বাংলাদেশে বায়ুদূষণের কারণে প্রতিবছর প্রায় ৮৮ হাজার ২৪০ জন মানুষের অকালমৃত্যু হচ্ছে, যা দৈনিক গড়ে প্রায় ২৪২ জন। একই সঙ্গে কর্মক্ষমতা ও উৎপাদনশীলতা হ্রাসের ফলে বছরে প্রায় ২ লাখ ৮০ হাজার কোটি টাকা অর্থনৈতিক ক্ষতি হচ্ছে, যা দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় ৫ শতাংশ। বিশেষ করে সূক্ষ্ম ধূলিকণা (পিএম২.৫) দূষণের কারণে এই প্রাণহানি ঘটে।
বুধবার (১৫ জুলাই) জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) পাবলিক হেলথ অ্যান্ড ইনফরমেটিক্স বিভাগের এক গবেষণায় এসব তথ্য উঠে এসেছে। এসব তথ্য তুলে ধরেন বিভাগের চেয়ারম্যান ও গবেষণা দলের প্রধান ড. মো. সাখাওয়াত হোসেন।
আরো পড়ুন
দেশের সব মাদরাসায় ৫ আগস্ট ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস’ পালনের নির্দেশ
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, বিভাগের (সি-টু-এ-এইচ-আর) পরিচালিত গবেষণায় দেশের ছয়টি প্রধান শহর ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, খুলনা, সিলেট ও বরিশালে বায়ুদূষণের স্বাস্থ্য ও অর্থনৈতিক প্রভাব বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
যেখানে দেখা যায়, বায়ুদূষণজনিত মোট মৃত্যুর মধ্যে বছরে ৩৭ হাজার ৫৯১ জন হৃদ্রোগে, ৮ হাজার ৩৪৪ জন দীর্ঘমেয়াদি শ্বাসতন্ত্রের রোগে এবং ৮১১ জন ফুসফুসের ক্যান্সারে মারা গেছেন। শহরভিত্তিক বিশ্লেষণে, সবচেয়ে বেশি অকালমৃত্যু হয়েছে ঢাকায়, যেখানে বছরে প্রায় ৫৬ হাজার ৭৩৩ জন মানুষের মৃত্যু (পিএম২.৫) দূষণের সঙ্গে সম্পর্কিত। এরপর রয়েছে চট্টগ্রাম (১১,২০২ জন), রাজশাহী (২,৮২৭ জন), খুলনা (২,৬২৫ জন), সিলেট (১,৪৮৪ জন) এবং বরিশাল (১,৩৬৯ জন)।
আরো পড়ুন
যুক্তরাষ্ট্রে ৬১৬ কোটি টাকায় বিক্রি টি. রেক্সের কঙ্কাল, গড়ল নতুন বিশ্বরেকর্ড
সংবাদ সম্মেলনে আরো জানানো হয়, গবেষণাটি সম্প্রতি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত Pollution জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে। যেখানে দেখানো হয়েছে, দেশে বায়ুদূষণের কারণে প্রতিবছর প্রায় ৮৮ হাজার ২৪০ জন মানুষের অকালমৃত্যু হচ্ছে। একই সঙ্গে বছরে প্রায় ২৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার অর্থনৈতিক ক্ষতি হচ্ছে।
গবেষণায় আরো উল্লেখ করা হয়, ২০১৩ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে ছয়টি শহরেই বায়ুদূষণজনিত অকালমৃত্যুর সংখ্যা ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে। সবচেয়ে উদ্বেগজনক পরিস্থিতি ঢাকায়, যেখানে প্রতি বছর গড়ে প্রায় ৩,৮৪৮ জন অতিরিক্ত মানুষের অকালমৃত্যু ঘটছে।
আরো পড়ুন
শহীদ আবু সাঈদের বাড়িতে আজও শোকের আবহ, দ্রুত বিচারের দাবি পরিবারের
গবেষকদের মতে, এটি নগরাঞ্চলে বায়ুদূষণের দ্রুত অবনতিশীল পরিস্থিতি এবং কার্যকর নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার জরুরি প্রয়োজনীয়তার ইঙ্গিত দেয়।
গবেষণাদলের প্রধান অধ্যাপক ড. মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ‘আমরা প্রায়ই বায়ুদূষণকে শুধু পরিবেশগত সমস্যা হিসেবে দেখি। কিন্তু আমাদের গবেষণা বলছে, এর ফলে বছরে প্রায় ৮৮ হাজার মানুষের অকালমৃত্যু এবং জিডিপির প্রায় ৫ শতাংশ সমপরিমাণ অর্থনৈতিক ক্ষতি হচ্ছে। এটি নীতিনির্ধারকদের জন্য একটি সতর্কবার্তা। এখনই কার্যকর উদ্যোগ না নিলে ভবিষ্যতে স্বাস্থ্যগত ও অর্থনৈতিক ক্ষতি আরো বাড়বে।’
আরো পড়ুন
১৬ জুলাইকে ঘিরে গোপালগঞ্জে বিজিবি মোতায়েন
গবেষণায় আরো বলা হয়েছে, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) বায়ুমানের নির্দেশিকা কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে বাংলাদেশে বায়ুদূষণজনিত অকালমৃত্যু ও অর্থনৈতিক ক্ষতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব। এ জন্য কার্যকর নীতিমালা প্রণয়ন, বিভিন্ন উৎস থেকে পিএম২.৫ নিঃসরণ হ্রাস, নগরাঞ্চলে সমন্বিত বায়ুমান ব্যবস্থাপনা জোরদার এবং জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার সুপারিশ করেছেন গবেষকরা।
উল্লেখ্য, গবেষণাটির যৌথ প্রথম লেখক ছিলেন জাবির পাবলিক হেলথ অ্যান্ড ইনফরমেটিক্স বিভাগের ক্লাইমেট চেঞ্জ, এয়ার কোয়ালিটি অ্যান্ড হেলথ রিসার্চ (সি-টু-এ-এইচ-আর) ইউনিটের রিসার্চ অ্যাসোসিয়েট সাইয়েদ মোহাম্মদ রাসেল এবং রিসার্চ অ্যাসিস্ট্যান্ট আফসানা আক্তার। এছাড়া গবেষক দলে ছিলেন–একই ইউনিটের রিসার্চ অ্যাসিস্ট্যান্ট তারেকুল ইসলাম, পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের পরিবেশ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক ড. মো. জিয়াউল হক, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের ক্লাইমেট চেঞ্জ অ্যান্ড হেলথ প্রমোশন ইউনিটের সাবেক পরিচালক ড. মো. ইকবাল কবির, হংকং বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক ড. কুই গুও, যুক্তরাজ্যের বার্মিংহাম বিশ্ববিদ্যালয়ের হেলথ ইকোনমিকস ইউনিটের গবেষণা ফেলো ড. জেমস এ হল, একই বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অব জিওগ্রাফি, আর্থ অ্যান্ড ইনভায়রনমেন্টাল সায়েন্সেসের সহযোগী অধ্যাপক ড. সুজান ই. বার্টিংটন, অধ্যাপক ড. জংবো শি এবং গবেষণার করেসপন্ডিং অথর ছিলেন জাবির পাবলিক হেলথ অ্যান্ড ইনফরমেটিক্স বিভাগের চেয়ারম্যান, সহযোগী অধ্যাপক ও সি-টু-এ-এইচ-আর ইউনিটের প্রধান ড. মো. সাখাওয়াত হোসেন, যিনি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের (সিয়ারো) উপদেষ্টা দলের সদস্য।