জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি হিসেবে বাংলাদেশের নির্বাচিত হওয়া নিঃসন্দেহে দেশের জন্য একটি বড় কূটনৈতিক অর্জন। এটি শুধু আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের মর্যাদাই বাড়ায়নি, বরং জলবায়ু পরিবর্তন, টেকসই উন্নয়ন, শান্তি প্রতিষ্ঠা এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোর স্বার্থের মতো গুরুত্বপূর্ণ বৈশ্বিক ইস্যুতে দেশের অবস্থান আরো জোরালোভাবে তুলে ধরার নতুন সুযোগ সৃষ্টি করেছে।
তবে এই সাফল্যের পাশাপাশি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রাতিষ্ঠানিক প্রশ্নও সামনে এসেছে। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী কি একই সময়ে দেশের পররাষ্ট্রনীতি কার্যকরভাবে পরিচালনা করার পাশাপাশি জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতির দায়িত্বও দক্ষতার সঙ্গে পালন করতে পারবেন?
এই বিতর্ক কোনো ব্যক্তি বা ব্যক্তিত্বকে কেন্দ্র করে নয়। এটি রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠান, জবাবদিহি এবং সুশাসনের প্রশ্ন। মূল বিষয় হলো বর্তমান এই ব্যবস্থা বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় সত্যিই সবচেয়ে কার্যকর কি না।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জাতীয় স্বার্থ, কৌশলগত স্বাধীনতা এবং সব গুরুত্বপূর্ণ অংশীদারদের সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্কের ওপর ভিত্তি করে একটি পররাষ্ট্রনীতির রূপরেখা তুলে ধরেছেন। প্রধানমন্ত্রীর ঘোষিত লক্ষ্য হলো বাংলাদেশ যেন ভারতসহ প্রতিবেশী দেশগুলোর পাশাপাশি, চীন ও যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের প্রধান শক্তিগুলোর সঙ্গে গঠনমূলক সম্পর্ক বজায় রাখে। একই সঙ্গে দেশের পররাষ্ট্রনীতি-সংক্রান্ত সব সিদ্ধান্ত যেন বাংলাদেশের নিজস্ব জাতীয় অগ্রাধিকারকে সামনে রেখেই নেওয়া হয়। এ ধরনের পররাষ্ট্রনীতি বাস্তবায়নের জন্য শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা এবং ধারাবাহিক রাজনৈতিক নেতৃত্ব প্রয়োজন।
বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অনেক বিষয়ই পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক, অর্থনৈতিক কূটনীতি, আঞ্চলিক নিরাপত্তা, আন্তর্জাতিক আলোচনা, বিনিয়োগ আকর্ষণ, অভিবাসন, জলবায়ু কূটনীতি এবং রোহিঙ্গা সংকট। এসব বিষয়ে কার্যকরভাবে কাজ করতে পররাষ্ট্রমন্ত্রী, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, অন্যান্য মন্ত্রণালয় এবং বিদেশে বাংলাদেশের কূটনৈতিক মিশনগুলোর মধ্যে নিয়মিত ও সমন্বিত যোগাযোগ ও সহযোগিতা প্রয়োজন।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানের যুক্তি এই দুই দায়িত্ব একসঙ্গে পালনের ঐতিহাসিক নজির রয়েছে। তিনি বাংলাদেশের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীর উদাহরণ দিয়েছেন, যিনি ১৯৮৬-৮৭ সালে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৪১তম অধিবেশনের সভাপতি ছিলেন। একইভাবে মালদ্বীপের আবদুল্লা শহীদ ৭৬তম অধিবেশনে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতির দায়িত্ব পালন করার পাশাপাশি দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রীও ছিলেন। তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে। হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী ও আবদুল্লা শহীদ দুজনই ছিলেন পেশাদার রাজনীতিবিদ। কিন্তু খলিলুর রহমান পেশাদার রাজনীতিবিদ নন। একই সঙ্গে সাম্প্রতিক জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের কয়েকজন সভাপতি নির্বাহী সরকারের দায়িত্ব ছাড়ার পর এই পদে দায়িত্ব নিয়েছেন। এসব ভিন্ন উদাহরণ দেখায় দুই দায়িত্ব একসঙ্গে পালন করা সম্ভব হলেও বিভিন্ন দেশ তাদের নিজস্ব পরিস্থিতি ও প্রশাসনিক প্রয়োজন অনুযায়ী ভিন্ন পথ বেছে নিয়েছে। এটি আরো বড় একটি প্রশ্ন সামনে আনে-আগের পরিস্থিতিতে যে ব্যবস্থা কার্যকর ছিল, বর্তমানের অনেক বেশি জটিল কূটনৈতিক পরিবেশেও কি সেটিই সবচেয়ে কার্যকর মডেল?
