খুলনার কয়রা উপজেলার মহারাজপুর ইউনিয়নের কয়রা-গিলাবাড়ি সড়কে শাকবাড়িয়া নদীর ওপর সেতু নির্মাণে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। এলজিইডির কর্মকর্তাদের ‘ম্যানেজ’ করে সেতুতে নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহার করা হচ্ছে বলে অভিযোগ তাদের।
স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) সূত্রে জানা গেছে, কয়রা সদর থেকে হায়াতখালি জিসি হয়ে গিলাবাড়ি জিসি সড়কে শাকবাড়িয়া নদীর ওপর ৩৬ মিটার দৈর্ঘ্যের আরসিসি গার্ডার সেতু নির্মাণ’ প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়। চার কোটি ৭১ লাখ টাকার প্রকল্পটি বাস্তবায়নের দায়িত্ব পায় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এসএ-জেডটি জেভি। ২০২২ সালের ৩ আগস্ট প্রতিষ্ঠানটিকে কার্যাদেশ দেওয়া হয়। ২০২৩ সালের ১৮ ডিসেম্বর কাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও কাজের মেয়াদ বাড়িয়ে ২০২৬ সালের ৩০ জুন করা হয়। এখন পর্যন্ত কাজের অগ্রগতি মাত্র ৫৫ শতাংশ।
এদিকে, গত বুধবার (৩ জুন) সকালে নির্মাণকাজে অনিয়ম দেখতে পেয়ে মহারাজপুর শাকবাড়িয়া নদের ওপর সেতু নির্মাণ কাজে বাধা দেয় স্থানীয়রা।
স্থানীয়দের অভিযোগ, সেতু নির্মাণে নিম্নমানের ইট, বালু ও পাথর ব্যবহার করা হচ্ছে। বিষয়টি এলজিইডি কর্মকর্তাদের জানালেও কোনো দৃশ্যমান ব্যবস্থা না নেওয়া হয়নি। এ নিয়ে প্রতিবাদ করলে কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তির মাধ্যমে তাদের হুমকিও দেওয়া হয়। পরে কিছু সময় কাজ বন্ধ রেখে আবারও এলজিইডি কর্মকর্তাদের সামনেই নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহারের মাধ্যমে কাজ শুরু করা হয়।
স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুল গফফার বলেন, ‘সেতুটি নির্মাণে ব্যাপক অনিয়ম হচ্ছে। মানুষ যাতে দেখতে না পায়, সেজন্য কাজ করা হচ্ছে গভীর রাতে। যে পাথর ব্যবহার করা হচ্ছে তা হাত দিয়ে চাপ দিলে ধুলোর মতো হয়ে যাচ্ছে। এজন্য আমরা নির্মাণকাজে বাধা দিই। কিন্তু কর্মকর্তাদের ম্যানেজ করে আবার কাজ শুরু করেছে।’ তিনি বলেন, ‘সেতুর নির্মাণকাজে ব্যয় প্রায় পাঁচ কোটি টাকা। এত টাকায় সেতু নির্মাণ করলে ৫০০ বছরেও কিছু হওয়ার কথা না। কিন্তু যেভাবে কাজ করা হচ্ছে তাতে ১০ বছরই যায় কিনা সন্দেহ।’
স্থানীয় আরেক বাসিন্দা আব্দুল বলেন, ‘সেতুতে বালু-সিমেন্ট সঠিক নিয়মে ব্যবহার করা হচ্ছে না। নিম্নমানের বালু-সিমেন্ট ব্যবহার করা হচ্ছে। কাজের সাইটে তথ্যসহ বাধ্যতামূলক সাইনবোর্ড দেওয়ার কথা থাকলেও তা দেওয়া হয়নি। শিডিউল ও নকশা এলাকাবাসী দেখতে চাইলেও না দেখিয়ে প্রভাবশালীদের দিয়ে হুমকি দেওয়া হচ্ছে। দেখানো হচ্ছে মামলার ভয়ও।’
আসাদুল ইসলাম, মইনুল গাজি, আহাদ আলীসহ বেশ কয়েকজন স্থানীয় বাসিন্দা বলেন, সরকার জনগণের জন্য কোটি কোটি টাকা খরচ করে সেতু নির্মাণের জন্য অনুমোদন দিলেও তা সরকারি কর্মকর্তা ও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মিলে নয়-ছয় করছে। এর আগে সাংবাদিকরা এলে উপজেলা প্রকৌশলী তাদেরকে বলেছিলেন, নিম্নমানের সামগ্রী সরিয়ে ভালো জিনিস দিয়ে কাজ করানো হবে। কিন্তু উপজেলা এলজিইডির কর্মকর্তা ও কয়েকজন প্রভাবশালীকে ম্যানেজ করে আবার নিম্নমানের সামগ্রী দিয়ে কাজ করা হচ্ছে।
এ ব্যাপারে ঠিকাদার জিয়াউল আহসান টিটুর মোবাইল ফোনে একাধিকবার কল দেওয়া হলেও তা বন্ধ পাওয়া জায়নি। জানা যায়, ৫ আগস্ট দেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর একাধিক মামলায় আসামি হয়ে পলাতক রয়েছেন তিনি। এ কারণে তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তিনি তার লোক দিয়ে সেতুর কাজ করাচ্ছেন বলে জানা গেছে।
এ ছাড়া স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি)-এর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. কামরুল ইসলাম সরদারের মোবাইল ফোনে কল দেওয়া হলেও তিনি তা ধরেননি। পরে ক্ষুদে বার্তা পাঠানো হলেও তাতে সাড়া মেলেনি।
অভিযোগের বিষয়ে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপক মো. মিরাজ হোসেনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি সেতুর বিষয়ে কথা বলতে অপারগতা প্রকাশ করেন। কালের কণ্ঠকে তিনি বলেন, ‘এসব বিষয়ে কাজের দায়িত্বে থাকা স্যার (ঠিকাদার)-এর সঙ্গে কথা বলুন। আমাকে যেভাবে কাজ করার কথা বলা হয়েছে, সে অনুযায়ী কাজ করাচ্ছি।’
তবে অভিযোগ অস্বীকার করে উপজেলা এলজিইডির উপ-সহকারী প্রকৌশলী আফজাল হোসেন বলেন, সিলেটের বালু (লাল বালু) ও পাথর খুবই ভালোমানের। নিয়ম অনুযায়ী কাজ হচ্ছে। জেলা অফিসের ল্যাব থেকে নির্মাণ সামগ্রী পরীক্ষা করে কাজ করা হচ্ছে।’ তবে নিম্নমানের সামগ্রী দিয়ে কাজ করার অভিযোগে স্থানীয়দের প্রতিবাদ প্রসঙ্গে কোন সদুত্তর দিতে পারেননি এ কর্মকর্তা।