ভ্রমণের একটি সুবিধা আছে। পরিচিত শহর থেকে দূরে গেলে নিজের দেশটিকে যেন একটু দূর থেকে দেখা যায়। আকাশে উড়তে উড়তে নিচের নদী, সড়ক, জনপদ, সীমান্ত সবই ছোট মনে হয়। তখন মনে হয়, আমরা যেসব বিষয় নিয়ে প্রতিদিন এত উত্তেজিত হই, সেগুলো হয়তো সত্যিই খুব ছোট। আবার বিমান যখন মাটিতে নামে, মুঠোফোনে খবরের জানালা খুলে যায়, তখন বোঝা যায় ঘটনাগুলো ছোট নয়; আমাদের দেখার জানালাটিই ছোট।
এই সপ্তাহে বাংলাদেশের রাজনৈতিক আকাশে আরেকটি দৃশ্যমান পরিবর্তন ঘটেছে। রাষ্ট্রপতি পদত্যাগ করেছেন। রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে আবার পরিবর্তন এসেছে। জুলাই অভ্যুত্থানের দুই বছর পূর্ণ হয়েছে। নির্বাচনের পর নতুন সরকার রাষ্ট্র পরিচালনা করছে। পুরোনো ক্ষমতাকাঠামোর অনেক মুখ দৃশ্যপট থেকে সরে গেছে, নতুন মুখ এসেছে। কিন্তু মানুষের পুরোনো প্রশ্নটি এখনো রয়ে গেছে—ক্ষমতার মানুষ বদলালেই কি ক্ষমতার চরিত্র বদলায়?
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে সরকার বদলেছে বহুবার। পতাকা বদলায়নি, জাতীয় সংগীত বদলায়নি, সংবিধানের প্রচ্ছদও প্রায় একই থেকেছে। বদলেছে ক্ষমতার কেন্দ্র, ভাষা, স্লোগান ও সুবিধাভোগীদের তালিকা। আমাদের সংকটটি সম্ভবত সেখানেই। আমরা রাষ্ট্র পরিবর্তনের কথা বলি, কিন্তু শেষ পর্যন্ত পরিবর্তন করি রাষ্ট্র পরিচালনাকারীদের। তারপর নতুন পরিচালকরাও কিছুদিনের মধ্যে পুরনো চেয়ারের ভাষা শিখে ফেলেন।
চেয়ার বড় বিচিত্র বস্তু। মানুষ চেয়ারে বসে না, অনেক সময় চেয়ারই মানুষের ওপর বসে যায়।
১. রাষ্ট্রপতি গেলেন, রাষ্ট্র কোথায় দাঁড়াল?
বাংলাদেশে রাষ্ট্রপতির পদ নিয়ে সাধারণ মানুষের আগ্রহ সাধারণত খুব বেশি থাকে না। কারণ আমাদের শাসনব্যবস্থায় রাষ্ট্রপতির দৃশ্যমান ক্ষমতা সীমিত। কিন্তু সংকটের সময়ে সীমিত ক্ষমতার পদও অসীম তাৎপর্য বহন করতে পারে। স্বাভাবিক সময়ে ছাদের দিকে কেউ তাকায় না; ঝড় শুরু হলে বোঝা যায় ছাদটি কতটা গুরুত্বপূর্ণ।
রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগ তাই শুধু একজন ব্যক্তির বিদায় নয়। এটি বাংলাদেশের দীর্ঘ রাজনৈতিক রূপান্তরের আরেকটি অধ্যায়। তিনি ছিলেন বিগত ক্ষমতাব্যবস্থার সময়ে নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি। সরকার বদলের পরও তিনি পদে ছিলেন। তাকে ঘিরে রাজনৈতিক বিতর্ক, প্রতিবাদ এবং পদত্যাগের দাবি ছিল। অবশেষে তিনি সরে গেলেন। সংবাদমাধ্যমে চিকিৎসাজনিত কারণের কথা এসেছে, আবার রাজনৈতিক চাপের কথাও আলোচিত হচ্ছে।
কিন্তু রাষ্ট্রপতির বিদায়ের চেয়েও বড় প্রশ্ন হলো, আমাদের প্রতিষ্ঠানগুলো কি ব্যক্তিনির্ভরতা থেকে বের হতে পারছে?
