বাংলাদেশে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের প্রস্তুতি শুরুর সঙ্গে সঙ্গে নির্বাচনী নীতিমালার বাইরেও একটি বিষয় আলোচনায় এসেছে। সরকারি কর্মচারী ও নিয়মিত রাজনৈতিক দলের সদস্যদের এই নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ সীমিত করার দাবি তুলেছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী।
যদিও এই বক্তব্যের মাধ্যমে আওয়ামী লীগের সমর্থকদের বোঝানো হয়েছে, তবু এই প্রস্তাব একটি বড় প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। তা হলো—কোনো নাগরিকের রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা কি তাকে নির্বাচনের মাধ্যমে জনপ্রতিনিধি হওয়ার অধিকার থেকে বঞ্চিত করতে পারে?
একটি গণতান্ত্রিক সমাজকে অবশ্যই ব্যক্তির অপরাধ এবং সমষ্টিগত রাজনৈতিক অপরাধের মধ্যে স্পষ্ট রেখা টানতে হবে। এই দুটো এক নয়। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকাকালীন তাদের বিরুদ্ধে নির্বাচনে কারচুপি, রাষ্ট্রীয় ও সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর অপব্যবহার, দুর্নীতি এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনসহ গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিযোগ নিয়ে সন্দেহের খুব বেশি অবকাশ নেই। যাদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি অপরাধের অভিযোগ রয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া উচিত এবং প্রমাণের ভিত্তিতে প্রয়োজন হলে যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করে বিচার হওয়া উচিত। জনসাধারণের আস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য জবাবদিহি অত্যন্ত জরুরি।
কিন্তু কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত সবাইকে গণহারে শাস্তির আওতায় আনা সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি বিষয়। কোনো দলের প্রতি সমর্থন থাকা কোনো ফৌজদারি অপরাধ নয়। একটি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় রাজনৈতিক পরিচয়ের জন্য নয়, বেআইনি কর্মকাণ্ডের জন্য শাস্তি দেওয়া হয়।
অন্যান্য দেশে উদ্ভূত এমন পরিস্থিতির পর্যবেক্ষণ এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। দক্ষিণ আফ্রিকায় বর্ণবৈষম্যের অবসানের পর ন্যাশনাল পার্টির সাধারণ সমর্থকদের রাজনীতি থেকে নিষিদ্ধ করা হয়নি। ট্রুথ অ্যান্ড রিকনসিলিয়েশন কমিশনের মতো ব্যবস্থার মাধ্যমে গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের জন্য দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনা হয়েছিল, আর একই সময়ে গণতান্ত্রিক প্রতিযোগিতার পথও উন্মুক্ত রাখা হয়েছিল।
আগাস্তো পিনোশের সামরিক শাসনের অবসানের পর চিলিও একই ধরনের পথ অনুসরণ করেছিল। আগের শাসনব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত রাজনৈতিক ব্যক্তিরা নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ পেয়েছিলেন, আর তাদের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ কী হবে, তা রাষ্ট্র নয়—জনগণের ওপরই ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল।
১৯৯৮ সালে প্রেসিডেন্ট সুহার্তোর পতনের পর ইন্দোনেশিয়াও সবার অন্তর্ভুক্তির পথ বেছে নিয়েছিল। কর্তৃত্ববাদী শাসনের সঙ্গে সবচেয়ে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত দল গোলকারকে নির্বাচনে অংশ নেওয়া থেকে নিষিদ্ধ করা হয়নি। প্রশাসনিকভাবে বাদ দেওয়ার পরিবর্তে জনসমর্থনের ওপর ভিত্তি করেই দলটির রাজনৈতিক প্রভাব কখনো বেড়েছে, কখনো কমেছে।
