দীর্ঘদিন ধরেই ভারতের প্রবীণ জনগোষ্ঠির অবসর ভাবনাটা ছিল গ্রামকেন্দ্রিক। ভালো কাজের সুযোগের আশায় গ্রাম ছেড়ে শহরে আসা মানুষের কর্মজীবনটা ব্যস্ত শহরেই কাটাতেন। কষ্ট করে সঞ্চয় করতেন। তারপর শেকড়ের টানে ফিরে যেতেন গ্রামে। শৈশবের স্মৃতি, চেনা পরিবেশ, আত্মীয়-স্বজন তাদের গ্রামে টেনে নিত।
তবে প্রবীণদের অবসর ভাবনাটা পাল্টে যাচ্ছে দ্রুতই। ভারতের বিপুলসংখ্যক প্রবীণ নাগরিক এখন আর নিছক বুড়ো হওয়ার জন্য এক মাথা গোঁজার ঠাঁই খুঁজছেন না। তারা জীবনের প্রতিটি ক্ষণ উদযাপন করতে চান। তারা এখন কমিউনিটি খুঁজছেন, নগরজীবনের সুবিধা তাদের জীবনের যে আয়েশ এনেছে, গ্রামে ফিরে সেটা হারাতে চান না।
হাতের কাছে স্বাস্থ্যসেবা, সামাজিক যোগাযোগ, ফিটনেস সুবিধা, নিরাপত্তা, স্বাচ্ছন্দ্য আর উদ্দেশ্যপূর্ণ জীবনযাপনই এখন তাদের অনেকের আকাঙ্ক্ষা। বৃদ্ধাশ্রমের প্রাচীন ধারণায়ও বদল এসেছে। কারো বোঝা হয়ে নয়, নিজের উপার্জিত অর্থে শেষ জীবনটা নিজের মতো করেই কাটাতে চান তারা। উন্নত চিকিৎসাব্যবস্থা, নিয়মিত জীবনযাপনে মানুষের গড় আয়ুও বেড়েছে, তাই বাড়ছে প্রবীণ জনগোষ্ঠির সংখ্যাও। ২০৩১ সালের মধ্যে ভারতের প্রবীণ জনসংখ্যা প্রায় ১৯ কোটি ৪০ লাখে পৌঁছাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এই ক্রমবর্ধমান প্রবীণ জনগোষ্ঠিই ভারতের আবাসন খাতে সৃষ্টি করেছে নতুন সম্ভাবনা।
২০২৫ সালে ভারতের প্রবীণ আবাসন বাজারের মূল্য ছিল ৩ দশমিক ৫৫ বিলিয়ন ডলার। ধারণা করা হচ্ছে, ২০২৬ সালে এই বাজার ৪ দশমিক ৪৭ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যাবে। ২০৩১ সালের মধ্যে এটি ১৪ দশমিক ১৪ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে।
ভারতের প্রবীণদের অবসর ভাবনায় এখনও দক্ষিণের শহরগুলোই এগিয়ে আছে। এক জরিপে দেখা গেছে, ভারতের পরিকল্পিত প্রবীণ আবাসনের ৬০ শতাংশই দক্ষিণ ভারতের শহরগুলোতে অবস্থিত। এর মধ্যে মনোরম আবহাওয়া, তুলনামূলকভাবে পরিচ্ছন্ন বাতাস, চমৎকার সব হাসপাতালের কারণে কোয়েম্বাটুর অনেকের পছন্দ। প্রযুক্তি খাতে কাজ করা প্রবীণদের প্রথম পছন্দ বেঙ্গালুরু। যারা নাগরিক সুবিধা ষোলআনা চান, কিন্তু নাগরিক ব্যস্ততা চান না; তাদের পছন্দ পুনে।
প্রবীণ আবাসন কেমন হওয়া উচিত, এই শহরগুলো তার একটা মানদণ্ড ঠিক করে দিয়েছে। আর এখান থেকে শিক্ষা নিয়ে প্রবীণদের আকৃষ্ট করতে নানা পরিকল্পনা নিয়ে এগিয়ে আসছে ভারতের অন্য শহরগুলোও।
