kalerkantho

রবিবার । ৩০ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৮। ১৩ জুন ২০২১। ১ জিলকদ ১৪৪২

আজ থেকে আট দিনের লকডাউনে দেশ

কঠোর নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে জনসচেতনতায় জোর

নিজস্ব প্রতিবেদক   

১৪ এপ্রিল, ২০২১ ০২:৫৬ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



কঠোর নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে জনসচেতনতায় জোর

করোনার সংক্রমণের ঊর্ধ্বগতি রুখতে দেশজুড়ে আট দিনের ‘কঠোর বিধি-নিষেধ’ শুরু হচ্ছে আজ বুধবার থেকে। লকডাউনের আদলে এই বিধি-নিষেধে যেমন মানুষের চলাচল কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হবে, তেমনি জোর দেওয়া হবে স্বাস্থ্যবিধি মানাসহ জনসচেতনতা বাড়ানোর ওপর। মাঠ প্রশাসন ও র‌্যাব-পুলিশ ব্যাপক প্রস্তুতি নিয়ে মাঠে থাকছে। জরুরি পরিষেবার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরা ছাড়া অন্যদের অহেতুক বাড়ির বাইরে ঘোরাফেরা না করার জন্য প্রশাসনের পক্ষ থেকে অনুরোধ জানানো হয়েছে। জরুরি প্রয়োজনে বের হতে হলে অনলাইন থেকে পুলিশের ‘মুভমেন্ট পাস’ বা চলাচলের অনুমতি সংগ্রহ করতে হবে। বিধি-নিষেধ অমান্য করলে ব্যবস্থা নেবে প্রশাসন।

আজ থেকে ২১ এপ্রিল মধ্যরাত পর্যন্ত জরুরি সেবার প্রতিষ্ঠান ছাড়া সব সরকারি-বেসরকারি অফিস, শপিংমল বন্ধ থাকবে। তবে সকাল ১০টা থেকে ১টা পর্যন্ত ব্যাংকে লেনদেন করা যাবে। পুঁজিবাজারও খোলা থাকবে। চালু থাকবে শিল্প-কারখানাও। সব ধরনের পরিবহন (সড়ক, নৌ, রেল, অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক ফ্লাইট) বন্ধ থাকবে; তবে পণ্য পরিবহন, উৎপাদনব্যবস্থা ও জরুরি সেবার সঙ্গে যুক্ত পরিবহন চলাচল করতে পারবে।

‘কঠোর বিধি-নিষেধ’ বাস্তবায়নে আজ সকাল থেকেই মাঠে থাকছে পুলিশ ও র‌্যাব। স্বাস্থ্যবিধি মানা এবং জরুরি প্রয়োজন ছাড়া বাইরে বের হওয়া কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হবে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। এ জন্য এলাকাভিত্তিক টহল ও চেকপোস্ট বসানো হবে।

গতকাল মঙ্গলবার এক অনুষ্ঠানে পুলিশপ্রধান ড. বেনজীর আহমেদ বলেন, ‘আগামীকাল (আজ) থেকে আপনাদের ঘরের বাইরে দেখতে চাই না। জরুরি প্রয়োজনে ঘরের বাইরে গেলে মাস্ক পরতে হবে এবং বাইরে থেকে ঘরে ফিরে স্যানিটাইজার দিয়ে পরিষ্কার হবেন। আপনার মাধ্যমে যেন আপনার প্রিয়জন করোনায় সংক্রমিত না হয়, সেদিকে লক্ষ রাখতে হবে।’ তিনি বলেন, ‘যদি জরুরি প্রয়োজনে ঘরের বাইরে যেতে চান, তাহলে মুভমেন্ট পাস নিতে হবে।’  প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, সরকারি বিধি-নিষেধ বাস্তবায়নের জন্য মাঠে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা  হবে। পাশাপাশি মানুষকে সচেতন করার কার্যক্রমও সপ্তাহব্যাপী চলবে।

