পর্ক : সম্ভাবনা, প্রত্যাশা ও কিছু ব্যক্তিগত ভাবনা

মো. শাহাদাত হোসেন
বাংলাদেশ-চীন সম্পর্ক : সম্ভাবনা, প্রত্যাশা ও কিছু ব্যক্তিগত ভাবনা

সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফর বাংলাদেশ-চীন সম্পর্ককে নতুন করে আলোচনায় নিয়ে এসেছে। গত কয়েক মাসে দুই দেশের উচ্চপর্যায়ের যোগাযোগ, পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠক এবং অর্থনৈতিক সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা থেকে প্রতীয়মান হচ্ছে যে উভয় দেশই তাদের সম্পর্ককে আরো বাস্তবমুখী ও ফলপ্রসূ পর্যায়ে নিয়ে যেতে আগ্রহী। একজন বাংলাদেশি হিসেবে এবং দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশ-চীন সম্পর্ক ও চীনা ভাষা প্রচারে সম্পৃক্ত একজন কর্মী হিসেবে এই পরিবর্তনগুলো আমি গভীর আগ্রহ নিয়ে পর্যবেক্ষণ করছি।

১৯৮৮ সালে যখন প্রথম চীনা ভাষা শেখার যাত্রা শুরু করি, তখন কল্পনাও করিনি যে একদিন বাংলাদেশ-চীন সম্পর্ক নিয়ে এত দীর্ঘসময় কাজ করার সুযোগ হবে। পরবর্তীকালে চীনে অধ্যয়ন, বিভিন্ন শিক্ষা ও গবেষণামূলক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ এবং উই স্পিক চাইনিজ ক্লাব বাংলাদেশ লিমিটেড (WSCC)-এর কার্যক্রম পরিচালনা করতে গিয়ে আমার উপলব্ধি হয়েছে যে রাষ্ট্রের মধ্যে সম্পর্কের প্রকৃত ভিত্তি শুধু চুক্তি, ঋণ বা অবকাঠামো নয়; বরং মানুষের মধ্যে বিশ্বাস, পারস্পরিক শ্রদ্ধা এবং দীর্ঘমেয়াদি সহযোগিতার মানসিকতা।

২০২৪ সালের ২০ মে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এমবিএ ভবনে ‘China-Bangladesh Relations and Belt and Road Initiative’ শীর্ষক একটি গোলটেবিল আলোচনায় অংশগ্রহণের সুযোগ হয়েছিল। সেখানে চীন ও বাংলাদেশের শিক্ষাবিদ, গবেষক এবং নীতিনির্ধারণী মহলের প্রতিনিধিদের আলোচনায় একটি বিষয় বারবার উঠে এসেছে—বাংলাদেশ ও চীনের সম্পর্ক ক্রমেই প্রতীকী বন্ধুত্বের সীমা অতিক্রম করে অর্থনীতি, প্রযুক্তি, শিক্ষা, মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং আঞ্চলিক সংযোগভিত্তিক অংশীদারিত্বে পরিণত হচ্ছে।

সম্প্রতি দুই দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠকের যৌথ বিবৃতিতে অর্থনীতি, বাণিজ্য, বিনিয়োগ, ডিজিটাল অর্থনীতি, পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনা, স্বাস্থ্যসেবা এবং জনগণের মধ্যে যোগাযোগ বৃদ্ধির ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। তিস্তা নদী ব্যবস্থাপনা ও পুনরুদ্ধার প্রকল্পে চীনের সম্ভাব্য সম্পৃক্ততা নিয়েও আলোচনা হয়েছে। এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের উন্নয়ন যাত্রায় নতুন গতি সঞ্চার হতে পারে।

তবে আমার কাছে মনে হয়, বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি বজায় রাখা। বাংলাদেশ ঐতিহাসিকভাবে সবার সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলার নীতিতে বিশ্বাসী। তাই কোনো একটি শক্তির দিকে অতিরিক্ত ঝুঁকে পড়া নয়, বরং বহুমাত্রিক কূটনৈতিক ভারসাম্য বজায় রেখে জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়াই হওয়া উচিত আমাদের মূল লক্ষ্য। আমার বিশ্লেষণ ভুলও হতে পারে, কিন্তু বর্তমান আন্তর্জাতিক বাস্তবতা পর্যবেক্ষণ করে আমার কাছে এমনটাই মনে হয়।

বাংলাদেশ-চীন সহযোগিতার ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তা করতে গিয়ে আমি প্রায়ই একটি প্রশ্ন করি—কোন প্রকল্পগুলো সাধারণ মানুষের জীবনে সবচেয়ে বেশি ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে?

