kalerkantho

বুধবার । ৭ আশ্বিন ১৪২৮। ২২ সেপ্টেম্বর ২০২১। ১৪ সফর ১৪৪৩

অনলাইন থ্রেটে বগুড়া সাইবার পুলিশে আস্থা

না বুঝে ফাঁদে পা দেয় বেশি নারীরা

নিজস্ব প্রতিবেদক, বগুড়া   

৬ আগস্ট, ২০২১ ০৩:৪৯ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



অনলাইন থ্রেটে বগুড়া সাইবার পুলিশে আস্থা

গোপালগঞ্জ পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের তৃতীয় বর্ষের ছাত্র বশির উল্লাহ সরদার (২২)। তাঁর সহযোগী আজহার উদ্দিন আবির (১৯) চাঁদপুর সরকারি কলেজের ছাত্র। ফ্যাবিহ্যাক্সর (FabiHaxor) ও রুট স্ক্রিপ্ট (Root Script) ছদ্মনাম ধারণ করে গত ডিসেম্বর ও জানুয়ারিতে দেশে সরকারি এবং বড় প্রতিষ্ঠানের বেশ কিছু ওয়েবসাইট হ্যাক করে তাঁরা। দুজনেরই উদ্দেশ্য ছিল ওয়েবসাইটের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সেটা আন্তর্জাতিক হ্যাকার পেজ ‘জন-এইচএ’ ফাঁস করা। একই সঙ্গে তাঁরা বাংলাদেশের হ্যাকারদের শক্তিশালী গ্রুপেরও (ব্ল্যাক ওয়েব) সদস্য। ব্ল্যাক ওয়েব গ্রুপটি এ পর্যন্ত দেশি-বিদেশি প্রায় তিন হাজার ৬৮৯টি ওয়েবসাইট হ্যাক করেছে। আবিরের ব্ল্যাকওয়েবের সঙ্গে কাজ করে অর্ধশতাধিক তরুণ। সম্প্রতি বগুড়া সাইবার ক্রাইম পুলিশের অভিযানে ভণ্ডুল হয়ে যায় দেশবিরোধী এই চক্রান্ত। আবিরের কাছ থেকে জব্দ করা কম্পিউটারে হ্যাকিং সম্পর্কিত ৩৬ গিগাবাইট ফাইল ও ওয়েবসাইট হ্যাকিংয়ের বিভিন্ন টুলসের হদিস মেলে।

মির্জা শামীম হাসান সনি ছিলেন বিকৃতমনা ধূর্ত সাইবার অপরাধী। সম্প্রতি তাঁকেই খুঁজে বের করে বগুড়ার সাইবার ক্রাইম পুলিশ। সনি কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের মেয়েদের নামে ভুয়া ফেসবুক আইডি খুলে কুৎসা ছড়ানো, ছবি দিয়ে মানহানিকর মিথ্যা তথ্যের মাধ্যমে চাতুরী করতেন। তাঁকে গ্রেপ্তারের মাধ্যমে সাঙ্গ হয় বিকৃতমনা সাইবার অপরাধীর অশুভ তৎপরতা।

বগুড়াসহ দেশের ভেতর বিভিন্ন গুরুতর অনলাইন থ্রেট নিয়ে কাজ করে যাচ্ছে বগুড়ার সাইবার ক্রাইম পুলিশ। মাত্র তিন বছরে এই কার্যক্রম চলাকালে তাদের সফলতার ঝুলিও বেশ বড়। আর সাম্প্রতিক সময়ে সাইবার অপরাধের শিকার ভুক্তভোগীদের জন্য আশার আলো পুলিশের এই কার্যক্রমটি।

গৃহবধূ বৃষ্টি চৌধুরী ঘনিষ্ঠ বান্ধবীদের কাছে একদিন নিজের কিছু ব্যক্তিগত ছবি শেয়ার করেন। হঠাৎ সেই ফোনটি নষ্ট হলে চলে যায় মেকারের হাতে। সেখান থেকেই কপি হয়ে যায় সব ছবি। এরপর বৃষ্টি চৌধুরীর ব্যক্তিগত ছবিগুলো ব্যবহার করে তৈরি করা হয় পর্নো সাইটের পেজ। তাতে মোবাইল ফোন নম্বরও দেওয়া হয়। রাত-দিন হয়রানি ও আজেবাজে মেসেজ ওই গৃহবধূর জীবনকে করে তোলে দুর্বিষহ। শেষ পর্যন্ত বগুড়ার সাইবার পুলিশের হস্তক্ষেপে বিভীষিকাময় এক জীবন থেকে মুক্তি পান তিনি।

