kalerkantho

রবিবার । ১ কার্তিক ১৪২৮। ১৭ অক্টোবর ২০২১। ৯ রবিউল আউয়াল ১৪৪৩

বড় একটা আক্ষেপ রয়েই গেল: বুয়েট শিক্ষার্থী আবরারের মা

মাসুদ রানা   

৬ অক্টোবর, ২০২১ ০৯:১৭ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



বড় একটা আক্ষেপ রয়েই গেল: বুয়েট শিক্ষার্থী আবরারের মা

‘ছেলে হারানোর বেদনা কাউকে বোঝানো যাবে না। ছেলেটা এতটাই ভালো ছিল যে তাকে দেখে সবাই হিংসা করত। যখন দোকানে কিছু কিনতে যেতাম, তখন সে কম দামের জিনিস নিত। প্রয়োজনের বাইরে কোনো চাহিদা ছিল না। তবে মৃত্যুর আগে কোর্ট-প্যান্ট, জুতা চেয়েছিল—এটার জন্য ব্যাংকে টাকাও পাঠাতে বলেছিল। কিন্তু সেই ভাগ্য আর হয়নি। জীবনের বড় একটা আক্ষেপ রয়েই গেল, তার চাওয়া কোর্ট-প্যান্ট, জুতা  দিতে পারলাম না।’ স্মৃতি আওড়িয়ে মনোবেদনার কথাগুলো এভাবেই বলার চেষ্টা করলেন এক মা। তিনি ছেলে হারানো মা রোকেয়া খাতুন। এই কয়েক দিন কাঁদতে কাঁদতে তাঁর দুই চোখের জল শুকিয়েছে। কারণ তাঁর মেধাবী ছেলের মৃত্যুর দিনটা যে দরজায় কড়া নাড়ছে! বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদ হত্যার দুই বছর হলো আজ। ২০১৯ সালের এই দিনে ঘটেছিল মর্মন্তুদ এই ঘটনা।

ওই দিন বুয়েটের ছাত্রাবাসে তাঁকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছিল। এ ঘটনার প্রায় এক বছর পর ২৫ জনের বিরুদ্ধে বিচার শুরুর আদেশ দেন আদালত। অথচ সন্তান হত্যার বিচার পেতে নিজের চাকরিটাও ছাড়তে হয়েছে বাবা বরকত উল্লাহর। এদিকে মামলাটির বিচারকাজ শেষ পর্যায়ে থাকলেও এখনো তিন আসামি অধরা। তাঁরা হলেন মোর্শেদুজ্জামান জিসান, এহতেশামুল রাব্বি তানিম ও মোস্তবা রাফিদ। তাঁদেরও আইনের আওতায় নিয়ে আসার দাবি জানিয়েছেন আবরারের ছোট ভাই ফায়াজ। আদরের সন্তানকে হারিয়ে এখনো শোকাতুর আবরারের মা-বাবা।

স্মৃতিচারণা করতে গিয়ে আবরারের মা রোকেয়া খাতুন বলছিলেন, ‘সে খুব নাড়ু পছন্দ করত। সর্বশেষ যেদিন ঢাকায় যায়, সেদিনও তাকে নাড়ু বানিয়ে দিয়েছি। ফাহাদের পছন্দের কোনো খাবার এখন আর তৈরি করতে পারি না। মনে হয়, সে তো আর কোনো দিন আমার হাতের কিছু খাবে না। তখন কিছুই আর সহ্য হয় না।’

আবরারের বাবা বরকত উল্লাহ বলেন, ‘মামলার বিচার শুরুর পর এক বছর কোনো কাজ করতে পারিনি। একটি বেসরকারি চাকরি করতাম, সেটাও ছেড়ে দিতে হয়েছে। নিজের জমানো টাকা থেকে এখন সংসার চালাতে হচ্ছে। এখন তো ছেলেকে আর ফিরে পাব না। তবে ছেলে হত্যার বিচারের জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করে যাচ্ছি। প্রথমে যে গতিতে মামলার বিচারকাজ শুরু হয়েছিল, বর্তমানে সেটা আর নেই। তাই দ্রুত এ মামলার বিচারকাজ শেষ হোক সেই প্রত্যাশা করছি।’ 

আবরার ফাহাদের একমাত্র ছোট ভাই আবরার ফায়াজ বলেন, ‘ভাই চলার পথে আমার একমাত্র সঙ্গী ছিল। তার সঙ্গে আমার এতটাই সখ্য ছিল যে এখন তাকে ছাড়া কিছু করতে গেলেই সেটা করতে পারি না। যারা আমার ভাইকে নির্মমভাবে হত্যা করেছে, তাদের সবার ফাঁসি চাই।’

মামলার হালচাল : ২০১৯ সালের ৬ অক্টোবর রাতে বুয়েটের শেরেবাংলা হলের দ্বিতীয় তলার সিঁড়ি থেকে অচেতন অবস্থায় আবরার ফাহাদকে উদ্ধার করা হয়। পরে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন। এ ঘটনার পরদিন ৭ অক্টোবর চকবাজার থানায় আবরারের বাবা হত্যা মামলা করেন। তদন্ত শেষে ওই বছরের ১৩ নভেম্বর মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ডিবির পরিদর্শক ওয়াহিদুজ্জামান আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেন। অভিযোগপত্রে ২৫ আসামিকে অভিযুক্ত করা হয়। এরপর গত বছরের ১৫ সেপ্টেম্বর আদালত আসামিদের অব্যাহতির আবেদন খারিজ করে এ মামলার অভিযোগ গঠনের মাধ্যমে বিচারের আদেশ দেন। বিচার চলাকালীন বিভিন্ন সময়ে এ মামলায় মোট ৬০ জন সাক্ষীর মধ্যে ৪৬ জনের সাক্ষ্য গ্রহণ করা হয়। তবে ৮ সেপ্টেম্বর যুক্তিতর্ক উপস্থাপনের দিন আদালত ফের আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেন।

ঢাকার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল-১-এর বিচারক আবু জাফর মো. কামরুজ্জামানের আদালতে বর্তমানে মামলাটি যুক্তিতর্ক উপস্থাপন পর্যায়ে রয়েছে। গত ১৫ ও ১৬ সেপ্টেম্বর দুই দিনে মোট ৩৭ সাক্ষীর পক্ষে যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষ করেছে রাষ্ট্রপক্ষ। বাকি ৯ সাক্ষীর যুক্তিতর্ক উপস্থাপনের জন্য আগামী ২০ অক্টোবর দিন ধার্য রয়েছে।

ঢাকার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল-১-এর বিশেষ পাবলিক প্রসিকিউটর আবু আব্দুল্লাহ ভুইয়া বলেন, ‘করোনার কারণে আবরার হত্যা মামলার বিচারকাজ বিঘ্নিত হয়েছে। আগামী ২০ অক্টোবর যুক্তিতর্ক উপস্থাপনের জন্য দিন ধার্য আছে। দ্রুত এ মামলার বিচারকাজ শেষ করে আদালত রায় দেবেন বলে প্রত্যাশা করছি।’



সাতদিনের সেরা