• ই-পেপার

ইবাদতের প্রতি আগ্রহ বাড়ানোর দোয়া

হাদিসের বাণী

জান্নাত ও জাহান্নামের বিস্ময়কর কথোপকথন

ইসলামী জীবন ডেস্ক
জান্নাত ও জাহান্নামের বিস্ময়কর কথোপকথন
সংগৃহীত ছবি

আবু সাইদ খুদরি (রা.) থেকে বর্ণিত, মহানবী (সা.) বলেছেন, জান্নাত এবং জাহান্নাম পরস্পর তর্ক করল। জাহান্নাম বলল, বড় বড় দাম্ভিক ও অহংকারীরা শুধু আমার মধ্যে থাকবে। আর জান্নাত বলল, আমার মধ্যে দুর্বল এবং গরিবরা বসবাস করবে। এরপরে মহান রব তাদের মধ্যে ফায়সালা করে দিলেন। তিনি বললেন, জান্নাত হলো আমার দয়ার একটি অংশ। সুতরাং আমি এর মাধ্যমে যাকে ইচ্ছা দয়া করব। আর হে জাহান্নাম, তুমি হলে আমার আজাব, আমি তোমার মাধ্যমে যাকে ইচ্ছা, তাকে আজাব দেব। আর তোমাদের দুজনকেই পরিপূর্ণ করার অধিকার আমার আছে। (সহিহ মুসলিম, ৭১৭৬, মুসনাদে আহমাদ, ১১৭৫৪)

শিক্ষা ও বিধান
১. অহংকার মানুষের ধ্বংসের অন্যতম কারণ। জাহান্নাম বলেছে, দাম্ভিক ও অহংকারীরা তার অধিবাসী হবে। এটি প্রমাণ করে যে অহংকার আল্লাহর কাছে অত্যন্ত ঘৃণিত। তাই মুসলিমের উচিত বিনয় ও নম্রতা অবলম্বন করা।

২. বিনয় ও অসহায়ত্ব আল্লাহর রহমত লাভের কারণ। জান্নাতে দুর্বল ও দরিদ্রদের উল্লেখ থেকে বোঝা যায়, যারা বিনয়ী, আল্লাহভীরু এবং দুনিয়ার অহংকার থেকে মুক্ত, তারা আল্লাহর বিশেষ রহমতের অধিকারী হতে পারে। তবে এর অর্থ এই নয় যে সব ধনী জাহান্নামী বা সব গরিব জান্নাতি; বরং মূল বিষয় হলো ঈমান, তাকওয়া ও চরিত্র।

৩. জান্নাত আল্লাহর রহমতের প্রকাশ। আল্লাহ বলেন, ‘জান্নাত আমার রহমতের একটি অংশ।’ অর্থাৎ জান্নাতে প্রবেশ শুধু আমলের কারণে নয়; বরং আল্লাহর অসীম দয়ার ফল।

৪. জাহান্নাম আল্লাহর ন্যায়বিচারের প্রকাশ। জাহান্নামের মাধ্যমে আল্লাহ অপরাধী ও অবাধ্যদের শাস্তি দেবেন। এতে আল্লাহর ইনসাফ ও বিচার প্রতিষ্ঠিত হবে।

৫. আল্লাহ সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী। জান্নাত ও জাহান্নাম—উভয়ই আল্লাহর সৃষ্টি এবং তিনি যাকে ইচ্ছা রহমত করবেন, যাকে ইচ্ছা ন্যায়সঙ্গতভাবে শাস্তি দেবেন।

৬. দুনিয়ার মর্যাদা নয়, আল্লাহর কাছে মর্যাদাই আসল। ধন-সম্পদ, পদমর্যাদা বা সামাজিক প্রভাব আল্লাহর কাছে সফলতার মানদণ্ড নয়। প্রকৃত মর্যাদা তাকওয়া ও সৎকর্মে।

৭. রিয়া, গর্ব ও আত্মঅহমিকা থেকে বেঁচে থাকা জরুরি। নিজেকে অন্যের চেয়ে বড় মনে করা, মানুষকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করা এবং অহংকার প্রদর্শন করা একজন মুমিনের জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক।