আমার মতে, আগামী দিনের সহযোগিতায় স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত। দেশের আটটি বিভাগে আন্তর্জাতিক মানের হাসপাতাল এবং বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা গেলে উন্নয়নের সুফল আরো সমভাবে ছড়িয়ে পড়বে। একইভাবে ঢাকা-কেন্দ্রিক উচ্চগতির রেল যোগাযোগ দেশের অর্থনৈতিক কার্যক্রমকে নতুন মাত্রা দিতে পারে।

বাংলাদেশের সামনে আরেকটি বড় সম্ভাবনার ক্ষেত্র হলো ব্লু ইকোনমি বা সমুদ্রভিত্তিক অর্থনীতি। বঙ্গোপসাগরের বিশাল সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে একটি আন্তর্জাতিক মানের সামুদ্রিক গবেষণা কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করা যেতে পারে। একই সঙ্গে নবায়নযোগ্য জ্বালানি, ডিজিটাল প্রযুক্তি এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা খাতে সহযোগিতা বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

দীর্ঘদিন চীনা ভাষা শিক্ষা ও মানবসম্পদ উন্নয়নের সঙ্গে যুক্ত থাকার অভিজ্ঞতায় আমি দেখেছি, বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ তার তরুণ জনগোষ্ঠী। তাই কারিগরি শিক্ষা, ভাষা প্রশিক্ষণ এবং আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারের উপযোগী দক্ষতা উন্নয়নের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। চীনা ভাষাসহ আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর প্রশিক্ষণ কর্মসূচি ভবিষ্যতে হাজার হাজার তরুণের জন্য নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করতে পারে।

আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, যেকোনো আন্তর্জাতিক উন্নয়ন প্রকল্পের সফলতা শেষ পর্যন্ত নির্ভর করে সাধারণ মানুষের জীবনে তার বাস্তব প্রভাবের ওপর। জনগণের হৃদয় ও আস্থা অর্জন করতে না পারলে কোনো প্রকল্পই দীর্ঘমেয়াদে সফল হতে পারে না। কর্মসংস্থান সৃষ্টি, প্রযুক্তি হস্তান্তর, দক্ষতা উন্নয়ন এবং স্থানীয় অর্থনীতিকে শক্তিশালী করার বিষয়গুলো তাই সর্বাগ্রে বিবেচিত হওয়া উচিত।

বাংলাদেশ ও চীনের সম্পর্কের পঞ্চাশ বছর পূর্তি আমাদের সামনে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মুক্ত করেছে। বিভিন্ন গণমাধ্যম সূত্রে এবং সাম্প্রতিক কূটনৈতিক তৎপরতা থেকে ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে যে আগামী কয়েক বছরে এই সম্পর্ক আরো গভীর হতে পারে। তবে সম্পর্কের প্রকৃত সাফল্য নির্ধারিত হবে কতগুলো চুক্তি স্বাক্ষরিত হলো তার ওপর নয়, বরং কতজন মানুষের জীবনমান উন্নত হলো, কত কর্মসংস্থান সৃষ্টি হলো এবং কতটা টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করা গেল তার ওপর।

সবশেষে, একজন দীর্ঘদিনের পর্যবেক্ষক ও অবদানকারী হিসেবে আমার বিশ্বাস, বাংলাদেশ-চীন সম্পর্কের সবচেয়ে বড় শক্তি অবকাঠামো, বাণিজ্য বা অর্থায়নের পরিসংখ্যানে নয়; বরং দুই দেশের জনগণের মধ্যে গড়ে ওঠা আস্থা, বন্ধুত্ব এবং পারস্পরিক সম্মানে নিহিত। সেই ভিত্তি যত শক্তিশালী হবে, উভয় দেশের জন্যই ভবিষ্যৎ তত উজ্জ্বল হবে।

