kalerkantho

সোমবার । ৭ আষাঢ় ১৪২৮। ২১ জুন ২০২১। ৯ জিলকদ ১৪৪২

বাজেটে সামাজিক সুরক্ষা গুরুত্ব পায়নি

নিজস্ব প্রতিবেদক   

৬ জুন, ২০২১ ০৮:৩৩ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



বাজেটে সামাজিক সুরক্ষা গুরুত্ব পায়নি

প্রস্তাবিত ২০২১-২২ অর্থবছরের বাজেট ঘোষণায় মহামারি পরিস্থিতিকে সঠিকভাবে নিরূপণ করা হয়নি। এ ধররের ক্ষেত্রে বিপদ হচ্ছে নীতিনির্ধারণের এক ধরনের শৈথিল্য কাজ করে। নীতিনির্ধারকরা যদি এ রকম একটি সংকটের সময়ে মাঠ পর্যায়ের পরিস্থিতি সঠিকভাবে নিরূপণ না করেন, তাহলে কিন্তু যথার্থ নীতি প্রণয়ন করা এবং তা বাস্তবায়নের তাগিদ তাঁরা বোধ করবেন না।

গতকাল শনিবার সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিংয়ের (সানেম) ভার্চুয়াল বাজেট-পরবর্তী এক সংবাদ সম্মেলনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ও সানেমের নির্বাহী পরিচালক ড. সেলিম রায়হান এসব কথা বলেন। বাজেটের ওপর সানেমের পর্যবেক্ষণ জানাতে এই সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়েছে। এ সময় আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ও সানেমের গবেষণা পরিচালক ড. সায়মা হক বিদিশা। 

ড. সেলিম রায়হান বলেন, “বাজেটের অনেক জায়গায় অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের কথা বলা হলেও সামাজিক পুনরুদ্ধারের বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে প্রতিফলিত হয়নি। করোনা মহামারির কারণে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সামাজিক সুরক্ষা, দারিদ্র্য, বৈষম্য ইত্যাদি সামাজিক বিষয়ের পুনরুদ্ধারের কথা বাজেটে আরো সুস্পষ্ট ও গুরুত্ব সহকারে উল্লেখ করার প্রয়োজন ছিল। মহামারির কারণে সৃষ্ট সমস্যাগুলোকে সমাধান করার চেষ্টা করা হয়েছে ‘অ্যাডহক’ ভাবে, সামগ্রিক কোনো পরিকল্পনার অধীনে নয়।”

তিনি বলেন, ‘টাকার অঙ্কে বাজেট বাড়লেও জিডিপির অনুপাতে আমাদের বাজেট খুব সামান্যই বেড়েছে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সামাজিক সুরক্ষা খাতে বর্তমানের তুলনায় দ্বিগুণ বাজেট বাড়ানোর প্রয়োজন রয়েছে, সে ক্ষেত্রে জিডিপির অনুপাতে ঘোষিত বাজেটের আকার যথেষ্ট নয়। আবার যে বাজেট ঘোষণা হয়েছে সেটিও বাস্তবায়ন হয় না, বছরের শেষে সংশোধিত বাজেটে এর আকার এক দফা কমে, পরে আবার প্রকৃত বাজেট নথিতে দেখা যায় এই বাজেট আরেক দফা কমে যায়। আবার এটিও মনে রাখতে হবে বিভিন্ন খাতে সরকারি খরচ মানেই বাস্তবায়ন নয়, অনেক সময় বিভিন্ন অনিয়মের কারণে খরচ করা আর বাস্তবায়ন করার মধ্যে বড় ফারাক থাকে।’

সানেমের নির্বাহী পরিচালক ড. সেলিম রায়হান বলেন, “বাজেট ঘাটতি বাড়ানোর বিষয়ে অর্থনীতিবিদরা একমত হলেও সক্ষমতার অভাবে বিভিন্ন প্রয়োজনীয় খাতে সরকারি খরচ বাড়ানো যাচ্ছে না। বাজেট ঘাটতি মেটাতে ব্যাংক খাত থেকে যে ঋণ নেওয়ার কথা বাজেটে বলা হয়েছে, সে ঋণের ‘সদ্ব্যবহার’ নিশ্চিত করা জরুরি। বাজেট ঘোষণায় অগ্রাধিকার খাত সঠিকভাবে নির্বাচন করা হয়েছে, এ জন্য আমরা অর্থমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানাই। তবে এই অগ্রাধিকারের খাতগুলোতে কিভাবে বাজেট বাস্তবায়ন হবে, সেই ‘রোডম্যাপ’ বাজেট ঘোষণায় অনুপস্থিত।”