৮. আল্লাহর রহমতের আশা এবং তাঁর শাস্তির ভয়—উভয়ই রাখতে হবে। এই হাদিস একজন মুমিনকে একই সঙ্গে আশাবাদী ও সতর্ক থাকার শিক্ষা দেয়। সে আল্লাহর রহমতের আশা করবে, আবার তাঁর শাস্তিকে ভয় করবে।
 

বৃষ্টির দিনে রাস্তায় গাড়ি চালানোর চার আদব

মুফতি মুহাম্মদ মর্তুজা
বৃষ্টির দিনে রাস্তায় গাড়ি চালানোর চার আদব
সংগৃহীত ছবি

বর্ষাকালের টানা বৃষ্টিতে সাময়িকভাবে শহরের অনেক সড়ক পানিতে তলিয়ে যায়। এ সময় একজন চালকের সামান্য অসচেতনতা যেমন দুর্ঘটনার কারণ হতে পারে, তেমনি পথচারী, দোকানদার ও অন্যান্য মানুষের দুর্ভোগও বাড়িয়ে দিতে পারে। অতএব সে সময় একজন মুমিন যখন চালকের ভূমিকায় থাকবেন, তখন জনদুর্ভোগ লাঘব ও ব্যক্তিগত নিরাপত্তায় ইসলামের দৃষ্টিতে তার কিছু করণীয় থাকে। নিম্নে সে করণীয়গুলো তুলে ধরা হলো—

১. ইচ্ছাকৃতভাবে কাউকে কষ্ট না দেওয়া : পানিবন্দি রাস্তায় দ্রুতগতিতে গাড়ি চালালে কাদা ও নোংরা পানি ছিটকে পথচারী, দোকানদার বা অন্য যানবাহনের আরোহীদের গায়ে পড়ে, যা খুবই বিরক্তিকর বিষয়। এ সময় আক্রান্ত ব্যক্তির মন থেকে না চাইতেও বদদোয়া এসে যায়। অতএব, মুমিন চালকদের উচিত এ রকম পরিস্থিতিতে যেন অন্যের কষ্ট না হয়, সে বিষয়ে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকা। কারণ পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ অন্যায়ভাবে অন্যকে কষ্ট দিতে নিষেধ করেছেন। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘আর যারা মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারীদের তাদের কৃত কোনো অন্যায় ছাড়াই কষ্ট দেয়, নিশ্চয়ই তারা বহন করবে অপবাদ ও সুস্পষ্ট পাপ।’ (সুরা : আহজাব, আয়াত : ৫৮)

এলোমেলো গাড়ি চালিয়ে ইচ্ছাকৃত যানজট সৃষ্টি করে মানুষকে দুর্ভোগে ফেলাও অন্যায়ভাবে কষ্ট দেওয়ার শামিল। আর মানুষকে অন্যায়ভাবে কষ্ট দেওয়া ইসলামবিরোধী কাজ। রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘প্রকৃত মুসলিম সেই, তার জিহ্বা ও হাত থেকে অপর মুসলমান নিরাপদে থাকে।’ (বুখারি, হাদিস : ১০)

২. ধীরে ও সতর্কভাবে গাড়ি চালানো : বৃষ্টির কারণে জমে থাকা পানির নিচে গর্ত, খোলা ম্যানহোল বা ভাঙা রাস্তা থাকতে পারে। তাই দ্রুতগতিতে গাড়ি চালানো নিজের ও অন্যের জীবনের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। আর পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ বলেছেন, ‘তোমরা নিজ হাতে নিজেদের ধ্বংসের মধ্যে নিক্ষেপ কোরো না।’ (সুরা : বাকারাহ, আয়াত : ১৯৫)

