ভারত থেকে বাংলাদেশে ঢোকার পথে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) গুলিতে দুই বাংলাদেশি মারাত্মকভাবে জখম হয়েছেন। আহত দুই বাংলাদেশিকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। এদিকে সম্ভাব্য পুশ ইন ঠেকাতে বাংলাদেশ সীমান্তে বিভিন্ন পয়েন্টে বিজিবি সর্বোচ্চ সতর্কাবস্থায় রয়েছে। আমাদের প্রতিনিধিদের পাঠানো প্রতিবেদন :
সাতক্ষীরা ও কালীগঞ্জ (সাতক্ষীরা) প্রতিনিধি জানান, ভারত থেকে বাংলাদেশে ঢোকার পথে বিএসএফের গুলিতে দুই বাংলাদেশি মারাত্মকভাবে জখম হয়েছেন। বুধবার ভোর ৩টায় সাতক্ষীরা সীমান্তে এই ঘটনা ঘটে। আহতরা হলেন সাতক্ষীরার কালীগঞ্জ উপজেলার শীতলপুরের মো. গোলাম রাব্বানীর ছেলে মো. মহিউদ্দীন গাজী (৪২) এবং মৃত ফজর আলী সরদারের ছেলে মো. শাহীন (২৮)। তাঁদের আশঙ্কাজনক অবস্থায় সাতক্ষীরা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। পুলিশ ও বিজিবির পক্ষ থেকে বিএসএফের গুলিতে দুজন আহত হওয়ার কথা নিশ্চিত করা হলেও হলেও কোন সীমান্ত এলাকায় ঘটনা ঘটেছে তা নিশ্চিত করা হয়নি। আহত মহিউদ্দীন গাজীর ছোট ভাই ইসরাত গাজী জানান, চার মাস আগে মহিউদ্দীন এবং এক বছর আগে শাহীন ভারতের তামিলনাড়ুতে যান। তাঁরা রাজমিস্ত্রির কাজ করতেন। কয়েক দিন আগে তাঁরা ফোনে জানিয়েছিলেন, দালালের মাধ্যমে তাঁরা দেশে ফিরবেন। বুধবার ভোরে একটি মাইক্রোবাসে তাঁদের নলতা হাসপাতাল এলাকায় রেখে যান অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিরা। খবর পেয়ে তাঁদের হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
আহত শাহীন জানান, তাঁরা দালালের মাধ্যমে ভারত থেকে বাড়ি ফিরছিলেন। দালালরা তাঁদের সীমান্তের পাটবাগানে নামিয়ে দিয়েছিল। এরপর তাঁরা গুলিবিদ্ধ হন। তাঁরা ধারণা করছেন, কালীগঞ্জ উপজেলার বসন্তপুর সীমান্ত এলাকায় এই ঘটনা ঘটে থাকতে পারে। কালীগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের জরুরি বিভাগের চিকিৎসক ডা. সুজায়েত হোসেন জানান, মহিউদ্দীনের ডান হাতে এবং শাহীনের পিঠে গুলি লেগেছে।
সাতক্ষীরা নীলডুমুর-১৭ বিজিবির অধিনায়ক লে. কর্নেল রাজীব শাহারিয়ার ও সাতক্ষীরা-৩৩ বিজিবির অধিনায়ক লে. কর্নেল আশিকুর রহমান চৌধুরী বিএসএফের গুলিতে দুজনের জখম হওয়ার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন। কালীগঞ্জ থানার ওসি জুয়েল হোসেন জানান, প্রাথমিকভাবে জানা গেছে, আহতরা অবৈধভাবে ভারতে গিয়েছিলেন এবং একইভাবে বাংলাদেশে ফেরার সময় বিএসএফ তাঁদের গুলি করে।
