kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ২১ নভেম্বর ২০১৯। ৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ২৩ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

টাকা-মাছ-ডিজেল চাঁদা হিসেবে দিতে হয় সাগরফেরৎ জেলেদের

দস্যুর ভূমিকায় শরণখোলা নৌপুলিশ!

শরণখোলা (বাগেরহাট) প্রতিনিধি   

৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ১৬:১৪ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



দস্যুর ভূমিকায় শরণখোলা নৌপুলিশ!

জীবনের ঝুঁকি নিয়ে গভীর সাগর থেকে ইলিশ আহরণ করে ফেরার পথে বলেশ্বর নদে নৌপুলিশের হাতে হয়রানির শিকার হতে হচ্ছে জেলেদের। নগদ টাকা, মাছ এমনকি ডিজেলও চাঁদা হিসেবে দিতে হচ্ছে তাদের। প্রতিবাদ করলে নানা রকম ভয়ভীতি দেখানো হচ্ছে। বাগেরহাটের শরণখোলার ধানসাগর নৌপুলিশের বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ করেন জেলে-মহাজনরা। 

তারা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, সুন্দরবন ও বঙ্গোপসাগর দস্যুমুক্ত হয়েছে। গত দুই বছর ধরে জেলে-মহাজনরা শান্তিতে মাছ শিকার ও ব্যবসা-বাণিজ্য করে আসছে। প্রতি বছর জেলেদের জিম্মি করে লাখ লাখ টাকা চাঁদা আদায় করতো দস্যুরা। কিন্তু দস্যুতা বন্ধ হলেও সম্প্রতি নৌপুলিশ দস্যুদের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে। দস্যুদের চেয়েও ভয়ঙ্কর হয়ে উঠেছে তারা।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ধানসাগর নৌপুলিশ ফাঁড়ির একটি দল নিয়মিত টহলের নামে বলেশ্বর নদের বগী, নলী, সুপতির মোহনা, কচিখালীর মোহনা এবং সুন্দরবনের ভোলা, শ্যালা, দুধমুখী নদসহ কটকা এলাকা পর্যন্ত চাঁদার রুট হিসেবে বেছে নিয়েছে। এমনকি বাগেরহাট জেলার এ নৌপুলিশ পিরোজপুর ও বরগুনা জেলার নৌসীমানার মধ্যে গিয়ে চাঁদা আদায়ের অভিযোগও রয়েছে। পুলিশের এ চাঁদাবাজিতে মৎস্যজীবীরা এখন অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে। 

পিরোজপুরের পাড়েরহাট এলাকার মৎস্য আড়ৎদার আ. হালিম জানান, গত ২৮ আগস্ট তার দাদন দেওয়া চারটি ট্রলার সাগর থেকে মাছ ধরে উঠে আসার সময় বলেশ্বর নদের নলী এলাকায় ধানসগার নৌপুলিশ ট্রলারগুলো আটক করে। পরে চার ট্রলার থেকে দেড় হাজার টাকা, চারটি ইলিশ মাছ ও এক টিন ডিজেল নিয়ে ছেড়ে দেয়।

মঠবাড়িয়া উপজেলার জলাধার এলাকার মৎস্য আড়ৎদার বাদল গাজী জানান, গত ১ ও ২ সেপ্টেম্বর বলেশ্বর নদীর পিরোজপুর জেলার নৌসীমানার শাপলেজা ও ভাইজোড়া এলাকায় ঢুকে ১০-১২টি ট্রলার জিম্মি করে চাঁদা আদায় করে শরণখোলার নৌপুলিশ। যেসব ট্রলারে টাকা ছিল না সেসব   ট্রলারের জেলেদের বাড়ি পাঠিয়ে টাকা এনে দেওয়ার পর তাদেরকে ছেড়েছে।

শরণখোলা মৎস্য আড়ৎদার সমিতির সভাপতি দেলোয়ার হোসেন ফরাজী জানান, গত ২৯ আগস্ট নৌ-পুলিশ তার একটি ফিসিং ট্রলার আটকে এক হাজার টাকা চাঁদা নিয়েছে। এ ছাড়া গত ২৭ আগস্ট উপজেলার রাজাপুর এলাকার ইব্রাহীম খাঁনের এফবি মায়ের দোয়া ফিশিং ট্রলারটি বঙ্গোপসাগর থেকে মাছ ধরে ফেরার পথে বলেশ্বর নদীতে আটক করে চাঁদা দাবি করা হয়। কিন্তু জেলেদের কাছে টাকা না থাকায় পুলিশ মাছ ধারার পারমিট ও বিএলসির কাগজ রেখে ট্রলার ছেড়ে দেয়। পরে তাদের টাকা দিয়ে ওই কাগজ ছাড়িয়ে আনতে এক সপ্তাহ দেরি হওয়ায় বন বিভাগের কাছে তাদের জরিমানা গুনতে হয়েছে।

রায়েন্দা বাজারের মৎস্য ব্যবসায়ী বিলাস রায় কালু জানান, সাগর থেকে ফিরে আসার পর চরদুয়ানী, জ্ঞানপাড়া থেকে শুরু করে বলেশ্বর নদীর বগী ও রামপালের হেড়মা পর্যন্ত ঘাটে ঘাটে পুলিশকে চাাঁদা দিতে হয়। তারা এখন বন ও জলদস্যুদের ভূমিকা পালন করছে।

বাগেরহাট জেলা ফিশিং ট্রলার মালিক সমিতির সভাপতি ও জাতীয় মৎস্যজীবী সমিতির শরণখোলা শাখার সভাপতি মো. আবুল হোসেন বলেন, বনবিভাগরে কাছ থেকে পাস-পারমিট নিয়ে বৈধভাবে জেলেরা বঙ্গোপসাগরে মাছ ধরতে যায়। জীবন-জীবিকার তাগিদে সাগরের উত্তাল ঢেউয়ের সাথে যুদ্ধকরে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তারা মাছ ধরে নিয়ে আসে। তাদের কাছ থেকে পুলিশের চাঁদা আদায় অত্যন্ত দুঃখজনক। তারা জেলেদের নিরাপত্তা না দিয়ে হয়রানি করছে। 

জানতে চাইলে বনবিভাগের শরণখোলা রেঞ্জের বগী স্টেশন কর্মকর্তা (এসও) মিজানুর রহমান বলেন, জেলেরা পারমিট নেওয়ার সময় নদীতে নৌপুলিশের চাঁদা আদায়ের কথা প্রায়ই অভিযোগ করেন। কিন্তু এ বিষয়ে তাদের কিছু করার নেই। 

শরণখোলার ধানসাগর নৌপুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ এসআই বদরুজ্জামান চাঁদা আদায়ের অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, তারা সম্প্রতি কোনো টহলে যাননি। তবে শিগগিরই টহলে নামবেন।

এ ব্যাপারে নৌপুলিশের খুলনা অঞ্চলের পুলিশ সুপার (এসপি) দ্বীন মোহাম্মদের কাছে জানতে চাইলে বলেন, নৌপুলিশ অথবা তাদের পরিচয়ে কেউ চাঁদা আদায় বা জেলেদের হয়রানি করার সত্যতা প্রমাণিত হলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা