সরকারি চাকরিজীবীদের বহু প্রতীক্ষিত নবম পে স্কেল বাস্তবায়ন সংক্রান্ত সুপারিশমালা এখনো চূড়ান্ত করতে পারেনি গঠিত উচ্চপর্যায়ের সচিব কমিটি। বুধবার (১৫ জুলাই) মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনির নেতৃত্বে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সম্মেলনকক্ষে এ সংক্রান্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক অনুষ্ঠিত হলেও সুপারিশমালা চূড়ান্ত করা সম্ভব হয়নি। জটিলতা কাটাতে আগামী সপ্তাহে সচিব কমিটির আবারও বৈঠকে বসার কথা রয়েছে।
অন্যদিকে, চলমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট ও ডলার সংকটের মাঝে এই নতুন ও উচ্চ হারের বেতন কাঠামো বাস্তবায়নে আইএমএফ (আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল) আপত্তি তুলেছে।
আইএমএফের উদ্বেগ ও অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক
গত ১২ জুলাই থেকে ঢাকা সফরে থাকা আইএমএফের একটি প্রতিনিধিদল অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সঙ্গে বৈঠক করেছে। বৈঠকে প্রতিনিধিদলটি চলমান আর্থিক সংকটের মধ্যে নতুন পে স্কেল বাস্তবায়নের তীব্র বিরোধিতা করে। সংস্থাটি মনে করে, সুনির্দিষ্ট আয়ের উৎস ঠিক না করে এই বেতন কাঠামো পুরোপুরি বাস্তবায়ন করতে গেলে দেশের অর্থনৈতিক সংকট আরো গভীর হবে। বিশেষ করে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের একাংশের ক্রয়ক্ষমতা হঠাৎ বেড়ে গেলে বাজারে মূল্যস্ফীতির চাপ সামলানো কঠিন হয়ে পড়বে।
বুধবারের বৈঠকে যা আলোচনা হলো
সূত্র জানায়, বুধবারের বৈঠকে পে স্কেল বাস্তবায়নের নানা প্রতিবন্ধকতা, সরকারের বর্তমান আর্থিক সক্ষমতা এবং বাস্তবায়নের বিভিন্ন ধাপ নিয়ে আলোচনা হয়েছে। পে কমিশনের প্রস্তাবিত ২০টি গ্রেডের বেতন কাঠামো নিয়েও আলোচনা হয়েছে। সেখানে গ্রেডের সংখ্যা কমিয়ে আনা বা সমন্বয়ের বিষয়েও একাধিক মতামত উঠে আসে।
মূল সুপারিশ অনুযায়ী:
- সর্বনিম্ন (২০তম) গ্রেডের বেতন: ৪৮ হাজার ৪০০ টাকা।
- সর্বোচ্চ (১ম) গ্রেডের বেতন: ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা (নির্ধারিত)।
বৈঠক শেষে অর্থ বিভাগের সচিব ড. খায়েরুজ্জামান মজুমদার সাংবাদিকদের বলেন, ‘কমিটি কত সময় নেবে বা কয়টি বৈঠক করবে, সেটা তাদের এখতিয়ার। তারা কাজ করছেন। সচিব কমিটির সুপারিশ হাতে পেলে আমরা পরবর্তী প্রশাসনিক পদক্ষেপ নেব। এর জন্য সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আরো কিছুটা সময় অপেক্ষা করতে হতে পারে।’
অর্থ বিভাগের একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে যে, পূর্ববর্তী অন্তর্বর্তী সরকারের সময় পে স্কেলের ঘোষণা এলেও বর্তমান বিএনপি সরকার তা বাস্তবায়নে বেশ আন্তরিক। সদ্য শুরু হওয়া ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা বাবদ ৮৯ হাজার ৮৩৬ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এ ছাড়া পেনশন ও গ্র্যাচুইটিসহ মোট বরাদ্দ দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৪১ হাজার ৪৩৪ কোটি টাকায়। নতুন পে স্কেলের আংশিক বাস্তবায়ন, এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের সুবিধা ও পেনশনভোগীদের সমন্বিত সুবিধা দেওয়ার লক্ষ্যেই মূলত অতিরিক্ত ৪৪ হাজার কোটি টাকার আর্থিক ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
২০২৫ সালে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় সাবেক অর্থসচিব জাকির আহমেদ খানের নেতৃত্বে গঠিত জাতীয় বেতন কমিশন সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন ১০০ থেকে ১৪২ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর সুপারিশ করে। তখন সর্বনিম্ন মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার এবং সর্বোচ্চ বেতন ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা করার প্রস্তাব দেওয়া হয়। তবে বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতা বিবেচনায় বর্তমান সরকার সেই সুপারিশ হুবহু গ্রহণ করছে না।
মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনির নেতৃত্বে গঠিত উচ্চপর্যায়ের কমিটি দেশের বর্তমান রাজস্ব আয়, মূল্যস্ফীতি, বাজেট ঘাটতি ও সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে নতুন একটি খসড়া প্রস্তুত করছে। সেই খসড়ার ভিত্তিতেই এগিয়ে চলছে গেজেট চূড়ান্তের কাজ।