• ই-পেপার

অবসরে জীবনের শেষ নয়, নতুন শুরু

সন্তান জন্মের পর বাবার জীবনেও আসতে পারে বিষণ্নতার ঝড়

সঞ্জয় দে
সন্তান জন্মের পর বাবার জীবনেও আসতে পারে বিষণ্নতার ঝড়
সংগৃহীত ছবি

একজন নারীর মা হয়ে ওঠার পরের অধ্যায়টি একদিকে যেমন আনন্দের, তেমনি বহু চ্যালেঞ্জে ভরপুর। এসব নিয়ে গবেষণা, আলোচনা, তর্ক-বিতর্কের শেষ নেই। তবে যে পুরুষ বাবা হয়ে ওঠেন, তার জীবনেও আছে রূপান্তরের চ্যালেঞ্জ। বিষয়টি নিয়ে আলোচনা যেমন নেই, তেমনি আছে সচেতনতার অভাব। কারণ ধরেই নেওয়া হয় পুরুষ মানেই শুধু আধিপত্যের গল্প। সংকট, দুর্বলতা অথবা চ্যালেঞ্জের কোনো জায়গা নেই একজন পুরুষের জীবনে। 

তবে আধুনিক সময়ের গবেষণা বলছে, পুরুষের জন্যও পিতৃত্ব সহজ কিছু নয়। সন্তানের জন্ম শুধু নারীকে বদলে দেয় না, পুরুষের জীবনেও গভীর জৈবিক, মানসিক ও সামাজিক পরিবর্তন নিয়ে আসে। দুই দশকের বেশ কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, বাবা হওয়ার পর পুরুষের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য, এমনকি সামাজিক ভূমিকাতেও বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটতে পারে।

সন্তান প্রসবের পর অনেক নারীর পোস্টপার্টাম ডিপ্রেশন বা প্রসব-পরবর্তী বিষণ্নতায় আক্রান্ত হওয়ার বিষয়টি অনেকেরই জানা। এই বিষণ্নতা কখনো কখনো গুরুতর মানসিক স্বাস্থ্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। দীর্ঘদিনের বিষণ্নতা, উদ্বেগ, ক্লান্তি ও আবেগগত অস্থিরতায় ভুগে আত্মহনন কিংবা সন্তানকে হত্যার মতো ঘটনাও বিরল নয়। 

সাম্প্রতিক বেশ কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, মায়ের পাশাপাশি বাবারাও সন্তানের জন্ম-পরবর্তী বিষণ্নতা বা প্যাটার্নাল পোস্টপার্টাম ডিপ্রেশনে ভুগতে পারেন। শুধু তা-ই নয়, বিষণ্নতায় আক্রান্ত হওয়ার সংখ্যাও চমকে ওঠার মতো। আবার বিষয়টি নিয়ে পারিবারিক ও সামাজিক সচেতনতা প্রায় শূন্যের কোটায় থাকায় পিতৃত্বের জগতে পা রাখা পুরুষের জীবনে বড় ধরনের জটিলতা দেখা দিতে পারে।

গবেষণায় দেখা গেছে, বাবারা এমন এক সময়ে গিয়ে পোস্টপার্টাম ডিপ্রেশনে আক্রান্ত হন, যখন মায়েরা সন্তান জন্মদানের প্রাথমিক ধকলের পর্ব পার করে ফেলেছেন। ফলে তখন বাবাদের বিষণ্ন জীবন শুরু হলেও বিষয়টিকে সন্তানের জন্মের সঙ্গে সম্পর্কিত হিসেবে অনেকে ভাবতে পারেন না। এতে ধীরে ধীরে জটিল হতে পারে বাবাদের মানসিক সমস্যা। 

আমেরিকান মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের জেএএমএ নেটওয়ার্ক জার্নালে চলতি বছরের মার্চে প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা যায়, বাবাদের বিষণ্নতা ও স্ট্রেসজনিত রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি অপ্রত্যাশিত একটি সময়ে বাড়তে থাকে। সন্তান জন্মের পর প্রথম বছরের শেষভাগে ৩০ শতাংশ বাবার ক্ষেত্রে এ ধরনের রোগে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। 

বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, সারা বিশ্বে ২৯ থেকে ৪০ শতাংশ মা পোস্টপার্টাম ডিপ্রেশনে ভোগেন। বাংলাদেশে এই হার প্রায় ৩৯.১ শতাংশ বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। সেদিক থেকে বৈশ্বিক বিভিন্ন গবেষণায় বাবাদের মধ্যে এই জটিলতায় আক্রান্তের হার ৩০ শতাংশ হওয়ার বিষয়টিও বেশ উদ্বেগজনক।   

গবেষকেরা ২০০৩ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে সুইডেনে জন্ম নেওয়া ১০ লাখেরও বেশি শিশুর বাবাদের তথ্য পর্যালোচনা করে রীতিমতো বিস্মিত হয়েছেন। দেখা গেছে, সন্তান মায়ের গর্ভে থাকার সময় এবং জন্মের পর প্রথম কয়েক মাসে বাবাদের মধ্যে বিষণ্নতা রোগের লক্ষণ প্রকাশ হওয়ার মাত্রা বেশ কম। তবে সন্তান জন্মের এক বছর পর অনেকের ক্ষেত্রে জটিলতা স্পষ্ট হতে শুরু করে। এ কারণে রোগটির সঙ্গে সন্তান জন্মের যোগসূত্র অনেকে ধরতে পারেন না। আর তাই বাবারা থাকেন সবার মনোযোগ, যত্ন ও সহমর্মিতার বাইরে।     

বিষয়টি নিয়ে নিউইয়র্কের নর্থওয়েল হেলথের সমন্বিত পরিচর্যা কর্মসূচির মেডিক্যাল ডিরেক্টর ডা. খাতিয়া মুন বেশ উদ্বিগ্ন। তিনি বলছিলেন, ‘নতুন সন্তানের আগমন মা-বাবা দুজনের জীবনেই ব্যাপক পরিবর্তন ও চাপ নিয়ে আসে। এ ক্ষেত্রে মায়ের স্বাস্থ্য কিছুটা গুরুত্ব পেলেও বাবার মানসিক স্বাস্থ্যের দিকটি সাধারণত সবার নজরের বাইরে থেকে যায়।’

তিনি বলেন, ‘বাবাদের মানসিক স্বাস্থ্যসংক্রান্ত সমস্যার জন্য পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা খুব গুরুত্বপূর্ণ। তবে বাস্তবে তেমনটি খুব দেখা যায় না। আমরা আরো বেশি পরীক্ষা চালাতে পারলে হয়তো সংগ্রামরত বাবাদের শনাক্ত করে সহায়তা দিতে পারতাম।’

ডা. মুন মনে করছেন, সন্তান জন্মের পর সাধারণত নতুন মা ও শিশু সবার মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকেন। এতে করে পুরুষের মানসিক স্বাস্থ্যসংক্রান্ত সমস্যা নজর এড়িয়ে যাওয়া ঝুঁকিতে পড়ে। তিনি বলেন, ‘গর্ভধারণ করা মা ও নবজাতকের দুর্বল অবস্থার প্রেক্ষাপটে বাবারা অনেক সময় বেশি চাপের মধ্যে পড়েন। সহায়তাকারীর ভূমিকা নিতে গিয়ে তাদের ওপর ধীরে ধীরে মানসিক চাপ তৈরি হয়। দীর্ঘ সময় ধরে এই ভূমিকা পালন করারও কঠিন হয়ে ওঠে।’

গবেষণা নিবন্ধটির প্রধান লেখক ডংহাও লু মনে করেন, সন্তান জন্মের পর মায়ের পাশাপাশি বাবার শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের যত্নের দিকেও মনোযোগ দেওয়া প্রয়োজন। গবেষণার ফল তুলে ধরে তিনি বলছেন, ‘বাবাদের ক্ষেত্রে বিষণ্নতায় আক্রান্ত হওয়ার চিত্রটি খানিকটা পরে দেখা যায়। এ জন্য সন্তান জন্মের অনেক পরেও বাবাদের মানসিক স্বাস্থ্যের অবনতির সংকেতগুলোর দিকে সতর্ক নজর দেওয়া প্রয়োজন।’