ডেভেলপাররা এখন নতুন জায়গা খুঁজছেন। ভারতের সবচেয়ে বড় রিয়েল এস্টেট ডেভলপার ডিএলএফ গুরুগ্রামে প্রবীণদের জন্য একটি ডেডিকেটেড আবাসন প্রকল্পের পরিকল্পনার কথা জানিয়েছে। ৫ লাখ বর্গফুট এলাকাজুড়ে বিস্তৃত এই আবাসনে থাকবে সব ধরনের নাগরিক সুযোগ-সুবিধা, যাতে প্রবীণরা শহরে থেকেও নাগরিক কোলাহলের বাইরে নিরিবিলি জীবন কাটাতে পারেন। এই প্রকল্পে ২ হাজার কোটি রুপির অথনৈতিক সম্ভাবনার কথা বলা হচ্ছে।
ডিএলএফ-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান বাণিজ্যিক কর্মকর্তা আকাশ ওহরি মনে করেন, ভারত একটি ঐতিহাসিক ডেমোগ্রাফিক সময়ে প্রবেশ করছে। আধুনিক ভারতে প্রবীণদের অবসর ভাবনাটা তিনি অল্প কথায় ফুটিয়ে তুলেছেন চমৎকারভাবে, ‘আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী, ডিজিটালি সংযুক্ত এবং গভীরভাবে সক্রিয় প্রবীণরা এখন অবসর জীবনকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করছেন।’
তার মতে, আধুনিক অবসরপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা একাকীত্বের পরিবর্তে স্বাধীনতা, উদ্দেশ্য, সামাজিক যোগাযোগ এবং শহুরে জীবনযাত্রার নাগাল পেতে চান। তার যুক্তি হলো, ভবিষ্যৎ লুকিয়ে আছে পেশাদারভাবে পরিচালিত এমন সব কমিউনিটির মধ্যে—যা প্রবীণদের সুস্থতা, নিরাপত্তা, সামাজিক ব্যস্ততা ও সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করার পাশাপাশি সারা জীবন ধরে গড়ে তোলা শহর ও পরিচিত মহলের সাথে যুক্ত থাকতে সাহায্য করবে।
যাদের অবসর ভাবনায় আধ্যাত্মিকতা প্রাধান্য পায়, তাদের পছন্দ মন্দিরকেন্দ্রিক শহর। এখানে এগিয়ে আছে তিরুপতি। মানাসুম সিনিয়র লিভিং সম্প্রতি তিরুপতিতে ‘ময়ূরা’ নামে একটি প্রকল্পের ঘোষণা দিয়েছে, যা তিরুপতিতে প্রবীণদের জন্য প্রথম গেটেট কমিউনিটি। এই প্রকল্পে আরাম ও সামাজিক জীবনের পাশাপাশি প্রবীণদের আধ্যাত্মিক সন্তুষ্টির কথাও মাথায় রাখা হয়েছে।
গুজরাটও প্রবীণদের নজর কাড়ার জন্য নানান পরিকল্পনায় নিজেকে গড়ে তুলছে। আহমেদাবাদ, গান্ধীনগর, ভাদোদরা এবং সুরাটের মতো শহরগুলোতে বড় বড় আধুনিক সব হাসপাতাল আছে, যেটা প্রবীণদের আকৃষ্ট করার বড় নিয়ামক। তবে নিছক স্বাস্থ্যসেবা নয়; গুজরাটের অবকাঠামোভিত্তিক উন্নয়ন মডেল, ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ, রাস্তাঘাট, বিমানবন্দর, মেট্রো প্রকল্প পুরো রাজ্যে জীবনযাত্রার মান উন্নত করেছে।
