গ্রীষ্মের দুপুর গড়াতেই আগুনের মতো হাওয়ায় পুড়িয়ে দিচ্ছে ত্বক। এই অতিরিক্ত গরম শরীরের জন্য মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করে। শিশু, বয়স্ক ব্যক্তি, গর্ভবতী নারী এবং দীর্ঘমেয়াদি নানা রোগে আক্রান্তদের ক্ষেত্রে ঝুঁকি আরো বেশি।
এমন প্রচণ্ড গরমে শরীরের স্বাভাবিক তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা ব্যাহত হলে দেখা দিতে পারে ‘হিট অ্যাক্সেশন’ বা তাপজনিত ক্লান্তি। সময়মতো ব্যবস্থা না নিলে এটি রূপ নিতে পারে ‘হিটস্ট্রোকে’।
হিটস্ট্রোকের আগে শরীর কোন কোন সংকেতগুলো দেয় তা বিবিসির প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়।

হিট অ্যাক্সেশন কী?
অতিরিক্ত গরমে শরীর যখন নিজেকে ঠাণ্ডা রাখতে হিমশিম খায়, তখন হিট অ্যাক্সেশন দেখা দেয়। এটি মূলত শরীরের একটি সতর্কতাসংকেত, যা জানিয়ে দেয় যে দ্রুত ঠাণ্ডা পরিবেশে যেতে হবে।
হিট অ্যাক্সেশন যে কারো হতে পারে। এমনকি সম্পূর্ণ সুস্থ ও কর্মক্ষম মানুষেরও হতে পারে। এটি কয়েক মিনিটের মধ্যেও হতে পারে, আবার ধীরে ধীরে কয়েক ঘণ্টা ধরে তৈরি হতে পারে।
এ অবস্থায় আক্রান্ত ব্যক্তি অতিরিক্ত ঘামতে পারেন, প্রচণ্ড গরম অনুভব করতে পারেন এবং শারীরিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়েন। এ ছাড়া মাথা ব্যথা, মাথা ঘোরা, বিভ্রান্তি, বমি বমি ভাব, দ্রুত শ্বাস-প্রশ্বাস, হৃদস্পন্দন বেড়ে যাওয়া এবং অতিরিক্ত তৃষ্ণাও দেখা দিতে পারে।
যেসব লক্ষণ দেখলে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে
- শরীর খুব গরম লাগলেও ঘাম না হলে
- শরীরের তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা তার বেশি হলে
- দ্রুত শ্বাস-প্রশ্বাস বা শ্বাসকষ্ট শুরু হলে
- বিভ্রান্ত আচরণ করতে থাকলে
- খিঁচুনি হলে
- অজ্ঞান হয়ে গেলে
- কোনো সাড়া না দিলে
হিটস্ট্রোক কী?
হিট অ্যাক্সেশন সময়মতো নিয়ন্ত্রণ না করা গেলে শরীরের তাপমাত্রা বিপজ্জনক মাত্রায় বেড়ে গিয়ে হিটস্ট্রোক হতে পারে। এর অর্থ হলো শরীর আর তাপ নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না এবং শরীরের অভ্যন্তরীণ তাপমাত্রা বিপজ্জনকভাবে বেড়ে যাচ্ছে। এ অবস্থায় দ্রুত চিকিৎসা সহায়তা নিতে হবে।
হিট অ্যাক্সেশন ও হিটস্ট্রোকের মধ্যে পার্থক্য কী?
হিট অ্যাক্সেশন সাধারণত গুরুতর নয়, যদি দ্রুত শরীর ঠাণ্ডা করা যায়। তবে হিটস্ট্রোক একটি জরুরি অবস্থা। ফলে অবিলম্বে এর চিকিৎসা প্রয়োজন হয়।