বাংলাদেশে প্রায় প্রতিটি সাংবিধানিক পদকে আমরা ব্যক্তির রাজনৈতিক পরিচয়ের মধ্য দিয়ে বিচার করি। নির্বাচন কমিশনার কে নিয়োগ দিলেন, বিচারপতি কোন সরকারের সময়ে দায়িত্ব পেলেন, রাষ্ট্রপতি কার ঘনিষ্ঠ ছিলেন, প্রশাসনের কর্মকর্তা কোন আমলের—এসব প্রশ্ন অপ্রাসঙ্গিক নয়। কিন্তু এসব প্রশ্নই যদি প্রতিষ্ঠানের বৈধতা নির্ধারণের একমাত্র মাপকাঠি হয়ে যায়, তাহলে কোনো প্রতিষ্ঠানই কখনো রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠান হয়ে উঠতে পারে না। সেটি এক সরকারের, এক দলের কিংবা এক ব্যক্তির প্রতিষ্ঠান হয়েই থেকে যায়।
আমাদের রাজনীতিতে একটি অদ্ভুত বিশ্বাস প্রচলিত—আমার লোক নিরপেক্ষ, অন্যের লোক পক্ষপাতদুষ্ট। আমি যাকে নিয়োগ দিই, তিনি যোগ্য; প্রতিপক্ষ যাকে নিয়োগ দেয়, তিনি দলীয়। ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে জুলাই অভ্যুত্থানে তাই যোগ্যতার সংজ্ঞাও বদলে যায়। রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের পর সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা রক্ষা জরুরি। কিন্তু ধারাবাহিকতা মানে শুধু নতুন কাউকে দ্রুত শপথ পড়ানো নয়। ধারাবাহিকতা মানে এমন একটি প্রক্রিয়া নিশ্চিত করা, যেখানে দেশের মানুষ বুঝতে পারে, রাষ্ট্র কোনো ব্যক্তি বা দলের ইচ্ছায় নয়, আইন ও প্রতিষ্ঠিত নিয়মে চলছে।
নতুন রাষ্ট্রপতি কে হবেন, সেটি গুরুত্বপূর্ণ। তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ, তিনি কীভাবে নির্বাচিত হবেন, তার ভূমিকা কীভাবে ব্যাখ্যা করা হবে এবং সংকটের সময়ে তিনি দলীয় আনুগত্যের ওপর সংবিধানের প্রতি আনুগত্য দেখাতে পারবেন কি না। রাষ্ট্রপতি ভবনের বাসিন্দা বদলানো সহজ। বঙ্গভবনকে সত্যিকারের সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করা কঠিন।
২. জুলাইয়ের স্মৃতি, ক্ষমতার পরীক্ষা
জুলাই এখন আর বাংলাদেশের ক্যালেন্ডারের একটি মাসমাত্র নয়। এটি একটি রাজনৈতিক স্মৃতি, একটি রক্তাক্ত অভিজ্ঞতা এবং রাষ্ট্র পুনর্গঠনের প্রতিশ্রুতি। দুই বছর আগে রাজপথে যারা নেমেছিলেন, তারা কেবল একটি সরকারের পতন চাননি। তারা এমন একটি ব্যবস্থার অবসান চেয়েছিলেন, যেখানে ভোট, বিচার, প্রশাসন, গণমাধ্যম এবং নাগরিক মর্যাদা ধীরে ধীরে ক্ষমতার অধীন হয়ে পড়েছিল। দুই বছর পর দাঁড়িয়ে প্রশ্ন করা অস্বাভাবিক নয়—সেই প্রতিশ্রুতির কতটা বাস্তবায়িত হয়েছে?
