প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে তোলা ছবি ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালায়ের উপসচিব পরিচয়ে ভিজিটিং কার্ড ছাপিয়ে প্রতারণা করা খুলনা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চাকরিচ্যুত চেইনম্যান মুজিবুর রহমানকে গ্রেপ্তার করেছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। গত বুধবার (১৫ জুলাই) বিকেলে রাজধানীর তোপখানা রোড এলাকা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।
ডিবির অতিরিক্ত উপপুলিশ কমিশনার মো. নুরে আলম কালের কণ্ঠকে এ তথ্য জানিয়েছেন।
প্রতারণার অভিযোগে দায়ের করা ১১টি মামলায় এরই মধ্যে তার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছেন আদালত। তদন্তে দুর্নীতি দমন কমিশন দুদক তার বিরুদ্ধে প্রতারণার সত্যতা পেয়েছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গ্রেপ্তারি পরোয়ানা মাথায় নিয়ে গ্রেপ্তার হওয়ার আগ পর্যন্ত তিনি মানুষের সঙ্গে প্রতারণা করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। সেই সঙ্গে হাতিয়ে নেন কোটি কোটি টাকা। অভিযোগ রয়েছে, আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর কতিপয় সদস্যকে ‘ম্যানেজ’ করে তিনি এমন প্রতারণা চালিয়ে যাচ্ছেন। গ্রেপ্তার এড়াতে তারা মুজিবুরকে সহযোগিতা করছেন।
অভিযোগ রয়েছে, পূর্বাচলে জায়গা বিক্রির কথা বলে মোস্তাফিজুর রহমান নামে এক ব্যবসায়ীর কাছ থেকে ৩ কোটি ৭ লাখ টাকা হাতিয়ে নেন মুজিবুর। শুধু তাই নয়, টাকা হাতিয়ে নেওয়ার পর ওই ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে স্ট্যাম্প ও সই জালিয়াতি করে উল্টো ৬ কোটি টাকার ‘মিথ্যা’ মামলা ঠুকে দেন।
পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন পিবিআইয়ের তদন্তে এরই মধ্যে তার মামলা মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছে। এর পরও আরো একটি মামলা করেন ওই ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে। সেটিও মিথ্যা প্রমাণিত হয়।
মোস্তাফিজুর রহমানের অভিযোগ, ‘পূর্বাচলে একটি প্লটের জন্য তিন কোটি ৭ লাখ টাকা দিয়ে জমি রেজিস্ট্রি না হওয়ায় এবং বারবার সময় দীর্ঘায়িত করায় তিনি চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। বিভিন্ন সময়ে তাকে হত্যার হুমকি দেওয়া হয়েছে। এর আগে এক সকালে তাকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে হত্যার চেষ্টা করা হয়। এ ঘটনায় রাজধানীর ধানমন্ডি থানায় সাধারণ ডায়ের (জিডি) করেন তিনি।
পিবিআই-এর এক কর্মকর্তা বলেন, ‘মজিবুর একজন অনেক বড় মাপের প্রতারক। তদন্তে প্রমাণ হয়েছে মজিবুর যেসব তথ্য দিয়ে মামলা করেন, তা সম্পূর্ণ মিথ্যা। তিনি অনেক মানুষের কাছ থেকে কোটি কোটি টাকা প্রতারণার মাধ্যমে হাতিয়ে নেন বলেও তদন্তে প্রমাণ হয়েছে।’
ওই ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, মজিবুর শুধু সাধারণ মানুষের সঙ্গেই প্রতারণা করেননি। তিনি পুলিশের অনেক সদস্যের সঙ্গেও প্রতারণা করেছেন। এমনকি পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধেও আদালতে মিথ্যা মামলা দিয়ে হয়রানি করেছেন। এমনকি পুলিশ সদর দপ্তরে তিনি ‘মিথ্যা তথ্য’ দিয়ে চিঠি লিখেছেন। তদন্তে তার প্রমাণ পাওয়া গেছে। এসব অভিযোগে এর আগে তাকে একাধিকবার গ্রেপ্তারও করা হয়। তবে ‘জামিন’ নিয়ে ফের তিনি একই কাজ করেন।