কোনো কিছু করা সম্ভব হওয়া আর বাস্তবে তা কার্যকরভাবে করা এই দুইয়ের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতির দায়িত্ব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও সময়সাপেক্ষ একটি আন্তর্জাতিক দায়িত্ব। এই পদে থাকা ব্যক্তি সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন, ১৯৩টি সদস্য রাষ্ট্রের মধ্যে আলোচনায় সমন্বয় করেন, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সাধারণ পরিষদের প্রতিনিধিত্ব করেন এবং সারা বছরজুড়ে বিস্তৃত কূটনৈতিক তৎপরতায় অংশ নেন।
একই সময়ে একজন পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে দেশের কূটনৈতিক কার্যক্রমে প্রতিদিন রাজনৈতিক দিকনির্দেশনা দিতে হয়। একজন মন্ত্রী সরকারের, সংসদের এবং শেষ পর্যন্ত জনগণের কাছে রাজনৈতিকভাবে দায়বদ্ধ থাকেন। কার্যকর পররাষ্ট্রনীতি গড়ে তুলতে শুধু আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সক্রিয় উপস্থিতিই যথেষ্ট নয়, দেশের ভেতরেও ধারাবাহিকভাবে দায়িত্ব পালন ও সম্পৃক্ত থাকা প্রয়োজন। বাংলাদেশ বর্তমানে যেসব কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি, সেগুলোর কারণে এই বিষয়টি আরো বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
দেশের পররাষ্ট্রনীতি কতটা কার্যকর তার একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হলো ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থকে ভিত্তি করে প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে গঠনমূলক সম্পর্ক বজায় রাখার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। ভারতের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ দেশটি বাণিজ্য, যোগাযোগ, পানিসম্পদ, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, সীমান্তে হত্যা, জ্বালানি সহযোগিতা এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সরাসরি প্রভাব ফেলে। এসব বিষয়ে অগ্রগতি আনতে ধারাবাহিক রাজনৈতিক মনোযোগ এবং উচ্চ পর্যায়ের নিয়মিত যোগাযোগ প্রয়োজন। গুরুত্বপূর্ণ দ্বিপক্ষীয় বিষয়গুলোর সমাধান প্রয়োজন হলে সরকারের অগ্রাধিকার, সময়সূচি এবং কী ফল অর্জিত হচ্ছে সে বিষয়ে জনগণ ও সংসদের কাছে স্পষ্ট ব্যাখ্যা দেওয়ার দায়িত্ব সরকারের রয়েছে।
গণমাধ্যমের একটি অংশ এবং উচ্চ পর্যায়ের কিছু কর্মকর্তার মধ্যে এমন আলোচনা রয়েছে যে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতি নির্বাচনে ভারতের ভোটকে ঘিরে পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানের ব্যক্তিগত অনুভূতি ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের ওপর কোনো প্রভাব ফেলেছে কি না। তবে এ ধরনের দাবি থেকে কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে হলে নির্ভরযোগ্য প্রমাণ প্রয়োজন। কিন্তু এর বাইরেও একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি রয়েছে। দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক পরিচালিত হওয়া উচিত দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় স্বার্থের ভিত্তিতে, স্বল্পমেয়াদি ধারণা বা কোনো ব্যক্তির ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দের ভিত্তিতে নয়।