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সন্তানের জন্মের সঙ্গে সঙ্গে বেশির ভাগ পুরুষের মধ্যে দায়িত্ববোধের বোঝা চেপে বসে। সেই সঙ্গে সন্তানের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ, আর্থিক ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তা, পরিবারকে সুরক্ষা দেওয়ার চাপ, এমনকি নিজের ক্যারিয়ার ও পরিবারের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা নিয়ে উদ্বেগও বাড়তে পারে। আবার বিভিন্ন গবেষণায় শিশুর জন্মের পর প্রথম কয়েক মাস থেকে এক বছর পর্যন্ত অনেক বাবার ঘুমের মান ও ঘুমের সময়—দুই ক্ষেত্রেই সমস্যার মুখোমুখি হওয়ার প্রমাণ পাওয়া গেছে। এর ফলে ক্লান্তি, মনোযোগে ঘাটতি, ও কর্মক্ষমতায় ছেদ ঘটতে পারে। এর সবই শেষপর্যন্ত প্রভাব ফেলে মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর। 

শিকাগোর ইউনিভার্সিটি অব ইলিনয়ের এক গবেষণাতেও বাবাদের পোস্টপার্টাম ডিপ্রেশনকে গুরুত্ব দেয়ার তাগিদ দেয়া হয়েছে। ২০২৩ সালে প্রকাশিত গবেষণা নিবন্ধে বলা হয়, বাবার বিষণ্নতা শনাক্ত ও চিকিৎসা করা গোটা পরিবারের জন্যই জরুরি। এর ফলে তার সঙ্গী ও সন্তানের সঙ্গেও সম্পর্কের উন্নতি ঘটে এবং সামগ্রিকভাবে পরিবারের মানসিক স্বাস্থ্য ভালো হতে পারে।

এই গবেষণায় অংশগ্রহণকারী ২৪ জনের মধ্যে ৩০ শতাংশের ক্ষেত্রেই সন্তান জন্মের ১ থেকে ১৫ মাসের মধ্যে বিষণ্নতার লক্ষণ শনাক্ত করেছেন গবেষকেরা। অংশগ্রহণকারীদের গড় বয়স ছিল ৩১ বছর। তারা সবাই ২০২০ সালে স্ত্রী ও নবজাতকের স্বাস্থসেবার জন্য শিকাগোর ইউআই হেলথ টু-জেনারেশন ক্লিনিকে গিয়েছিলেন। ইউনিভার্সিটি অব ইলিনয়ের গবেষকেরা এ সময় দেখতে পান, এই বাবারা মা এবং সন্তানের স্বাস্থ্যসেবার ব্যাপারে বেশ যত্নশীল, কিন্তু তারা নিজেদের স্বাস্থ্যের প্রতি অবহেলা করছেন। গবেষণায় অংশগ্রহণকারীরা স্বীকার করেছেন, তারা নিজেদের খারাপ অনুভূতি প্রকাশের ক্ষেত্রে দ্বিধা বোধ করেন। কারণ তাদের আশংকা, এগুলো প্রকাশ করলে সন্তানের মায়ের ওপর আরও মানসিক চাপ তৈরি হতে পারে। 

কিছু গবেষণায় দেখা যায়, পোস্টপার্টাম ডিপ্রেশন সাধারণভাবে প্রায় ৮ থেকে ১৩ শতাংশ বাবাকে আক্রান্ত করে। তবে সন্তানের মাও এই রোগে আক্রান্ত হলে বাবাদের মধ্যে আক্রান্তের হার ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে। অর্থাৎ নবজাতক ও মায়ের সেবাযত্নের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত বাবারাই পরে বিষণ্নতা রোগে আক্রান্ত হওয়ার বেশি ঝুঁকিতে থাকেন। 

