জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কিছু ‘বেআইনি’ আইন ও নীতিকে ‘ট্যাক্স টেরোরিজম’ বা কর সন্ত্রাস বলে আখ্যায়িত করেছেন নিট পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম। তিনি অভিযোগ করেছেন, এনবিআরের এসব নীতির কারণে বাধ্য হয়ে ব্যবসায়ীদের ভুয়া ব্যালেন্স শিট তৈরি করতে হচ্ছে। এর ফলে কাগজে-কলমে কোটি কোটি টাকা লাভ দেখানো হলেও বাস্তবে সেই টাকা ব্যবসায়ীদের কাছে থাকছে না।
শনিবার (৬ জুন) রাজধানীর সিরডাপ আন্তর্জাতিক কনফারেন্স সেন্টারে অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ‘চরচা ডটকম’ আয়োজিত এক গোলটেবিল আলোচনা শেষে সাংবাদিকদের এসব কথা বলেন বিকেএমইএ সভাপতি।
মোহাম্মদ হাতেম বলেন, ‘ডাকাতরা কী করে? অস্ত্র ধরে মানুষের কাছ থেকে টাকা ছিনিয়ে নেয়। আর এনবিআর কিছু বেআইনি আইনকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে আমাদের কাছ থেকে একইভাবে টাকা ছিনিয়ে নিচ্ছে। এটা বন্ধ হওয়া উচিত।’
একটি উদাহরণ দিয়ে তিনি ব্যালেন্স শিটের গরমিল ও কর ব্যবস্থার জটিলতা তুলে ধরেন। বিকেএমইএ সভাপতি বলেন, ‘ধরা যাক একজন ব্যবসায়ীর মোট রপ্তানি ১৫০ কোটি টাকা। ১ শতাংশ হারে উৎস কর বা এআইটি (অ্যাডভান্স ইনকাম ট্যাক্স) বাবদ এনবিআর শুরুতেই তার কাছ থেকে ১ কোটি ৫০ লাখ টাকা কেটে নিল। বছর শেষে রিটার্ন দাখিলের সময় দেখা গেল ওই ব্যবসায়ীর প্রকৃত লাভ হয়েছে ১ কোটি টাকা। ১২ শতাংশ করপোরেট ট্যাক্স হারে তার কর হওয়ার কথা ১২ লাখ টাকা। কিন্তু এনবিআর তো আগেই ১ কোটি ৩৮ লাখ টাকা বেশি নিয়ে বসে আছে।’
তিনি আরো বলেন, এখানেই শেষ নয়। এরপর ব্যালেন্স শিটের বিভিন্ন খরচ ‘ডিজেলাও’ (অনুমোদনহীন) করা হয়। উৎসে কর (টিডিএস) কাটা হয়নি—এমন অজুহাতে ওই খরচগুলোকে লাভের অংশ দেখিয়ে তার ওপর ৩০ শতাংশ হারে কর ধার্য করা হয়। এ ছাড়া ব্যাবসায়িক প্রয়োজনে ব্যাংকে রাখা এফডিআরের ওপর ব্যাংক ১০ শতাংশ উৎসে কর কাটলেও, পরে ট্যাক্স অফিস থেকে বলা হয় করের হার সাড়ে ২৭ শতাংশ। ফলে আরও সাড়ে ১৭ শতাংশ কর দাবি করা হয়। আর প্রতিষ্ঠানটি যদি লিমিটেড কোম্পানি না হয়ে প্রোপাইটারশিপ বা একক মালিকানাধীন হয়, তবে কেটে নেওয়া ওই দেড় কোটি টাকার ওপর আরও ৩০ শতাংশ সারচার্জ দিতে হয়।
মোহাম্মদ হাতেম ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘সব মিলিয়ে একটি ক্ষেত্রে দেখা গেল ৭২ থেকে ৭৩ লাখ টাকার মতো অতিরিক্ত ট্যাক্স ধার্য করে দেওয়া হলো। এখন এই টাকা জমা না দিলে এনবিআর রিটার্নও দাখিল করতে দিচ্ছে না। রিটার্ন আগে জমা নেবে, তারপর টাকার হিসাব হবে—তা নয়। টাকা না দিলে রিটার্নই নেবে না। একে আপনি ‘ট্যাক্স টেরোরিজম’ ছাড়া কী বলবেন?’
এই ব্যবস্থার কারণে ব্যবসায়ীরা কীভাবে ভুয়া হিসাব বিবরণী তৈরি করতে বাধ্য হচ্ছেন, তারও ব্যাখ্যা দেন বিকেএমইএ প্রধান। তিনি বলেন, ‘এনবিআর যেহেতু শুরুতেই দেড় কোটি টাকা কেটে রেখেছে, তাই ট্যাক্স ফাইল যারা তৈরি করে তারা তখন ‘ব্যাক ক্যালকুলেশন’ শুরু করে। ওই দেড় কোটি টাকা ট্যাক্স বৈধ করতে হলে লাভ দেখাতে হবে সাড়ে ১২ কোটি টাকা। ফলে বাধ্য হয়ে একটা ফেক বা ভুয়া ব্যালেন্স শিট তৈরি করা হয়।’
একই সঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের ‘রিস্ক ম্যানেজমেন্ট পলিসি’ বা ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা নীতিকেও এর জন্য দায়ী করেন তিনি। মোহাম্মদ হাতেম বলেন, ‘বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতি অনুযায়ী ব্যবসায় প্রতি বছর নির্দিষ্ট পরিমাণ লাভ না দেখালে বা স্কোর ৬০ শতাংশের নিচে নামলে ব্যাংক ঋণ বা অন্যান্য সুবিধা বন্ধ হয়ে যায়। ফলে লোকসান হলেও ব্যাংকের সুবিধা ধরে রাখতে ব্যবসায়ীদের লাভ দেখাতে হয়।’
এনবিআর চেয়ারম্যানের সঙ্গে তার আলোচনার সূত্র ধরে তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, ‘আমি এনবিআর চেয়ারম্যানকে আগেই বলেছি, কাগজে-কলমে আমি বছর বছর ৮ কোটি, ১০ কোটি বা ১২ কোটি টাকা লাভ দেখাচ্ছি। কিন্তু বাস্তবে ‘কাজের গরু গোয়ালে নাই, আছে কাগজে’। একটা পর্যায়ে গিয়ে আপনারা যখন আমাকে ধরবেন যে এই টাকা কোথায় গেল? আমি কি টাকা বিদেশে পাচার করেছি? তখন এর উত্তর কী হবে?’