লেখক : অবসরপ্রাপ্ত কর্নেল, অ্যাডজাঙ্কট প্রফেসর, উই স্পিক চাইনিজ ক্লাব বাংলাদেশ লিমিটেডের প্রতিষ্ঠাতা ও সাধারণ সম্পাদক

জামায়াতের দ্বৈত অবস্থানে রাজনৈতিক সংঘাতের আশঙ্কা

রাজনৈতিক বিশ্লেষক
জামায়াতের দ্বৈত অবস্থানে রাজনৈতিক সংঘাতের আশঙ্কা
সংগৃহীত ছবি

বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বর্তমানে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর ভূমিকা ও রাজনৈতিক লক্ষ্য নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিতর্ক তৈরি হয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সমালোচকদের মতে, দলটির সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ড কেবল গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণের ইচ্ছাই নয়, বরং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও জাতীয় ঐকমত্যের ওপর চাপ তৈরি করেও দ্রুত ক্ষমতার দিকে অগ্রসর হওয়ার একটি কৌশলের ইঙ্গিত দেয়। এমনটাই মনে করছেন তারা। এই আলোচনা মূলত উঠে এসেছে জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমানের সাম্প্রতিক একটি বক্তব্যকে ঘিরে। তিনি সরকারকে সতর্ক করে বলেন, সংস্কার এবং ‘জুলাই সনদ’ বাস্তবায়ন-সংক্রান্ত প্রতিশ্রুতি পূরণ না হলে বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক আন্দোলন গড়ে তোলা হতে পারে। 

বিশ্লেষকদের মতে, এ ধরনের বক্তব্যকে অনেকে গঠনমূলক রাজনৈতিক চাপ হিসেবে দেখেন না; বরং এটি দীর্ঘ রাজনৈতিক অস্থিরতার পর একটি নবগঠিত বা স্থিতিশীলতা পুনর্গঠনের পথে থাকা সরকারকে দুর্বল করার প্রচেষ্টা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

সমালোচকদের আরেকটি মত হলো—জামায়াত একদিকে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার কথা বলছে, আবার অন্যদিকে সরকারের প্রতি পর্যাপ্ত সময় না দিয়েই আন্দোলনের হুঁশিয়ারি দিচ্ছে। তাদের মতে, এই দ্বৈত অবস্থান জাতীয় পুনর্মিলন ও প্রাতিষ্ঠানিক শক্তিশালীকরণের পরিবর্তে নতুন করে রাজনৈতিক সংঘাত ও চাপের সংস্কৃতি তৈরি করতে পারে, যা দ্রুত রাজনৈতিক সুবিধা নেওয়ার প্রবণতাকেই উৎসাহিত করে।

জামায়াতের অবস্থান নিয়ে আরও একটি প্রশ্ন উঠেছে দেশের সার্বভৌমত্ব ও অর্থনৈতিক স্বাধীনতা সংশ্লিষ্ট ইস্যুতে তাদের তুলনামূলক নীরবতা নিয়ে। উদাহরণ হিসেবে বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে প্রস্তাবিত পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তির প্রসঙ্গ টানা হয়। সমালোচকদের দাবি, জামায়াত নিজেদের জাতীয় স্বার্থ ও ইসলামী সংহতির রক্ষক হিসেবে উপস্থাপন করলেও, এমন কিছু নীতিগত ইস্যুতে তাদের অবস্থান তুলনামূলকভাবে সংযত বা নীরব, যেখানে দেশের নীতিনির্ধারণী স্বাধীনতা বা শিল্পখাতের ওপর সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। এই ‘নির্বাচিত প্রতিক্রিয়া’ তাদের বক্তব্য ও বাস্তব অবস্থানের মধ্যে একটি ব্যবধান তৈরি করছে বলে তারা মনে করেন।

আরেকটি সমালোচনা উঠে এসেছে নতুন রাজনৈতিক শক্তি ও অ্যাক্টিভিস্ট নেটওয়ার্কগুলোর সঙ্গে জামায়াতের সম্পর্ক নিয়ে। বিরোধীদের অভিযোগ, এমন একটি রাজনৈতিক পরিবেশে দলটি সুবিধা পেয়েছে যেখানে ভিন্নমতকে প্রায়ই “ফ্যাসিস্ট” বা সংস্কারবিরোধী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। তাদের মতে, এই ধরনের লেবেলিংয়ের ফলে রাজনৈতিক বিতর্কের স্বাভাবিক পরিসর সংকুচিত হয়েছে এবং অনেক ক্ষেত্রে গঠনমূলক সমালোচনা যথাযথ আলোচনা ছাড়াই বাতিল হয়ে যাচ্ছে।

