• ই-পেপার

প্রধানমন্ত্রীর প্রথম ১০০ দিন

আধুনিক প্রযুক্তির প্রিপেইড মিটারে ভোগান্তির সুরাহা কি হবে না?

মুজতবা আহমেদ মুরশেদ
আধুনিক প্রযুক্তির প্রিপেইড মিটারে ভোগান্তির সুরাহা কি হবে না?
প্রতীকী ছবি

আলো ছাড়া অন্ধকার কে চায়? মানুষের সভ্যতার ইতিহাসই মূলত অন্ধকার থেকে আলোর পথে যাত্রার ইতিহাস। আর আধুনিক জীবনে সেই আলোর অন্যতম প্রধান উৎস বিদ্যুৎ। ঘরের বাতি থেকে শুরু করে ফ্রিজ, পাখা, মোবাইল ফোন, ইন্টারনেট, চিকিৎসা ব্যবস্থা, শিক্ষা কার্যক্রম—সবকিছুই আজ বিদ্যুতের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, এই বিদ্যুৎ ব্যবস্থাকে আরো আধুনিক ও গ্রাহকবান্ধব করার যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, সেই উদ্যোগের একটি অংশ আজ অনেক মানুষের কাছে নতুন ধরনের ভোগান্তির প্রতীক হয়ে উঠেছে। কথা হচ্ছে প্রি-পেইড বিদ্যুৎ মিটার নিয়ে।

একসময় বিদ্যুৎ বিল নিয়ে নানা অভিযোগ ছিল। মিটার রিডারের ভুল, অতিরিক্ত বিল, বিল বিতরণে অনিয়ম, বকেয়া আদায়ে জটিলতা—এসব সমস্যা সমাধানের লক্ষ্যেই দেশে প্রি-পেইড মিটার চালু করা হয়। যুক্তি ছিল খুবই আকর্ষণীয়। যত বিদ্যুৎ ব্যবহার করবেন, ততটুকুর মূল্য পরিশোধ করবেন। আগাম রিচার্জ করবেন, ফলে বকেয়া বিলের ঝামেলাও থাকবে না। প্রযুক্তির এই প্রয়োগকে তখন অনেকেই স্বাগত জানিয়েছিলেন।

কিন্তু বাস্তব অভিজ্ঞতা কি সেই প্রতিশ্রুতির সঙ্গে মিলছে?

দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের গ্রাহকদের কাছ থেকে দীর্ঘদিন ধরে একের পর এক অভিযোগ উঠে আসছে। অনেকেই বলছেন, এক হাজার টাকা রিচার্জ করলেও শুরুতেই ২০০ থেকে ২৫০ টাকা পর্যন্ত বিভিন্ন খাতে কেটে নেওয়া হয়।

কেউ বলেন ভ্যাট, কেউ বলেন ডিমান্ড চার্জ, কেউ বলেন সার্ভিস ফি। কিন্তু কোন খাতে কত টাকা কাটা হচ্ছে, তার বিস্তারিত ব্যাখ্যা অধিকাংশ গ্রাহক সহজে বুঝতে পারেন না। ফলে মানুষের মনে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন তৈরি হয়—আমি যে টাকা দিলাম, তার কতটুকু বিদ্যুৎ কিনতে ব্যয় হলো?

আরেকটি বড় সমস্যা হলো স্বচ্ছতার ঘাটতি, যা ধীরে ধীরে প্রযুক্তিগত সমস্যার চেয়েও বড় আস্থার সংকটে পরিণত হচ্ছে। একজন গ্রাহক যখন এক হাজার বা দুই হাজার টাকা রিচার্জ করেন, তখন তার স্বাভাবিক প্রত্যাশা থাকে যে, তিনি স্পষ্টভাবে জানতে পারবেন কত টাকা বিদ্যুৎ কেনার জন্য যুক্ত হলো এবং কোন খাতে কত টাকা কেটে নেওয়া হলো। কিন্তু বাস্তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রে সেই তথ্য সহজ, বোধগম্য এবং পূর্ণাঙ্গভাবে উপস্থাপিত হয় না। ভ্যাট, ডিমান্ড চার্জ, মিটার সমন্বয়, সার্ভিস ফি কিংবা অন্যান্য কর্তনের কথা বলা হলেও এর বিস্তারিত হিসাব সাধারণ গ্রাহকের নাগালের বাইরে থেকে যায়। ফলে মানুষ কেবল টাকা কাটার বিষয়টি দেখেন, কিন্তু কেন কাটা হলো বা কতটুকু যৌক্তিকভাবে কাটা হলো, তার সন্তোষজনক ব্যাখ্যা পান না।

এখানেই জন্ম নেয় সন্দেহ। আর জনসেবামূলক কোনো ব্যবস্থায় যখন স্বচ্ছতার ঘাটতি দেখা দেয়, তখন সেই শূন্যস্থান খুব দ্রুত গুজব, বিভ্রান্তি ও অবিশ্বাস দিয়ে পূরণ হয়ে যায়। মানুষ তখন প্রশ্ন করতে শুরু করে—আসলেই কি তারা ব্যবহৃত বিদ্যুতের মূল্য দিচ্ছেন, নাকি এমন কোনো অদৃশ্য ব্যয়ের বোঝা বহন করছেন, যার হিসাব তাদের কাছে স্পষ্ট নয়? প্রযুক্তির সফলতা কেবল তার যান্ত্রিক দক্ষতায় নয়, বরং ব্যবহারকারীর আস্থার ওপরও নির্ভর করে। আর সেই আস্থা গড়ে ওঠে তথ্যের স্বচ্ছতা, সহজবোধ্য হিসাব এবং জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে।

প্রযুক্তিগত জটিলতাও কম নয়। অনেক ক্ষেত্রে ব্যালেন্স শেষ হওয়ার আগেই মিটারের অ্যালার্ম বা সতর্কবার্তা গ্রাহকের নজরে আসে না। বিশেষ করে বহুতল ভবনে যেখানে মিটার নিচতলায় বা আলাদা বক্সের ভেতরে থাকে, সেখানে নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা প্রায় অসম্ভব। ফলাফল—হঠাৎ করেই পুরো বাসা অন্ধকার।

মিটারের ব্যাটারি সমস্যাও বহু গ্রাহকের দীর্ঘদিনের অভিযোগ। বিদ্যুৎ বিভ্রাটের সময় মিটারের অভ্যন্তরীণ ব্যাটারি কাজ করার কথা। কিন্তু সেই ব্যাটারির চার্জ কমে গেলে অনেক সময় পর্যাপ্ত ব্যালেন্স থাকা সত্ত্বেও সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। একজন গ্রাহকের দৃষ্টিতে এটি নিছক প্রযুক্তিগত ত্রুটি নয়; এটি সরাসরি জীবনযাত্রার ব্যাঘাত।

প্রবীণ নাগরিকদের সমস্যার কথাও ভাবতে হবে। প্রযুক্তি সবার জন্য সমান সহজ নয়। দীর্ঘ টোকেন নম্বর টাইপ করা, ভুল হলে আবার শুরু থেকে দেওয়া, মিটার লক হয়ে যাওয়া—এসব বিষয় তরুণদের জন্যও বিরক্তিকর, আর বয়স্ক মানুষের জন্য তা অনেক সময় চরম মানসিক চাপের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, বিভিন্ন এলাকায় অস্বাভাবিক বিল বা দ্রুত ব্যালেন্স শেষ হয়ে যাওয়ার অভিযোগ। এসব অভিযোগের সবগুলো সত্য কি না, তা নিরপেক্ষ তদন্ত ছাড়া বলা সম্ভব নয়। কিন্তু অভিযোগ যখন ব্যাপক আকার ধারণ করে, তখন দায়িত্বশীল কর্তৃপক্ষের উচিত সেই অভিযোগকে গুরুত্বের সঙ্গে যাচাই করা। কারণ জনগণের আস্থা হারালে কোনো প্রযুক্তিই সফল হতে পারে না।

এখানে একটি বিষয় স্পষ্টভাবে বলা প্রয়োজন। প্রি-পেইড মিটার নিজে কোনো খারাপ প্রযুক্তি নয়। বিশ্বের বহু দেশে এটি সফলভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে। সেখানে গ্রাহকরা স্বচ্ছ তথ্য পান, সহজে রিচার্জ করতে পারেন, অভিযোগ করলে দ্রুত সমাধান পান এবং ব্যবস্থার ওপর আস্থা রাখেন। অর্থাৎ সমস্যাটি প্রযুক্তির চেয়ে বেশি ব্যবস্থাপনা, স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহির।

তাহলে সমাধান কোথায়?