এর বিপরীত পর্যবেক্ষণও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। ২০০৩ সালের পর ইরাকের ব্যাপক দে-বাথিফিকেশন নীতির কারণে সাদ্দাম হোসেনের বাথ পার্টির সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগে বিপুলসংখ্যক মানুষকে জনবিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়েছিল। ২০০৩ সালে ইরাক আক্রমণের পর সাদ্দাম হোসেনের বাথ পার্টিকে নিষিদ্ধ করা, দলটির উচ্চপদস্থ সদস্যদের সরকারি চাকরি থেকে বরখাস্ত করা এবং দেশটির সামরিক বাহিনী ভেঙে দেওয়ার এই সরকারি নীতি রাজনৈতিক বিভাজনকে আরো গভীর করেছে এবং স্থিতিশীল গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান গড়ার প্রচেষ্টাকে জটিল করেছে বলে অনেক গবেষক ও নীতিনির্ধারক যুক্তি দিয়ে আসছেন।
এই পর্যবেক্ষণগুলো থেকে বাংলাদেশের সঠিক শিক্ষা গ্রহণ করা উচিত। ন্যায়বিচার সবচেয়ে জোরালো হয় যখন তা অপরাধীদের ওপর প্রয়োগ করা হয়। স্থানীয় সরকার নির্বাচন যদি নির্দলীয় পদ্ধতিতে ফিরে আসে, তবে এই নীতিটি আরো বেশি প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে। প্রার্থীরা দলীয় প্রতীকের পরিবর্তে প্রধানত তাদের ব্যক্তিগত খ্যাতি এবং স্থানীয় অবস্থানের ভিত্তিতে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন। এমন পরিস্থিতিতে অতীতের রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার কারণে ব্যক্তিদের বাদ দেওয়া শুধু নির্দলীয় নির্বাচনের লক্ষ্য বাস্তবায়ন কঠিন করবে না, বরং এই ধরনের নির্বাচনের মূল চেতনাকেও ক্ষুণ্ণ করবে।
ক্ষমতায় থাকাকালে আওয়ামী লীগ যদি সত্যিই জনগণের আস্থা হারিয়ে থাকে, তবে নির্বাচনের মাধ্যমেই তা প্রমাণ হওয়া উচিত। দলটির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত প্রার্থীরা জনসমর্থন পেতে ব্যর্থ হবেন। প্রশাসনিকভাবে বাদ দেওয়ার চেয়ে ভোটারদের দ্বারা প্রত্যাখ্যাত হওয়ার গণতান্ত্রিক বৈধতা অনেক বেশি।
এখানে আরো একটি বৃহত্তর নীতি জড়িত রয়েছে। যে রাজনৈতিক শক্তিই আজকের প্রতিদ্বন্দ্বীকে বাদ দিতে চায়, তাদের মনে রাখা উচিত যে, আগামীকাল তারা নিজেরাই বিরোধী দলে থাকতে পারে। একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক গোষ্ঠীকে চুপ করানোর জন্য তৈরি করা নিয়মগুলো খুব কমই তাদের মূল লক্ষ্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে।
বাংলাদেশ কয়েক দশক ধরে রাজনৈতিক বর্জনের চক্রে আবদ্ধ রয়েছে, যেখানে প্রতিটি বিজয়ী পক্ষ তাদের প্রতিপক্ষকে সংশোধনের অযোগ্য বলে গণ্য করে এসেছে। এই দৃষ্টিভঙ্গি স্থায়ী ন্যায়বিচার বা রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা—কোনোটিই আনতে পারেনি।
দেশের জবাবদিহি প্রয়োজন। কিন্তু গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি আস্থাও প্রয়োজন। যারা অপরাধ করেছে, তাদের স্বাধীন আদালতে জবাবদিহি করতে হবে। যারা কেবল রাজনৈতিক বিশ্বাস পোষণ করে, তাদের জবাবদিহি করতে হবে ভোটারদের কাছে।
শেষ পর্যন্ত আওয়ামী লীগসহ যেকোনো রাজনৈতিক দলের ভবিষ্যৎ তার প্রতিদ্বন্দ্বী বা প্রশাসনিক নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে নির্ধারিত হওয়া উচিত নয়। এই সিদ্ধান্ত হওয়া উচিত আদালতে যথাযথ প্রমাণ এবং ব্যালট বাক্সে জনগণের ভোটের মাধ্যমে।