অভ্যুত্থান করা এবং রাষ্ট্র পরিচালনা করা এক বিষয় নয়। রাজপথে স্লোগান সংক্ষিপ্ত হয়; রাষ্ট্র পরিচালনার বাক্য অনেক দীর্ঘ। আন্দোলনে শত্রু চিহ্নিত করা সহজ, শাসনে সমস্যা সমাধান করা কঠিন। একটি সরকারকে বিদায় করতে ঐক্য যথেষ্ট হতে পারে, কিন্তু একটি নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতি তৈরি করতে প্রয়োজন নীতি, ধৈর্য, আত্মসংযম ও জবাবদিহি।
জুলাইয়ের সবচেয়ে বড় শিক্ষা ছিল, কোনো ক্ষমতাই স্থায়ী নয়। কিন্তু ক্ষমতায় বসার পর মানুষ সাধারণত প্রথমেই এই শিক্ষাটিই ভুলে যায়। আমরা জুলাইকে কীভাবে স্মরণ করব? শুধু অনুষ্ঠান, আলোকচিত্র প্রদর্শনী, বক্তৃতা এবং স্মৃতিচারণার মধ্য দিয়ে? নাকি রাষ্ট্রের দৈনন্দিন আচরণে? কোনো তরুণ থানায় গিয়ে হয়রানি ছাড়া অভিযোগ করতে পারলে জুলাই বেঁচে থাকবে। বিরোধী মতের একজন মানুষ ভয় ছাড়া কথা বলতে পারলে জুলাই অর্থবহ হবে। সরকারি দলের সমর্থক অপরাধ করেও ছাড় না পেলে জুলাইয়ের ন্যায়বিচারের দাবি প্রতিষ্ঠিত হবে। গণমাধ্যম সরকারের প্রশংসা করার স্বাধীনতার পাশাপাশি সমালোচনা করার নিরাপত্তা পেলে জুলাইয়ের চেতনা বাস্তব রূপ পাবে। বিপ্লবের স্মৃতি সবচেয়ে বেশি অপমানিত হয় তখনই, যখন তার নামে নতুন সুবিধাভোগী শ্রেণি জন্ম নেয়।
আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে ইতিহাসকে প্রায়ই সম্পত্তিতে পরিণত করা হয়। একটি দল মুক্তিযুদ্ধের মালিকানা দাবি করে, আরেকটি দল জাতীয়তাবাদের; কেউ ধর্মের, কেউ গণতন্ত্রের, কেউ আবার বিপ্লবের একচ্ছত্র প্রতিনিধি হতে চায়। ইতিহাস তখন জাতির অভিন্ন উত্তরাধিকার না হয়ে রাজনৈতিক দোকানের সাইনবোর্ডে পরিণত হয়।
জুলাই কারো একার নয়। যারা প্রাণ দিয়েছেন, তাদের স্বপ্ন কোনো দলের নির্বাচনী ইশতেহারে বন্দি থাকতে পারে না। জুলাইয়ের মালিকানা দাবি করার চেয়ে তার দায় বহন করা জরুরি। নতুন সরকার নির্বাচনে বড় জনসমর্থন পেয়েছে। বড় বিজয় নিঃসন্দেহে বড় সুযোগ। কিন্তু বড় বিজয় একই সঙ্গে বড় বিপদও। কারণ বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা সরকারকে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার শক্তি দেয়, আবার বিরোধী কণ্ঠকে অপ্রয়োজনীয় মনে করার প্রলোভনও তৈরি করে। গণতন্ত্রের আসল পরীক্ষা নির্বাচনে জেতার দিন হয় না; শুরু হয় তার পরদিন থেকে। পূর্ববর্তী শাসনের ভুলগুলো শুধু বক্তৃতায় নিন্দা করলে হবে না। সেই ভুলগুলো পুনরাবৃত্তি না করাই হবে জুলাইয়ের প্রতি প্রকৃত শ্রদ্ধা।
৩. শুল্কের হিসাব ও বন্ধুত্বের ভাষা