ডা. মুন বলছেন, বাবা হওয়ার বাস্তবতার সঙ্গে মানিয়ে নিতে পুরুষকেও প্রচণ্ড সংগ্রাম করতে হয়। তাই মায়ের পাশাপাশি বাবাদের প্রতিও সমাজ ও পরিবারের সহমর্মী হওয়া উচিত। পুরুষ দৃশ্যত শক্তিধর হলেও তারও মানসিক সহায়তার প্রয়োজন রয়েছে। তারা সহায়তা না পেলে শেষপর্যন্ত পরিবারের অন্যকে সাহায্য করার ভূমিকাও ঠিকমতো পালন করতে পারে না।

বাবাদের মানসিক স্বাস্থ্যসংক্রান্ত যেকোনো উদ্বেগ বা উপসর্গের প্রতি মনোযোগ বাড়ানোর পরামর্শ দিচ্ছেন ডা. মুন। পুরুষের সংকটের বিশেষ আরেকটি দিক তুলে ধরে তিনি বলছেন, ‘গর্ভবতী অথবা নতুন মা অনেক বেশি চিকিৎসাসেবা, লোকজনের সঙ্গে দেখা-সাক্ষাৎ ও সামাজিক যোগাযোগের সুযোগ পান। বাবাদের ক্ষেত্রে এটি ঘটে না। কারণ পুরুষ এসব বিষয় নিয়ে নিজেদের পরিসরে তেমন আলোচনা করে না। এগুলো নিয়ে অন্য পুরুষের সঙ্গে সংযোগ গড়ে তোলার প্রবণতাও তার কম।’ 

আর তাই নতুন সন্তানের জনকদেরও নিজস্ব নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার পরামর্শ দিচ্ছেন ডা. মুন। এই নেটওয়ার্কের সদস্যরা একদিকে যেমন নিজেদের পিতৃত্বের অভিজ্ঞতা ভাগাভাগি করবেন, তেমনি যেকোনো মানসিক সংকট বা জটিলতায় পরস্পরের দিকে বাড়িয়ে দেবেন সহযোগিতার হাত।

ফিফা বিশ্বকাপ

জার্মানির সমর্থনে সোয়ান গ্রুপের চেয়ারম্যান খাবির উদ্দিন খানের র‍্যালি

অনলাইন ডেস্ক
জার্মানির সমর্থনে সোয়ান গ্রুপের চেয়ারম্যান খাবির উদ্দিন খানের র‍্যালি

ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬-এর উৎসবমুখর আবহে জার্মান জাতীয় ফুটবল দলের প্রতি সমর্থন জানিয়ে রাজধানী ঢাকায় এক বর্ণাঢ্য র‍্যালির আয়োজন করেন সোয়ান গ্রুপের চেয়ারম্যান খাবির উদ্দিন খান। দীর্ঘদিন ধরে জার্মান ফুটবলের একজন নিবেদিতপ্রাণ সমর্থক হিসেবে তিনি এবারও জার্মানিকে বিশ্বকাপের অন্যতম শিরোপা প্রত্যাশী দল হিসেবে দেখছেন।

র‍্যালিতে অংশ নেয় জার্মানির জাতীয় পতাকা ও বিশ্বকাপের ফিক্সচার সংবলিত বিশেষভাবে ব্র্যান্ডিংকৃত একাধিক পিকআপ ভ্যান। পুরো র‍্যালিজুড়ে পথচারী ও ফুটবলপ্রেমীদের মধ্যে হাজার হাজার জার্মান পতাকা ও জার্সি বিতরণ করা হয়, যা রাজধানীব্যাপী বিশ্বকাপের উচ্ছ্বাসকে আরো প্রাণবন্ত করে তোলে।

র‍্যালিটি রাজধানীর ইস্কাটন থেকে শুরু হয়ে মগবাজার, বিচারপতি ভবন, ফকিরাপুল, মতিঝিল, টিকাটুলি, মধুমিতা সিনেমা হল, আরামবাগ, শাহজাহানপুর, রমনা, হাতিরঝিল, সোনারগাঁও, ফার্মগেট, জাতীয় সংসদ ভবন, ধানমন্ডি ও কলাবাগান প্রদক্ষিণ করে শাহবাগে এসে শেষ হয়।

