kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ১৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৮। ২ ডিসেম্বর ২০২১। ২৬ রবিউস সানি ১৪৪৩

ই-কমার্সের সুষ্ঠু বিকাশে প্রয়োজন নজরদারি ও নিয়ন্ত্রণ

ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ   

১৬ অক্টোবর, ২০২১ ০৪:২৯ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



ই-কমার্সের সুষ্ঠু বিকাশে প্রয়োজন নজরদারি ও নিয়ন্ত্রণ

আমরা জানি, ইলেকট্রনিক নেটওয়ার্ক বা ইন্টারভিত্তিক ব্যবসা-বাণিজ্য তথা ই-কর্মাস দেশে দিন দিন প্রসারিত হচ্ছে এবং এটা অবশ্যম্ভাবী। বিশেষত কভিড-১৯ আসার পর এর ব্যাপক প্রসার ঘটছে। এর মাধ্যমে ক্রেতা-বিক্রেতা দুই পক্ষেরই সুবিধা হয়। বিভিন্ন উপায়ে অর্থ লেনদেন ও পণ্য সরবরাহ করা হয় ই-কমার্সের মাধ্যমে। বিভিন্ন ধরনের ই-কর্মাস দেখা যায়। তবে বাংলাদেশে যে বিশেষ ধরনটি দেখা গেল তা হচ্ছে বাজারদরের চেয়ে অকল্পনীয় কম দামে পণ্য বিক্রি করেও কম্পানিগুলোর অকল্পনীয় প্রবৃদ্ধি ঘটেছে। ইভ্যালি, ধামাকা, ই-অরেঞ্জ, ই-কমার্স—এই সব প্রতিষ্ঠান এমন অকল্পনীয় কাণ্ড ঘটিয়েছে। হাজার হাজার মানুষ টাকা হারিয়ে এখন ঘুরছে। শেষ পর্যন্ত আইন প্রয়োগকারী সংস্থা এবং আইন-আদালত পর্যন্ত পৌঁছেছে। সবচেয়ে বড় কথা, এ ধরনের ঘটনা আর্থ-সামাজিক শৃঙ্খলা যেমন নষ্ট করে, তেমনি জাতীয় সুনামও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এই খাতে সংঘটিত অনিয়মগুলো ঘটে যাওয়ার আগেই আমাদের সাবধান হওয়া উচিত ছিল। কিন্তু কেন আমরা সাবধান হতে পারলাম না? ভবিষ্যতের প্রয়োজনেই প্রশ্নটির জবাব খোঁজা উচিত।

ইভ্যালি বা এ ধরনের প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে দেশে ই-কমার্সে যে ভয়াবহ অনিয়মগুলো দেখতে পাচ্ছি, তার উদ্ভব ঘটেছে সাম্প্রতিককালে। ইভ্যালি ২০১৮ সালে রেজিস্ট্রেশন নিয়েছে। এটি রেজিস্ট্রার অব জয়েন্ট স্টক কম্পানির আওতাভুক্ত। তাদের অনুমোদিত মূলধন পাঁচ লাখ টাকা এবং পরিশোধিত মূলধন ৫০ হাজার টাকা। এমন একটা কম্পানি অল্প দিনে ৩০০ থেকে ৪০০ কোটি টাকার ব্যবসা করে ফেলেছে। এর পথ ধরে ধামাকা, ই-অরেঞ্জসহ আরো অনেকে এসেছে এবং দেশের ই-কর্মাসকে কালিমালিপ্ত করেছে। অথচ অ্যামাজন, আলিবাবার মতো বিশ্বের বড় বড় ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানগুলো বহুদিন ধরে ব্যবসা করলেও গুরুতর কোনো অভিযোগ নেই। আমাদের এখানে একটি প্রতিষ্ঠান গঠিত হওয়ার দু-এক বছরের মধ্যেই নানা রকম অপরাধ ও বেআইনি কাণ্ড ঘটিয়ে ফেলছে এবং নিজেরা ফুলেফেঁপে উঠছে। এটা এখন আমাদের ভাববার বিষয়।

যে বিষয়ে আমাদের এখন নজর দেওয়া দরকার সেটা হচ্ছে, এসব কম্পানি কিভাবে নিবন্ধিত হয়েছে এবং নিবন্ধিত হওয়ার পর এদের কেউ নজরদারি বা নিয়ন্ত্রণ করেছে কি না। এদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠানই বা কারা এবং কোনো রকম অভিযোগ থাকলে সেটা প্রতিকার বা প্রতিবিধানই কাদের করার কথা। ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানগুলোর এই ধরনের ব্যবসা-বাণিজ্য করার আগেই আমাদের আইন এবং নিয়ন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর নজরদারিতে আসা দরকার ছিল। ২০১৮ সালে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় একটি ন্যাশনাল ডিজিটাল কমার্স পলিসি করেছে। এরপর কথা ছিল একটা নিয়ন্ত্রণ সেল গঠন করা হবে, যা আজও হয়নি। ২০২০ সালে পলিসি সংশোধন করা হয়েছে। দ্বিতীয়ত, এসব প্রতিষ্ঠানের যারা রেজিস্ট্রেশন করেছে, জয়েন্ট স্টক কম্পানি বা অন্য যারাই হোক, তাদের দায়িত্ব ছিল বার্ষিক প্রতিবেদন এবং অন্যান্য আর্থিক প্রতিবেদন ও অডিট রিপোর্ট পর্যালোচনা করা। কিন্তু এখানে সুস্পষ্ট অস্বচ্ছতা দেখা গেল। ব্যাংকগুলোর অডিট রিপোর্ট বাংলাদেশ ব্যাংক দেখে। ক্যাপিটাল মার্কেটে লিস্টেড কম্পানিগুলোর অডিট রিপোর্ট সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন দেখে। কিন্তু ই-কমার্সের ব্যাপারে এমন কিছু হয়নি।