বিশেষজ্ঞ ও ভোক্তা অধিকারকর্মীরা কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপের কথা বলছেন। প্রথমত, পুরো প্রি-পেইড মিটার ব্যবস্থার স্বাধীন কারিগরি ও আর্থিক অডিট করতে হবে। দ্বিতীয়ত, প্রতিটি রিচার্জের ক্ষেত্রে কোন খাতে কত টাকা কাটা হচ্ছে, তার বিস্তারিত তথ্য তাৎক্ষণিকভাবে গ্রাহককে দেখাতে হবে। তৃতীয়ত, অস্বাভাবিক বিল বা অতিরিক্ত চার্জের অভিযোগ তদন্তে একটি স্বাধীন কমিশন গঠন করা যেতে পারে। চতুর্থত, মিটার ক্রয়, সফটওয়্যার ব্যবস্থাপনা এবং সরবরাহ সংক্রান্ত চুক্তিগুলো জনসমক্ষে প্রকাশ করা উচিত, যাতে জনগণ জানতে পারে তাদের অর্থ কীভাবে ব্যয় হচ্ছে।

পাশাপাশি অভিযোগ নিষ্পত্তির জন্য ২৪ ঘণ্টার দ্রুত প্রতিকার ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। রাত হোক বা ছুটির দিন, একজন গ্রাহক যেন বিদ্যুৎবিহীন অবস্থায় অসহায় হয়ে না থাকেন। প্রযুক্তি মানুষের জীবন সহজ করার জন্য, কঠিন করার জন্য নয়।

উপসংহারে বলা যায়, প্রিপেইড মিটার নিয়ে আজ যে প্রশ্ন, ক্ষোভ ও বিতর্ক তৈরি হয়েছে, তা শুধু একটি বিলিং ব্যবস্থার সংকট নয়; এটি জনআস্থা, প্রযুক্তিগত স্বচ্ছতা এবং সেবা খাতের জবাবদিহির সংকট। কোনো আধুনিক প্রযুক্তি তখনই জনবান্ধব হয়, যখন তার ব্যবহার পদ্ধতি সহজ, হিসাব স্পষ্ট, অভিযোগ প্রতিকার দ্রুত এবং প্রশাসনিক কাঠামো দায়বদ্ধ থাকে। কিন্তু গ্রাহক যদি রিচার্জের পর বুঝতেই না পারেন কোন খাতে কত টাকা কাটা হলো, পর্যাপ্ত ব্যালেন্স থাকার পরও যদি সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়, কিংবা অভিযোগ জানাতে গিয়ে যদি তাকে অন্ধকারে রাত কাটাতে হয়, তাহলে সেই প্রযুক্তির গ্রহণযোগ্যতা স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্নবিদ্ধ হয়।

তাই এই সংকটের সমাধান কেবল আশ্বাস, ব্যাখ্যা বা নীতিগত বক্তব্যে সম্ভব নয়। প্রয়োজন স্বাধীন ও তথ্যভিত্তিক তদন্ত, পূর্ণাঙ্গ প্রযুক্তিগত নিরীক্ষা, আর্থিক লেনদেনের স্বচ্ছতা, মিটার ক্রয় ও সফটওয়্যার ব্যবস্থাপনার জবাবদিহি এবং কার্যকর অভিযোগ নিষ্পত্তি ব্যবস্থা।

জনগণের মূল প্রশ্ন খুবই সরল : তারা কি সত্যিই ব্যবহৃত বিদ্যুতের মূল্য দিচ্ছেন, নাকি কোনো ব্যবস্থাগত ত্রুটি, অস্বচ্ছ হিসাব বা প্রশাসনিক ব্যর্থতার খেসারত বহন করছেন? এই প্রশ্নের স্বচ্ছ, বিশ্বাসযোগ্য ও প্রমাণভিত্তিক উত্তর দেওয়ার দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের। কারণ বিদ্যুৎ কেবল একটি সেবা নয়; এটি মানুষের দৈনন্দিন জীবন, উৎপাদন, শিক্ষা, চিকিৎসা, ক্ষুদ্র ব্যবসা এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক গতিশীলতার মৌলিক ভিত্তি। তাই প্রি-পেইড মিটার ব্যবস্থায় জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনতে হবে; আর সেই আস্থার একমাত্র পথ হল স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং গ্রাহকবান্ধব সংস্কার।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক, কবি ও কথাশিল্পী

আর কত মৃত্যু হলে বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবায় শৃঙ্খলা ফিরবে?

অদিতি করিম
আর কত মৃত্যু হলে বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবায় শৃঙ্খলা ফিরবে?
অদিতি করিম

অবশেষে কেঁচো খুঁড়তে বেরিয়ে এলো সাপ। ঈদের আগের দিন আদ্‌-দ্বীন হাসপাতালে ছয় শিশুর মৃত্যুর ঘটনায় গঠিত তদন্ত কমিটির রিপোর্টে দেখা যাচ্ছে, হাসপাতালটির জন্মই হয়েছে অবৈধভাবে। রাজধানীর আদ্-দ্বীন হাসপাতালে ছয় শিশুর মৃত্যুর ঘটনায় তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে সরকার। বৃহস্পতিবার (৪ জুন) বিকালে স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে তদন্ত প্রতিবেদন তুলে ধরেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন বকুল। প্রতিবেদনে ছয় শিশুর মৃত্যুর কারণ, হাসপাতালের অবহেলা এবং কার্যক্রম পরিচালনার সক্ষমতার বিষয়গুলো তুলে ধরা হয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তদন্ত কমিটি হাসপাতালটি পরিদর্শন করে ঐকমত্য পোষণ করেন যে ভবনটি হাসপাতাল কার্যক্রম পরিচালনার জন্য উপযুক্ত নয়।

এ হাসপাতালটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ১৯৯৭ সালে। তখন আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় ছিল। অবৈধভাবে গড়ে ওঠা আদ্‌-দ্বীন হাসপাতাল পাঁচটি সরকার পার করেছে। আওয়ামী লীগ, বিএনপি, ফখরুদ্দীনের এক-এগারোর সরকার, আবার আওয়ামী লীগ, ইউনূস সরকার এবং সবশেষ এখন বিএনপি সরকার। অথচ ছয় শিশুর মৃত্যুর আগে সবাই ঘুমিয়ে ছিল। কেউ অবৈধভাবে গড়ে ওঠা হাসপাতালটির বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি।

বাংলাদেশে বেসরকারি হাসপাতাল মান এবং চিকিৎসা তদারকির দায়িত্ব স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের। অধিদপ্তরের হাসপাতাল বিভাগ আছে। যাদের দায়িত্ব সরেজমিন পরিদর্শন করে বেসরকারি হাসপাতাল পরিচালনার লাইসেন্স প্রদান। শুধু লাইসেন্স প্রদান নয়, আইন অনুযায়ী স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নিয়মিত বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার পরিদর্শন করার কথা। প্রতি বছরই স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বেসরকারি হাসপাতালের মান যাচাই করে লাইসেন্স নবায়ন করার কথা। তাহলে ২৯ বছর কী হলো? কীভাবে হাসপাতালের জন্য সম্পূর্ণ অনুপযুক্ত একটি স্থাপনায় বছরের পর বছর মানুষের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলা হলো? এ দায় কার?

