অবকাঠামো নির্মাণ শেষে দেড় বছর আগে জেলা সিভিল সার্জনকে বুঝিয়ে দেওয়া হয় কুমিল্লার বরুড়া উপজেলার সোনাইমুড়ী ২০ শয্যার হাসপাতাল। নিয়োগ দেওয়া হয়েছে আবাসিক চিকিৎসকসহ জনবলও। তবু অজ্ঞাত কারণে এখনও চালু হয়নি হাসপাতালটি।
এদিকে, হাসপাতালটি হস্তান্তরের আগেই এর দেয়ালে ফাটল ধরে বলে জানা গেছে। চালু না হলেও বিদ্যুৎ বিল বকেয়া পড়েছে সোয়া চার লাখ টাকা।
জেলা স্বাস্থ্য প্রকৌশল সূত্রে জানা গেছে, ২০০২ সালে বিএনপি সরকারের আমলে তৎকালীন স্থানীয় সংসদ সদস্য এ কে এম আবু তাহেরের উদ্যোগে কুমিল্লার বরুড়া উপজেলার আদ্রা ইউনিয়নের সোনাইমুড়ি গ্রামে ২০ শয্যার হাসপাতালটি নির্মাণের কাজ শুরু হয়। ব্যয় ধরা হয় চার কোটি ১৩ লাখ টাকা। হাসপাতাল ভবনের প্রায় ৭০ শতাংশ কাজ শেষে অজ্ঞাত কারণে কাজ বন্ধ হয়ে যায়। দীর্ঘ দুই দশক পর ২০২৩ সালের ১৬ অক্টোবর পুনরায় অসমাপ্ত কাজ শেষ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। ছয় কোটি ৪৭ লাখ ৪৪ হাজার ৪৪০ টাকা ব্যয় নির্ধারণ করে কাজ শুরু করে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স কবির ট্রেডার্স। নির্ধারিত সময় নির্মাণ শেষ করে ২০২৪ সালের ৩ ডিসেম্বর ভবনটি জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়কে বুঝিয়ে দেওয়া হয়।
নথিপত্র পর্যালোচনা করে দেখা যায়, অকেজো পড়ে থাকা এ হাসপাতালে একজন আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা (আরএমও), দুইজন জুনিয়র কনসালট্যান্ট ও একজন চিকিৎসা কর্মকর্তাসহ মোট ১০ জনকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তবে তাদের কাউকেই হাসপাতালে আসতে দেখা যায় না। নিয়োগ পাওয়া আরএমও বর্তমানে নোয়াখালীর একটি হাসপাতালে সংযুক্তিতে রয়েছেন। একজন জুনিয়র কনসালট্যান্ট চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে এবং অন্যজন জাতীয় ক্যানসার গবেষণা ইনস্টিটিউটে কর্মরত। বাকি সাত কর্মীকে বরুড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে পাঠানো হয়েছে।
সম্প্রতি সরেজমিনে বরুড়া উপজেলার সোনাইমুড়ি গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, অযত্ন আর অবহেলায় পড়ে রয়েছে ২০ শয্যার হাসপাতালটি। কাগজে-কলমে অবকাঠামো প্রস্তুত থাকলেও ভেতরে নেই কোনো আসবাবপত্র, ওষুধ কিংবা চিকিৎসা সরঞ্জাম। মূল ভবনের পাশাপাশি চিকিৎসক ও নার্সদের জন্য রয়েছে আলাদা দুটি কোয়ার্টার। এছাড়া গাড়ি রাখার গ্যারেজ ও বিদ্যুৎ সাবস্টেশনের জন্য পৃথক ভবনও নির্মাণ করা হয়েছে।
তবে বাইরে থেকে চকচকে মনে হলেও সামনে যেতেই চোখে পড়ে অযত্ন আর অবহেলার ছাপ। হাসপাতাল ভবনের সামনের অংশের দেয়াল থেকে রঙের আস্তরণ খসে পড়ছে। পশ্চিম পাশে দোতলার বাইরের দেয়ালের একাধিক স্থানে ফাটল দেখা দিয়েছে। ভেতরে নিচতলার সিঁড়ির পাশের দেয়াল থেকেও আস্তরণ খসে পড়ছে। এতে নির্মাণ কাজের মান নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
নির্মাণ কাজ নিয়ে অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স কবির ট্রেডার্সের স্বত্বাধিকারী একরামুল কবির কালের কণ্ঠকে বলেন, প্রথমত কাজটি সরাসরি আমি করিনি। আমার প্রতিষ্ঠানের নামে অন্য একটি প্রতিষ্ঠান এই কাজ করেছে। আমি তাদের সঙ্গে কথা বলে আপনাকে দুই-তিন দিন পর জানাবো।