৩. রাস্তা থেকে কষ্টদায়ক বস্তু সরিয়ে দেওয়া : বন্যা বা ভারি বৃষ্টিতে গাছের ডাল, ইট, বাঁশ বা অন্যান্য প্রতিবন্ধক পড়ে থাকতে পারে। সাধ্য থাকলে সেগুলো সরিয়ে দেওয়াও একটি সওয়াবের কাজ। রাসুল (সা.) বলেছেন, ঈমানের স্তর সত্তরের অধিক। তার সর্বনিম্ন স্তর হলো রাস্তা থেকে কষ্টদায়ক বস্তু দূর করা। (তিরমিজি, হাদিস : ২৬১৪)

৪. বিপদে পড়া মানুষের সাহায্যে এগিয়ে যাওয়া : কোনো গাড়ি বন্ধ হয়ে গেলে, বৃদ্ধ, নারী বা শিশু পানিতে আটকে গেলে কিংবা কেউ দুর্ঘটনায় পড়লে সাধ্য অনুযায়ী সাহায্য করা একজন মুমিনের দায়িত্ব। এতে আল্লাহর রহমত ও সাহায্য মেলে। হাদিস শরিফে ইরশাদ হয়েছে, রাসুল (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘বান্দা যতক্ষণ তার ভাইয়ের সাহায্য করে, আল্লাহও ততক্ষণ তাঁর বান্দার সাহায্য করেন।’ (আবু দাউদ, হাদিস : ৪৯৪৬)

মনে রাখা উচিত বর্ষাকালে পানিবন্দি সড়কে দায়িত্বশীলভাবে গাড়ি চালানো শুধু ট্রাফিক আইন মানার বিষয় নয়, এটি ইসলামী নৈতিকতারও অংশ। আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের আশায় মানুষের কল্যাণকামী হয়ে ধীরগতিতে চলা, অন্যকে কষ্ট না দেওয়া, যানজট না বাড়ানো, রাস্তার প্রতিবন্ধকতা দূর করা এবং বিপদে পড়া মানুষের পাশে দাঁড়ানো—এসব কাজ আল্লাহর কাছে ইবাদত ও সওয়াবের মাধ্যম হতে পারে। একজন সচেতন মুসলিমের পরিচয় হলো তার উপস্থিতিতে মানুষ নিরাপদ থাকে এবং তার আচরণ মানুষের জন্য রহমত হয়ে ওঠে। মহান আল্লাহ সবাইকে দায়িত্বশীল আচরণ করার তাওফিক দান করুন। আমিন।

মুমিনের দ্বিন ও দুনিয়ার মধ্যে ভারসাম্য জরুরি

ইসলামী জীবন ডেস্ক
মুমিনের দ্বিন ও দুনিয়ার মধ্যে ভারসাম্য জরুরি
সংগৃহীত ছবি

মুসলিম সমাজে এমন কিছু লোকের আবির্ভাব হয়েছে, যারা আল্লাহর দ্বিনের বিধানকে দুনিয়ার বিষয় থেকে আলাদা করতে চায়। তারা দাবি করে—ধর্মের জন্য আইন প্রণয়ন করবেন আল্লাহ, আর দুনিয়ার জন্য আইন প্রণয়ন করবে মানুষ। এটি সুস্পষ্ট ভ্রান্তি ও পথভ্রষ্টতা। কারণ তারা আইন প্রণয়নের অধিকার একাধিক সত্তার হাতে তুলে দিয়েছে, অথচ আইন প্রণয়নের একচ্ছত্র অধিকার শুধু আল্লাহরই। ইসলামের মূল কথা দুটি—১. একমাত্র আল্লাহর ইবাদত করা। ২. দ্বিন ও দুনিয়ার সব ক্ষেত্রে শরিয়তের বিধানকে মান্য করা। কিন্তু বেশির ভাগ মানুষ এ সত্য জানে না। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘বিধান দেওয়ার অধিকার একমাত্র আল্লাহর। তিনি আদেশ দিয়েছেন, তোমরা শুধু তাঁরই ইবাদত করো। এটাই সরল ও সঠিক দ্বিন; কিন্তু বেশির ভাগ মানুষ তা জানে না।’ (সুরা : ইউসুফ, আয়াত : ৪০)

