kalerkantho

সোমবার । ৯ কার্তিক ১৪২৮। ২৫ অক্টোবর ২০২১। ১৭ রবিউল আউয়াল ১৪৪৩

বেনাপোলে স্মরণকালের ভয়াবহ যানজট, ভোগান্তির শেষ নেই

বেনাপোল প্রতিনিধি   

১৬ সেপ্টেম্বর, ২০২১ ২০:৫২ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



বেনাপোলে স্মরণকালের ভয়াবহ যানজট, ভোগান্তির শেষ নেই

দেশের সর্ববৃহৎ বেনাপোল স্থলবন্দরের বিপরীতে ভারতের পেট্রোপোল বন্দরের জায়গা সংকটের কারণে বেনাপোল বন্দর দিয়ে রপ্তানি বাণিজ্যে বড় ধরনের প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হচ্ছে। এতে করে ভারতে প্রবেশের অপেক্ষায় শত শত রপ্তানি পণ্য বোঝাই ট্রাক গত ১৫ দিন ধরে বেনাপোল বন্দরসহ আশপাশের প্রধান সড়ক এলাকায় অবস্থান করছে। যার ফলে এ বন্দর এলাকায় তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়েছে। তীব্র যানজটে বেনাপোল স্থলবন্দর কার্যত অচল হয়ে পড়ছে।

বেনাপোল স্থলবন্দরের চেকপোস্ট রপ্তানি গেট থেকে বেনাপোলের আমড়াখালি পর্যন্ত প্রায় চার কিলোমিটার সড়ক যানজটে এলাকাবাসীসহ পাসপোর্টধারী যাত্রীদের ভোগান্তির শিকার হতে হচ্ছে। ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, এই সংকট কৃত্রিমভাবে তৈরি করা হচ্ছে। ভারত প্রতিদিন এ বন্দর দিয়ে বাংলাদেশে ৩০০ থেকে ৩৫০ ট্রাক পণ্য রপ্তানি করলেও বাংলাদেশি পণ্য নেওয়ার ক্ষেত্রে তারা বরাবরই প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে। ভারত আগে ১৫০ থেকে ২০০ ট্রাক রফতানি পণ্য গ্রহণ করলেও বর্তমানে ৯০ থেকে ১০০ ট্রাক রপ্তানি পণ্য গ্রহণ করছে। দীর্ঘদিন ধরে এ অবস্থা বিরাজ করলেও প্রশাসনের কোনো কর্তা ব্যক্তিকে তা নিরসনে এগিয়ে আসতে দেখা যায়নি। এ নিয়ে বন্দর এলাকায় বসবাসকারী হাজার হাজার মানুষ ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।

বেনাপোল বন্দর দিয়ে রপ্তানি বেড়ে যাওয়ায় প্রতিদিন ২০০ থেকে ২৫০ ট্রাক রপ্তানি পণ্য নিয়ে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে বাংলাদেশি ট্রাক আসছে বেনাপোল বন্দরে। কিন্তু ভারতীয় কর্তৃপক্ষ স্থান সংকটসহ নানা সমস্যা দেখিয়ে প্রতিদিন ৯০ থেকে ১০০ ট্রাক পণ্য গ্রহণ করায় প্রতিদিন ট্রাকের লাইন বাড়ছে। বেনাপোল স্থলবন্দরের রপ্তানি গেট থেকে আমড়াখালি পর্যন্ত প্রায় চার কিলোমিটার মূল সড়কের দুই পাশে ট্রাক রেখে দেওয়ায় মূল সড়ক যানজটে এলাকাবাসীসহ পাসপোর্টধারী যাত্রীদের ভোগান্তির শিকার হতে হচ্ছে। রপ্তানি পণ্যবাহী ট্রাকের কারণে রিকশা-ভ্যানও যাতায়াত করতে পারছে না। ফলে পাসপোর্টধারী যাত্রীদের দুর্ভোগের শিকার হতে হচ্ছে। অনেকে হেঁটে চেকপোস্টে যেতে বাধ্য হচ্ছেন। বিশেষ করে স্কুল কলেজগামী ছাত্র-ছাত্রী, রোগী, মহিলা ও শিশুদের কষ্টের অন্ত নেই। এমন অবস্থার প্রেক্ষিতে বন্দর ব্যবহারকারী বিভিন্ন সংগঠন সভা করে ও কাস্টমস কর্তৃপক্ষ বেনাপোল-পেট্রাপোল বন্দরে রপ্তানি বাণিজ্য রাত ১১টা পর্যন্ত বৃদ্ধি করা হলেও সমস্যার কোনো সমাধান হচ্ছে না। এর আগে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত চলতো রপ্তানি কার্যক্রম।

সরেজমিনে দেখা গেছে, যশোর-বেনাপোল মহাসড়কের উপরে যত্রতত্র পণ্যবোঝাই অন্তত এক হাজার বাংলাদেশি ট্রাক ভারতে প্রবেশের অপেক্ষায় মূল সড়কে দাঁড়িয়ে রয়েছে। জায়গা না থাকায় ভারতের পেট্রাপোল স্থলবন্দর থেকে আমদানি পণ্যবোঝাই ট্রাকও বাংলাদেশে প্রবেশ করতে পারছে না।

