বাংলাদেশ এখন ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ‘ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড’ বা জনমিতিক লভ্যাংশের সময় পার করছে। দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় দুই-তৃতীয়াংশই (৬৩ দশমিক ৬৭ শতাংশ) এখন ৩৫ বছরের নিচে।
গবেষকদের মতে, তরুণদের সংখ্যাধিক্যের এই সুবর্ণ সুযোগ ২০৪০ সাল পর্যন্ত বজায় থাকবে। তবে এই বিপুল সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও দেশের তরুণদের একটি বড় অংশই তাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে চরম উদ্বেগের মধ্যে রয়েছে।
সম্প্রতি জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিলের (ইউএনএফপিএ) প্রকাশিত ‘লাইভস, চয়েজেস অ্যান্ড ফিউচারস : ডেমোগ্রাফিক ফিউচারস সার্ভে’ শীর্ষক বৈশ্বিক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এক উদ্বেগজনক চিত্র। জরিপ অনুযায়ী, বাংলাদেশের ৬৭ দশমিক ২ শতাংশ তরুণই অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, সংঘাত ও বৈষম্য নিয়ে আশঙ্কায় দিন কাটাচ্ছেন, যা দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ।
দক্ষিণ এশিয়ায় উদ্বেগের শীর্ষে বাংলাদেশ
বিশ্বের ৭৩টি দেশের ১৮ থেকে ৩৯ বছর বয়সী জনগোষ্ঠীর ওপর ইউএনএফপিএ এই জরিপটি পরিচালনা করে। দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশের তরুণদের মধ্যে এই উদ্বেগের হার অনেকটাই বেশি।
বাংলাদেশে ৬৭.২ শতাংশ, ভুটানে ৬৬.৩ শতাংশ, আফগানিস্তানে ৫৪.৭ শতাংশ, পাকিস্তানে ৫৩.২ শতাংশ, ভারতে ৪৭.৪ শতাংশ এবং শ্রীলঙ্কায় ৪৫ শতাংশ। তবে দক্ষিণ এশিয়ার নেপাল ও মালদ্বীপ এই জরিপের আওতাভুক্ত ছিল না।
বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটেও এই উদ্বেগের দিক থেকে ৭৩টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান দশম। তালিকার শীর্ষে রয়েছে কোস্টারিকা (৭০.৭ শতাংশ) এবং এশিয়ার মধ্যে বাংলাদেশের ওপরে একমাত্র দেশ ফিলিপাইন (৭০.৪ শতাংশ)।
ইউএনএফপিএর এই জরিপে অংশ নেওয়া বৈশ্বিক তরুণদের ৯০ শতাংশই মনে করেন, জীবনের সবচেয়ে বড় লক্ষ্য হলো ‘আর্থিক নিরাপত্তা’। এমনকি ৮১ শতাংশ তরুণ বিয়ের আগে এবং ৮৮ শতাংশ তরুণ সন্তান নেওয়ার আগে আর্থিক সচ্ছলতা নিশ্চিত করাকে অপরিহার্য বলে মনে করছেন।
কর্মসংস্থান ও দক্ষতার বড় ফারাক : কিউএস ইনডেক্স
এমন এক বাস্তবতায় দেশজুড়ে পালিত হচ্ছে ‘বিশ্ব যুব দক্ষতা দিবস’। আন্তর্জাতিক ও দেশীয় বিভিন্ন সূচকে বাংলাদেশের তরুণদের দক্ষতার ঘাটতি এবং ক্রমবর্ধমান বেকারত্বের এক জটিল চিত্র প্রকাশ পেয়েছে।
‘কিউএস ওয়ার্ল্ড ফিউচার স্কিলস ইনডেক্স ২০২৫’ অনুযায়ী, চাকরিদাতাদের চাহিদা অনুযায়ী দক্ষ গ্র্যাজুয়েট তৈরিতে ৮১টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ৬৭তম (স্কোর ৩৯.১)। ভবিষ্যৎমুখী একাডেমিক প্রস্তুতিতে দেশের স্কোর ৬৫.৭ এবং ভবিষ্যৎ শ্রমবাজারের প্রস্তুতিতে ৪২.৬। সব সূচক মিলিয়ে বাংলাদেশের সামগ্রিক স্কোর দাঁড়িয়েছে ৪৯.১। এই তালিকায় ৯৭.৬ স্কোর নিয়ে শীর্ষে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।
খাত-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে তরুণরা যে প্রথাগত শিক্ষা পাচ্ছেন, তার সঙ্গে শিল্প ও সেবা খাতের বাস্তব চাহিদার বড় ধরনের অমিল (স্কিলস মিসম্যাচ) রয়েছে।
এক বছরে উচ্চশিক্ষিত বেকার বাড়ল এক লাখের বেশি
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) শ্রমশক্তি জরিপ ২০২৩ অনুযায়ী, দেশে উচ্চশিক্ষিত বেকারের সংখ্যা বেড়ে ৯ লাখ ৬ হাজারে দাঁড়িয়েছে, যা ২০২২ সালে ছিল ৭ লাখ ৯৯ হাজার। অর্থাৎ, মাত্র এক বছরেই উচ্চশিক্ষিত বেকার বেড়েছে এক লাখের বেশি। আর গত এক দশকে এই সংখ্যা বেড়েছে প্রায় আট গুণ।
সরকারি টাস্কফোর্সের প্রতিবেদন বলছে, দেশের প্রতি ১০০ জন বেকারের মধ্যে ২৮ জনই উচ্চশিক্ষিত। ২০১০ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে উচ্চশিক্ষা বা টারশিয়ারি পর্যায়ের বেকারত্বের হার ৪.৯ শতাংশ থেকে লাফিয়ে ১২ শতাংশে পৌঁছেছে। অথচ সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের (জিইডি) তথ্যমতে, ১৫ থেকে ২৪ বছর বয়সী প্রায় ৫৫ লাখ তরুণ বর্তমানে কোনো ধরনের শিক্ষা, কর্মসংস্থান বা প্রশিক্ষণের মধ্যে নেই।