যেমন আল্লাহ তাঁর ইবাদতে কাউকে শরিক করা পছন্দ করেন না, তেমনি তিনি তাঁর বিধানের পরিবর্তে অন্য কারো বিধান মান্য করাও পছন্দ করেন না। কোরআনে এসেছে, ‘তিনি (আল্লাহ) তাঁর বিধান ও কর্তৃত্বে কাউকে শরিক করেন না।’ (সুরা : আল-কাহফ, আয়াত : ২৬)

আল্লাহ আমাদের নির্দেশ দিয়েছেন—দ্বিন বা দুনিয়ার যেকোনো মতবিরোধের সমাধান তাঁর কিতাব ও তাঁর রাসুল (সা.)-এর সুন্নাহর কাছে ফিরিয়ে নিতে। তিনি বলেন, ‘যদি তোমরা কোনো বিষয়ে মতবিরোধে লিপ্ত হও, তবে তা আল্লাহ ও রাসুলের কাছে প্রত্যাবর্তন করো—যদি তোমরা আল্লাহ ও আখিরাতের প্রতি ঈমান রাখো। এটাই উত্তম এবং পরিণামের দিক থেকে সর্বোত্তম।’ (সুরা : নিসা, আয়াত : ৫৯)

ইসলামী শরিয়তের অপব্যাখ্যা ও আধুনিক বিভ্রান্তি
মুসলিম সমাজে এমন বহু চিন্তাধারার উদ্ভব হয়েছে, যারা শরিয়তের দলিলগুলো শরিয়তের বিশেষজ্ঞ আলেমদের ব্যাখ্যা ছাড়াই বোঝার আহ্বান জানায়। তারা কোরআন ও সুন্নাহকে সালাফে সালেহিন, তাফসিরবিদ, মুহাদ্দিস ও ফকিহদের বোঝার পদ্ধতি অনুসরণ করে না; বরং তারা নিজেদের প্রবৃত্তির অনুসরণে কোরআন ও সুন্নাহর অর্থ বিকৃত করে। তারা যাকে ‘মত প্রকাশের স্বাধীনতা’ বলে, তার নামে চিন্তার বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে চায়। তারা প্রত্যেক মানুষকে—যোগ্যতা থাকুক বা না থাকুক, সব বিষয়ে মতামত দেওয়ার উৎসাহ দেয়। এমনকি তারা বিশ্বাসের স্বাধীনতার নামে কোরআন-সুন্নাহ অস্বীকার করা কিংবা শরিয়তের বিধান প্রত্যাখ্যান করার স্বাধীনতার কথাও বলে।

এসব লোক ইসলামী শরিয়তের দলিল নিয়ে খেলছে। তাদের অনেক বক্তব্য বিচ্ছিন্ন, অস্বাভাবিক ও বিভ্রান্তিকর। তারা সাহাবা ও তাবেঈনদের পথের বিরোধিতা করছে, অথচ আল্লাহ আমাদেরকে তাদের অনুসরণ করার নির্দেশ দিয়েছেন। তারা কোরআনের দ্ব্যর্থবোধক আয়াত নিয়ে মানুষের মধ্যে ফিতনা সৃষ্টি করতে চায় এবং আল্লাহর শরিয়ত বিকৃত করার চেষ্টা করে। এমনকি তাদের কেউ কেউ স্বাধীনতার নামে নাস্তিকতা, শরিয়তবিরোধিতা এবং ইসলাম থেকে বের হয়ে যাওয়ার পর্যায়েও পৌঁছে গেছে। আল্লাহ বলেন, ‘আল্লাহ যাকে আলো দেন না, তার জন্য কোনো আলো নেই।’ (সুরা : আন-নুর, আয়াত : ৪০)

‘তোমরাই তোমাদের দুনিয়ার বিষয় বেশি জানো’ হাদিসের সঠিক অর্থ কিছু লোক দ্বিনকে দুনিয়া থেকে পৃথক করার পক্ষে দলিল হিসেবে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর এই হাদিস পেশ করে—‘তোমরাই তোমাদের দুনিয়ার বিষয় বেশি জানো।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ২৩৬৩)