ব্যবসায়ীরা জানান, বাংলাদেশ থেকে প্রতিদিন পণ্য নিয়ে যত ট্রাক ভারতের পেট্রাপোল বন্দরে যায়, সেগুলোর স্থান সংকুলান করতে পারছে না সেখানকার বন্দর কর্তৃপক্ষ। কারণ, সেখানেও পণ্য নিয়ে বাংলাদেশমুখী প্রায় ৯০০ ট্রাক দাঁড়িয়ে আছে।
তবে অনেক ব্যবসায়ী এই দীর্ঘ যানজটের সাথে অর্থনৈতিক লেনদেনের বিষয়কে প্রাধান্য দিয়েছেন। বেনাপোলের ট্রাক শ্রমিক সংগঠনের নেতারা পরিকল্পিত ভাবে যানজট সৃষ্টি করে নিজেরাই হাজার হাজার টাকা আদায় করেছেন গোপনে। বন্দর কর্তৃপক্ষ রপ্তানি পণ্যের ট্রাক নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিলে তারা এই টাকা থেকে বঞ্চিত হবে এই কারণে ট্রাক শ্রমিকদের সিরিয়ালের নামে এই যানজট সৃষ্টি করে রাখে। এতে প্রতিদিন হাজার হাজার টাকা ক্ষতি গুনতে হচ্ছে ব্যবসায়ীদের। ভারতের পেট্রাপোল বন্দরে পণ্য খালাসের ওয়্যার হাউজ ও টার্মিনাল না থাকায় ব্যাহত হচ্ছে রফতানি বাণিজ্য।

দীর্ঘদিন ধরে যানজট বেনাপোল স্থলবন্দরের আমদানি-রপ্তানি ব্যাহত করলেও সমস্যা সমাধানের কোনো উদ্যোগ নেই। যানজট নিরসনের জন্য জরুরি ভিত্তিতে বেনাপোলে স্থায়ী ট্রাফিক পুলিশ নিয়োগ ও ট্রাক টার্মিনাল নির্মাণ করা প্রয়োজন বলে বন্দর ব্যবহারকারী বিভিন্ন সংগঠন দাবি জানিয়েছেন।

বেনাপোল ট্রাক-লরি শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক মো. শাহীন জানান, বর্তমানে বাংলাদেশ থেকে প্রচুর পরিমাণে সয়াবিনের ভূষি, পাট ও পাটজাত দ্রব্য এবং গার্মেন্ট, সাবান, ব্যাটারি, গার্মেন্টস ঝুট ভারতে রপ্তানি হচ্ছে। যার কারণে প্রতিদিন এসব পণ্য নিয়ে ২০০-২৫০ ট্রাক ভারতে প্রবেশের জন্য বেনাপোল বন্দরে আসছে। এ কারণে বেনাপোল বন্দর এলাকায় তীব্র যানজট সৃষ্টি হচ্ছে। আর তা ছাড়া বেনাপোল বন্দরে রপ্তানি পণ্যের ট্রাক রাখার কোনো টার্মিনাল নেই।

বেনাপোল সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মফিজুর রহমান সজন বলেন, বর্তমানে বাংলাদেশ থেকে প্রতিদিন প্রচুর পরিমাণে সয়াবিন স্ট্রাকশন, চাউলের ভূষিসহ অন্যান্য পণ্য রপ্তানি হচ্ছে ভারতে। ফলে প্রতিদিন এসব পণ্য বোঝাই প্রায় ২৫০টি ট্রাক ভারতে প্রবেশের জন্য বেনাপোল বন্দরে আসছে। কিন্তু ভারতীয় কর্তৃপক্ষ প্রতিদিন নিচ্ছে মাত্র ১০০ ট্রাক রপ্তানি পণ্য। এই কারণেই এত ট্রাক বেনাপোলে আটকে থাকছে যার ফলে বাড়ছে ভোগান্তি। এখন যে পরিমাণ যানজট হয়েছে মানুষজন চলাচল, বেনাপোল বাজার, বন্দর কাস্টমস এলাকাসহ সমস্ত এলাকা এক্সপোর্টের গাড়িতে ভরে গেছে। ভারতের পাশে কাস্টমস, বিএসএফ ও ব্যবসায়ীদের সাথে আমাদের বৈঠক আছে আমরা এ বিষয়গুলো নিয়ে জরুরিভাবে সমাধানের চেষ্টা চালাচ্ছি।

বেনাপোল বন্দরের উপ পরিচালক (ট্রাফিক) মামুন কবীর তরফদার জানান, বেনাপোল বন্দর দিয়ে ভারতের পেট্রাপোল বন্দরের সঙ্গে আমদানি পণ্যের পাশাপাশি পণ্য রফতানি বেড়েছে দ্বিগুণ। পেট্রাপোল বন্দর বাংলাদেশ থেকে প্রতিদিন আগে ১৫০ থেকে ২০০ ট্রাক রপ্তানি পণ্য গ্রহণ করলেও বর্তমানে ৯০ থেকে ১০০ ট্রাক রপ্তানি পণ্য গ্রহণ করছে। যার ফলে প্রায় এক হাজার থেকে ১২০০ ট্রাক পণ্য বোঝাই ট্রাক ভারতে প্রবেশের অপেক্ষায় বেনাপোল বন্দরে অবস্থান করছে। এতে বন্দর এলাকায় আমদানি-রপ্তানি পণ্য খালাসে ব্যাহত হচ্ছে।

তিনি আরো জানান, রপ্তানি বাণিজ্য আরো গতিশীল করতে সম্প্রতি ভারতের পেট্রাপোল বন্দরের কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করা হয় এবং তারা প্রতিদিন সকল ৬টা থেকে রাত ১১টা পর্যন্ত দুই শ‘র অধিক রপ্তানি পণ্যের ট্রাক নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছে। দ্রুত যাতে এক্সপোর্ট এর গাড়িগুলো ভারতে প্রেরণ করা যায় সে লক্ষে কাজ করছি। 



সাতদিনের সেরা