গিফট সিটি হলো গুজরাটের সবরচেয়ে বড় আকর্ষণের নাম। গিফট সিটি নামে পরিচিত গুজরাট ইন্টারন্যাশনাল ফাইন্যান্স টেক সিটি গুজরাটের গান্ধীনগর এবং আহমেদাবাদের মধ্যবর্তী সবরমতি নদীর তীরে অবস্থিত দেশের প্রথম পরিকল্পিত 'স্মার্ট সিটি' এবং আন্তর্জাতিক আর্থিক পরিষেবা কেন্দ্র। ভৌগোলিকভাবে ভারতের ভেতরে হলেও, গিফট সিটির আন্তর্জাতিক জোনে বিদেশি মুদ্রায় লেনদেন ও ব্যবসা করার সুবিধা রয়েছে। এখানে বিশ্বের বড় বড় ব্যাংক, বিমা কোম্পানি, স্টক এক্সচেঞ্জ এবং ফান্ড ম্যানেজমেন্ট প্রতিষ্ঠানের শাখা রয়েছে, রয়েছে বিশেষ কর সুবিধাও। মূলত দুবাই, সিঙ্গাপুরের সাথে প্রতিযোগিতার জন্যই গড়ে তোলা হয়েছে গিফট সিটি। যারা মানসম্মত অবসর জীবনযাপনের পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদী বিনিয়োগের পকিল্পনা করছেন, তাদের জন্য প্রথম পছন্দ হতে পারে গিফট সিটি।
হিমালয়ের পাদদেশে অবস্থিত দেরাদুন ঐতিহাসিকভাবে অনেকের অবসরের স্বপ্ন। যারা আধুনিক নগরজীবনের দ্রুতগতি এড়িয়ে হেলেদুলে শেষ জীবনটা কাটাতে চান তাদের প্রথম পছন্দ দেরাদুন। দিল্লি-দেরাদুন এক্সপ্রেসওয়ে নির্মিত দূরে থেকেও কাছে থাকার সুবিধা অনুভূতি পাবেন এখানকার বাসিন্দারা।
বড় শহরগুলোর তুলনায় পরিচ্ছন্ন বাতাস, নাতিশীতোষ্ণ জলবায়ু এবং উল্লেখযোগ্যভাবে কম দূষণের মাত্রা উত্তর ভারতের পাহাড়ি শহর কাসৌলিকেও অনেকের অবসরযাপনের গন্তব্য করে তুলেছে। চমৎকার যোগাযোগ ব্যবস্থা কাসৌলিকে এগিয়ে রাখবে। এখানে থাকলে প্রয়োজনে চণ্ডীগড়, মোহালি, পাঞ্চকুলা এবং সোলানের উন্নত স্বাস্থ্যসেবা সুবিধাও হাতের নাগালে থাকবে। সুস্থতা, কানেক্টিভিটি আর প্রশান্তি- একসাথে চাইলে কাসৌলিকে ভাবনার বাইরে রাখা মুশকিল।
শুরুতে যেমনটা বলা হয়েছে, প্রবীণ নাগরিকদের অবসর ভাবনায় দারুণ পরিবর্তন এসেছে। ভারতের প্রবীণ নাগরিকরা আগের প্রজন্মের তুলনায় অনেক বেশি স্বাস্থ্যবান, সামর্থ্যবান এবং স্বাবলম্বী। তারা দীর্ঘায়ু হচ্ছেন এবং অবসর জীবন থেকে তাদের প্রত্যাশাও বেশি। তারা হাসপাতালের সুবিধা যেমন চান, তেমনি যোগব্যায়ামের কেন্দ্রও চান। তারা নিরাপত্তা চান, আবার একই সাথে সামাজিক জীবনও চান। তারা স্বাচ্ছন্দ্য চান, কিন্তু একাকীত্ব বা বিচ্ছিন্নতা চান না। তাদের কাছে অবসর মানে জীবনের শেষ নয়। অনেকের কাছে অবসর এখন জীবনের নতুন অধ্যায়ের সূচনা মাত্র।