শুধু আদ্-দ্বীন হাসপাতাল নয়, বাংলাদেশে যত্রতত্র গজিয়ে ওঠা অধিকাংশ বেসরকারি হাসপাতালের অবস্থা এমনই। এসব হাসপাতাল মানুষের সেবা দেয় না, চিকিৎসার নামে ব?্যবসা করে। বেশির ভাগ বেসরকারি হাসপাতালের মূল লক্ষ্য মানুষের সেবা প্রদান নয়, নিরীহ রোগীদের জিম্মি করে মুনাফা অর্জন। এসব হাসপাতাল যেন একালের কসাইখানা।

বাংলাদেশের চিকিৎসা এখন বেসরকারি খাতের ওপর নির্ভরশীল। দেশের চিকিৎসাসেবার প্রায় ৭০ ভাগই প্রদান করে বেসরকারি হাসপাতাল এবং ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলো। সরকারি স্বাস্থ্যসেবায় সীমাবদ্ধতা এবং চিকিৎসকদের অতিরিক্ত অর্থলোভের কারণে ব?্যাঙের ছাতার মতো গড়ে উঠেছে বেসরকারি ক্লিনিক, হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার। এগুলোর মান নিয়ন্ত্রণের কেউ নেই। এসব স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানের বেশির ভাগেরই কোনো অনুমোদন নেই। কেবল আদ্-দ্বীনের মতো একটি বড় দুর্ঘটনার পর খানিকটা হইচই হয়, সরকারের পক্ষ থেকে কিছু তৎপরতা দেখা যায়, তারপর মানুষ যখন অন্যদিকে মনোযোগ দেয় তখন সবকিছু স্বাভাবিক হয়ে যায়। আবার অনিয়ম হয়ে যায় নিয়ম। বাংলাদেশের বেসরকারি হাসপাতালগুলো যেন একেকটি মৃত্যুকূপ। সাধারণ মানুষ এখানে চিকিৎসা নিতে আসে বাধ্য হয়ে। তারপর তাদের চিকিৎসার নামে সর্বস্ব লুট করা হয় এবং ঠেলে দেওয়া হয় মৃত্যুর দিকে। এসব দেখার কেউ নেই।

যখন যে সরকার ক্ষমতায় আসে তখন শুরুতে তারা এসব অবৈধ কসাইখানার মতো হাসপাতালগুলোর বিরুদ্ধে জোরালো অবস্থান নেয়। বিশেষ অভিযান পরিচালনা করা হয়। বেশ কিছু হাসপাতালের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়। অনেক হাসপাতাল বন্ধ করে দেওয়া হয়। কিন্তু কিছুদিন যেতে না যেতেই মানুষের জীবন নিয়ে ব্যবসা করা এসব হাসপাতাল সরকারকে অলৌকিকভাবে ম্যানেজ করে ফেলে। আবার শুরু হয় মানুষের জীবন নিয়ে ব্যবসা। এ দুষ্টচক্রে বন্দি এ দেশের মানুষ, এ দেশের স্বাস্থ্যসেবা।

বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পরও গত মার্চে শুরু হয় অবৈধভাবে গড়ে ওঠা বেসরকারি হাসপাতালের বিরুদ্ধে অভিযান। মার্চে পরিচালিত এসব অভিযানে দেখা যায়, চিকিৎসার নামে চলছে চরম অরাজকতা। পরীক্ষানিরীক্ষার জন্য নিজস্ব ল্যাবরেটরি নেই, তবু রোগীদের হাতে ধরিয়ে দেওয়া হচ্ছে ভুয়া রিপোর্ট। এমনকি সংঘর্ষ বা গুলিতে আহত রোগীদেরও নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে ভর্তি করছে নামসর্বস্ব কিছু বেসরকারি ক্লিনিক। সারা দেশে সরকারি হাসপাতালের আশপাশে লাখো বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার গড়ে উঠেছে; যার ৯৫ ভাগ অবৈধ। এর অধিকাংশের মালিক রাজনৈতিক দলের নেতা কিংবা প্রভাবশালী ব্যক্তিরা। একশ্রেণির ডাক্তার সরকারি হাসপাতালে ডিউটি না করে সেখানে কাজ করেন। সব মিলিয়ে সারা দেশে চিকিৎসাসেবায় চরম অব্যবস্থাপনা বিরাজ করছে। অধিকাংশ বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার লাইসেন্স ছাড়াই চিকিৎসাসেবা দিয়ে যাচ্ছে। ওখান থেকে টাকার ভাগ পান একশ্রেণির সিভিল সার্জন, বিভাগীয় পরিচালক (স্বাস্থ্য), এমনকি স্বাস্থ্য অধিদপ্তর পর্যন্ত যায়। ঢাকার বাইরে সরকারি হাসপাতাগুলোতে অর্ধেক জনবল শূন্য। আবার যাদের পোস্টিং দেওয়া হয়, তারা কর্মস্থলে থাকেন না। রাজধানীর মোহাম্মদপুর, যাত্রাবাড়ী ও পুরান ঢাকায় কয়েক হাজার অবৈধ ক্লিনিক আছে। ঢাকার চেয়েও খারাপ অবস্থা সারা দেশে।

সরকারি হাসপাতালে শয্যাসংকট, জনবলের অপ্রতুলতার কারণে মানুষ বাধ্য হয়ে বেসরকারি হাসপাতালে যাচ্ছে। তাই পাল্লা দিয়ে বাড়ছে বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের সংখ্যা। অলিগলিতে গড়ে ওঠা বেসরকারি হাসপাতাল, নার্সিংহোম এবং ক্লিনিকের কথা তো সবাই জানেন। কিন্তু পাঁচ তারকাবিশিষ্ট বিলাসবহুল হাসপাতালগুলোই বা কতটা সঠিক এবং মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা দিচ্ছে?

বাংলাদেশে সরকারি হাসপাতাল রয়েছে ৬৫৪টি এবং এসব হাসপাতালে শয্যার সংখ্যা ৫১ হাজার ৩১৬টি। আর বেসরকারি হাসপাতাল রয়েছে ৫ হাজার ৫৫টি, যেখানে মোট শয্যার সংখ্যা ১ লাখ ৫ হাজার ১৮৩টি। সরকারি-বেসরকারি মিলিয়ে মোট আইসিইউ শয্যা রয়েছে মাত্র ১ হাজার ১৬৯টি। এর মধ্যে সরকারি হাসপাতালে রয়েছে ৪৩২টি (ঢাকায় ৩২২, ঢাকার বাইরে ১১০) আর বেসরকারি হাসপাতালে রয়েছে ৭৩৭টি (ঢাকা মহানগরীতে ৪৯৪, ঢাকা জেলায় ২৬৭, অন্যান্য জেলায় ২৪৩)। তবে বাস্তবে অবৈধভাবে গড়ে ওঠা হাসপাতাল, ক্লিনিক এবং ডায়াগনস্টিক সেন্টারের সংখ্যা এর চেয়ে অনেক বেশি।

এর মধ্যে কিছু বেসরকারি হাসপাতাল আছে যারা নিজেদের আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন বলে দাবি করে। কিন্তু পাঁচ তারকা হোটেলের মতো গড়ে ওঠা বেসরকারি হাসপাতালগুলোর চিকিৎসার মান নিয়ে রয়েছে অনেক অভিযোগ। আদ্-দ্বীন হাসপাতালে যেমন ছয় শিশুর মৃত্যু হয়েছে, তেমন ছয় বছর আগে ২০২০ সালে এসি বিস্ফোরণে পাঁচজনের মৃত্যুর করুণ ঘটনা ঘটেছিল এমনই এক বিলাসবহুল হাসপাতালে। তখনকার সরকার সে সময় তদন্ত কমিটি গঠন করেছিল। ওই হাসপাতালের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার হুমকি দিয়েছিল। তারপর কিছুই হয়নি। এসব নামিদামি হাসপাতালের মালিকরা প্রচণ্ড ক্ষমতাবান। তাই তাদের বিরুদ্ধে কেউ ব্যবস্থা নেয় না। আরেকটি পাঁচ তারকা হাসপাতালের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছিল, মৃত রোগীদের ভেন্টিলেশনে রেখে লাখ লাখ টাকার বিল আদ্ায় করা হয়েছে। তিন বছর আগে ওই হাসপাতালের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু হয়। কিন্তু সেই তদন্ত রিপোর্ট এখনো আলোর মুখ দেখেনি। গত এপ্রিলে একটি নামি বেসরকারি হাসপাতালের বিরুদ্ধে মৃত ব্যক্তিকে ডায়ালাইসিস দেওয়ার অভিযোগ প্রমাণিত হয়। কিন্তু তারপর রহস্যজনক কারণে সেই ঘটনার বিচার হয়নি। ছোট হাসপাতাল এবং ক্লিনিকগুলো চিকিৎসার নামে মানুষের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলে। মানহীন পরিবেশে রোগীদের জিম্মি করে অর্থ আদায় করে। আর বড় হাসপাতালগুলো পাঁচ তারকা হোটেলের মতো সেবা দেয় বটে, কিন্তু চিকিৎসার নামে রোগীদের সর্বস্বান্ত করে।

