বর্ষা মৌসুম শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দেশে বেড়েছে ডেঙ্গু সংক্রমণ। তবে রংপুর বিভাগে এখনো বড় ধরনের প্রাদুর্ভাব দেখা না দিলেও আগামীতে দেখা দিতে পারে বলে আশঙ্কা বাসিন্দাদের।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে আক্রান্তের সংখ্যা ও এডিস মশার বিস্তার বাড়ছে। ফলে রংপুরেও সংক্রমণের ঝুঁকি রয়েছে। তারা বলছেন, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে এখনই সমন্বিত মশা নিধন, পরিচ্ছন্নতা অভিযান এবং জনসচেতনতা বাড়ানো জরুরি।
মঙ্গলবার (৭ জুলাই) দুপুরে রংপুর বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালকের কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত বিভাগের আট জেলায় ডেঙ্গু সংক্রমণ ধরা পড়েছে ৪৪ জনের শরীরে। এর মধ্যে রংপুরে ১১ জন, গাইবান্ধায় ১০ জন; লালমনিরহাট ও নীলফামারীতে আটজন করে; দিনাজপুরে চারজন এবং ঠাকুরগাঁওয়ে তিনজন আক্রান্ত হয়েছেন। এ সময় ৩৭ জন চিকিৎসায় সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন এবং কোনো মৃত্যুর ঘটনা ঘটেনি।
স্বাস্থ্য বিভাগ বলছে, বর্তমানে আক্রান্তের সংখ্যা কম হলেও বর্ষাকালে পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যেতে পারে। বিশেষ করে ঢাকা ও অন্যান্য আক্রান্ত এলাকা থেকে যাতায়াতের মাধ্যমে ভাইরাস বহনকারী এডিস মশার বিস্তার ঘটার আশঙ্কা রয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ডেঙ্গু এখন শুধু বড় শহরের রোগ নয়; পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে এটি জেলা ও প্রত্যন্ত এলাকায়ও ছড়িয়ে পড়ছে। ফলে কমবেশি সারা বছরই ডেঙ্গু আক্রান্তের খবর পাওয়া যাচ্ছে।
পরিসংখ্যান বলছে, ২০২২ সালে রংপুর বিভাগের আট জেলায় মোট ২৬৫ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত হন। এর মধ্যে দিনাজপুরের এম আব্দুর রহিম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ১৪৭ জন এবং রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ৫৪ জন চিকিৎসা নেন। এছাড়া নীলফামারীতে ৩২ জন, ঠাকুরগাঁওয়ে ১০ জন, পঞ্চগড়ে ৯ জন, লালমনিরহাটে সাতজন, কুড়িগ্রামে চারজন এবং গাইবান্ধায় দুইজন আক্রান্ত হন।
স্বাস্থ্য বিভাগ থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে বিভাগে ডেঙ্গুর সবচেয়ে বড় প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়। ওই বছর আক্রান্ত হন পাঁচ হাজার ৪৯৪ জন এবং মারা যান ১২ জন। মৃতদের মধ্যে দিনাজপুরে পাঁচজন, রংপুরে চারজন, গাইবান্ধায় দুজন এবং লালমনিরহাটে একজন ছিলেন। একই বছরে রংপুর জেলায় এক হাজার ২৯৫ জন আক্রান্ত হন, যার মধ্যে স্থানীয়ভাবে সংক্রমিত ছিলেন ৪৬০ জন।
২০২৪ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ৭ ডিসেম্বর পর্যন্ত বিভাগে ডেঙ্গু আক্রান্ত হন এক হাজার ৪৭২ জন। এর মধ্যে দিনাজপুরে ৩৪৪ জন, নীলফামারীতে ৩০১ জন, কুড়িগ্রামে ২১৭ জন, রংপুরে ১৯৭ জন, গাইবান্ধায় ১৪৬ জন, পঞ্চগড়ে ১১৮ জন, ঠাকুরগাঁওয়ে ৭৭ জন এবং লালমনিরহাটে ৬৩ জন আক্রান্ত হন। ওই বছর গাইবান্ধা ও নীলফামারীতে একজন করে মোট দুইজনের মৃত্যু হয়।
২০২৫ সালে আক্রান্তের সংখ্যা কমে দাঁড়ায় এক হাজার ১৮৭ জনে এবং ওই বছর ডেঙ্গুতে কোনো মৃত্যুর ঘটনা ঘটেনি।
রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, রোগীর চাপ বাড়লে ডেঙ্গু রোগীদের জন্য বিশেষ কর্নার বা আলাদা ওয়ার্ড চালুর প্রস্তুতি রয়েছে। প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসক, নার্স ও অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মীদেরও প্রস্তুত রাখা হয়েছে।
এদিকে, রংপুর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক অ্যাড. মাহফুজ উন নবী চৌধুরী ডন বলেন, ‘ডেঙ্গুসহ মশাবাহিত রোগ প্রতিরোধে গত ২৫ জুন থেকে মাসব্যাপী বিশেষ মশা নিধন ও পরিচ্ছন্নতা কর্মসূচি চালানো হচ্ছে। নগরীর প্রত্যেক ওয়ার্ডে এডিস মশার লার্ভা ধ্বংস, ওষুধ ছিটানো এবং পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে। নাগরিকদেরও নিজ নিজ বাসাবাড়ি ও আশপাশ পরিষ্কার রাখতে হবে।’
চিকিৎসকদের পরামর্শ, বাড়ির আশপাশে ডাবের খোসা, পরিত্যক্ত টায়ার, ফুলের টব, পানির ট্যাংক কিংবা যেকোনো পাত্রে তিন দিনের বেশি পানি জমতে দেওয়া যাবে না। জ্বর, মাথাব্যথা, শরীর ব্যথা বা চোখের পেছনে ব্যথার মতো উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রশাসনের কার্যকর উদ্যোগের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের সচেতন অংশগ্রহণই পারে রংপুরকে ডেঙ্গুর বড় প্রাদুর্ভাব থেকে নিরাপদ রাখতে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রংপুর বিভাগীয় উপপরিচালক ডা. ওয়াজেদ আলী বলেন, ‘রংপুরে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে গত দেড় বছরে কোনো মৃত্যুর ঘটনা ঘটেনি। আক্রান্তের সংখ্যাও আগের তুলনায় কমেছে। তবে বর্ষা মৌসুমে ঝুঁকি একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যাবে না। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা, মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করা, মশারি ব্যবহার এবং জনসচেতনতা বাড়ানোর বিকল্প নেই।’
উপপরিচালক আরো বলেন, ‘ডেঙ্গু রোগী বাড়লে চিকিৎসা দিতে প্রত্যেক জেলা ও উপজেলা হাসপাতালে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। রক্ত পরীক্ষার কিটসহ প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সরঞ্জামেরও কোনো ঘাটতি নেই।’





