রাজধানীর মোহাম্মদপুর জেনেভা ক্যাম্পে ৫ আগস্ট পরবর্তী দফায় দফায় অভিযানের পরও মাদক কারবার এখনো নিয়ন্ত্রণে আসেনি। বর্তমানে পুলিশের তালিকাভুক্তদের মধ্যে গডফাদারদের ঘিরে জেনেভা ক্যাম্পে সাধারণ মানুষদের মধ্যে আতঙ্ক রয়েছে।
তারা হলেন- মনু ওরফে গাল কাটা মনু, ইমতিয়াজ, শাহ আলম ও বিল্লু এখন প্রকাশ্যে জেনেভা ক্যাম্পে খুচরা মাদক কারবারিদের নেতৃত্ব দিচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
এছাড়াও সালাম, নেটা সেলিম, ইরফান, লালনসহ পুলিশের অনেক তালিকাভুক্ত গডফাদার ক্যাম্পে মাদক ব্যবসার নেতৃত্ব দেয়। তাদের প্রত্যেকের ৪০ থেকে ৫০ জনের বেশি সহযোগী ক্যাম্প ও আশপাশের এলাকায় ঘুরে ঘুরে অনেকটা প্রকাশ্যে মাদক বিক্রি করে।
কখনো লাইন ধরে অনেকটা রিলিফের পণ্যের মতোও তাদের কাছ থেকে মাদক কিনতে দেখা যায় সরেজমিনে। অথচ এ এলাকায় আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বারবার জোরালো অভিযানেও নিয়ন্ত্রণে আসেনি এই মরণনেশার লেনদেন।
এদের গ্রেপ্তারের বিষয়ে জানতে চাইলে মোহাম্মদপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মেজবাহ উদ্দীন কালের কণ্ঠকে বলেন, জেনেভা ক্যাম্পের মাদক গডফাদারদের মধ্যে অনেকেই এরই মধ্যে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে গ্রেপ্তার হয়েছে। বর্তমানে যারা গ্রেপ্তার হয়নি তাদেরকেও গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে। তারা থানা তালিকাভুক্ত মাদক কারবারি। তাদের ধরতে অভিযান চলছে।
পুলিশ জানায় সর্বশেষ গত সোমবার রাতে ক্যাম্পে অভিযানের আগেই তারা এলাকা ছেড়ে পালিয়ে যায়।
এলাকায় খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মাদক গডফাদাররা আধিপত্য ধরে রাখতে ক্যাম্পে তাদের সহযোগীদের দিয়ে বিপুল অস্ত্রের মজুদ করেছে। এতে প্রায়ই বেধে যাচ্ছে সংঘর্ষ। এর জেরে প্রাণ যাচ্ছে এলাকার নিরীহ মানুষের।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, দীর্ঘদিন ধরে রাজধানীর মোহাম্মদপুর এক আতঙ্কের জনপদ। শুধু মাদক কারবারই নয়, প্রায়ই ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটে এ এলাকায়। এলাকার বাসিন্দারা আতঙ্কের মধ্যে থাকেন। মাঝে মধ্যে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান হয় এতে কিছুদিনের জন্য স্বস্তি ফিরলেও ফের একই পরিস্থিতি চলে।
অপরাধ বিশ্লেষকরা বলছে, মোহাম্মদপুর থানাধীন আটকেপড়া পাকিস্তানিদের আবাসস্থল জেনেভা ক্যাম্পে দীর্ঘদিন ধরে মাদক ব্যবসা চলছে। সেখানে হাত বাড়ালেই মাদক পাওয়া যায়। বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরাও তাদের ক্রেতা। মাদক নিয়ন্ত্রণে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের আরো কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। না হলে সমাজে বিশৃঙ্খলা দেখা দেবে।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সিসিটিভি ক্যামেরা এলাকায় পুলিশের একাধিক সূত্র বলছে, মোহাম্মদপুর বিহারী ক্যাম্পসহ আশপাশের এলাকা অপরাধমূলক পরিস্থিতি বিবেচনা করে ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরার (সিসিটিভি) আওতায় আনার পরিকল্পনা করছে পুলিশ।
সর্বশেষ গত সোমবার মোহাম্মদপুরের জেনেভা ক্যাম্পে বিশেষ অভিযান চালিয়েছে র্যাব, পুলিশ ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের (ডিএনসি)। মাদক অপরাধীদের গ্রেপ্তার করতে চার ঘণ্টাব্যাপী এই বিশেষ অভিযানে ১৬ জনকে আটক করা হয়। তবে এদের মধ্যে শীর্ষ পর্যায়ের ‘গডফাদার’ মাদক ব্যবসায়ী নেই মোহাম্মদপুর থানার ওসি জানান। মোহাম্মদপুর থানা পুলিশ সূত্র নিশ্চিত করেছে, মাদকবিরোধী অভিযানে অফিসারসহ সব মিলিয়ে তিন বাহিনীর বিশাল বহর এই অভিযানে অংশ নেয়।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও পুলিশ সদর দপ্তর সূত্র জানায়, গত ৩০ এপ্রিল থেকে রাজধানীসহ সারা দেশে মাদক কারবারিদের বিরুদ্ধে বিশেষ অভিযান শুরু হয়েছে। নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার পর মাদকের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের ঘোষণা দেওয়ার পর থেকেই এই তৎপরতা বৃদ্ধি পায়।