আমাদের বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবার মূল লক্ষ্য মানুষকে সেবা দেওয়া নয়, যেকোনো মূল্যে অর্থ উপার্জন। এ অর্থ আদ্ায়ের প্রক্রিয়া অধিকাংশ সময়ই হয় নীতিহীন, অমানবিক এবং অন্যায়ভাবে।

পুরো বেসরকারি চিকিৎসাব্যবস্থা যেন এক সিন্ডিকেটের কাছে বন্দি। কিছু মুনাফালোভী ব্যবসায়ী এবং চিকিৎসকের যোগসাজশে গড়ে উঠেছে এ ভয়ংকর সিন্ডিকেট। এর শুরু হয় যখন একজন রোগী কোনো অসুখে চিকিৎসকের কাছে যান। তিনি সরকারি হাসপাতালে নামি চিকিৎসকের কাছে গেলে তাকে প্রাইভেট ক্লিনিকে গিয়ে দেখানোর পরামর্শ দেওয়া হয়। এরপর শুরু হয় তার এক করুণ যাত্রা। চিকিৎসক তাকে প্রয়োজনের অতিরিক্ত একগাদা পরীক্ষা দেন, যাতে তাকে কমিশন দেওয়া সেন্টারটির আয়-উপার্জন ভালো হয়। রোগ নির্ণয়ের জন্য যেখানে পাঠানো হয়, সেখান থেকে চিকিৎসক পান মোটা অঙ্কের কমিশন। অভিযোগ আছে, পরীক্ষা না করেই ভুয়া রিপোর্ট দেয় অনেক ডায়াগনস্টিক সেন্টার। পরীক্ষার পাশাপাশি রোগ নির্ণয় ছাড়াই দেওয়া হয় একগাদা ওষুধ। ফার্মা কোম্পানিগুলো থেকেও বিপুল পরিমাণ কমিশন পান ডাক্তাররা। অর্থাৎ পুরো প্রক্রিয়ায় চিকিৎসক, ক্লিনিক, ডায়াগনস্টিক সেন্টার এবং ওষুধ কোম্পানিগুলোর মুনাফা লাভের সুযোগ সৃষ্টি হয়। রোগীদের সুস্থ করে তোলা এখানে গৌণ। এরপর রোগীর উন্নতি না হলে তো সবার জন্য অবারিত সুযোগ। তার সর্বস্ব কেড়ে নেওয়ার আয়োজন শুরু হয়। তাকে ভর্তি করা হয় বেসরকারি হাসপাতালে। চিকিৎসার নামে চলে লুণ্ঠন। এভাবেই বেসরকারি চিকিৎসায় জিম্মি এ দেশের জনগণ। যারা একটু বুদ্ধিমান এবং সামর্থ্যবান, তারা মানুষরূপী এই অর্থলোভীদের হাত থেকে বাঁচতে বিদেশে চিকিৎসা নিতে যান। বাংলাদেশ থেকে প্রতি বছর প্রায় ৮ লাখের মতো মানুষ চিকিৎসা করাতে বিদেশে যাচ্ছেন। এর মধ্যে অর্ধেকের বেশি মানুষ আগে যেতেন ভারতে, এখন যান থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুরে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে চিকিৎসার নামে প্রতি বছর বাংলাদেশ থেকে প্রায় ৫০০ কোটি মার্কিন ডলারের সমপরিমাণ অর্থ বিদেশে চলে যাচ্ছে। এতে দেশটির অর্থনীতিও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। দেশে যদি আদ্-দ্বীন হাসপাতালের মতো ঘটনা আরও ঘটতে থাকে, তাহলে চিকিৎসার জন্য বিদেশে যাওয়ার সংখ্যা আরও বাড়বে।

বাংলাদেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার এই ভয়াবহ সিন্ডিকেট ভাঙতে না পারলে একদিকে যেমন মানুষের ন্যূনতম স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত হবে না, তেমন গোটা চিকিৎসাব্যবস্থার প্রতি জনগণের আস্থা নষ্ট হয়ে যাবে। ইতোমধ্যে দেশের মানুষের একটি বড় অংশ মনে করেন তারা দেশে সঠিক চিকিৎসা পাবেন না। মানুষের এ আস্থাহীনতা ফিরিয়ে আনতে হলে সরকারকে কঠোর হতে হবে। জনগণের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় কোনো ছাড় দেওয়া যাবে না।

আদ্-দ্বীন হাসপাতালের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের মধ্য দিয়ে সরকার একটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারে। বেসরকারি হাসপাতালগুলোকে জবাবদিহিতার আওতায় আনতে হবে। তাদের যেকোনো মূল্যে শৃঙ্খলার মধ্যে আনতেই হবে। মানুষের অসুখ পুঁজি করে যারা অর্থলোভে উন্মত্ত, তাদের কোনো ছাড় দেওয়া যাবে না। আদ্-দ্বীনের ট্র্যাজেডি সরকারের সামনে স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে জনবান্ধব করার সুযোগ করে দিয়েছে। সরকার কি এ সুযোগ কাজে লাগাবে, নাকি আবার সবকিছু আগের মতোই হয়ে যাবে?

উপজেলা হাসপাতাল ১০০ শয্যায় : স্বাস্থ্যসেবায় নতুন উদ্যোগ

ড. মোঃ মিজানুর রহমান
উপজেলা হাসপাতাল ১০০ শয্যায় : স্বাস্থ্যসেবায় নতুন উদ্যোগ
প্রতীকী ছবি

দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থা বহু বছর ধরেই বিভিন্ন কাঠামোগত সীমাবদ্ধতা, জনবল ঘাটতি, সেবাগত বৈষম্য এবং প্রশাসনিক জটিলতার চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে এগিয়ে চলেছে। বিশেষ করে গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর চিকিৎসাসেবার প্রধান কেন্দ্র হিসেবে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকার কথা। কিন্তু বাস্তবে এসব প্রতিষ্ঠান নানা সমস্যায় জর্জরিত। শহর ও গ্রামের স্বাস্থ্যসেবার ব্যবধান এতটাই প্রকট যে, অনেক ক্ষেত্রে গ্রামীণ মানুষকে সাধারণ ও জরুরি চিকিৎসার জন্যও জেলা কিংবা বিভাগীয় শহরের হাসপাতালের ওপর নির্ভর করতে হয়।

এই প্রেক্ষাপটে সরকারের সাম্প্রতিক উদ্যোগ—দেশের প্রায় ৪৯২টি ৫০ শয্যার উপজেলা হাসপাতালকে ১০০ শয্যায় উন্নীত করার পরিকল্পনা—স্বাস্থ্যখাতে একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত পরিবর্তনের ইঙ্গিত বহন করে। এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য শুধু শয্যা সংখ্যা বৃদ্ধি নয়; বরং গ্রামীণ পর্যায়ে চিকিৎসাসেবার সক্ষমতা বৃদ্ধি, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসা অন্তর্ভুক্তি এবং জরুরি স্বাস্থ্যসেবার বিকেন্দ্রীকরণ। এছাড়া পাঁচটি বিভাগীয় শহরে ২০০ শয্যার শিশু বিশেষায়িত হাসপাতাল নির্মাণ করার কাজ ছয় মাসের মধ্যে উদ্বোধনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। পাশাপাশি চীন-বাংলাদেশ যৌথ উদ্যোগে পাঁচটি বড় শহরে নারীদের জন্য ১০০০ শয্যার আধুনিক হাসপাতাল নির্মাণের পরিকল্পনাও রয়েছে।