কিন্তু এরা হাদিসটির প্রকৃত প্রেক্ষাপট গোপন করে। একবার রাসুলুল্লাহ (সা.) কিছু লোককে খেজুরগাছে পরাগায়ণ (পুরুষ গাছের রেণু স্ত্রী গাছে দেওয়া) করতে দেখলেন। তিনি বললেন, ‘আমার মনে হয়, এটি না করলেও চলবে।’ লোকেরা ভেবেছিল এটি নবী (সা.)-এর নির্দেশ, তাই তারা পরাগায়ণ বন্ধ করে দিল। ফলে সে বছর ফলন কমে গেল। পরে বিষয়টি রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে জানানো হলে তিনি বললেন, ‘যদি এতে তাদের উপকার হয়, তবে তারা তা করুক। আমি তো শুধু একটি ধারণা প্রকাশ করেছিলাম। তাই আমার অনুমানের জন্য আমাকে দোষারোপ কোরো না। কিন্তু আমি যখন তোমাদের কাছে আল্লাহর পক্ষ থেকে কোনো বিষয় বলি, তখন অবশ্যই তা গ্রহণ করবে। কারণ আমি কখনো আল্লাহর নামে মিথ্যা বলি না।’ (সহিহ মুসলিম)

শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যাহ (রহ.) বলেন, ‘রাসুলুল্লাহ (সা.) তাদের পরাগায়ণ করতে নিষেধ করেননি; বরং তারা ভুলবশত মনে করেছিল যে তিনি নিষেধ করেছেন।’ (মাজমুউল ফাতাওয়া : ১৮/১২)

অতএব, শরিয়ত মানুষের দ্বিন ও দুনিয়া—উভয়ের কল্যাণ সাধনের জন্য এসেছে। দুনিয়াবি বিষয়ে অভিজ্ঞতা, গবেষণা ও পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে উন্নতি করতে ইসলাম উৎসাহিত করেছে। যেমন—নিজের প্রয়োজন অনুযায়ী বাড়ি নির্মাণ করা, উপযোগী কৃষিপদ্ধতি গ্রহণ করা, নতুন শিল্প ও প্রযুক্তি উদ্ভাবন করা, মানুষের উপকারে আসে এমন আবিষ্কার করা, খাদ্য প্রস্তুতের নতুন পদ্ধতি গ্রহণ করা, উপকারী সব বৈজ্ঞানিক উন্নয়ন সাধন করা। এসব ক্ষেত্রে শরিয়ত বাধা দেয় না; বরং উপকার হলে উৎসাহিত করে।

দুনিয়াবি লেনদেন ও ইবাদতের মূলনীতি

ইসলামে মূলনীতি হলো দুনিয়াবি লেনদেন (মুয়ামালাত) মূলত বৈধ, যতক্ষণ না আল্লাহ ও তাঁর রাসুল তা হারাম ঘোষণা করেন। ইবাদত সম্পূর্ণরূপে শরিয়তনির্ভর; শরিয়তের অনুমতি ছাড়া নতুন কোনো ইবাদত প্রবর্তন করা বৈধ নয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি আমাদের এই দ্বিনের মধ্যে এমন কিছু নতুন সৃষ্টি করবে, যা এর অন্তর্ভুক্ত নয়, তা প্রত্যাখ্যাত হবে।’ (সহিহ বুখারি ও মুসলিম)

এখানে ‘আমাদের এই বিষয়’ বলতে দ্বিন বোঝানো হয়েছে, দুনিয়ার উপকারী বিষয় নয়। সুতরাং দুনিয়াবি এমন সব কাজ যা শরিয়তের নীতিবিরোধী নয়, সেগুলো গ্রহণে কোনো বাধা নেই। কিন্তু যে ব্যক্তি দুনিয়ার নামে শরিয়তের বিরোধিতা বৈধ মনে করে, সে আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের অবাধ্যতা করে। আল্লাহ বলেন, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের অবাধ্যতা করে, সে তো স্পষ্ট পথভ্রষ্টতায় পতিত হয়েছে।’ (সুরা : আহজাব, আয়াত : ৩৬)

