বিশ্বের শীর্ষ ধনীদের একজন ইলন মাস্কের মহাকাশ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান স্পেসএক্স ইতিহাসের সবচেয়ে বড় প্রাথমিক শেয়ার বিক্রির (আইপিও) পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে। প্রতিষ্ঠানটি শেয়ারবাজার থেকে ৭৫ বিলিয়ন ডলার সংগ্রহ করতে চায়। পরিকল্পনা অনুযায়ী আইপিও সম্পন্ন হলে এটি বিশ্বের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় আইপিও হিসেবে নতুন রেকর্ড গড়বে।
গত ৩ জুন (বুধবার) রয়টার্স-এর এক প্রতিবেদন এ তথ্য জানায়।
স্পেসএক্স জানিয়েছে, তারা ৫৫ কোটি ৫৬ লাখ শেয়ার প্রতি শেয়ার ১৩৫ ডলার (প্রায় ১৬,৫৫৮.৪৯ বাংলাদেশি টাকা) দরে বিক্রি করবে। এর মাধ্যমে কম্পানিটির সম্ভাব্য বাজারমূল্য দাড়াবে প্রায় ১ দশমিক ৭৫ (প্রায় বাংলাদেশি ২১.৪৬ ট্রিলিয়ন টাকা) থেকে ১ দশমিক ৭৭ ট্রিলিয়ন ডলার (প্রায় বাংলাদেশি ২১.৭১ ট্রিলিয়ন টাকা)। এই মূল্যায়ন সফল হলে স্পেসএক্স বিশ্বের সবচেয়ে মূল্যবান প্রযুক্তি ও মহাকাশ কম্পানিগুলোর একটি হয়ে উঠবে।
বর্তমানে স্পেসএক্সের প্রায় অর্ধেক মালিকানা রয়েছে প্রতিষ্ঠাতা ইলন মাস্কের হাতে। আইপিওর পরও তিনি কম্পানির নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখবেন। বিশেষ ধরনের ভোটাধিকারসম্পন্ন শেয়ারের কারণে কম্পানির সিদ্ধান্ত গ্রহণে তার প্রভাব আগের মতোই শক্তিশালী থাকবে।
বিশ্লেষকদের হিসাব অনুযায়ী, প্রস্তাবিত মূল্যায়ন অনুসারে শুধু স্পেসএক্সে থাকা মাস্কের অংশীদারির মূল্যই প্রায় ৮৪০ বিলিয়ন ডলারে (বাংলাদেশি প্রায় ১০.৩ ট্রিলিয়ন টাকা) পৌঁছাতে পারে। এর সঙ্গে বৈদ্যুতিক গাড়ি নির্মাতা টেসলায় তার মালিকানার মূল্য যোগ করলে মোট সম্পদের পরিমাণ ১ ট্রিলিয়ন ডলার (বাংলাদেশি প্রায় ১২.২৬ লক্ষ কোটি টাকা) ছাড়িয়ে যেতে পারে। এমনটি হলে বিশ্বের প্রথম ‘ট্রিলিয়নিয়ার’ হওয়ার ইতিহাস গড়তে পারেন ইলন মাস্ক।(সুত্রঃ সিএনএন)
কেন এত আলোচনায় স্পেসএক্স?
২০০২ সালে প্রতিষ্ঠিত স্পেসএক্স শুরুতে রকেট নির্মাণ ও মহাকাশে বিভিন্ন পণ্য পরিবহনের কাজ করলেও বর্তমানে এটি মহাকাশ প্রযুক্তি, স্যাটেলাইট যোগাযোগ এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা—এই তিন খাতেই গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান তৈরি করেছে।
কম্পানিটির সবচেয়ে সফল প্রকল্পগুলোর একটি হলো স্টারলিংক। এই স্যাটেলাইটভিত্তিক ইন্টারনেট সেবা বর্তমানে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে দ্রুতগতির ইন্টারনেট সরবরাহ করছে এবং স্পেসএক্সের আয়ের বড় উৎস হিসেবে কাজ করছে।
এ ছাড়া চলতি বছরের শুরুতে ইলন মাস্ক তার কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক প্রতিষ্ঠান এক্স-এআই কে স্পেসএক্সের সঙ্গে একীভূত করেন। ফলে মহাকাশ প্রযুক্তির পাশাপাশি এআই খাতও এখন কম্পানিটির ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধির অন্যতম চালিকাশক্তি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
আইপিওর অর্থ কোথায় ব্যয় হবে?
স্পেসএক্স জানিয়েছে, আইপিও থেকে সংগৃহীত অর্থ বিভিন্ন উচ্চাভিলাষী প্রকল্পে বিনিয়োগ করা হবে। এর মধ্যে রয়েছে স্টারলিংক নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার জন্য বড় কম্পিউটিং অবকাঠামো তৈরি, নতুন প্রজন্মের মহাকাশযান উন্নয়ন এবং ভবিষ্যতে চাঁদ ও মঙ্গল গ্রহে মানব বসতি স্থাপনের পরিকল্পনা।
মহাকাশে ডেটা সেন্টার স্থাপন এবং সৌরশক্তিচালিত প্রযুক্তি ব্যবহারের মতো নতুন ধারণা নিয়েও কাজ করছে বলে জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি ।
রেকর্ড ভাঙার পথে
বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে বড় আইপিওর রেকর্ড রয়েছে সৌদি আরবের তেল কম্পানি সৌদি আরামকোর দখলে। প্রতিষ্ঠানটি ২০১৯ সালে প্রায় ২৯.৪ বিলিয়ন ডলার (প্রায় নাম বাংলাদেশি ৩,৬০,৬০৭.১৭ কোটি টাকা) সংগ্রহ করেছিল। স্পেসএক্সের পরিকল্পিত ৭৫ বিলিয়ন ডলারের ( বাংলাদেশি প্রায় ৯,১৯,৯১৬.২৫ কোটি টাকা) আইপিও সেই রেকর্ডকে অনেক দূরে ছাড়িয়ে যাবে।
বিনিয়োগ বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা খাত নিয়ে বিনিয়োগকারীদের ব্যাপক আগ্রহ এবং স্পেসএক্সের মহাকাশ ব্যবসার সম্ভাবনাই কম্পানিটির মূল্যায়নকে এত উঁচুতে নিয়ে গেছে।
তবে কিছু বিশেষজ্ঞ সতর্ক করে বলেছেন, স্পেসএক্সের ভবিষ্যৎ মূল্যায়নের বড় অংশই এখনও সম্ভাবনার ওপর নির্ভরশীল। বিশেষ করে মহাকাশভিত্তিক ডেটা সেন্টার, মঙ্গল গ্রহে মানব বসতি কিংবা নতুন এআই প্রকল্পগুলোর অনেকগুলোই এখনো বাস্তবায়নের প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে।
তারপরও প্রযুক্তি ও বিনিয়োগ বিশ্বের নজর এখন স্পেসএক্সের দিকেই। কারণ এই আইপিও শুধু একটি কম্পানির শেয়ারবাজারে আসা নয়, বরং মহাকাশ ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক ব্যবসার ভবিষ্যৎ নিয়েও নতুন প্রত্যাশা তৈরি করছে।




