জয়পুরহাটের কালাই উপজেলার চাঁন্দাইর দারুলউলুম দ্বিমুখী দাখিল মাদরাসার এক শিক্ষক দীর্ঘদিন ধরে ঢাকায় অবস্থান করলেও তাঁর নামে নিয়মিত হাজিরা দেখিয়ে সরকারি বেতন-ভাতা উত্তোলনের অভিযোগ উঠেছে। একই সঙ্গে তাঁর পরিবর্তে অন্য একজন শ্রেণিকক্ষে পাঠদান করছেন এবং হাজিরা খাতায়ও তাঁর পক্ষে স্বাক্ষর করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। ঘটনাটি এলাকায় ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার জন্ম দিয়েছে।
সরেজমিন বৃহস্পতিবার (২৩ জুলাই) মাদরাসায় গিয়ে দেখা যায়, অন্যান্য শিক্ষক যথারীতি ক্লাস নিলেও সহকারী জুনিয়র মৌলভী ফুয়াদ হোসেনকে প্রতিষ্ঠানে পাওয়া যায়নি। তাঁর নির্ধারিত শ্রেণিতে পাঠদান করাচ্ছিলেন জাহিদ নামে এক ব্যক্তি। হাজিরা খাতা পর্যালোচনায় দেখা যায়, ফুয়াদ হোসেনের নামের বিপরীতে নিয়মিত উপস্থিতি দেখানো হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, তাঁর পরিবর্তে জাহিদই হাজিরা খাতায় স্বাক্ষর করছেন।
উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিস সূত্রে জানা যায়, আহাম্মেদাবাদ ইউনিয়নের ঝামুটপুর গ্রামে অবস্থিত চাঁন্দাইর দারুলউলুম দ্বিমুখী দাখিল মাদরাসাটি ১৯৮৫ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটিতে প্রায় ২৫০ জন শিক্ষার্থী এবং ১৮ জন শিক্ষক-কর্মচারী রয়েছেন।
মাদরাসা সূত্রে জানা যায়, এনটিআরসিএর সুপারিশে ফুয়াদ হোসেন ২০২৫ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর ইবতেদায়ি শাখায় সহকারী জুনিয়র মৌলভী হিসেবে যোগদান করেন। অভিযোগ রয়েছে, যোগদানের পর থেকেই তিনি নিয়মিত শ্রেণিকক্ষে অনুপস্থিত থাকেন। প্রতি মাসে বেতন-ভাতা উত্তোলনের সময় এক-দুই দিনের জন্য মাদরাসায় এলেও বাকি সময় ঢাকায় অবস্থান করেন। এ সময়ে তাঁর পরিবর্তে অন্য একজন পাঠদান করেন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ফুয়াদ হোসেন বর্তমানে ঢাকায় অবস্থান করে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করছেন। স্থানীয়দের দাবি, তাঁর অনুপস্থিতিতে জাহিদ নামে এক ব্যক্তি দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষার্থীদের পাঠদান করছেন। বিষয়টি মাদরাসা কর্তৃপক্ষের জ্ঞাতসারেই চলছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে মাদরাসার একাধিক শিক্ষক বলেন, ফুয়াদ নিয়মিত মাদরাসায় আসেন না। মাসে একবার এসে প্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে চলে যান। বাকি সময় অন্য একজন ক্লাস নেন। বিষয়টি প্রতিষ্ঠানের প্রায় সবাই জানেন।
স্থানীয় অভিভাবকদের অভিযোগ, এমনিতেই শিক্ষার্থীসংখ্যা কমছে। এর মধ্যে একজন শিক্ষক নিয়মিত অনুপস্থিত থাকায় শিক্ষার মান আরো ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তারা ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান।
জাহিদ নামে পাঠদানকারী ব্যক্তি বলেন, ‘ফুয়াদ ঢাকায় থাকেন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করছেন। তাই কয়েক মাস ধরে তাঁর ক্লাস আমি নিচ্ছি।’ তবে তিনি কী ভিত্তিতে পাঠদান করছেন কিংবা এ বিষয়ে কোনো নিয়োগ বা অনুমোদন রয়েছে কি না—এ প্রশ্নের সন্তোষজনক উত্তর দিতে পারেননি।
এদিকে অভিযুক্ত শিক্ষক ফুয়াদ হোসেনের ব্যবহৃত মোবাইলফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি।
মাদরাসার সুপার হাফিজার রহমান বলেন, ‘ফুয়াদ এক মাসের ছুটিতে রয়েছেন। বর্তমানে তিনি ক্লাস নিচ্ছেন না।’ তবে ছুটিতে থাকা অবস্থায়ও তাঁর নামে হাজিরা, বেতন-ভাতা উত্তোলন এবং অন্য একজনের মাধ্যমে পাঠদানের অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি স্পষ্ট কোনো ব্যাখ্যা না দিয়ে বিষয়টি এড়িয়ে যান।
এ বিষয়ে কালাই উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) মনসুর রহমান বলেন, ‘বিষয়টি আমার জানা ছিল না। ঢাকায় অবস্থান করে অন্য কাউকে দিয়ে পাঠদান করানোর কোনো সুযোগ নেই। অভিযোগের সত্যতা যাচাই করে তদন্তপূর্বক প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’