এক দশক আগেও বৈশ্বিক তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) বাজারে যুক্তরাষ্ট্রের উপস্থিতি ছিল প্রায় অদৃশ্য। অথচ ২০২৫ সালে বিশ্বের অতিরিক্ত এলএনজি সরবরাহের প্রায় ৯৩ শতাংশই এসেছে দেশটি থেকে। শেল গ্যাস বিপ্লব, বিশাল উৎপাদন, আধুনিক অবকাঠামো এবং নমনীয় রপ্তানিনীতির সমন্বয়ে যুক্তরাষ্ট্র এখন বিশ্বের সবচেয়ে বড় এলএনজি রপ্তানিকারক।
এনার্জি ইনস্টিটিউটের ‘স্ট্যাটিস্টিক্যাল রিভিউ অব ওয়ার্ল্ড এনার্জি ২০২৬’ অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বৈশ্বিক এলএনজি রপ্তানি বেড়ে ২০ দশমিক ৪ ট্রিলিয়ন ঘনফুটে পৌঁছেছে, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ১ দশমিক ২ ট্রিলিয়ন ঘনফুট বেশি। এর মধ্যে প্রায় ১ দশমিক ১ ট্রিলিয়ন ঘনফুটই সরবরাহ করেছে যুক্তরাষ্ট্র।
ফলে বৈশ্বিক এলএনজি বাজারে যুক্তরাষ্ট্রের অংশীদারত্ব বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৫ দশমিক ৪ শতাংশে। দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা কাতারের রপ্তানি ৩ দশমিক ৯ ট্রিলিয়ন ঘনফুট এবং তৃতীয় স্থানে থাকা অস্ট্রেলিয়ার রপ্তানি ৩ দশমিক ৭ ট্রিলিয়ন ঘনফুট।
আরো পড়ুন
বিচ্ছেদের গুঞ্জনের মধ্যেই নিউইয়র্কে একসঙ্গে অভিষেক-ঐশ্বরিয়া
মাত্র ১০ বছর আগে চিত্রটি ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। ২০১৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের এলএনজি রপ্তানি ছিল ০ দশমিক ০৩ ট্রিলিয়ন ঘনফুটেরও কম। তখন বাজারে নেতৃত্ব দিচ্ছিল কাতার। কিন্তু ২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের রপ্তানি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫ দশমিক ২ ট্রিলিয়ন ঘনফুটে, যা এক দশকে প্রায় ২০০ গুণ বৃদ্ধি।
বিশ্লেষকদের মতে, এই সাফল্যের মূল ভিত্তি শেল গ্যাস বিপ্লব। বিপুল পরিমাণ কম খরচে প্রাকৃতিক গ্যাস উৎপাদনের পাশাপাশি উপসাগরীয় উপকূলের পাইপলাইন, গ্যাস সংরক্ষণাগার, গভীর সমুদ্রবন্দর এবং জ্বালানি অবকাঠামো দ্রুত রপ্তানি সক্ষমতা গড়ে তুলতে সহায়তা করেছে। একসময় যেসব টার্মিনাল গ্যাস আমদানির জন্য নির্মিত হয়েছিল, সেগুলোই পরে এলএনজি রপ্তানি টার্মিনালে রূপান্তর করা হয়।
২০২৫ সালে লুইজিয়ানার প্ল্যাকিমাইনস এলএনজি প্রকল্প এবং কর্পাস ক্রিস্টি স্টেজ-৩ চালু হওয়ায় মার্কিন রপ্তানি আরো দ্রুত বেড়েছে। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার (আইইএ) হিসাবে, ওই বছরে বৈশ্বিক এলএনজি সরবরাহ বৃদ্ধির ৬০ শতাংশের বেশি এসেছে শুধু প্ল্যাকিমাইনস প্রকল্প থেকেই।
আরো পড়ুন
শেষ সিনেমা থেকেই রেকর্ড পারিশ্রমিক নিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী বিজয়?