এই পরিস্থিতির মধ্যেই ই-কমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ—ই-ক্যাবের মতে, ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা কয়েক হাজার ছাড়িয়ে গেছে। অদ্ভুত একটা ব্যাপার। এত প্রতিষ্ঠান রেজিস্ট্রেশন হয়েছে এবং সব কটিই অনিয়ম করছে তা নয়। তবে নজরদারি ও নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সুস্পষ্ট প্রশ্ন রয়েছে। এই পটভূমিতেই ইভ্যালির উত্থান এবং তাদের অনিয়মটাই প্রথম জোরেশোরে শোনা যায়। এখন শুনছি, ৩০ ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান আইন নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থার তদন্তের অধীনে আছে। বোঝাই যাচ্ছে, গুরুতর অভিযোগই রয়েছে এদের বিরুদ্ধে।

এই খাতে হাজার হাজার কোটি টাকার ব্যবসা। এখানে বহু মানুষ প্রতারিত হচ্ছে, টাকা হারাচ্ছে। স্বল্পবিত্ত, মধ্যবিত্ত, এমনকি গ্রামগঞ্জের লোকরাও এসবের ছলচাতুরীর শিকার হয়েছে। এটা ব্যক্তিগত ক্ষতি। কিন্তু জাতীয় ক্ষতি অপরিসীম। ব্যবসা-বাণিজ্যের সুন্দর একটি মাধ্যমের অপব্যবহার করা হয়েছে। এটা দেশের জন্য অনেক ক্ষতি।

যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্রসহ উন্নত দেশগুলোতে দেখা যায়, তথ্য-প্রযুক্তি আইন সম্পর্কিত নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানগুলো নজরদারি করে। আর আর্থিক লেনদেনসংক্রান্ত কোনো বিষয় থাকলে তা সংশ্লিষ্ট আর্থিক রেগুলেটরি প্রতিষ্ঠান করে তথা কেন্দ্রীয় ব্যাংক, সিকিউরিটিজ কমিশনের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো দেখে। কিন্তু বাংলাদেশের এমনটা দেখা যায়নি। অর্থ জমা নিয়ে গ্রাহকদের বোনাস দেওয়ার মতো ‘ই-ওয়ালেট’ কার্যক্রম লাইসেন্স ছাড়া পরিচালনা করার কথা নয়। বাংলাদেশ ব্যাংক দুই বছর আগে এ বিষয়ে সতর্ক করে দিয়েছিল। অথচ ইভ্যালি ও ই-ওয়ালেট কার্যক্রম চালিয়েছে এবং ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ পর্যন্ত বোনাসও ঘোষণা করে। এটা নিঃসন্দেহে বেআইনি। অথচ ইভ্যালি বলেছে যে তাদের কার্যক্রম ই-ওয়ালেটের মধ্যে পড়ে না। এটা নিছক একটা অজুহাত এবং একটা সময় পর্যন্ত তারা ধরাছোঁয়ার বাইরে ছিল।

বিশ্বের অনেক দেশ, এমনকি ভারতেও কোনো ই-কমার্স ফার্ম প্রতিষ্ঠা করার সময় জিএসটি রেজিস্ট্রেশনের দরকার হয়। যখনই জিএসটি রেজিস্ট্রি হয়, তখনই প্রতিষ্ঠানটি নজরদারিতে চলে আসে। তখন তারা যা লেনদেন করে, তা জিএসটিতে রেকর্ডেড হয়। কিন্তু বাংলাদেশে আমি কোনো দিন শুনিনি সব ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানের ভ্যাট রেজিস্ট্রেশন আছে বা ইনকাম ট্যাক্স রেজিস্ট্রেশন আছে। এগুলো এনবিআর দেখে কি না বা এনবিআরের দৃষ্টিতে এসেছে কি না স্পষ্ট নয়। আরেকটা গুরুতর অভিযোগ হলো, ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানগুলোর অনেকেই এমএলএম কম্পানির মতো ব্যবসা করেছে। ঠিক পুরোপুরি না হলেও এমএলএমের কাছাকাছি ব্যবসা তারা করেছে। এখানে একজন ই-কমার্স প্রতিষ্ঠা করে এবং সে কয়েকজন এজেন্ট নিয়োগ দেয়। তারা আবার সাব-এজেন্ট নিয়োগ দেয়। এটা করে করে পিরামিডের মতো একটা কাঠামো দাঁড়িয়ে যায়। ওপরের দিকে কয়েকজন লোকের কাছেই প্রায় সব অর্থ চলে যায়। তারপর নিচের দিকে যারা সেলার বা এজেন্ট তারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