কারা সূত্র জানায়, এর আগে কারা কর্তৃপক্ষের সঙ্গেও তিনি প্রতারণা করেছেন। তার প্রতারণার শিকার হয়ে একজন শিক্ষক এখন পথের ফকির। এক মুরব্বির কাছ থেকে ৫ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। ওই মুরব্বি দাবি করেন, টাকা চাওয়ায় তাকে মিথ্যা কথা বলে চাঁদপুর থেকে ঢাকায় ডেকে এনে একটি নির্জন কক্ষে আটকিয়ে ব্যাপক নির্যাতন করে। এরপর অস্ত্রের মুখে হত্যার হুমকি দিয়ে তার কাছ থেকে টাকা না পাওয়ার স্বীকারোক্তি আদায় করেন। এ ছাড়া নির্যাতনের পর জোরপূর্বক স্টাম্পেও সই করিয়ে নেন। ওই ভুক্তভোগী এখন মামলা করে এর প্রতিকার চান। তার কাছ থেকে হাতিয়ে নেওয়া বিপুল অর্থও ফেরত চান।
পুলিশের তদন্তে মজিবুরের ব্যাংক লোনের পাশাপাশি বিপুল অর্থের মালিক হওয়ার তথ্যও পাওয়া যায়। তিনি সব সময় সত্যকে আড়াল করে গণমাধ্যম ও পুলিশকে মিথ্যা তথ্য দেন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মজিবুর রহমান বিভিন্ন সময়ে ভিন্ন পরিচয় ব্যবহার করেছেন। কখনো রাজউকের কর্মকর্তা, আবার কখনো স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের পার্সোনাল অফিসার। পূর্বে তিনি আওয়ামী লীগের প্রাথমিক সদস্য ছিলেন বলে দাবি করেন, এখন তিনি বিএনপিতে যোগ দিয়েছেন বলেও প্রচারণা চালান।
তার বিরুদ্ধে আরো অভিযোগ রয়েছে, তিনি কখনো স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উপসচিব, কখনো রাজউকের অথরাইজড অফিসার আবার কখনো গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের প্রকৌশলী হিসেবে পরিচয় দিয়ে মানুষের কাছ থেকে হাতিয়ে নিয়েছেন কোটি কোটি টাকা। অথচ খুলনা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চাকরিচ্যুত এই চেইনম্যান মজিবুর রহমান একজন চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী ছিলেন। প্রতারণার এই মাস্টারমাইন্ড মজিবুর এখন বিপুলপরিমাণ অবৈধ সম্পদের মালিক।
খুলনা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের তথ্য মতে, চেইনম্যান মুজিবুর রহমানকে ঘুস, দুর্নীতিসহ নানা অনিয়মের অভিযোগে ২০২০ সালের ১২ নভেম্বর বরখাস্ত করা হয়। এরপর শুরু হয় তার বহুমুখী পরিচয়ের বহুবিধ প্রতারণা। রাজউকের প্লট দেওয়ার নামে একাধিক মানুষের কাছ থেকে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগের পাশাপাশি পিবিআইয়ের তদন্তে তার জালিয়াতি অনেক অভিযোগ পেয়েছেন তারা।
রাজউকের প্লট দেওয়ার নামে মজিবুরের বিরুদ্ধে রয়েছে চেক জালিয়াতির অভিযোগও। তিনি এক ভুক্তভোগীকে সব টাকা পরিশোধে কয়েকটি চেক প্রদান করেন। কিন্তু চেকগুলো ব্যাংকে ডিজঅনার হয়। শুধু এই ব্যক্তি নয়, অনেকেরই সঙ্গেই মুজিবুর এমন প্রতারণা করেন বলে অভিযোগ পেয়েছেন ফ্ল্যাট ওনার অ্যাসোসিয়েশন।
মজিবুরের প্রতারণার শিকার বীর মুক্তিযোদ্ধা ও বিটিভির সাবেক পরিচালক শেখ আব্দুল সালেক বলেন, ‘প্রতারক মজিবুর বহু সহজ সরল মানুষকে তার প্রতারণার ফাঁদে ফেলেছেন। তার বিরুদ্ধে আদালতের এতগুলো ওয়ারেন্ট থাকার পরও তাকে গ্রেপ্তার করা হয় না। এত কিছুর পরও নতুন করে তার প্রতারণার বিভিন্ন প্রজেক্ট আমরা জানতে পেরেছি।’
ধানমন্ডি কনকর্ড নুসরাত অ্যাপার্টমেন্ট ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ লুৎফর রহমান বলেন, ‘মজিবুর তাদের ভবনের একটি ফ্লাটের মালিক, আমার ধারণা, সে প্রতারণার টাকায় এই ফ্লাট কিনেছে। আমরা তার গ্রেপ্তার ও শাস্তি চাই।’
একের পর এক প্রতারণা করার পরও কেন শাস্তির আওতায় আসছে না মুজিবুর, এমন প্রশ্ন অনেকের। বীর মুক্তিযোদ্ধা শেখ আব্দুল সালেক বলেন, “এক হলো প্রশাসন চোখ বুঝে থাকা, ‘অপরাধগুলো দেখেও আমি দেখলাম না’। এর চেয়ে বড় অন্যায় সব জেনেশুনেও তারা অ্যাকশনে না যাওয়া।”