ড. সেলিম রায়হান বলেন, “শিক্ষা খাত করোনা মহামারির কারণে যে ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তার উল্লেখ বাজেটে সঠিকভাবে করা হয়নি। বিশালসংখ্যক শিক্ষার্থী অনলাইন শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে, শিক্ষার্থীদের মধ্যে ‘ডিজিটাল ডিভাইড’-এর মতো নতুন বৈষম্য সৃষ্টি হচ্ছে, বিভিন্ন গবেষণায় শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়ার হার বৃদ্ধি পাওয়ার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে, বাল্যবিয়ের হার বাড়ছে ইত্যাদি বিষয় মোকাবেলায় শিক্ষা খাতে সুনির্দিষ্ট কোনো পরিকল্পনা বাজেট ঘোষণায় নেই।”

ড. সায়মা হক বিদিশা তাঁর আলোচনায় বলেন, “বাজেটে মোটামুটিভাবে গত বছরগুলোর একটা ধারাবাহিকতা বজায় রেখেছে এবং আমাদের প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির মধ্যে ফারাক রয়ে গেছে। তাহলে কি আমরা শুধু ফারাকটাই দেখছি? আমাদের কোনো প্রত্যাশাই কি মেটেনি? সেটা আমরা বলব না। যেমন—আমরা দেখেছি সামাজিক নিরাপত্তা খাত, স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বেড়েছে যাকে অবশ্যই আমরা ইতিবাচক হিসেবে দেখতে পারি। আমরা দেখেছি যে ব্যষ্টিক পর্যায়ে বিভিন্ন ধরনের পলিসি নেওয়া হয়েছে। সেগুলোর মধ্যে যদি আমরা দেখি, কৃষি খাতে বিনিয়োগকে উৎসাহিত করতে, কৃষিপণ্যগুলোকে সহজলভ্য করতে কিছু ছাড় ও অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে, সেটাকে অবশ্যই আমরা সাধুবাদ জানাব। আমরা দেখেছি যে স্বাস্থ্য খাতে বিনিয়োগকে উৎসাহিত করতে বিভিন্ন কর অব্যাহতির সুযোগ রয়েছে যেটা আমরা ইতিবাচক দিক হিসেবে চিন্তা করতে পারি। স্বাস্থ্য খাতের বিভিন্ন পণ্যকে সুলভ করার জন্য প্রচেষ্টা লক্ষ করেছি, সেটাও ইতিবাচক দিক। নারী উদ্যোক্তাদের যে সুবিধাগুলো রাখা হয়েছে সেটা নারী উদ্যোক্তাদের সহায়তা করবে, সেটাও একটা প্রশংসনীয় উদ্যোগ। বাকি যে বিভিন্ন উদ্যোগ রয়েছে সেগুলোর মধ্যেও বেশ কিছু বিষয় রয়েছে যেগুলো আমাদের প্রত্যাশার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ।”

সানেমের এই গবেষণা পরিচালক আরো বলেন, ‘সার্বিকভাবে আমরা এই বাজেট থেকে কী চেয়েছিলাম? প্রত্যাশা প্রাপ্তির ফারাকটা মূলত যে কারণে, সেটা হচ্ছে যে এই বাজেটে মূলত ছোট ছোট কিছু নীতির মাধ্যমে ব্যষ্টিক পর্যায়ে কিছু প্রণোদনা, উদ্দীপনা, ছাড়ের মাধ্যমে ব্যবসাগুলোকে সহায়তা করার মাধ্যমে সাধারণ মানুষকে সহায়তা করার চেষ্টা করা হয়েছে। কিন্তু সার্বিকভাবে আমাদের প্রত্যাশা ছিল কর্মসংস্থান ও দারিদ্র্য বিমোচন এই দুটি বিষয়কে সামনে রেখে তার পাশাপাশি সামাজিক অবকাঠামো, স্বাস্থ্য ও শিক্ষাকে সামনে রেখে, এই বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দিয়ে বরাদ্দ তো বৃদ্ধি করা হবেই, এর পাশাপাশি খুব পরিষ্কার একটি রোডম্যাপ থাকবে। ব্যষ্টিক পর্যায়ে এর কিছুটা প্রতিফলন হলেও সামষ্টিক পর্যায়ে এর প্রতিফলন আমরা দেখতে পাইনি। এখানে আমাদের এক ধরনের হতাশা কাজ করছে।’



সাতদিনের সেরা