আন্তর্জাতিক বাজারে বড় ধরনের ওঠানামার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে সোনা ও অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম। সোমবার (১৮ মে) লেনদেনের শুরুতে বিশ্ববাজারে সোনার দাম গত দেড় মাসেরও বেশি সময়ের মধ্যে সর্বনিম্ন স্তরে নেমে যায়। তবে সময়ের ব্যবধানে সেই ধাক্কা সামলে বাজার কিছুটা ঘুরে দাঁড়িয়েছে। যদিও বিশ্বজুড়ে বন্ডের মুনাফা বৃদ্ধি এবং মূল্যস্ফীতির আশঙ্কায় সোনার এই দাম বাড়ার গতি শেষ পর্যন্ত বেশ সীমিত ছিল।
এদিকে মধ্যপ্রাচ্যে ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা ও ইরান যুদ্ধ অবসানের প্রচেষ্টা থমকে যাওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুড অয়েলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১১০ ডলার ছাড়িয়ে গেছে।
সোমবার আন্তর্জাতিক বাজারে স্পট গোল্ড বা তাৎক্ষণিক সরবরাহের বিপরীতে সোনার দাম শূন্য দশমিক ৩ শতাংশ বেড়ে প্রতি আউন্স ৪ হাজার ৫৫২.৫৯ ডলারে পৌঁছায়। অথচ দিনের শুরুতেই এই দাম গত ৩০ মার্চের পর সর্বনিম্ন স্তরে নেমে গিয়েছিল। অন্যদিকে, আগামী জুন মাসে সরবরাহের চুক্তিতে মার্কিন সোনার ফিউচার বা আগাম দাম শূন্য দশমিক ১ শতাংশ কমে প্রতি আউন্স ৪ হাজার ৫৫৭ ডলারে দাঁড়িয়েছে।
বাজার বিশ্লেষক প্রতিষ্ঠান জেফরিসের মালিকানাধীন ট্রেডু ডটকমের জ্যেষ্ঠ বাজার বিশ্লেষক নিকোস জাবোরাস বলেন, প্রযুক্তিগত কারণে সোনার দামের এই পতন সাময়িক। বাজার এখনো সোনাকে পুরোপুরি মন্দার দিকে ঠেলে দিতে প্রস্তুত নয়, কারণ দীর্ঘ মেয়াদে সোনার কাঠামোগত ভিত্তি এখনো শক্তিশালী।
তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভ (ফেড) চলতি বছর সুদের হার তো কমাচ্ছেই না, বরং উল্টো তা বাড়ানোর আভাস দিচ্ছে। দীর্ঘ সময় ধরে উচ্চ সুদের হারের এমন প্রবণতা সোনার মতো লভ্যাংশহীন সম্পদের ওপর সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের কারণে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ছে, যা নতুন করে বিশ্ব অর্থনীতিতে মূল্যস্ফীতির আশঙ্কা তৈরি করেছে। এর ফলে টোকিও থেকে নিউইয়র্ক—সবখানেই বন্ডের বাজারে দরপতন হয়েছে। বিপরীতে, বেঞ্চমার্ক ১০ বছর মেয়াদী মার্কিন ট্রেজারি বন্ডের মুনাফা (ইল্ড) বেড়ে ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারির পর সর্বোচ্চ স্তরে পৌঁছেছে।
সিএমই গ্রুপের ফেডওয়াচ টুলের তথ্য অনুযায়ী, বিনিয়োগকারীরা এখন ধারণা করছেন আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে ফেড আবারও সুদের হার বাড়াতে পারে, যার সম্ভাবনা প্রায় ৪০ শতাংশ।
অন্যদিকে, ইরান যুদ্ধ বন্ধের কূটনৈতিক প্রচেষ্টা স্থবির হয়ে পড়ায় এবং কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ ‘হরমুজ প্রণালি’ মূলত বন্ধ থাকায় আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুড অয়েলের দাম বেড়ে প্রতি ব্যারেল ১১০ ডলার ছাড়িয়েছে।
বিনিয়োগকারীদের চাহিদা কিছুটা কম থাকায় বিশ্বের বড় বড় ব্যাংকগুলো সোনার ভবিষ্যৎ দামের পূর্বাভাস কমাতে শুরু করেছে। শীর্ষস্থানীয় মার্কিন বিনিয়োগ ব্যাংক জে পি মরগান তাদের ২০২৬ সালের সোনার গড় দামের পূর্বাভাস প্রতি আউন্স ৫ হাজার ৭০৮ ডলার থেকে কমিয়ে ৫ হাজার ২৪৩ ডলারে নামিয়ে এনেছে।
ব্যাংকটির বিশ্লেষকদের মতে, ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং সুদের হারের ওঠানামার কারণে আগামী কয়েক সপ্তাহ বাজার বেশ অস্থির থাকতে পারে। তবে যুদ্ধ পরিস্থিতির সমাধান হলে সোনার বাজারে বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ এবং চাহিদা আবারও ফিরবে।
সোনার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারে অন্যান্য মূল্যবান ধাতুর দামেও মিশ্র প্রবণতা দেখা গেছে। সোমবার স্পট সিলভার বা রুপার দাম শূন্য দশমিক ৮ শতাংশ বেড়ে প্রতি আউন্স ৭৬.৫২ ডলার হয়েছে। তবে প্ল্যাটিনামের দাম শূন্য দশমিক ২ শতাংশ কমে প্রতি আউন্স ১ হাজার ৯৬৯.৯০ ডলারে নেমেছে এবং প্যালাডিয়ামের দাম শূন্য দশমিক ২ শতাংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৪১৫.৭৬ ডলারে।
দেশের বাজারে প্রতি ভরি (১১.৬৬৪ গ্রাম) ২২ ক্যারেটের স্বর্ণের দাম পড়ছে ২ লাখ ৩৮ হাজার ১২১ টাকা। এছাড়া ২১ ক্যারেটের প্রতি ভরি ২ লাখ ২৭ হাজার ৩৩১ টাকা, ১৮ ক্যারেটের প্রতি ভরি ১ লাখ ৯৪ হাজার ৮৪৭ টাকা এবং সনাতন পদ্ধতির প্রতি ভরি স্বর্ণ ১ লাখ ৫৮ হাজার ৬৮৯ টাকায় বেচাকেনা হচ্ছে।
সূত্র : রয়টার্স