হাসপাতালটি দেখাশোনার দায়িত্বে থাকা মোতালেব জানান, গত তিন বছর ধরে তিনি ২৪ ঘণ্টা হাসপাতালটি পাহারা দিচ্ছেন। আগে মাসে ২০ হাজার টাকা করে পেলেও গত আট মাস ধরে তিনি মাত্র দুই থেকে তিন হাজার টাকা করে পাচ্ছেন। তিনি আরো জানান, বর্তমানে হাসপাতালের বকেয়া বিদ্যুৎ বিলের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে চার লাখ ২০ হাজার টাকায়। এ কারণে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়েছে। রাতে অন্ধকার ও গরমের মধ্যে পাহারা দিতে খুব কষ্ট হয়। ঠিকমতো টাকা না পাওয়ায় তিনি পরিবার নিয়েও কষ্টে রয়েছেন বলে জানান।
এদিকে, অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও জনবল থাকা সত্ত্বেও হাসপাতালটি চালু না হওয়ায় স্থানীয়রা ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তাদরে দাবি, হাসপাতালটি চালু হলে বরুড়া উপজেলার আদ্রা, পয়ালগাছা, বাউকসার, লক্ষ্মীপুর ও আড্ডা ইউনিয়ন এবং এর পাশের কচুয়া উপজেলার আশ্রাপুর ইউনিয়নের প্রায় দেড় লাখ মানুষ দোরগোড়ায় স্বাস্থ্যসেবা পাবে।
সোনাইমুড়ি গ্রামের বাসিন্দা মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, এলাকায় কেউ অসুস্থ হলে তাকে চিকিৎসার জন্য কুমিল্লা বা বরুড়া সদরে নিতে হয়। যাতায়াত সমস্যার কারণে সঠিক সময় চিকিৎসকের কাছে রোগীর পৌঁছানো সম্ভব হয় না। হাসপাতালটি চালু হলে এ অঞ্চলের মানুষের চিকিৎসা নিয়ে দুর্দশা লাঘব হবে। স্থানীয় সংসদ সদস্য গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী জাকারিয়া তাহেরের কাছে আমাদের একটাই চাওয়া, তিনি যেন দ্রুত হাসপাতালটি চালুর ব্যবস্থা করেন।
পদুয়ারপার গ্রামের বাসিন্দা শারমিন আক্তার বলেন, আমার বয়স যখন ছয় বছর, তখন থেকে দেখছি হাসপাতালটির কাজ চলে। মাঝে কিছুদিন বন্ধ থাকলেও এখন পুরোপুরি প্রস্তুত। কেন চালু হচ্ছে না, সেটাই আমাদের জানা নেই। রাত-বিরাতে বাচ্চারা অসুস্থ হলে ডাক্তার দেখাতে নেওয়ার পথে বড় ধরনের ক্ষতি হয়ে যাওয়ার ভয় থাকে।
বরুড়া উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা সাজিদুর রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, হাসপাতালটি চালু না হওয়ায় নিয়োগ পাওয়া ১০ জনকে অন্যত্র কাজ করতে হচ্ছে। বর্তমানে সাতজন কর্মী বরুড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে কর্মরত। হাসপাতালটি পরিপূর্ণভাবে চালু করতে আরো অন্তত ১৪ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী প্রয়োজন। সেইসঙ্গে আসবাবপত্র ও চিকিৎসা সরঞ্জামও বরাদ্দ পাওয়া যায়নি। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে লিখিতভাবে জানানো হয়েছে।
এ বিষয়ে কুমিল্লা সিভিল সার্জন ডা. আলী নূর মোহাম্মদ বশির আহমেদ বলেন, হাসপাতালটি চালু করার জন্য আমরা যে জনবল চেয়েছি। এর মধ্যে চিকিৎসকসহ ১০ জন আমাদের রয়েছে। বাকি জনবল ও আসবাবপত্র, চিকিৎসা সরঞ্জাম এবং ওষুধের বরাদ্দ পেলে শিগগির হাসপাতালটি চালু করতে পারবো বলে আমরা আশাবাদী।
হাসপাতাল ভবনের দেয়ালে ফাটলের বিষয়ে জানতে চাইলে স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর কুমিল্লার নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আবুল খায়ের বলেন, ভবনে স্ট্রাকচারাল (কাঠামোগত) কোনো সমস্যা নেই। হয়তো দেয়াল গাঁথুনি কারণে এমন হতে পারে। আপনার মাধ্যমে বিষয়টি জেনেছি, পরিদর্শন শেষে এ ব্যাপারে বিস্তারিত বলা যাবে।
বকেয়া বিদ্যুত বিলের বিষয়ে নির্বাহী প্রকৌশলী বলেন, এই টাকা ব্যবহারকারীকে দিতে হবে অর্থাৎ জেলা সিভিল সার্জন দেবেন।