শূন্যরেখা থেকে ১০ জনকে সরিয়ে নিল বিএসএফ : যশোর অফিস ও বেনাপোল প্রতিনিধি জানান, যশোরের শার্শা উপজেলার বেনাপোল সাদিপুর সীমান্তে কয়েক দিন ধরে আলোচিত পুশ ইন চেষ্টার ঘটনার কিছুটা পরিবর্তন হয়েছে। দুই দিন ধরে শূন্যরেখায় অবস্থান করা নারী, পুরুষ, শিশুসহ ১০ জনকে বুধবার ভোররাতে সরিয়ে নিয়েছে বিএসএফ। বুধবার সকালে ড্রোনের মাধ্যমে নজরদারি চালিয়ে সীমান্ত এলাকায় তাদের আর কোনো উপস্থিতি শনাক্ত করতে পারেনি বিজিবি। সীমান্ত সূত্র জানায়, গত রবিবার গভীর রাতে ভারতের হরিদাসপুর সীমান্ত এলাকায় তিনটি ট্রাকে করে দেড় শতাধিক মানুষকে জড়ো করা হয়। পরে রাতের আঁধারে সীমান্তের কিছু অংশের আলো নিভিয়ে নারী, পুরুষ, শিশুসহ আনুমানিক ১৫ জনকে বাংলাদেশের দিকে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা চালানো হয়। তবে যশোর-৪৯ বিজিবি ব্যাটালিয়নের টহলরত সদস্যরা তাদের সীমান্ত অতিক্রম করতে বাধা দেন। ফলে তারা সীমান্তের শূন্যরেখায় অবস্থান নিতে বাধ্য হয়। এর পর থেকে কয়েক দিন ধরে ওই ব্যক্তিদের সীমান্তের ভারতীয় অংশে মানবেতর অবস্থায় থাকতে দেখা যায়। অবশেষে বুধবার ভোররাতে বিএসএফ তাদের শূন্যরেখা থেকে সরিয়ে নেয় বলে জানা গেছে।
পাঁচবিবি সীমান্তে পুশ ইন ঠেকাতে সতর্ক বিজিবি : জয়পুরহাট প্রতিনিধি জানান, জয়পুরহাটের পাঁচবিবি উপজেলার ঘোনাপাড়া সীমান্তে ৮-১০ দিন আগে বাঁশের বেড়া দেওয়ার চেষ্টা করে বিএসএফ। সে সময় কড়াভাবে বিজিবি বাধা দেওয়ার পর থেকে উত্তেজনা কিছুটা প্রশমিত হয়। তবে বিএসএফ ঘোনাপাড়া সীমান্তের ২৮১ নম্বর পিলারের ৪৭ ও ৪৮ নম্বর সাব-পিলারের কাছে শূন্যরেখা ঘেঁষে কাঁটাতারের বেড়া দেওয়ার কাজ শুরু করেছে—এমন খবর ছড়িয়ে পড়লেও সরেজমিনে এর কোনো সত্যতা মেলেনি। হাটখোলা বিওপি ক্যাম্প কমান্ডার আনিস আহমেদ বলেন, ‘পুশ ইন ও মাদকসহ অবৈধ কর্মকাণ্ড ঠেকাতে প্রতিটি বিওপিতে বিজিবি সদস্য দ্বিগুণ করা হয়েছে। টহল জোরদার করার পর কাঁটাতারের বেড়া দেওয়ার চেষ্টার কোনো ঘটনা ঘটেনি। বিজিবি সূত্রে জানা যায়, বুধবার সকালে পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে নিশ্চিত হওয়ার পর অতিরিক্ত মোতায়েন অনেকটা শিথিল করা হয়েছে। বর্তমানে সীমান্তে বিজিবির নিয়মিত টহল ও পর্যবেক্ষণ কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।
যশোর-৪৯ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম খান বলেন, ‘রবিবার রাত থেকে সাদিপুর সীমান্তে নজরদারি জোরদার করা হয়েছিল। আমাদের সদস্যরা পুশ ইনের চেষ্টা প্রতিহত করেছে। বর্তমানে সীমান্ত পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে এবং নিয়মিত টহল অব্যাহত আছে।’
স্থানীয় সূত্রগুলোর দাবি, সীমান্তের ভারতীয় অংশে এখনো শতাধিক মানুষ অবস্থান করছে। তাদের অনেকেই দীর্ঘদিন ধরে ভারতে বসবাসকারী এবং নাগরিকত্বসংক্রান্ত জটিলতায় পড়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ফলে ভবিষ্যতে নতুন করে পুশ ইনের চেষ্টা হতে পারে—এমন আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।