এছাড়া, বিশ্বব্যাংকের দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক ভাইস প্রেসিডেন্ট জোহানেস জাটের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত এক দশকে বাংলাদেশের শ্রমবাজারে ১ কোটি ৪০ লাখ তরুণ প্রবেশ করলেও কর্মসংস্থান তৈরি হয়েছে মাত্র ৮৭ লাখের। অর্থাৎ, প্রায় অর্ধেক কর্মক্ষম তরুণই কাজ পাননি।
উচ্চশিক্ষার বিস্তার বনাম বাজারের চাহিদা
বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে ১৬৩টি বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে। এর মধ্যে গত দেড় দশকে নতুন করে ২২টি পাবলিক ও ৫৬টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। তবে শিক্ষার মান নিয়ে বড় প্রশ্ন রয়েছে; দেশের ৩৮টি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক-শিক্ষার্থী অনুপাত ১:২০-এর বেশি এবং ৫১টি বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রফেসরের সংখ্যা পাঁচজনেরও কম।
সবচেয়ে বড় সংকট হলো শিক্ষার্থীর বিন্যাসে। বর্তমানে দেশে মোট শিক্ষার্থীর প্রায় ৮১ শতাংশই পড়ছেন জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় (প্রায় ৩৩.৮৪ লাখ) ও ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের (৫.০৩ লাখ) অধীনে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ভবিষ্যতের কর্মক্ষেত্রে যখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), তথ্যপ্রযুক্তি ও পরিবেশবিজ্ঞানের চাহিদা বাড়ছে, তখন বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষার অর্ধেকের বেশি এবং জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই-তৃতীয়াংশ শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছেন প্রথাগত মানবিক ও সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদে। ফলে পাস করার পর চাকরি পাওয়া তাদের জন্য আরও কঠিন হয়ে পড়ছে।
রেমিট্যান্সেও পড়ছে দক্ষতার ঘাটতির প্রভাব
দক্ষতার এই ঘাটতির সবচেয়ে বড় খেসারত দিতে হচ্ছে বৈদেশিক শ্রমবাজারে। জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্য অনুযায়ী, প্রতিবছর বাংলাদেশ থেকে যে বিপুলসংখ্যক কর্মী বিদেশে যান, তাদের সিংহভাগই অদক্ষ বা স্বল্পদক্ষ। ফলে মধ্যপ্রাচ্য বা দূরপ্রাচ্যের দেশগুলোতে তারা কম বেতনের সাধারণ শ্রমিকের কাজে যোগ দিতে বাধ্য হন।
আন্তর্জাতিক মানের কারিগরি প্রশিক্ষণ, ভাষাজ্ঞান এবং আন্তর্জাতিক সনদের অভাবে বাংলাদেশ উন্নত দেশগুলোর ওয়েল্ডার, ইলেকট্রিশিয়ান, মেশিন অপারেটর বা কেয়ারগিভারের মতো উচ্চ আয়ের বাজারগুলো ধরতে পারছে না। ফলে ভারত, ফিলিপাইন বা ভিয়েতনামের কর্মীদের চেয়ে বাংলাদেশি কর্মীদের গড় আয় অনেক কম হচ্ছে।
উত্তরণের উপায় ও সরকারি উদ্যোগ
এই সংকট উত্তরণে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক ড. সেলিম রায়হান বলেন, ‘শিল্পখাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের সহায়তা এবং শিক্ষাব্যবস্থার সঙ্গে শ্রমবাজারের চাহিদার সমন্বয় জরুরি। প্রযুক্তি ও আইটি খাতে বিনিয়োগ এবং স্টার্টআপগুলোকে উৎসাহিত করতে পারলে ধীরে ধীরে শিক্ষিত বেকারত্ব কমিয়ে আনা সম্ভব।’
জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (এনএসডিএ) নির্বাহী চেয়ারম্যান ড. নাজনীন কাউসার চৌধুরী মনে করেন, বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বয়ের অভাব ও প্রশাসনিক অদক্ষতার কারণে অতীতে মানবসম্পদ উন্নয়নের বিনিয়োগের শতভাগ সুফল পাওয়া যায়নি। তবে তদারকি বাড়ালে বাজেটের অপচয় রোধ করা সম্ভব।
সরকার বর্তমানে সংকট মোকাবিলায় নানামুখী উদ্যোগ নিচ্ছে। যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. মাহবুব-উল-আলম জানিয়েছেন, যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের মাধ্যমে বর্তমানে ৮৩টি ট্রেডে প্রাতিষ্ঠানিক ও অপ্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। এছাড়া বিশ্বব্যাংকের সহায়তায় ‘আর্ন’ (EARN) নামে একটি নতুন প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে, যার মাধ্যমে আগামী ৩০ মাসে ৭ লাখ মানুষকে দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। পাশাপাশি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) বিষয়ে দক্ষ জনবল তৈরিতে আরেকটি বিশেষ প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে সরকার।