হিটস্ট্রোক কেন এত বিপজ্জনক?
হিটস্ট্রোক যেহেতু একটি জরুরি অবস্থা। এ ধরনের লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা নিতে হবে। কারণ চিকিৎসায় দেরি হলেই মস্তিষ্ক, হৃদযন্ত্র, কিডনি ও অন্যান্য অঙ্গপ্রত্যঙ্গ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। ফলে এর লক্ষণগুলো সম্পর্কে ধারণা রাখা প্রয়োজন।
হিটস্ট্রোকের লক্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে—ঠাণ্ডা জায়গায় বিশ্রাম নেওয়ার পরও সুস্থ না হওয়া, শরীর খুব গরম লাগলেও ঘাম না হওয়া, শরীরের তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা তার বেশি হওয়া, দ্রুত শ্বাস-প্রশ্বাস, বিভ্রান্ত আচরণ, খিঁচুনি, অজ্ঞান হয়ে যাওয়া কিংবা কোনো সাড়া না দেওয়া।
কারা বেশি ঝুঁকিতে?
বাংলাদেশের আবহাওয়ায় রিকশাচালক, নির্মাণশ্রমিক, কৃষিশ্রমিক, ট্রাফিক পুলিশসহ যারা দীর্ঘ সময় খোলা আকাশের নিচে কাজ করেন, তারা বেশি ঝুঁকিতে থাকেন।
এ ছাড়া বয়স্ক ব্যক্তি, হৃদরোগী, ডায়াবেটিস রোগী এবং উচ্চ রক্তচাপের রোগীদেরও সতর্ক থাকতে হয়। তবে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকে শিশুরা।

শিশুরা কেন বেশি ঝুঁকিতে?
শিশুদের ক্ষেত্রে লক্ষণগুলো একটু ভিন্ন হতে পারে। এছাড়া শিশুরা কেমন অনুভব করছে সেটা বোঝাতেও পারে না। ফলে তারা বেশি ঝুঁকিতে। এ ক্ষেত্রে কিছু লক্ষণ দেখে বুঝতে হবে তারা কেমন অনুভব করছে।
- অস্বাভাবিকভাবে ঘুমঘুম ভাব দেখাতে পারে
- দুর্বল হয়ে পড়তে পারে কিংবা স্বাভাবিকের তুলনায় কম সক্রিয় হয়ে যেতে পারে।
আক্রান্ত ব্যক্তিকে প্রাথমিক সহায়তা দেবেন যেভাবে
কাউকে হিট অ্যাক্সেশনে আক্রান্ত মনে হলে প্রথমেই তাকে রোদ বা উষ্ণ পরিবেশ থেকে সরিয়ে ঠাণ্ডা ও ছায়াযুক্ত স্থানে নিতে হবে। সম্ভব হলে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষে রাখা ভালো।
শরীরের অপ্রয়োজনীয় বা আঁটসাঁট পোশাক খুলে দিতে হবে, যাতে তাপ সহজে বের হতে পারে। ঠান্ডা পানিতে ভেজানো কাপড়, স্পঞ্জ বা তোয়ালে দিয়ে শরীর মুছে দিতে হবে। ঘাড়, বগল ও কুঁচকির মতো স্থানে বরফ বা ঠাণ্ডা সেঁক দিলে দ্রুত উপকার পাওয়া যায়।
শরীর ভেজা অবস্থায় হাতপাখা বা বৈদ্যুতিক ফ্যান দিয়ে বাতাস করলে পানি দ্রুত বাষ্পীভূত হয়ে শরীর ঠাণ্ডা হতে সাহায্য করে। একই সঙ্গে পর্যাপ্ত পানি বা খাবার স্যালাইন পান করতে দিতে হবে।
সাধারণত ৩০ মিনিটের মধ্যে অবস্থার উন্নতি হওয়ার কথা। যদি উন্নতি না হয়, অথবা হিটস্ট্রোকের কোনো লক্ষণ দেখা দেয়, তাহলে দ্রুত হাসপাতালে নিতে হবে। এ জন্য ৯৯৯ নম্বরে কল করে জরুরি সেবা নিতে পারেন।

গরমে নিরাপদ থাকার উপায়
তাপপ্রবাহের সময় অপ্রয়োজনে দুপুর ১২টা থেকে বিকেল ৪টার মধ্যে বাইরে না যাওয়াই ভালো। বাইরে গেলে ছাতা, টুপি বা হালকা রঙের ঢিলেঢালা পোশাক ব্যবহার করা উচিত। পর্যাপ্ত পানি পান করতে হবে, তৃষ্ণা লাগার অপেক্ষা না করে নিয়মিত পানি খাওয়া জরুরি। অতিরিক্ত চা, কফি বা অ্যালকোহল শরীরকে পানিশূন্য করতে পারে, তাই এগুলো সীমিত রাখা ভালো।
গরমের এই সময়ে সামান্য অসতর্কতাও বড় বিপদের কারণ হতে পারে। তাই হিট অ্যাক্সেশন ও হিটস্ট্রোকের লক্ষণ সম্পর্কে সচেতন থাকা এবং দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়াই হতে পারে জীবন রক্ষার সবচেয়ে কার্যকর উপায়।




