‘কত সরকার এলো-গেল, কিন্তু আমাদের জন্য মৃত্যুকূপ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা সেতুটি অপসারণ করে নতুন সেতু হলো না। ২৫ বছর চলে গেছে শুধু আশ্বাসে। মানুষের মৃত্যু হলেই কি সংশ্লিষ্টদের টনক নড়বে?’
প্রশ্নটি কিশোরগঞ্জের কটিয়াদী উপজেলার মুমুরদিয়া ইউনিয়নের নামা বোয়ালিয়া গ্রামের ষাটোর্ধ্ব বাসিন্দা আবু তাহের মিয়ার। ইউনিয়নের শিবনাথ সাহার বাজারসংলগ্ন নদীর ওপর জীর্ণ সেতুটি দীর্ঘদিন ধরে ঝুঁকিপূর্ণ থাকায় কথাগুলো বলেন তিনি।
স্থানীয়রা জানায়, শিবনাথ সাহার বাজারসংলগ্ন জরাজীর্ণ সেতুটি অপসারণ করে নতুন সেতু নির্মাণের দাবিতে এলাকাবাসী বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করলেও কোনো পদক্ষেপ চোখে পড়েনি।
স্থানীয় সূত্র জানায়, ষাটের দশকে শিবনাথ সাহার বাজারসংলগ্ন কুড়িখাঁই নদীতে একটি পাকা সেতু নির্মাণ করা হয়। ২০০১ সালে সেতুটির রেলিং ও পাটাতন ভেঙে যায়। সেতুর মাঝখানে সৃষ্টি হয় বড় বড় গর্ত। এরপর থেকে প্রায় ২৫ বছর ধরে সেতুটি ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। স্থানীয়রা গর্তে কাঠ ও বাঁশ দিয়ে জোড়াতালি দিয়ে কোনো রকমে চলাচল করছেন।
শনিবার (২৫ জুলাই) সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, সেতুর দুই পাশে জনবহুল এলাকা। কিছুক্ষণ পরপরই যানবাহন চলাচল করছে। সেতুর মাঝখানের বড় দুটি গর্ত দিয়ে নিচের পানি দেখা যায়। ঝুঁকি এড়াতে চালকরা যাত্রী নামিয়ে কোনো রকমে সেতু পার হচ্ছেন। আশপাশে কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থাকায় শিক্ষার্থীদেরও প্রতিদিন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করতে হচ্ছে। অন্তত ২০ গ্রামের মানুষের যাতায়াতের প্রধান সড়ক এটি।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সেতুটি দিয়ে বোয়ালিয়া, নামা বোয়ালিয়া, তেলিচারা, পাড়া মণ্ডলভোগ, কাহেতেরটেকী, ভাংনাদী, চারিয়া, দড়িচারিয়া, মাগুরা, কুড়িখাঁই, চাতল ও মুমুরদিয়াসহ অন্তত ২০ গ্রামের মানুষ যাতায়াত করে। সেতুটি বেহাল থাকায় কৃষিপণ্য পরিবহন ও রোগী আনা-নেওয়ায় চরম ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। বিকল্প পথে ঘুরে যেতে সময় ও খরচ—দুটিই বেশি লাগছে।
দড়িচারিয়া গ্রামের বাসিন্দা আব্দুল মতিন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘হাসপাতালে জরুরি রোগী নিয়ে গেলে অনেক পথ ঘুরে যেতে হয়। আমাদের কাছে আশ্বাস এখন ছলনার নাম। কারণ গত ২৫ বছর ধরে শুধু প্রতিশ্রুতিই শুনে আসছি।’
নামা বোয়ালিয়া গ্রামের জসিম বলেন, ‘দিন-রাত সেতুর ওপর দিয়ে চলাচল করতে ভয় লাগে। মনে হয়, এই বুঝি ধসে পড়ল। চালকরা আতঙ্ক নিয়ে চলাচল করেন। উপায়হীন মানুষকে জীবনের ঝুঁকি নিয়েই চলাচল করতে হচ্ছে। অপ্রয়োজনীয় স্থানে সেতু পড়ে আছে, অথচ আমাদের এই গুরুত্বপূর্ণ সমস্যার দিকে কারো নজর নেই।’
নির্ভরযোগ্য একটি সূত্র জানিয়েছে, স্থানীয় সংসদ সদস্য মো. জালাল উদ্দীন সেতুটি দ্রুত নির্মাণের জন্য উদ্যোগ নিয়েছেন। এরই মধ্যে সেতুটির জন্য বরাদ্দ চেয়ে ডিও লেটার দেওয়া হয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট দপ্তরকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে আবেদন করার নির্দেশও দেওয়া হয়েছে।
কটিয়াদী উপজেলা স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) উপজেলা প্রকৌশলী মো. এহেতেশামুল হক বলেন, ‘সেতুটি বর্তমানে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। ইতোমধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত সেতুটি পরিদর্শন করে কারিগরি প্রতিবেদন ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে জরুরি ভিত্তিতে পাঠানো হয়েছে। বরাদ্দ পাওয়া গেলে দ্রুত নতুন সেতু নির্মাণের কাজ শুরু হবে।’