সূত্র বলছে, আইনের দুর্বলতার কারণে অনেক অপরাধীকে আটক করার পরও দীর্ঘ সময় জেলে রাখা সম্ভব হচ্ছে না।
পুলিশ ও ক্যাম্পের বাসিন্দাদের সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়, এর আগে মাদক অপরাধীদের হাতে খুন হয় শাহ আলম নামের এক নিরাপরাধ তরুণ। তাকে চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। গত এক বছরে একই কারণে এই মাদক কারবারিরা আরো পাঁচজন খুন করে। তাদের চাপাতির কোপে ও গুলিতে আহত হয় অর্ধ শতাধিক লোক। এর মধ্যে নারী ও শিশু রয়েছে।
পুলিশ বলছে, ক্যাম্পের অন্তত ৮০ শতাংশ লোক প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে এখন মাদকে জড়িয়ে পড়েছে। তবে ক্যাম্পের বাসিন্দারা বলছে, ক্যাম্পে দারিদ্র্যের পাশাপাশি রয়েছে বেকারত্ব। এর সুযোগ নিচ্ছে মাদক ব্যবসায়ীরা।
পুলিশ বলছে, সম্প্রতি জেনেভা ক্যাম্পে তারা গোয়েন্দা অনুসন্ধান চালিয়ে জানতে পেরেছেন, ক্যাম্পের ৮০ শতাংশ বাসিন্দা মাদক ব্যবসায় জড়িত। জামিনে থাকাদের পাশাপাশি অন্তত ২০ জন শীর্ষ মাদক ব্যবসায়ী এখনো নিয়ন্ত্রণ করছে ক্যাম্পের মাদক কারবার। তারা ক্যাম্পে থাকে না। শিশু ও কিশোরদের পাশাপাশি নারীদেরও ব্যবহার করে তারা ক্যাম্পে মাদক কারবার করছে।
সাম্প্রতিক সময়ে পুলিশের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, জেনেভা ক্যাম্পে ছোট ছোট ঘর রয়েছে। সেই সঙ্গে রয়েছে পান-সিগারেট-চায়ের অনেক দোকান। এর বাইরে ভাসমান কিছু দোকান রয়েছে। এসবের অনেকগুলো মাদক ব্যবসায়ীরা ব্যবহার করে।
পুলিশ বলছে, গত এক বছরে মোহাম্মদপুর থানায় যেসব মামলা হয়েছে, এর অন্তত ৬০ শতাংশ মামলা হয়েছে মাদককে কেন্দ্র করে। এসব শীর্ষ মাদক ব্যবসায়ীদের মধ্যে অনেকেই ৫ আগস্ট-পরবর্তী সরকার পরিবর্তনের পর যৌথ বাহিনীর অভিযানে গ্রেপ্তার হয়েছিল। তবে বিভিন্ন সময়ে জামিনে বের হয়ে তাদের অনেকেই ফের আগের মতো ক্যাম্পে মাদক ব্যবসা শুরু করে। এর মধ্যে বুনিয়া সোহেল ৩৬ মামলার আসামি। অন্যদের বিরুদ্ধেও ১০ থেকে ১২টি করে মাদকদ্রব্যসংক্রান্ত মামলা রয়েছে বলে পুলিশ সূত্র জানিয়েছে।
এক বছরে যারা নিহত : বিভিন্ন সময়ে ক্যাম্পে মাদক বিরোধে সংঘর্ষের ঘটনায় নিহতদের মধ্যে অনেকেই রয়েছেন। গত বছরের ৬ আগস্ট ক্যাম্পে গুলিতে মারা যান শাহেন শাহ নামের এক যুবক। একই দিনে গলায় গুলিবিদ্ধ হন শুভ নামের আরেক যুবক। তার আগে শাহ আলম নামে এক তরুণকে হত্যা করা হয়। পরে ১৭ আগস্ট আবারও সংঘর্ষ শুরু হয়, যা চলে ২৩ আগস্ট পর্যন্ত। আরেক দফা বিরতির পর আবার ৩০ আগস্ট থেকে ৪ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সংঘর্ষ হয়। ৪ সেপ্টেম্বর সোহেলের গুলিতে মারা যান অটোরিকশাচালক সাদ্দাম হোসেন সনু। আহত হন কুরাইশ। এরপর ২২ সেপ্টেম্বর শুরু হয়ে পরদিন সকাল পর্যন্ত চলে দুই পক্ষের ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া, ইট-পাটকেল ছোড়াছুড়ি ও গোলাগুলি। এর মধ্যে চুয়া সেলিমের স্ত্রী নাগিন বেগম এবং ২৩ সেপ্টেম্বর চারকো ইরফান গুলিবিদ্ধ হন। ২৪ সেপ্টেম্বর গুলিবিদ্ধ সাগর চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। তিনি পেশায় কসাই ছিলেন। এর আগে ৩১ মে ককটেল বিস্ফোরণ ও গুলিতে মারা যায় রাসেল নামের এক শিশু।
স্থানীয়দের ভাষ্য, বুনিয়া সোহেল নিজে মোটরসাইকেলে করে এসে ককটেল ফাটিয়ে চলে যায়। এরপর থেকে ক্যাম্পের বিভিন্ন জায়গায় ককটেল বিস্ফোরণ ঘটানো হয়।
ক্যাম্পের বাসিন্দারা যা বলছেন : ক্যাম্পের এক বাসিন্দা কালের কণ্ঠকে বলেন, এখনো এই ক্যাম্পের মাদক নিয়ন্ত্রণকারীদের মধ্যে বুনিয়া সোলের লোকজন ক্যাম্পের ৭ নম্বর সেক্টরে মাদক কারবার করছে। আর চুয়া সেলিমের এলাকা হচ্ছে এবি-ব্লক পাক্কা (পাকা) ক্যাম্প।