এ উপলক্ষে খাবির উদ্দিন খান বলেন, ‘ফুটবল এমন একটি খেলা, যা মানুষকে ভৌগোলিক ও সাংস্কৃতিক সীমারেখার ঊর্ধ্বে নিয়ে গিয়ে একসূত্রে গাঁথে। জার্মানি সবসময় শৃঙ্খলা, দলগত চেতনা এবং লড়াকু মানসিকতার প্রতীক। এই মূল্যবোধগুলো আমাকে অনুপ্রাণিত করে। বিশ্বকাপের এই আনন্দ সবার সঙ্গে ভাগাভাগি করতেই আমাদের এই আয়োজন।’

সোয়ান গ্রুপ বিশ্বাস করে, খেলাধুলা সমাজে ইতিবাচকতা, সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতির বার্তা ছড়িয়ে দেয়। সেই বিশ্বাস থেকেই বিশ্বকাপের এই বৈশ্বিক উৎসব উদযাপন এবং ফুটবলপ্রেমীদের আনন্দে শামিল হওয়ার লক্ষ্যে এই বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে।

খাবির উদ্দিন খান আশা প্রকাশ করেন যে, এ ধরনের আয়োজন বিশ্বকাপকে ঘিরে দেশের ফুটবলপ্রেমীদের মধ্যে আরও উৎসাহ ও সম্প্রীতির পরিবেশ সৃষ্টি করবে এবং খেলাধুলার প্রতি নতুন প্রজন্মকে আরও বেশি অনুপ্রাণিত করবে।

ছাদে ছাদে হাসুক সোলার প্যানেল

কালের কণ্ঠ ডেস্ক
ছাদে ছাদে হাসুক সোলার প্যানেল

বছর ১৫ আগে কিশোরগঞ্জের হাওর ভ্রমণের অভিজ্ঞতা শেয়ার করেছিলেন একজন। ভেবেছিলেন, দুর্গম হাওরে আর যাই হোক আলোর দেখা পাবেন না। কিন্তু সন্ধ্যা হতেই চমকে গেলেন তিনি। ঘরে বাতি জ্বলছে, তবে টিমটিম করে। খোঁজ নিয়ে জানলেন, এই আলোর উৎস সৌরবিদ্যুৎ। সূর্য যেমন দিনে আমাদের আলো দেয়, চাইলে দিনের আলোকে বিদ্যুতে বদলে রাতেও তা ব্যবহার করা সম্ভব।

কিন্তু সেই অপার সম্ভাবনা এতদিন বাংলাদেশে ’সম্ভবনা’তেই আটকে ছিল। নবায়ণযোগ্য জ্বালানী এখনো টিমটিম করেই জ্বলছে। এত দিনেও সৌর বিদ্যুতের সম্ভাবনা আটকে আছে আমলাদের ফাইল, রাজনীতিবিদদের কথার ফুলঝুরি আর সেমিনার-সিম্পোজিয়ামের কথামালায়।

এবারই প্রথম কথার ফুলঝুড়িকে আলোর ফুলে বদলে দেওয়ার সুযোগ এসেছে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য প্রস্তাবিত বাজেটে নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতের শুল্কে বৈপ্লবিক পরিবর্তনের প্রস্তাব করা হয়েছে। তাতেই বদলে যেতে পারে বাংলাদেশের জ্বালানি খাতের চিত্র।

ছোট্ট বাংলাদেশে গাদাগদি করে ১৮ কোটি মানুষ বাস করে। আর আধুনিক জীবনের পুরোটাই বিদ্যুৎনির্ভর। বিদ্যুৎ ছাড়া জমিতে সেচ থেকে শুরু করে শিল্পে উৎপাদন, ঘরে ঘরে আলো, স্মার্ট ডিভাইসের ব্যবহার—কিছুই সম্ভব না। ১৮ কোটি মানুষের বিদ্যুতের চাহিদা মেটাতে হিমশিম খেতে হয় যেকোনো সরকারকে। বিপুল ভর্তুকি দিয়েও চাহিদা মেটানো যায় না। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধে জ্বালানি তেলের সরবরাহে চরম সংকট সৃষ্টির পর জ্বালানী রূপান্তরের প্রয়োজনটা সবাই হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছেন। বাড়তি দাম দিয়েও সময়মতো জ্বালানি পাওয়ার নিশ্চয়তা নেই। বাংলাদেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন হয় মূলত চড়া দামের তেল আর গ্যাসে। অথচ বিনা মূল্যের জ্বালানী উৎস সূর্য সারা বছর আমাদের আলো দিতে পারে। সৌর বিদ্যুৎ উৎপাদন খরচ চার ভাগের একভাবে নামিয়ে আনতে পারে। প্রাথমিক স্থাপনার চড়া মূল্যের কারণে এতদিন সৌর বিদ্যুতে মানুষের আগ্রহ কম ছিল। এবার সরকার নজর দিয়েছে সেই দিকেই।