বাংলাদেশের ওপর যুক্তরাষ্ট্র নতুন করে শুল্কারোপ করেছে—এ খবরটি শুধু ব্যবসায়ীদের উদ্বেগের বিষয় নয়; এটি আমাদের অর্থনীতি, কূটনীতি এবং রাষ্ট্রীয় সক্ষমতারও পরীক্ষা। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ভাষায় বন্ধুত্বের কথা অনেক বলা হয়। কিন্তু বাণিজ্যের টেবিলে বন্ধুত্বের হাসির পাশাপাশি হিসাবের যন্ত্রটিও চালু থাকে। রাষ্ট্রের মধ্যে স্থায়ী বন্ধু নেই—এ কথা বহুবার বলা হয়েছে। স্থায়ী স্বার্থ আছে, এ কথাও আমরা মুখস্থ জানি। সমস্যা হলো, আমরা অনেক সময় অন্য রাষ্ট্রের স্বার্থ বুঝি, নিজের স্বার্থ নির্ধারণ করতে পারি না। বাংলাদেশ দীর্ঘদিন স্বল্পমজুরি, তৈরি পোশাক এবং কিছু বাজারসুবিধার ওপর নির্ভর করে অর্থনৈতিক সাফল্য অর্জন করেছে। সেই সাফল্য গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু পৃথিবী বদলে যাচ্ছে। শুল্কনীতি এখন শুধু বাণিজ্য ঘাটতি কমানোর অস্ত্র নয়; শ্রম অধিকার, পরিবেশ, নিরাপত্তা, প্রযুক্তি এবং ভূরাজনৈতিক অবস্থানও এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে। ফলে একটি দেশের কারখানায় কী উৎপাদিত হচ্ছে, তার পাশাপাশি সেই দেশ কীভাবে শাসিত হচ্ছে, শ্রমিক কী অধিকার পাচ্ছেন এবং সে কোন কূটনৈতিক বলয়ে দাঁড়াচ্ছে—সবকিছুই বাজারে প্রবেশের শর্ত হয়ে উঠতে পারে। আমাদের কূটনীতি এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি দক্ষ ও বহুমাত্রিক হতে হবে। ওয়াশিংটনে এক ভাষা, দিল্লিতে আরেক ভাষা, বেইজিংয়ে তৃতীয় ভাষা বললেই তাকে ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতি বলা যায় না। কূটনৈতিক ভারসাম্য মানে সবার সঙ্গে হাসিমুখে ছবি তোলা নয়। এর অর্থ হলো, দেশের স্বার্থের একটি স্পষ্ট কাঠামো থাকা এবং সেই কাঠামো অনুযায়ী অংশীদার নির্বাচন করা।
ভারত বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে ব্রিকস সম্মেলনে আমন্ত্রণ জানিয়েছে। এটি আঞ্চলিক সম্পর্ক পুনর্গঠনের সুযোগ। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য ও নিরাপত্তা সম্পর্ক গুরুত্বপূর্ণ। চীন অবকাঠামো, বিনিয়োগ এবং প্রযুক্তির বড় অংশীদার। ইউরোপ আমাদের প্রধান বাজারগুলোর একটি। জাপান দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন সহযোগী। এই সম্পর্কগুলোর কোনো একটিকে অন্যটির বিকল্প হিসেবে দেখা হবে কূটনৈতিক অলসতা। বাংলাদেশকে কারো পক্ষে বা বিপক্ষে দাঁড়ানোর আগে নিজের পায়ে দাঁড়াতে হবে। কিন্তু নিজের পায়ে দাঁড়ানোর কথাটি বক্তৃতায় যত সহজ, অর্থনীতিতে তত কঠিন। রপ্তানি বহুমুখীকরণ, দক্ষ মানবসম্পদ, নির্ভরযোগ্য জ্বালানি, বন্দরের সক্ষমতা, করব্যবস্থার সংস্কার এবং ব্যবসায় সুশাসন ছাড়া কূটনৈতিক স্বাধীনতা অর্জন করা যায় না। যে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার হিসাব দুর্বল, তার পররাষ্ট্রনীতির কণ্ঠও ধীরে ধীরে নিচু হয়ে আসে।
পররাষ্ট্রনীতি শেষ পর্যন্ত পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় একা পরিচালনা করে না। দেশের কারখানা, বিশ্ববিদ্যালয়, আদালত, বন্দর, ব্যাংক এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা—সবকিছু মিলে পররাষ্ট্রনীতি তৈরি হয়। দুর্বল অর্থনীতি নিয়ে শক্তিশালী কূটনীতির অভিনয় করা যায়; দীর্ঘদিন চালানো যায় না।
