বাংলা একাডেমির তথ্যকেন্দ্র থেকে মাইকে বারবার ভেসে আসছিল সতর্ক বার্তা—‘মেলা প্রাঙ্গণে আপনার শিশুকে সাবধানে রাখবেন। ভিড়ের মধ্যে হাতছাড়া হলে হারিয়ে যেতে পারে।’ বইমেলার দশম দিন গতকাল শুক্রবার ছিল সাপ্তাহিক ছুটি। মেলায় বিপুল বইপ্রেমী মানুষ ও দর্শনার্থীদের উপস্থিতি নিয়ে লেখক-প্রকাশকরা মন্তব্য করেছেন, এ যে একুশে ফেব্রুয়ারির উপচে পড়া ভিড়। গতকাল মেলায় নতুন বই এসেছে ২৬০টি। গতকাল সকাল ১১টায় মেলার ফটক খুললে অভিভাবকদের হাত ধরে প্রবেশ করে শিশুরা। দুপুর ১টা পর্যন্ত ছিল শিশু প্রহর। চিত্রাঙ্কন ও আবৃত্তি প্রতিযোগিতায় অংশ নেয় তারা। এ সময় প্রিয় লেখক ও শিক্ষাবিদ মুহম্মদ জাফর ইকবালকে পেয়ে শিশু-কিশোররা উৎফুল্ল হয়ে ওঠে। বই কেনাকাটা শেষে দুপুরের পর যখন অনেকে মেলা থেকে ফিরে যাচ্ছিল, তখন মেলায় প্রবেশের জন্য বাইরে বইপ্রেমী মানুষের দীর্ঘ লাইন। সন্ধ্যা পর্যন্ত মেলা প্রাঙ্গণে আর পা ফেলার স্থানও ছিল না। একুশে ফেব্রুয়ারি মেলা প্রাঙ্গণ যে রকম লেখক-পাঠকে জমজমাট হয়ে ওঠে, গতকাল অনেকটা তেমনি ছিল। বিপুল মানুষের ভিড়ে মেলামাঠ ধুলায় একাকার হয়ে যায়। এ নিয়ে বিরক্তি প্রকাশ করেছে অনেকে। তবে খণ্ড খণ্ড আড্ডা, নতুন বই ঘিরে উচ্ছ্বাস আর প্রিয় লেখকদের কাছে পেয়ে মানুষ ভুলে গেছে এই সাময়িক কষ্ট। গতকাল সন্ধ্যায় মেলা প্রাঙ্গণে অনন্যা প্রকাশনীর প্যাভিলিয়নের সামনে কথা হয় রবিন আল আমিন ও আঞ্জুমান আরা মুন্না দম্পতির সঙ্গে। দুই সন্তানকে সঙ্গে নিয়ে মেলায় এসেছেন তাঁরা। তাঁদের সবার হাতে নতুন বইয়ের ব্যাগ। রবিন জানালেন, কলেজজীবনে কথাসাহিত্যিক ইমদাদুল হক মিলনের ‘ও রাধা ও কৃষ্ণ’ উপন্যাসটি পড়ে তাঁর ভক্ত হয়ে যান। এর পর থেকে তাঁর লেখা পেলেই পড়েন। গতকাল মেলা থেকে কিনেছেন তাঁর লেখকজীবনের ৫০ বছরের অভিজ্ঞতা নিয়ে লেখা নতুন বই ‘যে জীবন আমার ছিল’। মেয়েদের জন্য কিনেছেন ‘পাহাড়কাঞ্চনপুর’ ও ‘ভূত এসে দেখা করে গেল’। আঞ্জুমান আরা মুন্না জানালেন, তিনি ইমদাদুল হক মিলনের প্রেমের উপন্যাসের ভীষণ ভক্ত। সন্তানরাও প্রচুর বই পড়ে। প্রত্যেকের বইয়ে লেখক আলাদা করে অটোগ্রাফ দিয়েছেন। ভীষণ খুশি তারা। অনন্যার প্যাভিলিয়নে অটোগ্রাফ দেওয়ার ফাঁকে ফাঁকে ইমদাদুল হক মিলন বলছিলেন, ‘মেলায় বইপ্রেমী মানুষের বিপুল উপস্থিতি, কেনাকাটা, হৈচৈ—সব মিলিয়ে সত্যি জমজমাট। দশম দিনেই একুশে ফেব্রুয়ারির ভিড় দেখতে পাচ্ছি। বিক্রিও বেশ ভালো। মেলায় ছোট-বড় সব প্রকাশকের বই বিক্রি হচ্ছে।’ মেলায় দেখা মিলল আরেক লেখকের। সোহরাওয়ার্দী উদ্যান অংশে দাঁড়িয়ে বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দিচ্ছিলেন আন্দালিব রাশদী। গণমাধ্যমকর্মীদের বললেন, ‘মেলায় আজ প্রচুর মানুষ। সবার হাতে বই দেখলে ভালো লাগত।’ অমর একুশে বইমেলায় গতকাল শিশুপ্রহরে পছন্দের বই কিনতে এসেছিল বহু শিশু। সিসিমপুরের টুকটুকি, হালুম, ইকরি, শিকুদের পেয়ে তারা মেতে ওঠে আনন্দে। ছবি : কালের কণ্ঠ মেলায় পাঠক সমাবেশের কর্ণধার শহিদুল ইসলাম বিজুর সঙ্গে কথা হয়। কালের কণ্ঠকে তিনি বলেন, ‘এটা তো বইয়ের মেলা। মেলায় মানুষ আসবে। কেউ কিনতে আসবে, কেউ বেড়াতে আসবে। যারা বেড়াতে আসছে, তারাও বইয়ের সঙ্গে আছে। অনেকে বই দেখছে, এখন না কিনলেও পরে কিনবে। মেলায় আসাটাকেই আমি ইতিবাচকভাবে দেখি।’ সেগুনবাগিচা থেকে মেলায় এসেছেন একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা সেলিম আহমেদ। তিনি জানান, আধাঘণ্টার বেশি সময় লাইনে দাঁড়িয়ে তবে মেলায় প্রবেশ করতে পেরেছেন। পর্যাপ্ত প্রবেশপথের অভাবে এই ভোগান্তি বলে তাঁর মন্তব্য। নতুন বই গতকাল মেলায় আসা নতুন বইয়ের মধ্যে রয়েছে—কথাপ্রকাশের আহসান হাবীবের ‘টিউশন মাস্টার’, সালেক খোকনের আদিবাসী উৎসবকথা, সুবর্ণ মেলায় এনেছে মুহম্মদ জাফর ইকবালের ‘টিটিং’, ঝিঙেফুল এনেছে লুত্ফর রহমান রিটনের ‘দাবায়া রাখতে পারবা না’, গ্রন্থকুটির এনেছে হামীম কামরুল হকের ‘বিজনপুরের রেশমিচুড়ি’, আগামী প্রকাশনী এনেছে রফিকুর রশীদের ‘মুক্তিযুদ্ধের উপন্যাস সমগ্র’, ময়ূরপঙ্খি এনেছে নাসরিন সুলতানা শীলা অনূদিত ‘কুয়ার পানি’, নাগরী এনেছে প্রশান্ত মৃধার ‘অবিরাম গুঞ্জন’, আফসার ব্রাদার্স এনেছে মুহম্মদ জাফর ইকবালের ‘তিতুনের জন্মদিন’ ও ‘পিনু মিনু এবং একটি হাতি’, আহসান হাবীবের ‘গোয়েন্দা গগন’ প্রভৃতি। মেলা মঞ্চের অনুষ্ঠান গতকাল বইমেলার মূল মঞ্চে অনুষ্ঠিত হয় জন্মশতবার্ষিক শ্রদ্ধাঞ্জলি : শিল্পী সফিউদ্দীন আহমেদ এবং জন্মশতবার্ষিক শ্রদ্ধাঞ্জলি : এস এম সুলতান শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন মলয় বালা ও সৈয়দ নিজার। আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন সুশান্তকুমার অধিকারী, ইমাম হোসেন সুমন, নাসির আলী মামুন এবং নীরু শামসুন্নাহার। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন মুনতাসীর মামুন।