মার্কিন এলএনজির আরেকটি বড় শক্তি হলো এর নমনীয় বাণিজ্যিক কাঠামো। যুক্তরাষ্ট্রের বেশির ভাগ চুক্তি দেশীয় গ্যাসের দামের সঙ্গে সংযুক্ত এবং ক্রেতারা প্রয়োজনে চালানের গন্তব্য পরিবর্তনের সুযোগ পান। ফলে বাজারদর অনুযায়ী একই চালান ইউরোপ, এশিয়া কিংবা লাতিন আমেরিকায় পাঠানো সম্ভব হয়।
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের পর ইউরোপের জ্বালানি নিরাপত্তায় যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্ব আরো বেড়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের এনার্জি ইনফরমেশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের (ইআইএ) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ইউরোপে মার্কিন এলএনজি সরবরাহ দৈনিক গড়ে ১০ দশমিক ৩ বিলিয়ন ঘনফুটে পৌঁছায়, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ৬৩ শতাংশ বেশি। ওই বছর ইউরোপ যুক্তরাষ্ট্রের মোট এলএনজি রপ্তানির প্রায় ৬৮ শতাংশ গ্রহণ করে।
বিশ্লেষকদের মতে, এলএনজির সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো এর নমনীয়তা। পাইপলাইনের গ্যাস নির্দিষ্ট ক্রেতার জন্য বরাদ্দ থাকলেও এলএনজি বহনকারী জাহাজ সমুদ্রে চলার সময়ও গন্তব্য পরিবর্তন করতে পারে। ফলে কোথাও দাম বেড়ে গেলে দ্রুত সেখানে সরবরাহ পাঠানো সম্ভব হয়। তবে এর ফলে ক্রেতাদের মধ্যে প্রতিযোগিতাও বাড়ে এবং সংকটকালে দাম দ্রুত বাড়তে পারে।
আরো পড়ুন
পরবর্তী রাষ্ট্রপতি কে হবেন, এটি দলের উচ্চ পার্যায়ের সিদ্ধান্ত : রুহুল কবির রিজভী
যুক্তরাষ্ট্রের এই উত্থানের পেছনে রয়েছে রেকর্ড উৎপাদনও। ২০২৫ সালে দেশটির প্রাকৃতিক গ্যাস উৎপাদন দৈনিক ১০৩ দশমিক ৯ বিলিয়ন ঘনফুটে পৌঁছায়, যা বৈশ্বিক উৎপাদনের এক-চতুর্থাংশের বেশি। একই সময়ে অভ্যন্তরীণ ব্যবহারও রেকর্ড ৮৮ দশমিক ৪ বিলিয়ন ঘনফুটে উন্নীত হয়। অর্থাৎ দেশীয় চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি রপ্তানিও বাড়াতে সক্ষম হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।
এখনো উৎপাদনের প্রধান কেন্দ্র অ্যাপালেচিয়া অঞ্চল। তবে পারমিয়ান বেসিন ও হেইনসভিল অঞ্চলও দ্রুত গুরুত্ব পাচ্ছে। বিশেষ করে হেইনসভিলের অবস্থান উপসাগরীয় উপকূলের এলএনজি টার্মিনালের কাছাকাছি হওয়ায় রপ্তানির জন্য এটি কৌশলগত সুবিধা দিচ্ছে।
বিশ্ব গ্যাস বাণিজ্যের কাঠামোও দ্রুত বদলে যাচ্ছে। ২০২৫ সালে আন্তঃআঞ্চলিক এলএনজি বাণিজ্য বেড়েছে প্রায় ৬ দশমিক ৫ শতাংশ, বিপরীতে পাইপলাইনভিত্তিক গ্যাস বাণিজ্য কমেছে ৩ দশমিক ৬ শতাংশ। বর্তমানে আন্তঃআঞ্চলিক প্রাকৃতিক গ্যাস বাণিজ্যের প্রায় ৫৫ শতাংশই এলএনজিনির্ভর, যা এক দশক আগে ছিল ৪০ শতাংশেরও কম।
আরো পড়ুন
একবার পরিচয় যাচাই করেই মিলবে একাধিক আর্থিক সেবা, নতুন ব্যবস্থা আনছে ভারত
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এর ফলে বৈশ্বিক গ্যাস বাজার ক্রমেই তেলের বাজারের মতো আন্তঃসংযুক্ত হয়ে উঠছে। কোনো অঞ্চলে সরবরাহ বিঘ্ন ঘটলে তার প্রভাব দ্রুত অন্য অঞ্চলের বাজারেও পড়ছে।
সাম্প্রতিক সময়ে হরমুজ প্রণালি ঘিরে উত্তেজনাও এই বাস্তবতাকে আরো স্পষ্ট করেছে। আইইএর তথ্য অনুযায়ী, ওই প্রণালি দিয়ে বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ এলএনজি পরিবাহিত হয়। ফলে মধ্যপ্রাচ্যের বাইরে যুক্তরাষ্ট্রের মতো বিকল্প সরবরাহকারীর গুরুত্ব আরো বেড়েছে।
আগামী কয়েক বছরে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান আরো শক্তিশালী হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। গোল্ডেন পাস, পোর্ট আর্থার, রিও গ্র্যান্ডে এবং কর্পাস ক্রিস্টি স্টেজ-৩-এর সম্প্রসারণসহ একাধিক নতুন প্রকল্প নির্মাণাধীন। আইইএর পূর্বাভাস অনুযায়ী, এই দশকের শেষ নাগাদ বৈশ্বিক এলএনজি বাজারের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ সরবরাহ করবে যুক্তরাষ্ট্র।
আরো পড়ুন
এইচএসসির ৫ বিষয়ে পরীক্ষা নিয়ে জরুরি নির্দেশনা
তবে চ্যালেঞ্জও কম নয়। নতুন এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণে বিপুল বিনিয়োগ, পর্যাপ্ত পাইপলাইন অবকাঠামো, দীর্ঘমেয়াদি ক্রেতা নিশ্চিত করা এবং দেশীয় বাজারে গ্যাসের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখা বড় পরীক্ষা হয়ে থাকবে। কারণ রপ্তানি যত বাড়বে, দেশীয় বাজারেও দামের ওপর তত চাপ সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
তার পরও বর্তমানে বৈশ্বিক এলএনজি বাজারে সবচেয়ে বড় পরিবর্তনের চালিকাশক্তি যুক্তরাষ্ট্রই। উৎপাদন, রপ্তানি সক্ষমতা এবং নতুন বিনিয়োগের ধারাবাহিকতা অব্যাহত থাকলে আগামী কয়েক বছরেও দেশটি বিশ্বের এলএনজি সুপারপাওয়ার হিসেবে তার অবস্থান আরো সুসংহত করবে।