দেশে করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ের প্রথম দফায় গত ২৯ মার্চ ১৮ দফা নির্দেশনা জারি করা হয়। এরপর ৫ থেকে ১১ এপ্রিল পর্যন্ত আরো ১৩ দফা নির্দেশনা জারি করা হয়। নির্দেশনায় পুরোপুরি লকডাউন না দিয়ে অফিস-আদালত ও শিল্প-কলকারখানা খোলা রাখা হয়। বন্ধ রাখা হয় শপিং মল, দোকানপাট এবং গণপরিবহন। এসব নির্দেশনায় কার্যত কোনো সুফল আসেনি। যে কারণে স্বাস্থ্যবিধি মেনে গণপরিবহন ও শপিং মল খুলে দেয় সরকার। তবে সংক্রমণ ও মৃত্যু বেড়ে যাওয়ায় কভিডসংক্রান্ত কেন্দ্রীয় কারিগরি কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী আরো কঠোর লকডাউনে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। সে অনুযায়ী আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের ঘোষণা দিয়েছিলেন যে এবার সর্বাত্মক লকডাউনে যাবে সরকার। কিন্তু ব্যবসায়ীদের দাবির মুখে সর্বাত্মক লকডাউন বা সাধারণ ছুটি থেকে পিছিয়ে কঠোর বিধি-নিষেধের মধ্যেই থেকেছে সরকার। সরকারের এই সিদ্ধান্ত সংক্রমণ রোধে কতটা কার্যকর ভূমিকা রাখবে, সেই প্রশ্ন সামনে থাকছে। শিল্প-কলকারাখানা, ব্যাংক, খাবার দোকান খোলা থাকলে কিছু মানুষের চলাচল তো থাকবেই। এর মধ্যে পুলিশের পক্ষ থেকে আবার মুভমেন্ট পাস চালু হয়েছে। এই পাসের কারণে চলাচল কতটা নিয়ন্ত্রিত হবে, সেই প্রশ্নও থাকছে।

মিরপুরের ভাসানটেকের বাসিন্দা রফিকুল ইসলাম। কাজ করেন মতিঝিলের একটি রেস্তোরাঁয়। তাঁর মাথায় চিন্তা, এই লকডাউনের মধ্যে কিভাবে কর্মস্থলে যাবেন। তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘পরিবারের আরো দুজন মিরপুরে চাকরি করে। আমি সবার সঙ্গে থাকি। এখন লকডাউনের মধ্যে মতিঝিলে কিভাবে যাব?’ মুভমেন্ট পাসের কথা জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, ‘অনলাইন তো আমি বুঝি না। আল্লায় জানে, হাঁটা ছাড়া উপায় থাকব না।’

বেসরকারি একটি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা খালেদ সাইফুল্লাহ বলেন, ‘আমার জরুরি ওষুধ কেনার দরকার। কাছাকাছি দোকানো পাওয়া যাচ্ছে না। শ্যামলী থেকে শাহবাগ যেতে হবে। তখন আমি কী দিয়ে যাব? যদি গাড়ি নিয়ে যাই, তাহলে কী দিয়ে প্রমাণ করব আমার জরুরি ওষুধ দরকার? এসব কারণে অনেকে হয়তো প্রকৃত প্রয়োজন থাকতেও বাধাগ্রস্ত হবে। আবার অনেকে এসব অজুহাতে বাইরে বের হতে চাইবে।’

জানতে চাইলে পুলিশ সদর দপ্তরের সহকারী মহাপরিদর্শক (এআইজি, মিডিয়া) সোহেল রানা কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সরকার যেসব নির্দেশনা দিয়েছে এবং দেবে তার আলোকেই কাজ করবে পুলিশ।’