বাংলাদেশ কি এই পরিবর্তনের জন্য বাস্তবিকভাবে প্রস্তুত? শুধুমাত্র অবকাঠামো সম্প্রসারণ কি দীর্ঘদিনের স্বাস্থ্য সংকট সমাধান করতে সক্ষম, নাকি এটি কাঠামোগত দুর্বলতাকে আরো স্পষ্ট করে তুলবে? উল্লেখ্য, স্বাস্থ্যখাতকে কেবল চিকিৎসা কাঠামো হিসেবে নয়, বরং একটি অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক এবং প্রশাসনিক ব্যবস্থার সমন্বিত রূপ হিসেবে বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলো গ্রামীণ জনগণের জন্য প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের সরকারি স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র। নীতিগতভাবে প্রতিটি উপজেলায় ৫০ শয্যার হাসপাতাল থাকার কথা থাকলেও বাস্তবে এসব প্রতিষ্ঠান বহু সীমাবদ্ধতার মধ্যে পরিচালিত হচ্ছে।

দেশে বর্তমানে প্রায় ৪৯২টি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ৫০ শয্যা থাকার কথা বলা হলেও বাস্তবে শয্যা সংখ্যা ও রোগীর চাপের মধ্যে বড় ধরনের অসামঞ্জস্য বিদ্যমান। অনেক হাসপাতালে এক শয্যায় একাধিক রোগীকে চিকিৎসা নিতে হয়, যা স্বাস্থ্যসেবার গুণগত মানকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে। চিকিৎসক সংকট এই ব্যবস্থার অন্যতম প্রধান সমস্যা। অনুমোদিত পদ থাকলেও বাস্তবে অনেক হাসপাতালে পর্যাপ্ত চিকিৎসক উপস্থিত থাকেন না। বিশেষ করে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের অভাব অত্যন্ত প্রকট। ফলে জটিল রোগীদের প্রায়ই জেলা বা বিভাগীয় হাসপাতালে রেফার করা হয়। একই সঙ্গে নার্স, টেকনোলজিস্ট এবং সহায়ক কর্মীর ঘাটতি সেবার মানকে আরো দুর্বল করে।

অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতাও স্পষ্ট। অনেক হাসপাতালে আধুনিক চিকিৎসা যন্ত্রপাতি নেই, আবার যেগুলো রয়েছে সেগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ দুর্বল। আইসিইউ, উন্নত ডায়াগনস্টিক সুবিধা এবং জরুরি চিকিৎসা ব্যবস্থা অধিকাংশ উপজেলায় কার্যত অনুপস্থিত। ফলে উপজেলা হাসপাতালগুলো কার্যকর দ্বিতীয় স্তরের চিকিৎসা কেন্দ্র হিসেবে গড়ে ওঠার পরিবর্তে অনেক ক্ষেত্রে কেবল প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। গ্রামীণ স্বাস্থ্যসেবার সংকট কেবল অবকাঠামোগত নয়; এটি অর্থনৈতিক, সামাজিক এবং প্রশাসনিক কারণের সমন্বিত ফলাফল। সবচেয়ে বড় সংকট হলো বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের ঘাটতি। অনেক উপজেলায় সার্জন, গাইনি, শিশু বিশেষজ্ঞ বা অ্যানেসথেসিওলজিস্ট নিয়মিতভাবে পাওয়া যায় না। ফলে মাতৃস্বাস্থ্য ও শিশুস্বাস্থ্যসহ গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসাসেবা ব্যাহত হয়।

এই ঘাটতির কারণে রোগীদের বড় অংশকে জেলা বা শহরে যেতে হয়, যা তাদের জন্য ব্যয়বহুল এবং কষ্টসাধ্য। পরিবহন, চিকিৎসা এবং সময়—সব মিলিয়ে এটি দরিদ্র পরিবারের ওপর অতিরিক্ত আর্থিক চাপ সৃষ্টি করে, যা দারিদ্র্যের চক্রকে আরো গভীর করে। সরকারি হাসপাতালের ওপর অতিরিক্ত চাপ দীর্ঘ অপেক্ষা, সীমিত সময়ের চিকিৎসা এবং মনোযোগের অভাব তৈরি করছে, যা ধীরে ধীরে মানুষের আস্থা কমিয়ে দিচ্ছে। এই শূন্যতা পূরণে বেসরকারি হাসপাতাল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেও তাদের উচ্চ ব্যয় সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে। অনেক ক্ষেত্রে অতিরিক্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও ফি আদায়ের অভিযোগও রয়েছে। ফলে অনেক রোগী উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশমুখী হন, বিশেষ করে প্রতিবেশী দেশ ভারতে। এতে দেশের বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা বাইরে চলে যায় এবং অভ্যন্তরীণ স্বাস্থ্যব্যবস্থার প্রতি আস্থার ঘাটতি আরো স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

বাংলাদেশে স্বাস্থ্যঝুঁকি বৃদ্ধির পেছনে চিকিৎসা ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতার পাশাপাশি সামাজিক আচরণ, জীবনযাত্রার পরিবর্তন এবং পরিবেশগত কারণ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। বিশেষ করে প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যসেবার দুর্বলতার কারণে সংক্রামক রোগের পাশাপাশি দ্রুত বাড়ছে অসংক্রামক রোগ—যেমন ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ ও কিডনি জটিলতা। এর একটি বড় কারণ হলো খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তন। শহর ও গ্রাম উভয় এলাকায় প্রক্রিয়াজাত খাবার, ফাস্ট ফুড এবং উচ্চ চর্বি ও চিনিযুক্ত খাদ্যের ব্যবহার বেড়েছে। একই সঙ্গে ভেজাল ও রাসায়নিকযুক্ত খাদ্য এবং কৃষিতে অতিরিক্ত কীটনাশক ব্যবহারের ফলে দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। এর প্রভাবে পুষ্টিহীনতা ও স্থূলতা—দুই বিপরীত সমস্যা একসঙ্গে বাড়ছে। পরিবেশ দূষণও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। শহরে বায়ুদূষণ এবং গ্রামে নিরাপদ পানির অভাব, আর্সেনিক ও দুর্বল স্যানিটেশন ব্যবস্থা ডায়রিয়া, চর্মরোগ ও কিডনি সমস্যার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। এসব কারণে স্বাস্থ্যঝুঁকি ক্রমাগত জটিল হয়ে উঠছে।

একই সঙ্গে জীবনযাত্রার পরিবর্তন রোগ বৃদ্ধিকে ত্বরান্বিত করছে। শারীরিক পরিশ্রম কমে যাওয়া, দীর্ঘসময় বসে থাকা এবং প্রযুক্তিনির্ভর জীবনযাপন স্থূলতা, ডায়াবেটিস ও হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। পাশাপাশি অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা ও সামাজিক চাপ মানসিক স্বাস্থ্যেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে, যা পরোক্ষভাবে শারীরিক রোগের ঝুঁকি বৃদ্ধি করে। অন্যদিকে স্বাস্থ্য সচেতনতার ঘাটতি এখনো একটি বড় সমস্যা। অনেক মানুষ প্রাথমিক লক্ষণকে গুরুত্ব না দিয়ে দেরিতে চিকিৎসা নেন, ফলে রোগ জটিল আকার ধারণ করে এবং চিকিৎসা আরো ব্যয়বহুল ও কঠিন হয়ে পড়ে। সব মিলিয়ে এই সামাজিক ও জীবনযাত্রাগত কারণগুলো বাংলাদেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপর চাপ বাড়াচ্ছে এবং রোগের প্রকৃতিকে আরো জটিল করে তুলছে।