সূর্যের আলো থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারলে কতটা লাভ, সেটার প্রমাণ পেতে খুব বেশি দূর যেতে হবে না। পাকিস্তান আর ভিয়েতনামের দিকে তাকালেই হবে। তাও এই দুই দেশে বিপ্লবটা হয়েছে বেশি দিন আগে নয়। ২০২২ সালে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর জ্বালানী তেলের দাম বেড়ে গেলে অন্য অনেক দেশের মত পাকিস্তানও বিপাকে পড়ে যায়। পাকিস্তান সরকার সোলার আমদানির শুল্ক শূন্য করে দেয়। ফলও পেয়েছে হাতে হাতে। ২০২০ সালে জ্বালানি খাতে সোলারের অংশ ছিল ২ দশমিক ৯ ভাগ, ২০২৫ সালে তা বেড়ে দাড়িয়েছে ৩২ দশমিক ৩ ভাগে। বর্তমানে প্রতি চারটি পাকিস্তানি পরিবারের মধ্যে একটি কোনো না কোনোভাবে সোলার ব্যবহার করছে। এই ছোট উদ্যোগ তাদের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ কমিয়েছে দারুণভাবে।

ভিয়েতনাম থেকেও শিক্ষা নেওয়ার সুযোগ আছে। ২০১৮ সালেও ভিয়েতনামে বিদ্যুতে সোলারের অবদান ছিল কার্যত শূন্য। ২০২৫ সালের শেষ নাগাদ তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৯ হাজার মেগাওয়াটে।

এবার বাংলাদেশের পালা। প্রস্তাবিত বাজেটে সোলার প্যানেল, ইনভার্টার, লিথিয়াম ব্যাটারি, ডিসি ক্যাবল এবং মাউন্টিং স্ট্রাকচারের ওপর থেকে আমদানি শুল্ক প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়েছে। আগে যা ছিল ২০ শতাংশ। সোলারের অন্যান্য যন্ত্রাংশের ওপর থেকেও কাস্টমস ও নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক কমিয়ে শূন্য করা হয়েছে। ব্যাটারি স্টোরেজের শুল্ক ৬১ দশমিক ৮ ভাগ থেকে কমিয়ে শূন্যে নামিয়ে আনার প্রস্তাব করা হয়েছে।

বাণিজ্যিক সোলার বিনিয়োগ ২০৩৫ সাল পর্যন্ত পূর্ণ আয়কর অবকাশ পাবে। আর খুচরা ও শিল্প গ্রাহকদের যারা সোলার স্থাপন করবেন, তারা বিদ্যুৎ বিলে ৫ ভাগ রেয়াত পাবেন। 

বাজেটে সোলারের শূল্ক প্রস্তাবনা কার্যকর হলে এক মেগাওয়াট রুফটপ সোলার স্থাপনে খরচ ২৫ থেকে ৩০ ভাগ কমে আসবে। একটি এক-কিলোওয়াট-ঘণ্টার স্টোরেজ ব্যাটারি যার দাম ছিল ৩০০ ডলার, তা এখন ১৬০ ডলারে পাওয়া যাবে। এক মেগাওয়াট স্থাপনার খরচ প্রায় ৫০ লাখ টাকা কমবে। এতদিন যা ছিল স্বপ্ন, কথামালার অংশ; এখন তা হতে পারে লাভজনক বাস্তবতা।