আলেমদের ব্যাখ্যা
সৌদি আরবের স্থায়ী ফতোয়া বোর্ড (আল-লাজনাহ আদ-দায়িমাহ) বলেছে, ‘তোমরাই তোমাদের দুনিয়ার বিষয় বেশি জানো’ হাদিসটি সহিহ। এর অর্থ হলো কৃষি, শিল্প, সেলাই, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং এ ধরনের দুনিয়াবি বিষয়ে মানুষ অভিজ্ঞ। তবে প্রত্যেক ক্ষেত্রে শরিয়তের বিধান মেনে চলতে হবে।’ (ফাতাওয়া আল-লাজনাহ আদ-দায়িমাহ : ১(১৮/২৭)

শাইখ মুহাম্মাদ ইবনু উসাইমিন (রহ.) বলেন, ‘নবীরা মানুষের জন্য রেখে গেছেন শরিয়তের জ্ঞান; শিল্প, প্রযুক্তি বা কারিগরি বিদ্যা নয়।’ দুনিয়াবি যেসব বিষয়ে শরিয়তের বিধান আছে। কোরআনের দীর্ঘতম আয়াতই হলো ঋণ ও ব্যবসা-বাণিজ্য সম্পর্কিত। (সুরা : আল-বাকারাহ, আয়াত : ২৮২)

এটি প্রমাণ করে, ইসলাম দুনিয়ার বিষয়ও সুস্পষ্টভাবে নির্দেশনা দিয়েছে। দুনিয়াবি যেসব বিষয় শরিয়ত হারাম করেছে, তার মধ্যে আছে—সুদ, জুয়া, ব্যভিচার, বেপর্দা ও অশালীনতা, ব্যবসায় প্রতারণা, ইসলাম ও মুসলিমদের বিরুদ্ধে শত্রুতাকারীদের প্রতি অবৈধ আনুগত্য। এসব ক্ষেত্রে ‘আমরাই আমাদের দুনিয়ার বিষয় বেশি জানি’ এই অজুহাতে শরিয়ত অমান্য করা বৈধ নয়। আবার দুনিয়ার যেসব বিষয়ে শরিয়ত বিধান দিয়েছে, যেমন বিবাহ, তালাক, উত্তরাধিকার, ক্রয়-বিক্রয়, ইজারা, খাদ্য, বিচারব্যবস্থা—এসব ক্ষেত্রেও শরিয়তের পরিবর্তে মানুষের বানানো বিধান গ্রহণ করা বৈধ নয়।

যেসব দুনিয়াবি বিষয়ে মানুষ স্বাধীনভাবে উন্নয়ন করতে পারে
অন্যদিকে যেসব বিষয় শরিয়তের বিরোধী নয়, যেমন—শিল্প-কারখানা, কৃষি, চিকিৎসাবিজ্ঞান, প্রকৌশল, প্রযুক্তি ও তথ্য-প্রযুক্তি, বৈধ ব্যবসা-বাণিজ্য, প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা, সড়ক পরিবহন ও ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ, বিমান ও নৌপরিবহন এবং এ ধরনের অন্যান্য দুনিয়াবি উন্নয়নমূলক কাজ—এসব ক্ষেত্রে মানুষকে চিন্তা-গবেষণা, উদ্ভাবন ও উন্নয়নের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা নেক কাজ ও তাকওয়ার ক্ষেত্রে পরস্পর সহযোগিতা করো; পাপ ও সীমা লঙ্ঘনের কাজে সহযোগিতা কোরো না।’ (সুরা : মায়িদা, আয়াত : ২)