৪. কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, আসল নির্বুদ্ধিতা
পৃথিবীর বড় শক্তিগুলো এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার নেতৃত্ব নিয়ে প্রতিযোগিতায় নেমেছে। যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের সম্পর্কের নতুন আলোচনাতেও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বড় বিষয় হয়ে উঠছে। কে সবচেয়ে শক্তিশালী মডেল তৈরি করবে, কার কাছে সবচেয়ে বেশি তথ্য থাকবে, কে সবচেয়ে উন্নত চিপ বানাবে, কার তথ্যকেন্দ্র সবচেয়ে বেশি বিদ্যুৎ ব্যবহার করবে—ভবিষ্যতের ক্ষমতা অনেকটাই এসব প্রশ্নের ওপর নির্ভর করছে।
একসময় শক্তিশালী রাষ্ট্রের পরিচয় ছিল সেনাবাহিনী, নৌবহর ও পারমাণবিক অস্ত্র। এখন তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে অ্যালগরিদম, তথ্যভাণ্ডার ও কম্পিউটিং ক্ষমতা। বাংলাদেশে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে আগ্রহ বেড়েছে। সরকারি দপ্তর থেকে বিশ্ববিদ্যালয়, ব্যবসা থেকে গণমাধ্যম—সর্বত্র এর ব্যবহার নিয়ে আলোচনা চলছে। কিন্তু আমরা আবারও প্রযুক্তিকে যন্ত্র হিসেবে না দেখে জাদুর কাঠি হিসেবে দেখার ঝুঁকিতে আছি।
আমাদের ধারণা, একটি নতুন সফটওয়্যার বসালেই দুর্নীতি কমে যাবে, অনলাইনব্যবস্থা চালু করলেই সেবা সহজ হবে, ক্যামেরা লাগালেই শহর নিরাপদ হবে এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করলেই প্রশাসন বুদ্ধিমান হয়ে উঠবে। কিন্তু প্রযুক্তি মানুষের চরিত্র সংশোধন করে না। অসৎ ব্যবস্থার হাতে উন্নত প্রযুক্তি দিলে অসততা আরো দ্রুত ও দক্ষ হয়ে উঠতে পারে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে ভুয়া ছবি, বক্তব্য ও সংবাদ তৈরি করা আগের চেয়ে সহজ হয়েছে। রাজনীতি ও নির্বাচনে এর প্রভাব ভয়াবহ হতে পারে। একটি সম্পাদিত দৃশ্য, নকল কণ্ঠ কিংবা বানানো নথি কয়েক মিনিটে লাখো মানুষের কাছে পৌঁছে যেতে পারে। পরে সত্য প্রকাশিত হলেও প্রথম মিথ্যাটিই মানুষের মনে থেকে যায়। কারণ মিথ্যা সাধারণত উত্তেজনাপূর্ণ; সত্যকে ব্যাখ্যা করতে সময় লাগে। আমরা এমনিতেই যাচাই না করে সংবাদ ভাগ করি। এখন যন্ত্র আমাদের সেই অভ্যাসের জন্য অসীম পরিমাণ উপকরণ তৈরি করে দিচ্ছে।
রাষ্ট্রের তাই শুধু কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার নীতি নয়, তথ্যের সত্যতা যাচাই, ব্যক্তিগত গোপনীয়তা, নাগরিক অধিকার এবং অ্যালগরিদমিক জবাবদিহির কাঠামো প্রয়োজন। কোন তথ্য সংগ্রহ করা যাবে, কীভাবে ব্যবহার করা হবে, নাগরিকের বিরুদ্ধে স্বয়ংক্রিয় সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে আপিলের সুযোগ থাকবে কি না, এসব প্রশ্ন এখনই নির্ধারণ করা দরকার।