বাংলাদেশের স্বাস্থ্যখাতে সবচেয়ে বড় কাঠামোগত সীমাবদ্ধতাগুলোর একটি হলো অপর্যাপ্ত অর্থনৈতিক বরাদ্দ। স্বাস্থ্যসেবা একটি দীর্ঘমেয়াদি এবং ব্যয়বহুল খাত হলেও এখানে বরাদ্দ এখনো প্রয়োজনের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে স্বাস্থ্যখাতে সরকারি ব্যয় জিডিপির প্রায় ১ শতাংশের কাছাকাছি, যা দক্ষিণ এশিয়া এমনকি বৈশ্বিক গড়ের তুলনায়ও অনেক নিচে। তুলনামূলকভাবে উন্নত ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে স্বাস্থ্যখাতে জিডিপির ৪ থেকে ৬ শতাংশ এবং উন্নত দেশগুলোতে ৬ থেকে ১০ শতাংশ পর্যন্ত ব্যয় করা হয়। এই পার্থক্য শুধু সংখ্যাগত নয়; এটি সরাসরি স্বাস্থ্যসেবার মান, অবকাঠামো, চিকিৎসা প্রযুক্তি এবং জনবল সক্ষমতার সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত।

এই সীমিত বাজেটের কারণে বাংলাদেশের স্বাস্থ্যখাতে একটি দীর্ঘস্থায়ী ঘাটতি তৈরি হয়েছে। হাসপাতাল নির্মাণ ও সম্প্রসারণ করা হলেও অনেক ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগ, প্রশিক্ষণ এবং আধুনিক চিকিৎসা যন্ত্রপাতি সরবরাহ করা সম্ভব হয় না। ফলে অবকাঠামো থাকলেও কার্যকর সেবা প্রদানের সক্ষমতা সীমিত থেকে যায়। উপজেলা পর্যায়ের হাসপাতালগুলোতে এই সমস্যা আরো প্রকট। নতুন ভবন বা শয্যা বৃদ্ধি করা হলেও নিয়মিত পরিচালনা ব্যয়, ওষুধ সরবরাহ, ল্যাব সুবিধা এবং জরুরি চিকিৎসা ব্যবস্থার জন্য প্রয়োজনীয় অর্থায়ন প্রায়ই পর্যাপ্ত থাকে না। এর ফলে অনেক প্রকল্প শুরু হলেও পূর্ণ সক্ষমতায় পৌঁছাতে পারে না।

৪৯২টি উপজেলা হাসপাতালকে একযোগে ১০০ শয্যায় উন্নীত করার জন্য প্রয়োজন বিপুল অবকাঠামো বিনিয়োগ, দক্ষ জনবল এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। অর্থনৈতিক সক্ষমতার এই ঘাটতি উপজেলা হাসপাতাল ১০০ শয্যায় উন্নীত করার মতো বৃহৎ উদ্যোগ বাস্তবায়নে একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিচ্ছে। কারণ এই ধরনের প্রকল্প কেবল নির্মাণ পর্যায়ে সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি পরিচালন কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত। নতুন শয্যা চালু করার জন্য অতিরিক্ত ডাক্তার, নার্স, টেকনোলজিস্ট, ওষুধ সরবরাহ এবং নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ প্রয়োজন, যা ধারাবাহিক অর্থায়ন ছাড়া সম্ভব নয়।

এছাড়া স্বাস্থ্যখাতে ব্যয়ের কাঠামোও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বাজেটের বড় অংশ যদি শুধু অবকাঠামো উন্নয়নে ব্যয় হয় কিন্তু মানবসম্পদ উন্নয়ন ও সেবার মান বৃদ্ধিতে যথেষ্ট বরাদ্দ না থাকে, তাহলে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যায় না। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, হাসপাতাল নির্মিত হলেও পর্যাপ্ত জনবল না থাকায় তা পূর্ণ সক্ষমতায় কাজ করতে পারে না।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল স্বাস্থ্যব্যয়ের ওপর জনগণের ব্যক্তিগত খরচের চাপ। সরকারি বরাদ্দ সীমিত থাকায় বাংলাদেশে চিকিৎসা ব্যয়ের বড় অংশই রোগীদের নিজস্ব অর্থে বহন করতে হয়। ফলে বাংলাদেশে মোট স্বাস্থ্যব্যয়ের প্রায় ৬০–৭০ শতাংশের মতোই জনগণ সরাসরি বহন করে, যা বৈশ্বিক গড়ের তুলনায় অনেক বেশি। তুলনামূলকভাবে উন্নত রাষ্ট্রগুলোতে করভিত্তিক বা বীমাভিত্তিক স্বাস্থ্যব্যবস্থার কারণে ব্যক্তিগত ব্যয় সাধারণত ১০–৩০ শতাংশের মধ্যে সীমিত থাকে। দক্ষিণ এশিয়ায় শ্রীলঙ্কা তুলনামূলকভাবে কম ব্যক্তিগত ব্যয়ের মাধ্যমে উন্নত সরকারি স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে পারলেও বাংলাদেশ ও পাকিস্তানে এই চাপ বেশি। ভারতের ক্ষেত্রেও বিশেষ করে গ্রামীণ অঞ্চলে ব্যক্তিগত ব্যয়ের বোঝা উল্লেখযোগ্য।

শুধু ভবন সম্প্রসারণ করলেই স্বাস্থ্যসেবা উন্নত হবে না, যদি সেখানে পর্যাপ্ত চিকিৎসক, নার্স, টেকনিশিয়ান এবং আধুনিক যন্ত্রপাতি না থাকে। বিশেষ করে গ্রামীণ এলাকায় চিকিৎসক আকৃষ্ট করা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। নিরাপত্তা, আবাসন, প্রণোদনা এবং ক্যারিয়ার উন্নয়নের সুযোগ না থাকলে জনবল সংকট থেকেই যাবে।

যেকোনো বৃহৎ স্বাস্থ্য সংস্কারের সাফল্য নির্ভর করে রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং প্রশাসনিক দক্ষতার ওপর। বাংলাদেশে স্বাস্থ্যখাতে বহু প্রকল্প গ্রহণ করা হলেও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে দীর্ঘসূত্রতা, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এবং সমন্বয়ের অভাব একটি বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও দপ্তরের মধ্যে সমন্বয় না থাকলে প্রকল্প বাস্তবায়ন ধীর হয়ে যায়। আবার অনেক ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া জটিল হওয়ায় দ্রুত পরিবর্তন আনা সম্ভব হয় না। এর সঙ্গে দুর্নীতি ও অনিয়ম যুক্ত হলে প্রকল্পের কার্যকারিতা আরো কমে যায়।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) সাধারণভাবে প্রতি ১০ হাজার জনে অন্তত ১০ জন চিকিৎসক এবং প্রতি ১ হাজার জনে প্রায় ৩টি হাসপাতাল শয্যার প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করে। এই মানদণ্ডের তুলনায় বাংলাদেশ এখনও পিছিয়ে, বিশেষ করে গ্রামীণ অঞ্চলে। দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে শ্রীলঙ্কা তুলনামূলকভাবে শক্তিশালী প্রাথমিক স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তুলেছে। ভারতের স্বাস্থ্য অবকাঠামো বিস্তৃত হলেও আঞ্চলিক বৈষম্য রয়েছে। পাকিস্তানও একই ধরনের সমস্যায় ভুগছে। অন্যদিকে জার্মানি, যুক্তরাজ্য ও জাপানের মতো উন্নত দেশে স্বাস্থ্যব্যবস্থা শুধু চিকিৎসা নির্ভর নয়; বরং প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যসেবার ওপর জোর দেওয়া হয়, যা দীর্ঘমেয়াদে রোগের হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনে।

উপজেলা হাসপাতাল ১০০ শয্যায় উন্নীত করার উদ্যোগ সফল হলে এটি বাংলাদেশের স্বাস্থ্যখাতে একটি বড় পরিবর্তন আনতে পারে। প্রথমত, গ্রামীণ জনগণের জন্য চিকিৎসা সহজলভ্য হবে এবং শহরের ওপর চাপ কমবে। দ্বিতীয়ত, দরিদ্র মানুষের চিকিৎসা ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসবে। তৃতীয়ত, এটি টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (SDG-3) অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে এই সম্ভাবনা বাস্তবে রূপ পাবে কেবল তখনই, যখন অবকাঠামোর পাশাপাশি মানবসম্পদ, প্রশাসনিক দক্ষতা, স্বচ্ছতা এবং রাজনৈতিক অঙ্গীকার নিশ্চিত করা হবে।