র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সরকারের নির্ধোরিত ১৩ দফা বাস্তবায়নে কাজ করবে র‌্যাব। পাশাপাশি মানবিক সহায়তার কাজও করবে। এই সময় কেউ যেন গুজব না ছড়াতে পারে, সে ব্যাপারে মনিটরিং হবে। বিভিন্ন পয়েন্টে র‌্যাব হাত ধোয়ার ব্যবস্থা করবে। ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে বাইরে মাস্ক পরার ব্যবস্থা করার পাশাপাশি সুরক্ষাসামগ্রীর ভেজালবিরোধী অভিযানও চলবে। এই বিধি-নিষেধের সময় রমজান থাকায় বাজারেও মনিটর করবে র‌্যাব।’

নওগাঁর ডিসি হারুন-অর-রশীদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘জনপ্রতিনিধি, রাজনৈতিক নেতা, বণিক সমিতি, পরিবহন সেক্টরসহ সব পর্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের সঙ্গে বৈঠক করে সরকারি নির্দেশনা কার্যকরের প্রস্তুতি নিয়েছি। জেলার সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে ইউনিয়ন পর্যন্ত যাতে মানুষ সচেতন থাকে, তার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। আশা করি, আমরা সফল হব।’

ময়মনসিংহের ফুলপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শীতেষ চন্দ্র সরকার বলেন, সরকারি বিধি-নিষেধ কার্যকর করতে ব্যাপক প্রচার চালিয়েছি। বিভিন্ন অংশীজনের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করেছি। জেলা প্রশাসন থেকেও অনেকে নির্দেশনা এসেছে। তিনি বলেন, আগামীকাল (আজ) মোবাইল কোর্ট পরিচালনার পাশাপাশি মানুষকে সচেতন করার কার্যক্রমও সপ্তাহব্যাপী চলতে থাকবে।

এদিকে কভিডকালে সচল কলকারখানায় স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণ হচ্ছে কি না তা বিশেষ নজরদারির মাধ্যমে নিশ্চিতে কাজ করবে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্ট কমিটি। এরই মধ্যে লকডাউনে স্বাস্থ্যবিধি মেনে কারখানা খোলা রাখতে শ্রম মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন কলকারখানায়  নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এসব কারখানাকে নজরদারিতে রাখবে শ্রম মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর (ডাইফি) ও শিল্প পুলিশ।

শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, গত সোমবারের সভায় মালিক প্রতিনিধিরা শ্রমিকদের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় নেওয়া পদক্ষেপগুলো তুলে ধরেন। অন্যদিকে শ্রমিক প্রতিনিধিরা গার্মেন্ট শ্রমিকদের কারখানায় আনা-নেওয়া, শিফটিং ডিউটি, শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখার বিষয়ে বিভিন্ন দাবিদাওয়া তুলে ধরেন।

জানতে চাইলে শ্রম প্রতিমন্ত্রী মন্নুজান সুফিয়ান কালের কণ্ঠকে বলেন, ডাইফি সারা দেশকে ২৩ অঞ্চলে ভাগ করে নজরদারি করবে। এর মধ্যে শ্রমঘন শিল্পাঞ্চল হিসেবে সাতটি অঞ্চলকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। এগুলো হলো ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর, ময়মনসিংহ ও নরসিংদী।

তিনি আরো বলেন, ‘আগামী ঈদ পর্যন্ত কঠোর নজরদারির মধ্যে রাখার জন্য বলা হয়েছে। কারখানার মালিকরা আমাদের নিশ্চিত করেছেন, শ্রমিকদের পরিবহনে কোনো সমস্যা হবে না। অধিকাংশ শ্রমিক কাছাকাছি দূরত্বে অবস্থান করেন।’

এদিকে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থেকে গতকাল জারি করা এক অফিস আদেশে মন্ত্রণালয়ের অধীন সব দপ্তর, সংস্থা ও প্রতিষ্ঠানের কর্মচারীদের ছুটি বাতিল করা হয়েছে। একই সঙ্গে এ মন্ত্রণালয়ের অধীন সব প্রতিষ্ঠান ‘লকডাউন’ চলাকালে খোলা থাকবে বলেও আদেশে জানানো হয়েছে।



সাতদিনের সেরা