সব ঠিক থাকলে দুই বছরের মধ্যে ছাদ থেকেই ২ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুত পাওয়া সম্ভব। আগামী এক দশকেই বদলে যেতে পারে বাংলাদেশের জ্বালানি খাতের চিত্র। লাভের অঙ্কটা আরেকটু মিালয়ে নিন। জাতীয় গ্রিডের বিদ্যুৎ পেতে শিল্প-কারখানাগুলোকে অফ-পিক আওয়ারে প্রতি ইউনিট ১১ টাকা ৫৬ পয়সা আর পিক আওয়ারে ১৬ টাকা খরচ করতে হয়। নতুন ব্যবস্থায় সোলারের মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারলে প্রতি ইউনিটে খরচ হতে পারে মাত্র ৩ টাকা।

সোলারের সবচেয়ে বড় বাধা ছিল কাঠামো স্থাপনের উচ্চ ব্যয়। সরকার সেটা নাগাল এনে দিচ্ছে। তবে মাথায় রাখতে হবে, শূন্য শুল্কের সুযোগে নিম্নমানের যন্ত্রাংশ ঢুকে সোলারের সম্ভাবনাকে শুরুতেই যেন আটকে না দেয়। নিম্নমানের যন্ত্রাংশের কারণে স্থাপিত সোলার কাঠামো দ্রুত কার্যক্ষমতা হারাতে পারে। যাতে লাভের গুড় পিঁপড়ার পেটে যেতে পারে। মানুষ সোলারের বাপারে আগ্রহ হারাতে পারে। তাই শুল্ক কমানোর পাশাপাশি আমদানি করা যন্ত্রাংশের মানের দিকটিও কঠোরভাবে নজরদারিতে রাখতে হবে।

সব মিলিয়ে সত্যিকার অর্থে বাংলাদেশ এখন সৌরবিদ্যুৎ খাতে বিপ্লবের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে। সরকার তার কাজটুকু ঠিকমতই করেছে। এখন এগিয়ে আসতে হবে উদ্যোক্তাদের। তবে লাভের হিসাবটা ঠিকঠাকমতো করতে পারলে এবার ছাদভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন এগিয়ে যাওয়ার পথে আর কোনো দ্বিধা থাকার কথা নয়। আশা করা যায়, বাংলাদেশের ছাদে ছাদে এখন হাসবে সোলার প্যানেল, নিছক দেখানোর জন্য নয়, সে প্যানেল থেকে আসা বিদ্যুৎ আলোকিত করবে বাংলাদেশকে। নিজের ভালো ভাই পাগলেও বোঝে।

মানুষকে সম্মান দিতে টাকা লাগে না

কালের কণ্ঠ ডেস্ক
মানুষকে সম্মান দিতে টাকা লাগে না
এআই দিয়ে তৈরি প্রতীকী ছবি

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রতিদিন লাখো কনটেন্ট শেয়ার করা হয়। প্রতিদিন কোটি মানুষ তা দেখেনও। কিন্তু মাঝে মধ্যে দুয়েকটা ছোট কনটেন্ট মানুষকে মুগ্ধ করে, মানুষের হৃদয় ছুঁয়ে যায়, মানবতাকে ঊর্ধ্বে তুলে ধরে।

নয়াদিল্লীর ব্যস্ত এলাকা কনট প্লেসে মাকিন ইনফ্লুয়েন্সার স্টিভ ইয়ালোর সঙ্গে এক কলম বিক্রেতা বৃদ্ধার কথোপকথন রীতিমত ভাইরাল সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। ১ মিনিট ২০ সেকেন্ডের ভিডিও প্রমাণ করে উদারতা, মানবতা আসলে অমূল্য। মানুষকে সম্মান করতে, তার মর্যাদাকে ঊর্ধ্বে তুলে ধরতে টাকা লাগে না। তারচেয়ে বড় কথা হলো, একজন মানুষ আরেকজনের মানুষের সাথে সংযোগ সৃষ্টির জন্য ভাষা কোনো বাধা নয়। একজন ভালো মানুষ চাইলেই হৃদয়ের উষ্ণতা দিয়ে আরেকজন মানুষের হৃদয় জয় করতে পারেন।