পরিশেষে বলতে হয়, উপজেলা হাসপাতালকে ১০০ শয্যায় উন্নীত করার উদ্যোগ নিঃসন্দেহে একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ। তবে এটি কেবল অবকাঠামোগত পরিবর্তন হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকলে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া কঠিন হবে। বাংলাদেশের স্বাস্থ্যখাতের মূল সমস্যা কেবল শয্যা বা ভবন নয়; এটি একটি সমন্বিত ব্যবস্থাগত সংকট, যেখানে অর্থনীতি, প্রশাসন, মানবসম্পদ এবং নীতি একসঙ্গে কাজ করে।

অতএব, এই উদ্যোগকে যদি বৃহত্তর স্বাস্থ্যখাত সংস্কারের সঙ্গে সমন্বিতভাবে বাস্তবায়ন করা যায়, তবে তা গ্রামীণ স্বাস্থ্যসেবায় উল্লেখযোগ্য পরিবর্তনের পথ খুলে দিতে পারে। কিন্তু যথাযথ নীতিগত রূপান্তর ছাড়া এটি কেবল একটি সংখ্যাগত অর্জন হয়েই থাকবে, যার কার্যকর প্রভাব জনগণের দৈনন্দিন জীবনে তেমনভাবে প্রতিফলিত হবে না।

লেখক : অর্থনীতিবিদ, গবেষক ও কলামিস্ট

মাটি বাঁচান, গাছ লাগান : পরিবেশ ও ভবিষ্যৎ রক্ষার সময় এখনই

অধ্যাপক ড. মো. আবুল কাসেম
মাটি বাঁচান, গাছ লাগান : পরিবেশ ও ভবিষ্যৎ রক্ষার সময় এখনই
অধ্যাপক ড. মো. আবুল কাসেম

আমাদের আবাসস্থল পৃথিবীর বয়স​ প্রায় ৪ দশমিক ৫ বিলিয়ন। আমরা তার পৃষ্ঠে বসবাস করি, যেখানে ৭১ শতাংশ পানি এবং বাকি ২৯ শতাংশ ভূমি রয়েছে।

আমাদের এই ধরণীটা খুব শান্ত, কোন তর্কে জড়ায় না কিন্তু এটি আপোস করেন না, সময়মতো সতর্ক সংকেত পাঠায় যেমন সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, ভয়াবহ দাবানল, তাপপ্রবাহ, হিমবাহ গলে  যাওয়া ইত্যাদি। ক্রমবর্ধমান তাপমাত্রা, ক্রমাবনতিশীল বাস্তুতন্ত্র (Ecosystem) এবং চরম আবহাওয়ার ঘটনা প্রবাহের ক্রমবর্ধমান পুনরাবৃত্তির প্রেক্ষাপটে, বিশ্বব্যাপী সচেতনতা বৃদ্ধি ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের লক্ষ্যে প্রতি বছর ৫ই জুন বিশ্ববাসী বিশ্ব পরিবেশ দিবস পালন করছে।

এটি জলবায়ু পরিবর্তন, জীববৈচিত্র্য হ্রাস এবং দূষণের মতো ক্রমবর্ধমান বৈশ্বিক সংকট মোকাবেলার জন্য একটি জরুরি আহ্বান হিসেবে কাজ করে যাচ্ছে। এরই প্রেক্ষাপটে প্রথম বিশ্ব পরিবেশ দিবস পালিত হয় ১৯৭৩ সালে, “Only One Earth” থিমে। এরপর থেকে প্রতি বছর ৫ই জুন দিবসটি সারা বিশ্বে একটি নির্দিষ্ট সিম (প্রতিপাদ্য) নিয়ে পালিত হয়ে আসছে।
জাতিসংঘের মতে, বর্তমান পৃথিবী এক সংকটময় সন্ধিক্ষণে এসে দাঁড়িয়েছে, যার জন্য অবিলম্বে সমন্বিত জোরালো পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন।  এ বছরের প্রতিপাদ্য হলো “Inspired by Nature. For Climate. For Our Future.” — অর্থ হলো: “প্রকৃতি থেকে অনুপ্রাণিত। জলবায়ুর জন্য। আমাদের ভবিষ্যতের জন্য।”

আজারবাইজান প্রজাতন্ত্র ‘বাকুতে’ মহামান্য রাজকুমারী ক্যামিলা অফ বুর্বন টু সিসিলিস-এর পৃষ্ঠপোষকতায় মূল বিশ্ব পরিবেশ দিবস অনুষ্ঠিত হচ্ছে। আনুষ্ঠানিক উদযাপনের পাশাপাশি বিশ্বজুড়ে শত শত সহায়ক উদ্যোগের মধ্যে রয়েছে নাগরিক, প্রতিষ্ঠান এবং ব্যবসাকে সম্পৃক্ত করে বিভিন্ন জনসভা, সচেতনতামূলক প্রচারণা এবং ডিজিটাল কার্যক্রম পরিচালনা করা। বিশ্বের অন্যান্য দেশেরমতো বাংলাদেশেও পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় এবং পরিবেশ অধিদপ্তর (DOE) বিভিন্ন কার্যক্রম আয়োজন করছে। এর মধ্যে রয়েছে র‍্যালি, সেমিনার, বৃক্ষরোপণ ও সচেতনতামূলক প্রচারাভিযান। 

জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলা ও পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি একটি অত্যন্ত কার্যকরী পদক্ষেপ। বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি বাস্তবায়নে পদক্ষেপসমূহ:

স্বাস্থ্যকর মাটি

বৃক্ষ জন্মানোর প্রধান ভিত্তি হলো স্বাস্থ্যকর মাটি। স্বাস্থ্যকর মাটি ছোট জীব থেকে শুরু করে মানবগোষ্ঠী পর্যন্ত সকলকে প্রয়োজনীয় উপাদানের যোগান দিয়ে থাকে। ইহা উদ্ভিদকে পুষ্টি সরবরাহ করে, যা আমাদেরকে খাওয়ায়, পানিকে ফিল্টার করে আমাদের পানের যোগ্য করে দেয়, বন্যা থেকে রক্ষা করে, লক্ষ কোটি জীবের বাসস্থান হিসেবে কাজ করে এবং আমাদেরকে এন্টিবায়োটিক সরবরাহ করে। 

স্বাস্থ্যকর মাটির মূল উপাদান হলো জৈব পদার্থ পরিমাণ ৩ থেকে ৬ শতাংশ থাকা দরকার কিন্তু বাংলাদেশের অনেক জমিতে তার পরিমাণ ১ শতাংশের নিচে। বর্তমানে আমাদের প্রায় ৭৫% আবাদি জমি তার উর্বরতা শক্তি হারিয়ে ফেলেছে, শুধুমাত্র অধিক মাত্রায় রাসায়নিক সার ব্যবহার ও জৈব পদার্থ ঘাটতির কারণে। দেশে প্রায় ৮০% আবাদি জমিতে জৈব পদার্থের ঘাটতি রয়েছে। মাটিকে সুস্থ বা জীবিত রাখার একমাত্র উপায় হলো বেশি পরিমাণে জৈব পদার্থ যোগ করা এবং রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের ব্যবহার যথাসম্ভব কমিয়ে আনা। জৈব পদার্থের প্রধান উৎস হলো শহর-বন্দর ও গ্রামের সব রকমের পচনশীল আবর্জনা এবং পশুর গোবর। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের খামার শাখার তথ্য অনুযায়ী দেশে প্রায় ২ কোটি ৪৮ লাখ ৫৬ হাজার পশু রয়েছে। দৈনিক ১০ কেজি হিসেবে উক্ত পশু সমূহ থেকে বছরে গোবর আসে প্রায় ৯ কোটি ১২.৫ লাখ টন। অন্যদিকে, আমাদের নগরগুলোতে দৈনিক প্রায় ২৫ হাজার মেট্রিক টন বর্জ্য উৎপন্ন হয়, তার মধ্যে রয়েছে ১৭ হাজার মেট্রিক টন পচনশীল বর্জ্য (Ahmed, 2019)।  দৈনিক উৎপাদিত বিপুল পরিমাণ পচনশীল বর্জ্য ও গরুর গোবর একটি অত্যাধুনিক স্মার্ট, টেকসই পরিবেশবান্ধব "ব্ল্যাক সোলজার ফ্লাই (Black Soldier Fly- BSF)" এর মাধ্যমে তৈরি করা সম্ভব উন্নত মানের জৈব সার ও বিকল্প প্রাণিখাদ্য (যেমন- মাছ ও পোল্ট্রির খাবার)। বর্জ্যকে সম্পদে রূপান্তরের এই উদ্ভাবনী ব্যবস্থাপনা থেকে যেমন জমির উর্বরতা বৃদ্ধি পাবে, তেমনি তৈরি হবে নতুন কর্মসংস্থান, পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন ও জলাবদ্ধ মুক্ত শহর।

