চিকিৎসা ব্যয় কমাতে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে স্বাস্থ্যসেবা ও জনস্বাস্থ্য খাতে একাধিক কর ও শুল্ক ছাড়ের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এতে কিডনি রোগী, হৃদরোগী, চক্ষুরোগী এবং বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন ব্যক্তিদের চিকিৎসা ব্যয় কমার পাশাপাশি ওষুধ ও চিকিৎসা সরঞ্জামের স্থানীয় উৎপাদনও উৎসাহিত হবে। অর্থ মন্ত্রণালয় ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
আজ বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট উপস্থাপন করা হবে। এবারের বাজেটে ডায়ালিসিস ফিল্টার আমদানির ওপর বিদ্যমান ১৫ শতাংশ ভ্যাট এবং ৫ শতাংশ অগ্রিম আয়কর সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করা হবে। একই সঙ্গে হেমোডায়ালিসিসে ব্যবহৃত ব্লাড টিউবিং সেটের ওপর আরোপিত ৭.৫ শতাংশ আগাম করও মওকুফের প্রস্তাব রয়েছে। সরকারের হিসাব অনুযায়ী, এর ফলে প্রতি ডায়ালিসিসে রোগীদের ব্যয় প্রায় ৮০০ টাকা পর্যন্ত কমতে পারে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য মতে, দেশে কোনো না কোনো কিডনি রোগে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা প্রায় তিন কোটি ৮০ লাখ। এর মধ্যে ৪০ থেকে ৫০ হাজার মানুষের কিডনি বিকল। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজের (বিআইডিএস) ২০২৪ সালের এক গবেষণায় দেখা যায়, ডায়ালিসিসের খরচ বহন করতে গিয়ে ৯২ শতাংশ পরিবার আর্থিক সংকটে পড়ে। প্রায় ২০ শতাংশ রোগী প্রয়োজনীয়সংখ্যক ডায়ালিসিসও নিতে পারেন না।
হৃদরোগ ও চক্ষু চিকিৎসার ব্যয় কমানোর লক্ষ্যে আমদানি করা হার্টের রিং বা স্টেন্ট এবং চোখের ইনট্রাওকুলার লেন্সের সরবরাহ পর্যায়ে আরোপিত ১০ শতাংশ ভ্যাট প্রত্যাহারের প্রস্তাব করা হয়েছে। এর ফলে একটি স্টেন্টের দাম প্রায় ২০ হাজার টাকা এবং একটি ইনট্রাওকুলার লেন্সের দাম প্রায় পাঁচ হাজার টাকা পর্যন্ত কমতে পারে।
দেশে চিকিৎসা যন্ত্রপাতিশিল্পের বিকাশেও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। চিকিৎসা যন্ত্রপাতি ও যন্ত্রাংশ উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় বিভিন্ন কাঁচামাল আমদানিতে শুল্ক রেয়াতের প্রস্তাব রয়েছে। পাশাপাশি হাসপাতালসহ জনকল্যাণমূলক প্রতিষ্ঠানগুলোকে মূলধনী যন্ত্রপাতি ও যন্ত্রাংশ আমদানিতে আগাম কর অব্যাহতি সুবিধা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
ওষুধশিল্পের বিকাশে বাজেটে বিশেষ প্রণোদনা রাখা হয়েছে। ক্যান্সারের ওষুধ উৎপাদনের জন্য নতুন ৯টি কাঁচামাল আমদানিতে শুল্ক ও ভ্যাট সম্পূর্ণ অব্যাহতির প্রস্তাব করা হয়েছে। পাশাপাশি অ্যাকটিভ ফার্মাসিউটিক্যাল ইনগ্রেডিয়েন্ট (এপিআই) তৈরির ৫১টি কাঁচামালের আমদানি শুল্ক প্রত্যাহার এবং ওষুধশিল্পের আরো ১৭টি কাঁচামালে শুল্কমুক্ত সুবিধা দেওয়ার প্রস্তাব রয়েছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, এতে দেশীয় ওষুধশিল্প আরো শক্তিশালী হবে এবং ওষুধের উৎপাদন ব্যয় কমবে।
বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন ব্যক্তিদের জন্যও একাধিক সুবিধা রাখা হয়েছে। তাদের ব্যবহারের জন্য ২১ ধরনের সহায়ক যন্ত্রপাতি আমদানিতে সব ধরনের শুল্ক ও কর সম্পূর্ণ অব্যাহতির প্রস্তাব করা হয়েছে। এ ছাড়া ১৫টি পণ্যের ক্ষেত্রে অগ্রিম আয়কর ২ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১ শতাংশ নির্ধারণের প্রস্তাব রয়েছে।
জনস্বাস্থ্য সুরক্ষার বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে এবারের বাজেটে। নিকোটিন পাউচ ও নিকোটিন গ্র্যানুলস আমদানিতে ৩৫০ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক আরোপের প্রস্তাব করা হবে। একই সঙ্গে সিগারেটের বিভিন্ন স্তরে মূল্যবৃদ্ধি এবং তামাকপণ্যের উৎপাদন ও সরবরাহ পর্যবেক্ষণে ‘ট্র্যাক অ্যান্ড ট্রেস’ ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
বাজেট প্রসঙ্গে গতকাল স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী ড. এম এ মুহিত বলেছেন, স্বাস্থ্য খাতকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে ইতিহাসের অন্যতম বড় বাজেট প্রস্তাব করা হচ্ছে। তিনি জানান, দেশের সব মানুষকে ধীরে ধীরে একটি ডিজিটাল স্বাস্থ্য ব্যবস্থার আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে। ই-হেলথ কার্ড চালুর মাধ্যমে রোগীর চিকিৎসা, ওষুধ ও পরীক্ষার তথ্য সংরক্ষণ করা হবে, যা অপ্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও ওষুধ ব্যবহারের প্রবণতা কমাবে।
তিনি আরো বলেন, দেশের প্রতিটি উপজেলা হাসপাতালকে অন্তত ১০১ শয্যায় উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণে এক লাখ নতুন স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ দেওয়া হবে, যার মধ্যে ৮০ হাজারই নারী। চিকিৎসক সংকট দূর করতে বড় পরিসরে নতুন ডাক্তার নিয়োগের উদ্যোগও নেওয়া হচ্ছে।