হেঁটে যাওয়ার সময় স্টিভ ইয়ালো দেখতে পান এক বয়োবৃদ্ধা কনট প্লেসের ফুটপাতে বসে কলম বিক্রি করছেন। কিন্তু তেমন কেউ তার কাছ থেকে কলম কিনছেন না। আসলে স্মার্ট ডিভাইসের যুগে কলমের চাহিদাও কমে গেছে। স্টিভের হয়তো কলম দরকারও ছিল না। তবু তিনি বৃদ্ধাকে দেখে এগিয়ে যান। 
কেমন আছেন? জানতে চাইতেই বৃদ্ধা উত্তর দেন ফোকলা দাঁতের হাসিতে। এই হাসিতেই এক ভারতীয় বৃদ্ধার সঙ্গে এক মার্কিন তরুণের দারুণ এক সংযোগ ঘটে। এ সংযোগ পারস্পরিক মর্যাদা, ভালোবাসা আর সম্মানের। স্টিভ জানতে চান, কলমের দাম কত? কাশফুলের মত সাদা চুলের বৃদ্ধা হেসে উত্তর দেন, ‘ফিফটি’। সম্ভবত এই একটি ইংরেজি শব্দই তাকে কেউ শিখিয়ে দিয়েছে। এরপর  স্টিভ তার নাম জানতে চান। বৃদ্ধার উত্তর ছিল গালভরা হাসি। স্টিভ প্রথমে একশ রুপি দিয়ে দুটি কলম কেনেন। পরে কেনেন আরো দুটি। এক পর্যায়ে গুনে দেখেন বৃদ্ধার হাতে মোট ১৮টি কলম আছে। ক্যালকুলেটরে হিসাব করে দেখেন, দাম মোট ৯০০ রুপি। কিন্তু স্টিভের কাছে ছিল সাকুল্যে ৫৫০ রুপি। নিজের সর্বস্ব তিনি বৃদ্ধার হাতে তুলে দেন। বৃদ্ধার জন্য শুভকামনা জানিয়ে যাওয়ার সময় স্টিভ নিয়ে যান শুধু দুটি কলম।

কথোপকথনের এক পর্যায়ে কলম বিক্রেতা বৃদ্ধা বলছিলেন, তিনি একা মানুষ, একা থাকেন। কিস্তু স্টিভ আবার হিন্দি বোঝেন না। বলছিলেন পরে অনুবাদ করে বুঝে নেবেন। একদম হিন্দি না বোঝা মার্কিন পর্যটকের সঙ্গে ‘ফিফটি’ ছাড়া আর কোনো ইংরেজি শব্দ না বোঝা ভারতীয় বৃদ্ধার এক মিনিট ২০ সেকেন্ডের কথোপকথনই এখন হয়ে উঠেছে সারল্য, উদারতা আর মানবতার স্মারক। তাদের কথোপকথন বুঝতে কারো দোভাষি লাগেনি। হাসি আর ভালোবাসার কোনো অনুবাদ লাগে  না।

অনেকেই সেই পোস্টে মন্তব্য করতে গিয়ে তাদের ভালোলাগার অনুভূতির কথা জানিয়েছেন। তাদের এই কথোপকথনকে বর্ননা করেছেন, দয়া ও মানবিক বন্ধনের শক্তির এক হৃদয়ছোঁয়া চিহ্ন হিসেবে। আসলে ছোট ছোট উদারতাও অনেক সময় দুই পক্ষের মধ্যেই সম্পর্কের দারুণ রসায়ন সৃষ্টি করতে পারে। আরেকজন মন্তব্য করেছেন, ‘কখনও কখনও আমরা কাউকে সবচেয়ে মূল্যবান যে জিনিসটি দিতে পারি তা টাকা নয়, সেটি হলো এক মুহূর্তের মর্যাদা এবং উদারতা।’

আসলেই টাকা দিয়ে সবকিছু কেনা যায় না। মানুষকে মর্যাদা দিতে, সম্মান করতে লাগে একটি উদার, মানবিক হৃদয়।