আবাদি জমি

বর্তমানে বাংলাদেশের লোকসংখ্যা ১% হারে বাড়ছে অন্যদিকে আবাদযোগ্য জমি ১% হারে কমছে। তাছাড়া যেখানে সেখানে নতুন বাড়িঘর তৈরি করে আশেপাশে জমিগুলো ব্যবহারের অযোগ্য করে তুলছে। তার জন্য ভূমি সেটলমেন্ট অ্যাক্ট বাস্তবায়ন করা দরকার। 

সিসি ক্যামেরার ব্যবহার

উন্নত দেশগুলোর মতো আসবাবপত্র, খাট, সোফা, বালিশ, তোশক নিজ খরচে সিটি করপোরেশনের নির্ধারিত স্থানে রাখার নির্দেশ থাকতে হবে। ইচ্ছেমতো যেখানে-সেখানে সব রকমের ময়লা-আবর্জনা ফেলব আর সিটি করপোরেশন প্রতিদিন সব সরিয়ে নেবে এ মানসিকতা থেকে বের হতে হবে। আমাদের কারণেই সামান্য বৃষ্টিতে শহরগুলোতে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়। এই অবস্থা থেকে পরিত্রাণ ও সতর্কতার জন্য বিভিন্ন পয়েন্টে সিসি ক্যামেরা ব্যবহার করা যেতে পারে।

ইটের বিকল্প পরিবেশবান্ধব ব্লক ইটের ব্যবহার

বাংলাদেশে প্রায় ৮ হাজার ইটভাটা আছে, বছরে তৈরি হয় প্রায় ৩,৫০০ কোটি ইট, তাতে ১৩ কোটি টন মাটি ব্যবহৃত হয়, যা ৬৫ হাজার হেক্টর জমির ওপরের স্তরের মাটির সমান।  ইটভাটার কারণে পার্বত্য এলাকার পাহাড়গুলো এখন ঝুঁকিতে রয়েছে। ইটভাটার মালিক ও ব্যবহারকারীদের কাছে পরিবেশবান্ধব ব্লক ইটের সুবিধাসমূহ তুলে ধরতে হবে এবং তার উৎপাদন এবং ব্যবহারেও আকৃষ্ট করতে হবে।

প্লাস্টিকের ব্যবহার সীমিতকরণে করণীয়

প্লাস্টিক বর্জ্য মাটিতে ক্ষয় হতে ৪০০ থেকে ৫০০০ বছর লাগে। প্লাস্টিক উদ্ভিদের পুষ্টি, পানি গ্রহণ ও চলাচলে বাধা প্রদান করে। ফলে উদ্ভিদের শেকড় মাটির গভীরে প্রবেশ করতে পারে না। পরিবেশ অধিদপ্তরসহ সরকারি অফিসের আয়োজনে এবং রাজনৈতিক প্রচারণায় প্লাস্টিক ব্যানারের পরিবর্তে প্রিন্টেড মেটেরিয়াল, মাল্টিমিডিয়া ও অন্যান্য দেশের মতো ডিজিটাল মাধ্যম ব্যবহার করা যেতে পারে। কোন অনুষ্ঠানে পরিবেশ দিবসে কোন প্লাস্টিকের পণ্য ব্যবহার করে দিবস থেকে প্রশ্নবিদ্ধ করা ঠিক হবে না, এদিকে আমাদেরকে সতর্ক থাকতে হবে।

বৃক্ষের চারা ও রোপনের স্থান নির্বাচন

বাংলাদেশ সরকার ২০২৬ থেকে ২০৩০ সাল পর্যন্ত দেশজুড়ে ‘৫ বছরে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ’ শীর্ষক একটি বৃহৎ কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে।পরিবেশ রক্ষা ও সবুজায়নের লক্ষ্যে চলমান এই কর্মসূচিতে দেশীয় প্রজাতির বৃক্ষরোপণকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে এবং এর অংশ হিসেবে বিভিন্ন সিটি করপোরেশন ও স্থানীয় পর্যায়ে বৃক্ষরোপণ অভিযান চলমান আছে। বিভাগীয় শহরগুলোতে বৃক্ষের চারা ও স্থান নির্বাচনের ক্ষেত্রে বনবিভাগের সহায়তা নিলে উক্ত পদক্ষেপের কার্যকারিতা বৃদ্ধি পাবে, অন্যথায় বিনামূল্যে চারা বিতরণ বা স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদেরকে বিনামূল্যে চারা সরবরাহ করলে বৃক্ষরোপণের সুফল বয়ে আনবে না, কারণ বৃক্ষ রোপনের জন্য উপযুক্ত জায়গা শহরগুলোতে খুঁজে পাওয়া কঠিন। অন্যদিকে অন্তবর্তী কালীন সরকার গত ১৫ই মে ২০২৫ পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের বন–১ অধিশাখা এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে ইউক্যালিপটাস ও আকাশমণি গাছ দুটির চারা তৈরি, রোপণ ও কেনাবেচা নিষিদ্ধ করেছেন। তাদের নিষিদ্ধ করার পিছনে বিজ্ঞানসম্মত কোন ব্যাখ্যা ছিল না। বর্তমান সরকারের কাছে বিষয়টি পূণ:বিবেচনা করে গাছ দুইটির চাষাবাদ বন্ধ না করে  উপকূলীয় অঞ্চল, অবক্ষয়িত বন, পতিত জমি, রাস্তা–ঘাট, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সরকারি ও বেসরকারি অফিস প্রাঙ্গণ ও জলাভূমির আশেপাশে রোপণের উদ্যোগ নিলে প্রাকৃতিক দুর্যোগ, পরিবেশ সংরক্ষণ ও মানুষের কাঠের চাহিদা লাঘবে গাছ দুটো ভূমিকা রাখবে। ইসলাম ধর্ম অনুযায়ী, গাছ লাগানো একটি 'সাদাকায়ে জারিয়া' বা চলমান দান। যতদিন ওই গাছ থেকে মানুষ, পশুপাখি বা কীটপতঙ্গ উপকৃত হবে (ফল খাবে, ছায়া নেবে), ততদিন গাছ রোপণকারী ব্যক্তি মৃত্যুর পরেও এর সওয়াব বা পুণ্য পেতে থাকবেন। আমাদের স্লোগান হোক 'মাটি বাঁচান গাছ লাগান, পরিবেশ বাঁচান'। সর্বোপরি পরিবেশ রক্ষায় মাটি হলো প্রধান ভিত্তি। এটি পৃথিবীর সকলের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা, উদ্ভিদ ও প্রাণীর বেঁচে থাকা এবং জলবায়ু নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে প্রকৃতিকে টিকিয়ে রাখতে বহুমুখী ভূমিকা পালন করে। আমাদের উচিত প্রকৃতির প্রেরণার শক্তিকে কাজে লাগিয়ে ভবিষ্যত প্রজন্মের জন্য একটি পরিবেশবান্ধব আবাসভূমি রেখে যাওয়া।

লেখক : অধ্যাপক ড. মো. আবুল কাসেম। 

মৃত্তিকা বিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।