রংপুরের গঙ্গাচড়ায় দ্বিতীয় তিস্তা সেতুর সংযোগ সড়কের বেশ কয়েকটি অংশ ধসে পড়েছে। কয়েক দিনের টানা বৃষ্টিতে সড়কের নিচের মাটি সরে গিয়ে বড় বড় গর্ত সৃষ্টি হয়েছে। এতে ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করছে যানবাহন ও পথচারীরা।
স্থানীয় সূত্র জানায়, গত শুক্রবার (১৬ মে) সকাল থেকে টানা বৃষ্টিতে সংযোগ সড়কে এই ধস নামার ঘটনা ঘটে। দ্রুত সংস্কার করা না হলে যে কোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনা বা যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার ঘটনা ঘটতে পারে।
স্থানীয়রা জানায়, সড়কে ধস নামার তিন দিন পার হলেও সড়ক বিভাগ এখনও কোনো উদ্যোগ নেয়নি।
সোমবার (১৮ মে) দুপুরে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, উপজেলার মহিপুর এলাকায় সেতুর উত্তর প্রান্তের সংযোগ সড়কের অন্তত আটটি স্থানে ধস নেমেছে। কোথাও কোথাও গভীর গর্ত সৃষ্টি হয়েছে। সড়কের বিভিন্ন অংশে পিচ ও খোয়া উঠে গিয়ে নিচের মাটি দেবে গেছে। ভারী যানবাহন চলাচলের সময় সড়ক আরো ভেঙে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
জানা গেছে, সংযোগ সড়কটি রংপুর ও লালমনিরহাট জেলার মানুষের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগ মাধ্যম। বুড়িমারী স্থলবন্দরসহ লালমনিরহাটের পাটগ্রাম, হাতীবান্ধা, কালীগঞ্জ ও আদিতমারী উপজেলার সঙ্গে রংপুরের সরাসরি যোগাযোগের অন্যতম প্রধান পথ এটি। প্রতিদিন শিক্ষা, চিকিৎসা, ব্যবসা-বাণিজ্য ও নিত্যপ্রয়োজনে প্রায় অর্ধলাখ মানুষ সড়কটি ব্যবহার করে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, সাম্প্রতিক টানা বৃষ্টিতে সড়কের ক্ষতিগ্রস্ত অংশ আরো ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে। নির্মাণকাজে শুরু থেকেই অনিয়মের কারণে বারবার সড়কে ধস দেখা দিচ্ছে বলে মনে করছে তারা।
সেতু এলাকার বাসিন্দা আরিফুর রহমান বলেন, কয়েক দিনের বৃষ্টিতে সেতুর উত্তর পাশে বড় বড় গর্ত সৃষ্টি হয়েছে। দ্রুত সংস্কার না করলে যে কোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। তিনি বলেন, সড়কটি দিয়ে প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ চলাচল করে। ভারী যানবাহনও চলাচল করে। তাই ঝুঁকি আরো বেশি।
আবদুল মান্নান নামের আরেক বাসিন্দা বলেন, বর্ষা এলেই নদীভাঙন শুরু হয়। আর সড়কটির অবস্থাও আগে থেকেই নাজুক। কয়েকটি স্থানে খোয়া উঠে গেছে, বড় বড় গর্ত সৃষ্টি হয়েছে। বৃষ্টি আরো বেশি হলে সড়কের বড় অংশ ভেঙে যেতে পারে।
আবদুল মান্নান আরো বলেন, এর আগেও কয়েকবার এমন ভাঙন দেখা গেছে। পরে সংস্কার করা হয়। কিন্তু কাজের মান ভালো না হওয়ায় আবারও একই অবস্থা সৃষ্টি হয়েছে। পুরো প্রকল্পে অনিয়ম ও দুর্নীতির ছাপ এখন স্পষ্ট।
সেতু এলাকার বাসিন্দা নিয়াজ আহমেদ বলেন, সংস্কারের নামে শুধু টাকা খরচ হচ্ছে, টেকসই কোনো কাজ হচ্ছে না। বারবার ধস নামছে, আর মানুষ জীবনের ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করছে। ১৫৩ কোটি টাকার সেতু ও সড়ক প্রকল্পে যদি এমন অবস্থা হয়, তাহলে কাজের মান নিয়ে প্রশ্ন উঠবেই।
স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) সূত্রে জানা গেছে, সবশেষ ২০২৪ সালে রংপুরের বুড়িরহাট থেকে গঙ্গাচড়ার শেষ প্রান্ত সিরাজুল মার্কেট পর্যন্ত তিস্তা সেতুর সংযোগ সড়কের প্রায় ১১ কিলোমিটার অংশ সংস্কার ও বর্ধিত করতে প্রায় ২৮ কোটি টাকা ব্যয় করা হয়। যৌথভাবে কাজটি বাস্তবায়ন করে মেসার্স খায়রুল কবির রানা, কে কে আর লিমিটেড ও বরেন্দ্র লিমিটেড নামের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান।
একই সময় লালমনিরহাট অংশের সিরাজুল মার্কেট থেকে কাকিনা পর্যন্ত সড়ক সংস্কারে ব্যয় হয় আরো তিন কোটি ৫৩ লাখ টাকা। কাজটি করে শাহাদাত এন্টারপ্রাইজ নামের একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান।
গঙ্গাচড়া উপজেলার লক্ষ্মীটারী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আব্দুল্লাহ আল হাদী বলেন, ‘এটি রংপুর-লালমনিরহাট অঞ্চলের অন্যতম ব্যস্ত সড়ক। বন্যা মৌসুম শুরুর আগেই এমন ধস উদ্বেগজনক। দ্রুত সংস্কার না হলে পুরো সড়ক ভেঙে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।’
এ ব্যাপারে গঙ্গাচড়া উপজেলা প্রকৌশলী শাহ মো. ওবায়দুর রহমান বলেন, ধসের খবর পাওয়ার পর ঘটনাস্থল পরিদর্শন করা হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত অংশ দ্রুত সংস্কারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
প্রসঙ্গত, রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলার উন্নয়ন এবং বুড়িমারী স্থলবন্দরসহ লালমনিরহাট জেলার বিভিন্ন উপজেলার সঙ্গে যোগাযোগ সহজ করতে তিস্তা নদীর ওপর নির্মিত দ্বিতীয় তিস্তা সেতুটি ২০১৯ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর উদ্বোধন করা হয়। প্রায় ১৫৩ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এ সেতু চালুর পর থেকে বিভিন্ন সময়ে সংযোগ সড়কে ধস, খানাখন্দ ও ভাঙনের ঘটনা ঘটেছে। কয়েক দফায় ভারী যানবাহন চলাচলও বন্ধ রাখতে হয়েছিল।