শিক্ষাব্যবস্থাতেও বড় পরিবর্তন প্রয়োজন। শিক্ষার্থীরা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে উত্তর লিখছে—এ নিয়ে শুধু নিষেধাজ্ঞা দিলে লাভ হবে না। প্রশ্নের ধরন বদলাতে হবে। মুখস্থ উত্তর নয়, বিশ্লেষণ, যুক্তি ও সৃজনশীলতার মূল্যায়ন করতে হবে। শিক্ষককে পুলিশের ভূমিকায় বসিয়ে প্রযুক্তি ঠেকানো যাবে না। তাকে পথপ্রদর্শকের ভূমিকায় শক্তিশালী করতে হবে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা আমাদের কাজ সহজ করতে পারে। কিন্তু চিন্তা করার দায়িত্ব থেকে মুক্তি দিতে পারে না। যন্ত্র যত বুদ্ধিমান হচ্ছে, মানুষের নিজের বুদ্ধি ব্যবহারের প্রয়োজন তত বাড়ছে।
শেষ কথা
ভ্রমণে সবচেয়ে আকর্ষণীয় মুহূর্তটি কখন আসে? গন্তব্যে পৌঁছানোর সময়, নাকি ফেরার পথে? আমার মনে হয়, ফেরার পথে। কারণ যাওয়ার সময় চোখে থাকে নতুন জায়গার কৌতূহল ফেরার সময় সঙ্গে থাকে তুলনা।
অন্য দেশের বিমানবন্দর, সড়ক, শৃঙ্খলা কিংবা নাগরিকসেবা দেখে আমরা প্রায়ই দীর্ঘশ্বাস ফেলি। কিন্তু উন্নত রাষ্ট্র শুধু চকচকে অবকাঠামোর নাম নয়। উন্নত রাষ্ট্র হলো এমন এক ব্যবস্থা, যেখানে ক্ষমতাবান ব্যক্তি জানেন তার সীমা কোথায়, প্রতিষ্ঠান জানে তার দায়িত্ব কী এবং নাগরিক জানে তার অধিকার কেড়ে নেওয়া হলে কোথায় প্রতিকার চাইতে হবে।
আমাদের দেশে রাষ্ট্রপতি বদলেছে। সরকার বদলেছে। রাজনৈতিক বাস্তবতা বদলেছে। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের সমীকরণ বদলাচ্ছে। প্রযুক্তি মানুষের জীবন ও সত্যের ধারণা বদলে দিচ্ছে। এত পরিবর্তনের মধ্যেও একটি বিষয় বদলানো সবচেয়ে কঠিন—ক্ষমতার সংস্কৃতি। আমরা প্রায়ই মনে করি, ভালো মানুষকে ক্ষমতায় বসাতে পারলেই ভালো রাষ্ট্র তৈরি হবে। ভালো মানুষের প্রয়োজন অবশ্যই আছে। কিন্তু রাষ্ট্র শুধু ভালো মানুষের সদিচ্ছার ওপর চলতে পারে না। এমন প্রতিষ্ঠান প্রয়োজন, যা খারাপ মানুষকেও খারাপ কাজ করতে বাধা দেবে এবং ভালো মানুষকেও সীমা অতিক্রম করতে দেবে না। আইনের শক্তি এখানেই। আইন কোনো শাসকের মহানুভবতার বিকল্প নয়; আইন শাসকের মহানুভবতার প্রয়োজনই কমিয়ে দেয়।
জুলাইয়ের স্মৃতি, রাষ্ট্রপতির পদত্যাগ, বাণিজ্যিক চাপ এবং প্রযুক্তির বিস্তার—চারটি আলাদা ঘটনা বলে মনে হতে পারে। আসলে চারটিই ক্ষমতার গল্প। কোথাও সাংবিধানিক ক্ষমতা, কোথাও জনতার ক্ষমতা, কোথাও অর্থনৈতিক ক্ষমতা, কোথাও তথ্যপ্রযুক্তির ক্ষমতা। প্রশ্ন একটাই—এই ক্ষমতাগুলো কে নিয়ন্ত্রণ করবে?
উত্তরটি কোনো এক নেতা, দল কিংবা সরকারের কাছে নেই। উত্তরটি থাকতে হবে সংবিধানে, প্রতিষ্ঠানে, নাগরিক সচেতনতায় এবং আমাদের সম্মিলিত রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে। ক্ষমতা বদলানো একটি ঘটনা। রাষ্ট্র বদলানো একটি দীর্ঘ সাধনা।
লেখক : প্রেসিডেন্ট, সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ (সিজিএস)