জানা যায়, গেল তিন বছরে দুই শতাধিক সাইবার অপরাধের নিষ্পত্তি করেছে বগুড়া সাইবার পুলিশ ইউনিট। এসব অভিযোগকারীর মধ্যে গৃহবধূ ও স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের সংখ্যাই বেশি। এ ছাড়া বঙ্গবন্ধু, প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রিসভার সদস্যদের নামে অপপ্রচার, পদ্মা সেতু নিয়ে গুজব ছড়ানোর মতো অপরাধীদেরও গ্রেপ্তার করা হয়।

বগুড়ার পুলিশ সুপার (এসপি) আলী আশরাফ ভূঞার উদ্যোগে ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বরে বগুড়ায় পরীক্ষামূলকভাবে সাইবার ক্রাইম পুলিশের কার্যক্রম শুরু হয়। শুরুতেই ব্যাপক সাড়া ফেলায় ২০১৯ সালের ২৪ জানুয়ারি রাজশাহী রেঞ্জের তৎকালীন ডিআইজি এম খুরশীদ হোসেন বগুড়ায় এসে পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে সাইবার পুলিশ বগুড়া ইউনিটের আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম উদ্বোধন করেন। ফেসবুকে গুজব রটানো, রাষ্ট্রবিরোধী প্রচার, জঙ্গি তৎপরতাসহ সাইবার অপরাধ দমনে তৎপর সাইবার পুলিশ ইউনিট। বিশেষ করে ফেসবুক বা বিভিন্ন অনলাইন যোগাযোগ মাধ্যমে প্রতারণার শিকার নারীরা তাঁদের অভিযোগ নিয়ে আসতে শুরু করেন সাইবার পুলিশের কাছে। তাঁদের পরিচয় গোপন রেখে এবং অনেকের পরিবারকে না জানিয়ে সমস্যা সমাধান করা হয়।

বগুড়ার পুলিশ সুপার আলী আশরাফ ভূঞা বলেন, সিনিয়র কর্মকর্তাদের সহযোগিতার কারণে এসব অর্জন সম্ভব হয়েছে। সাইবার পুলিশের কার্যক্রম শুরুর পর থেকে এখন পর্যন্ত নিষ্পত্তি হয়েছে ২২০টি অভিযোগ। মামলা হয়েছে ৩৫টি এবং অভিযোগকারী মামলা না করায় বিকল্পভাবে নিষ্পত্তি করা হয় আরো ১৮৫টি অভিযোগ। ১৮৫টি অভিযোগের বেশির ভাগই স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও গৃহবধূদের।

পুলিশ সুপার বলেন, যেসব মামলা হচ্ছে সেগুলোর মধ্যে রয়েছে সরকারি ওয়েবসাইট হ্যাক, ক্রিপ্টোকারেন্সি, বঙ্গবন্ধু, প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রিসভার নামে অপপ্রচার, পদ্মা সেতু নিয়ে গুজব ও রাষ্ট্রবিরোধী প্রচারণা, প্রতারণামূলক অর্থ হাতিয়ে নেওয়া, ছাত্রীর ফেসবুক আইডি হ্যাক করে ইউটিউবে ছবি ও ভিডিও প্রকাশ, পুলিশ বাহিনীকে গালমন্দ করে ফেসবুকে লাইভসহ আরো অনেক সাইবার অপরাধ।

সাইবার থ্রেটের আরো একটি বড় মাধ্যম হলো অনলাইনে টাকা লেনদেন (ক্রিপ্টোকারেন্সি)। বগুড়া সাইবার পুলিশ এই চক্রের তিন সদস্যকেও গ্রেপ্তার করে। ক্রিপ্টোকারেন্সি ব্যবসায় জড়িত চক্রটি একশ্রেণির গ্রাহকের কাছ থেকে বিটকয়েন, বিটকয়েন ক্যাশ, লাইটকয়েন, ওয়েবমানি, পারফেক্ট মানি কেনাবেচা করে। গ্রাহক চক্রটির কাছে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে প্রথমে টাকা পাঠায়, বিনিময়ে চক্রটি গ্রাহকের চাহিদামতো অনলাইন ওয়ালেট বা অ্যাকাউন্টে  ক্রিপ্টোকারেন্সি পাঠিয়ে দেয়। চক্রটি কারো কাছে ক্রিপ্টোকারেন্সি পাঠায়, আবার কারো কাছে কারেন্সি না পাঠিয়ে টাকা আত্মসাৎ করে। সাইবার পুলিশ বগুড়া ইউনিট বেশ কয়েক মাস ধরে এমন কিছু বিট কয়েন কারবারির ওপর নজর রাখে। তারা বেশ খোলামেলাভাবে অনলাইনে এই অবৈধ কারবার করে আসছিল। এমন একটি চক্রের তিন সদস্যকে হবিগঞ্জের মাধবপুর ও লক্ষ্মীপুরের রায়পুরে অভিযান চালিয়ে বগুড়া সাইবার পুলিশ গ্রেপ্তার করে।



সাতদিনের সেরা