কারো কারো মতে, জামায়াতের প্রভাব কেবল দলীয় কাঠামোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং সামাজিক, শিক্ষাগত, ধর্মীয় ও নাগরিক বিভিন্ন ক্ষেত্রে সক্রিয় সমমনা ও সহযোগী সংগঠনের মাধ্যমেও তা বিস্তৃত। যদিও প্রতিটি রাজনৈতিক দলই নিজেদের প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করে, তবে তাদের দাবি অনুযায়ী এসব নেটওয়ার্কের সম্মিলিত প্রভাব নীতিনির্ধারণে প্রভাব ফেলতে পারে এবং কিছু সামাজিক ও সাংস্কৃতিক গোষ্ঠীর ওপর চাপ তৈরি করতে পারে, যাদের অনেকেই জামায়াতের আদর্শিক অবস্থানের বিরোধী হিসেবে বিবেচিত।

বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতাও এই বিতর্ককে আরও জটিল করেছে। অনেক বিশ্লেষকের মতে, বাংলাদেশ এখনো ‘রাস্তার রাজনীতি’, জনচাপভিত্তিক আন্দোলন এবং ইউনূস নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের সময় দৃশ্যমান কিছু অনানুষ্ঠানিক রাজনৈতিক চাপের প্রবণতার প্রভাব মোকাবিলা করছে। ধারাবাহিক সরকারগুলো এসব প্রবণতা পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনতে পারেনি বলেও তারা মনে করেন। ফলে আইনশৃঙ্খলা ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার চ্যালেঞ্জগুলো বিদ্যমান, যা বিভিন্ন রাজনৈতিক শক্তিকে তাদের অবস্থান আরও দৃঢ়ভাবে তুলে ধরার সুযোগ করে দিচ্ছে।

এছাড়া, কিছু ক্ষেত্রে জামায়াতের পররাষ্ট্রনীতি নিয়েও সমালোচনা রয়েছে। দলটি বিশ্বজুড়ে মুসলিম ইস্যুতে সরব থাকলেও, যুক্তরাষ্ট্রের নীতিগত ভূমিকা বা মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত—যা জ্বালানি বাজার, বৈশ্বিক অর্থনীতি এবং বাংলাদেশি প্রবাসীদের জীবনে সরাসরি প্রভাব ফেলে—সেসব বিষয়ে তুলনামূলকভাবে সংযত অবস্থান নেওয়া হচ্ছে বলে সমালোচকদের দাবি। তাদের মতে, মুসলিম স্বার্থের পক্ষে অবস্থান নেওয়া রাজনৈতিক শক্তির ক্ষেত্রে এসব বিষয়ে আরও ধারাবাহিক ও স্পষ্ট অবস্থান প্রত্যাশিত।

তবে এই সমালোচনাগুলো সম্পূর্ণভাবে গ্রহণযোগ্য নাকি রাজনৈতিক ব্যাখ্যার অংশ—তা একটি চলমান বিতর্কের বিষয়। তবুও উদ্বেগের বিষয় হলো, জামায়াতসহ সকল রাজনৈতিক শক্তির বর্তমান কৌশল গণতান্ত্রিক চর্চা ও দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় স্থিতিশীলতার পরিবর্তে দ্রুত ক্ষমতার প্রতিযোগিতার দিকে ঝুঁকছে কি না, সেই প্রশ্ন।
একটি ভঙ্গুর রাজনৈতিক বাস্তবতায় শেষ পর্যন্ত প্রত্যাশা একটিই—দলীয় স্বার্থের বাইরে গিয়ে সংবিধান, প্রতিষ্ঠান এবং স্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিবেশকে অগ্রাধিকার দেওয়া। কারণ রাজনৈতিক সংঘাত ও অস্থিরতা বাড়লে তার চাপ পড়ে পুরো রাষ্ট্র কাঠামো ও গণতান্ত্রিক অর্জনের ওপর।