‘সবার আগে বাংলাদেশ’ নীতির ভিত্তিতে পররাষ্ট্রনীতি পরিচালনা করতে হলে প্রাতিষ্ঠানিক ধারাবাহিকতা এবং কৌশলগত শৃঙ্খলা প্রয়োজন। একই সময়ে ভারত, চীন, যুক্তরাষ্ট্র এবং অন্যান্য অংশীদার দেশের সঙ্গে সম্পর্ক পরিচালনার জন্য স্পষ্ট অগ্রাধিকার নির্ধারণ এবং ধারাবাহিক রাজনৈতিক তদারকি অপরিহার্য। এ কারণেই প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা কী হবে, সেই প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ। যদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতির দায়িত্ব পালনে উল্লেখযোগ্য সময় ব্যয় করেন, তাহলে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় প্রতিদিন কীভাবে পরিচালিত হবে সে বিষয়ে সরকারের স্পষ্ট ব্যাখ্যা দেওয়া উচিত।
মন্ত্রণালয়ের দৈনন্দিন কার্যক্রমের দায়িত্ব কে পালন করবেন? গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত সিদ্ধান্তগুলোর সমন্বয় কীভাবে হবে? আর যদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী বছরের বড় একটি সময় বিদেশে থাকেন তাহলে সংসদ কীভাবে মন্ত্রণালয়ের ওপর কার্যকর তদারকি করবে? এগুলো কোনো রাজনৈতিক দলকে কেন্দ্র করে করা প্রশ্ন নয়। প্রশ্নগুলো সুশাসন ও রাষ্ট্র পরিচালনার সঙ্গে সম্পর্কিত।
একটি শক্তিশালী কূটনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে রাজনৈতিক নেতৃত্ব এবং পেশাগত দক্ষতা—দুইটিই সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের পেশাদার কূটনীতিকরা দীর্ঘদিন ধরে বিদেশে দেশের জাতীয় স্বার্থ তুলে ধরতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছেন। তবে কূটনীতিকরা সরকারের নীতি বাস্তবায়ন করেন। আর রাজনৈতিক নেতৃত্ব সেই নীতির দিকনির্দেশনা নির্ধারণ করে কৌশলগত সিদ্ধান্ত নেয় এবং তার ফলাফলের জন্য জবাবদিহি করে।
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতির দায়িত্ব পাওয়া বাংলাদেশের জন্য একটি সম্মানের বিষয় এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের অবস্থান আরো শক্তিশালী করার একটি সুযোগ। বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান কূটনৈতিক ভূমিকার স্বীকৃতি হিসেবে এই অর্জনকে স্বাগত জানানো উচিত। তবে আন্তর্জাতিক মর্যাদার সঙ্গে দেশের সুশাসনের প্রয়োজনেরও ভারসাম্য থাকতে হবে। মূল প্রশ্নটি একজন ব্যক্তি কৌশলগতভাবে বা নিয়ম অনুযায়ী দু’টি গুরুত্বপূর্ণ পদ একসঙ্গে রাখতে পারেন কি না, তা নয়। আসল প্রশ্ন হলো, অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও সময়সাপেক্ষ এই দু’টি দায়িত্ব একজনের ওপর অর্পণ করা হলে তা বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ সবচেয়ে ভালোভাবে রক্ষা করবে কি না।
শক্তিশালী রাষ্ট্র গড়ে ওঠে শক্তিশালী প্রতিষ্ঠানের ওপর। দায়িত্বের স্পষ্ট বণ্টন, কার্যকর দায়িত্ব অর্পণ এবং জবাবদিহি সফল রাষ্ট্র পরিচালনার অপরিহার্য ভিত্তি। বাংলাদেশ যখন ক্রমেই আরো জটিল আন্তর্জাতিক পরিবেশের মধ্যে এগিয়ে যাচ্ছে, তখন দেশের পররাষ্ট্রনীতি পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে এমনভাবে গড়ে তুলতে হবে যাতে তারা ধারাবাহিক, লক্ষ্যভিত্তিক এবং জবাবদিহিমূলক নেতৃত্ব দিতে পারে। বাংলাদেশের কূটনীতির সাফল্য শুধু বিদেশে দেশের প্রতিনিধিদের পরিচিতি বা গুরুত্বের ওপর নির্ভর করবে না। বরং দেশে তাদের সহায়তাকারী প্রতিষ্ঠান ও ব্যবস্থার শক্তির ওপরও তা অনেকটাই নির্ভর করবে।