ইসলামে মানুষের সম্মান শুধু সামাজিক শিষ্টাচার নয়; বরং এটি ঈমান ও আল্লাহভীতিরই প্রতিফলন। পবিত্র হাদিসে এসেছে, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, আল্লাহকে সম্মান করার একটি অংশ হলো, বৃদ্ধ মুসলিমকে সম্মান করা, কোরআন ধারণকারীকে সম্মান করা এবং ন্যায়পরায়ণ শাসককে সম্মান করা। (আবু দাউদ, হাদিস : ৪৮৪৩)
এ হাদিসে স্পষ্টভাবে বোঝানো হয়েছে, এই তিন শ্রেণির মানুষকে সম্মান করা মূলত আল্লাহর প্রতি সম্মান প্রদর্শনেরই অংশ। নিম্নে এই তিন শ্রেণির বিষয়টি আরো স্পষ্ট করে তুলে ধরা হলো—
বয়োজ্যেষ্ঠ মুসলিম : পবিত্র হাদিসে বয়োজ্যেষ্ঠ ব্যক্তিদের সম্মান করার প্রতি গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। হাদিসের ভাষ্য মতে, আল্লাহ তাআলার প্রতি ভক্তি-সম্মান প্রদর্শনের দাবি হলো মজলিস-বৈঠকে প্রবীণ ও বয়স্ক মুসলিমদের সম্মানজনক স্থানে বসানো, তাঁদের প্রতি ভক্তিপূর্ণ আচরণ করা, প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে তাঁদের যথাযথ সেবাযত্ন করা। যেমন—হাত ধরে রাস্তা পার করিয়ে দেওয়া, যানবাহনে উঠতে সাহায্য করা, অজু-ইস্তিঞ্জায় সহজতার প্রতি লক্ষ রাখা ইত্যাদি। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, যে আমাদের ছোটদের দয়া করে না এবং বড়দের সম্মান করে না, সে আমাদের অন্তর্ভুক্ত নয়। (তিরমিজি, হাদিস : ১৯২০, আবু দাউদ, হাদিস : ৪৯৪৩)
এটি প্রমাণ করে যে বয়োজ্যেষ্ঠদের সম্মান করা ইসলামী চরিত্রের মৌলিক একটা অংশ।
বর্তমান সমাজের অনেক জায়গায় দেখা যায়, তরুণরা বড়দের কথা শোনে না, অসম্মানজনক আচরণ করে এবং তাঁদের অভিজ্ঞতাকে গুরুত্ব দেয় না। পারিবারিক ও সামাজিক জীবনে বড়দের প্রতি সেই আগের মতো শ্রদ্ধাবোধ অনেকটাই কমে গেছে। ফলে পারিবারিক বন্ধন দুর্বল হচ্ছে।
আলেম তথা কোরআনধারী ব্যক্তি : যাঁরা মহাগ্রন্থ আল কোরআনের জ্ঞান ধারণ করেন ও তা প্রচার করেন, মহান আল্লাহর দরবারে তাঁদের বিশেষ সম্মান রয়েছে। এ ব্যাপারে পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা বলেছেন, ‘আল্লাহ তোমাদের মধ্যে যারা ঈমান এনেছে এবং যাদের জ্ঞান দান করা হয়েছে (আলেমগণ), তাদের মর্যাদা বহু স্তরে উন্নীত করেন।’ (সুরা : আল-মুজাদালা, আয়াত : ১১)
হাদিসে এসেছে, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম সেই ব্যক্তি, যে কোরআন শেখে এবং শেখায়। (বুখারি, হাদিস : ৫০২৭)
অন্য হাদিসে এসেছে, আলেমরা নবীগণের উত্তরাধিকারী। (তিরমিজি, হাদিস : ২৬৮২)
আলেমদের সম্মান করা মানে দ্বিনের আলোকে সম্মান করা। কারণ তাঁরা নবীদের উত্তরাধিকারী। আলেমদের অবমাননা করা মূলত ইলম ও শরিয়তের মর্যাদাকে ক্ষুণ্ণ করা।
বর্তমানে অনেক ক্ষেত্রে আলেম ও কোরআনধারী ব্যক্তিদের যথাযথ সম্মান দেওয়া হয় না। কেউ কেউ দ্বিনি জ্ঞানকে ছোট করে দেখে বা সামাজিকভাবে তাঁদের গুরুত্ব কমিয়ে দেয়। অথচ সমাজের নৈতিক দিকনির্দেশনার মূল ভিত্তিই তাঁরা। এই অবমূল্যায়ন সমাজে দ্বিনি চেতনা দুর্বল করে দিচ্ছে।
ন্যায়পরায়ণ শাসক : যে শাসক জনসাধারণের মধ্যে ন্যায় ও ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করে, নিজেও কারো প্রতি জুলুম করে না, জনগণকেও পারস্পরিক জুলুম-নিপীড়ন থেকে বিরত রাখে, আল্লাহ তাআলার কাছে তার মর্যাদা অপরিসীম। হাদিসে এসেছে, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, সাত শ্রেণির মানুষকে আল্লাহ তাআলা কিয়ামতের দিন তাঁর ছায়ায় স্থান দেবেন, তাদের মধ্যে অন্যতম এক শ্রেণি হলো, ন্যায়পরায়ণ শাসক। (বুখারি, হাদিস : ৬৮০৬)
অন্য হাদিসে এসেছে : আল্লাহর কাছে সবচেয়ে প্রিয় সেই ব্যক্তি, যে মানুষের জন্য বেশি উপকারী। (আল মুজামুল আওসাত, হাদিস : ৫৭৮৭)
যে সমাজ বয়োজ্যেষ্ঠ, আলেম ও ন্যায়পরায়ণ নেতৃত্বকে সম্মান করতে শেখে, সে সমাজেই নৈতিকতা, স্থিতি ও বরকত প্রতিষ্ঠিত হয়। আর যেখানে এ সম্মান লোপ পায়, সেখানে নৈতিক অবক্ষয় ও সামাজিক অস্থিরতা অনিবার্য হয়ে ওঠে। আল্লাহ তাআলা আমাদের ইসলামের সঠিক বুঝ দান করুন।