সুতরাং সার্বিক দিক থেকে আমরা দেশের ই-কমার্স খাতের নিয়ন্ত্রণের বিষয়টাকে হালকাভাবে নিয়েছি। আগেকার দিনে আমরা দেখেছি, কোনো পণ্যের অর্ডার করলে উৎপাদক বা বিক্রেতা প্রতিষ্ঠান ডাকযোগে পাঠাত। এতে জিনিস বুঝে পাওয়ার পর সঙ্গে সঙ্গেই টাকা পরিশোধ করা হতো। কিন্তু সাম্প্রতিককালে দেখা গেল, ইভ্যালি বা অন্য প্রতিষ্ঠানের কাছে মানুষ টাকা আগেই দিয়ে দিচ্ছে। তারপর তাদের কাছে জিম্মি হয়ে পড়ছে। এটাও সমস্যার কারণ হতো না, যদি নজরদারি ও নিয়ন্ত্রণ করার মেকানিজমটা থাকত।

এখানে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের দায় রয়েছে—কী করে একটা অনিয়ম এভাবে ছড়িয়ে পড়ল! বাংলাদেশ ব্যাংকেরও কিছু দায় আছে, যেহেতু অস্বাভাবিক লেনদেন হয়েছে। আবার ভোক্তা অধিকার আইন সম্পর্কিত অধিদপ্তর আছে, যারা গ্রাহকদের অধিকার বলবৎ করবে। তাদের আইনের ৪৫ ধারায় এমন একটা বিষয় আছে যে কেউ এ ধরনের প্রতারণা করলে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা অথবা এক বছরের কারাদণ্ড হবে। তারা বিষয়টি দেখল না। দেশে একটা প্রতিযোগিতা কমিশন আছে। তারা এখন বলছে যে তারা একটা মামলা দায়ের করেছিল। কিন্তু বেশি দূর এগোয়নি। প্রশ্ন হচ্ছে, আপনি যখন দেখলেন যে ৫০ হাজার টাকা দরের একটা ফ্রিজ ৩০ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে, তখনই তো ফেয়ারপ্রাইসের নিয়মে ব্যবস্থা নেওয়ার দরকার ছিল। ৫০০ টাকার একটা পেনড্রাইভ কিভাবে ১০ টাকায় বিক্রি হয়? এসব বিষয় তো প্রতিযোগিতা কমিশনের দেখা দরকার ছিল। তার মানে কোনো সংস্থাই সুষ্ঠুভাবে নজরদারি করেনি। এখন একেকজন নানা বক্তব্য দিচ্ছে। একটা বিষয় স্পষ্ট, আমাদের ই-কমার্সে নিয়ন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠান নেই বলা যাবে না। কিন্তু নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠায় দায় কেউই অনুভব করেনি।

এখন করণীয় হচ্ছে সমন্বিত উপায়ে ই-কমার্সের অনিয়ম দূর করা। যারা দোষী তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। সবাইকে নিয়ন্ত্রণের মধ্যে আনতে হবে। এ জন্য পৃথক রেগুলেটরি কমিশন করার কথা বলা হচ্ছে। আমার মনে হয় না এর কোনো প্রয়োজন আছে। এ ধরনের কমিশন করে লাভ নেই। দেশে বহু কমিশন আছে। তাতে খুব একটা কাজ হয় না এবং সরকারও খুব একটা গুরুত্ব দেয় না। বরং ই-কমার্স নিয়ন্ত্রণ ও নজরদারি করার জন্য যেসব আইন আছে তা ঠিকঠাকমতো প্রয়োগ করা দরকার। সংশ্লিষ্ট সব প্রতিষ্ঠান ঠিকঠাকমতো দায়িত্ব পালন করলেই কাজটা হয়ে যায়। মনে রাখা দরকার, দেশে ডিজিটাল লিটারেসি বা ইন্টারনেট সাক্ষরতা খুব কম। এমনিতে আমাদের সাক্ষরতার অভাব রয়েছে। এর মধ্যে তথ্য-প্রযুক্তির সাক্ষরতা খুব কম। এখানে কিভাবে কাজ হয়, কী করলে ডিজিটাল বিজনেস বা ই-কমার্সকে আরো টেকসই করা যায়, ভোক্তা হিসেবে কিভাবে প্রতারণা থেকে রক্ষা পাওয়া যায় তা ঠিকমতো না জানায় লোকজন বিপদে পড়ে যায়। তাই ডিজিটাল লিটারেসি বাড়ানোর দিকেও মনোযোগ দিতে হবে।

লেখক : সাবেক গভর্নর, বাংলাদেশ ব্যাংক এবং অধ্যাপক, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়
অনুলিখন : আফছার আহমেদ



সাতদিনের সেরা