একটি পরিবারের বহুদিনের স্বপ্ন ছিল পবিত্র কাবাঘর জিয়ারত করা। সেই উপলক্ষে ওমরাহর নিয়তে ঘর ছেড়ে একই পরিবারের পাঁচজনের মধ্যে সৌদির মহাসড়কে নিভে গেল তিনজনের প্রাণ। ওই পরিবারের মা-ছোট ছেলে ও মেয়ে মারা গেছে। আর হাসপাতালে মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ছেন বাবা ও বড় ছেলে। সন্তানেরা প্রথমবারের মতো চোখ ভরে দেখবে বায়তুল্লাহ, সেই স্বপ্ন নিয়েই গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে সৌদি আরবের রিয়াদ থেকে মক্কার উদ্দেশে রওনা হয়েছিল পরিবারের পাঁচ সদস্য। কিন্তু আল্লাহর ঘরের পথে সেই যাত্রাই হয়ে উঠল তাদের জীবনের শেষ সফর।
শুক্রবার (২৪ জুলাই) বিকেলে ফরিদপুরের সালথা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. দবির উদ্দিনের কথা হলে তিনি জানান, হাসপাতালে আহত শফিকুল ইসলাম খোকন নিজেই প্রাইভেটকারটি চালাচ্ছিলেন।
এর আগে গতকাল বৃহস্পতিবার (২৩ জুলাই) বাংলাদেশ সময় বিকেল ৩টার দিকে রিয়াদ থেকে প্রায় ৩০০ কিলোমিটার দূরে ঘটে এই হৃদয়বিদারক দুর্ঘটনা।
দুর্ঘটনায় নিহতরা হলেন ফরিদপুরের সালথা উপজেলার আটঘর ইউনিয়নের আটঘর গ্রামের সাবেক চেয়ারম্যান মরহুম নাজিমুদ্দিন মোল্লার মেয়ে তানিয়া তাহমিনা রিনা (৪৫), তার ছেলে তাসবিক (২০) এবং মেয়ে জারা (১৫)। আহত হয়েছেন রিনার স্বামী শফিকুল ইসলাম খোকন ও বড় ছেলে নাবিল। তারা সৌদির স্থানীয় একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।
স্বজনরা জানান, সকালে সবাই আনন্দ-উচ্ছ্বাসে রওনা হয়েছিলেন। পরিবারের সদস্যদের বহনকারী প্রাইভেটকারটি রিয়াদ-মক্কা মহাসড়ক দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছিল। প্রায় ৩০০ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করার পর পেছন থেকে দ্রুতগতির একটি ভারী যান সজোরে ধাক্কা দেয় গাড়িটিকে। প্রচণ্ড আঘাতে দুমড়ে-মুচড়ে যায় প্রাইভেটকারটি। ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান তানিয়া তাহমিনা রিনা, তার কলেজপড়ুয়া ছেলে তাসবিক এবং কিশোরী মেয়ে জারা। আহত শফিকুল ইসলাম ও নাবিলকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নেওয়া হয়। চিকিৎসকরা তাদের নিবিড় পর্যবেক্ষণে রেখেছেন।
শফিকুল ইসলামের গ্রামের বাড়ি কিশোরগঞ্জের ভৈরবে হলেও প্রায় ২৬ বছর ধরে তিনি পরিবার নিয়ে সৌদি আরবের রিয়াদে বসবাস করছিলেন। সন্তানদের বড় করেছেন প্রবাসেই। কর্মব্যস্ত জীবনের ফাঁকে পরিবারের সঙ্গে ওমরাহ পালন ছিল তাদের বহুদিনের আকাঙ্ক্ষা। কিন্তু সেই আকাঙ্ক্ষাই হয়ে উঠল এক পরিবারের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি।
নিহতের ভাই তৌহিদ মোহাম্মাদ মুরাদ বলেন, পরিবারের সবাই ওমরাহর উদ্দেশ্যে বের হয়েছিল। পথে তাদের গাড়িকে পেছন থেকে একটি বড় যানবাহন ধাক্কা দেয়। ঘটনাস্থলেই তার বোন, ভাগ্নে ও ভাগ্নির মৃত্যু হয়। ভগ্নিপতি ও বড় ভাগ্নে গুরুতর আহত অবস্থায় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।
নিহতের মামাতো ভাই নাসিম আহমেদ কবীর জানান, দুর্ঘটনার সংবাদ পাওয়ার পর থেকেই দেশে-বিদেশে থাকা স্বজনদের মধ্যে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। সবাই আহতদের সুস্থতার জন্য দোয়া করছেন।
সালথা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) দবির উদ্দিন বলেন, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী মহোদয় যোগাযোগ রাখছিলেন লাশ দেশে আসার বিষয়টি নিয়ে। তবে সড়ক দুর্ঘটনায় লাশের অবস্থা বিকৃত হয়ে গিয়েছিল। তাই সৌদির মাটিতেই তাদের তিনজনের দাফন ইতিমধ্যেই সম্পন্ন হয়েছে।
তিনি বলেন, নিহত ও আহতরা সবাই সৌদিতেই প্রবাস জীবন যাপন করতেন। নিহত তানিয়া তাহমিনার স্বামী আহত সফিকুল ইসলাম সেখানে চাকরি করতেন। তার গ্রামের বাড়ি কিশোরগঞ্জের ভৈরব উপজেলায় হলেও ঢাকার উত্তরার বাড়িতে তার মা থাকেন বলে জানতে পেরেছি।