পরিশেষে ইসলাম কখনো দ্বিন ও দুনিয়াকে পরস্পর বিচ্ছিন্ন করে না; বরং ইসলাম মানুষের আধ্যাত্মিক, নৈতিক, সামাজিক, পারিবারিক, অর্থনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে আল্লাহর বিধানকে অনুসরণ করার শিক্ষা দেয়। একই সঙ্গে শরিয়তের সীমার মধ্যে থেকে বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, চিকিৎসা, কৃষি, শিল্প ও মানবকল্যাণমূলক সব দুনিয়াবি বিষয়ে গবেষণা, উদ্ভাবন ও উন্নয়নকে উৎসাহিত করে।

অতিমাত্রায় সোশ্যাল অ্যাক্টিভিটি ইবাদতে বিঘ্নতা সৃষ্টি করছে

ইসলামী জীবন ডেস্ক
অতিমাত্রায় সোশ্যাল অ্যাক্টিভিটি ইবাদতে বিঘ্নতা সৃষ্টি করছে
সংগৃহীত ছবি

প্রযুক্তি আজ আমাদের জীবনের অবিচ্ছেদ্য সঙ্গী। কিন্তু যে প্রযুক্তি জীবনকে সহজ করেছে, সেই প্রযুক্তিই নীরবে আমাদের হৃদয়ের সবচেয়ে মূল্যবান ইবাদত নামাজের একাগ্রতা কেড়ে নিচ্ছে। আমাদের মধ্যে অনেকেই নামাজে দাঁড়িয়েও কাজের চিন্তা, মেসেজ, নোটিফিকেশন, ফেসবুক, ভিডিও বা ফোনকলের কথা ভাবতে থাকেন। নামাজে দাঁড়ানোর পর মনে আসে, আমাকে কেউ ফোন দিচ্ছে কি না বা কেউ আমাকে মেসেজ দিচ্ছে কি না, অথবা নামাজ শেষ করেই দ্রুত কাউকে মেসেজ দিতে হবে। বারবার চেষ্টা করেও আমরা নামাজে মনোযোগ বসাতে পারি না, নামাজের মধ্যে একাগ্রতা সৃষ্টি করতে পারি না। এখন আমরা দুই রাকাত নামাজও পূর্ণ মনোযোগ সহকারে আদায় করতে পারি না।

ফলে দাঁড়িয়ে থাকে শুধু আমাদের শরীর; অথচ মন ঘুরে বেড়ায় কর্মস্থলে, মোবাইলের পর্দায়, অপঠিত বার্তায় কিংবা দুনিয়ার অগণিত ব্যস্ততায়। আমরা আল্লাহর সামনে দাঁড়িয়েও যেন দুনিয়ার সামনেই দাঁড়িয়ে থাকি। তাই নামাজ আদায় করা হলেও তার প্রকৃত স্বাদ ও খুশু (একাগ্রতা) হারিয়ে যায়। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ সফল মুমিনদের অন্যতম বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করে বলেন, ‘নিশ্চয়ই মুমিনরা সফল হয়েছে, যারা তাদের সালাতে বিনয়ী ও একাগ্র।’ (সুরা : মুমিনুন, আয়াত : ১-২)

এই আয়াত স্পষ্ট করে যে শুধু নামাজ পড়াই যথেষ্ট নয়; বরং নামাজে মনোযোগ ও বিনয় অর্জন করাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আল্লাহ তাআলা অন্য আয়াতে বলেন, ‘ধৈর্য ও সালাতের মাধ্যমে সাহায্য প্রার্থনা করো। আর এটি অবশ্যই কঠিন, তবে খুশুসম্পন্ন ব্যক্তিদের জন্য নয়।’ (সুরা : বাকারাহ, আয়াত : ৪৫)

এই আয়াতের ব্যাখ্যায় আলেমরা বলেছেন, যে নামাজে পরিপূর্ণ মনোযোগ থাকে না, সে নামাজ আদায় হলেও তার প্রকৃত স্বাদ থাকে না এবং পরিপূর্ণ সওয়াবও পাওয়া যায় না। (মাআরিফুল কুরআন : ১/২২১)
নামাজের মর্যাদা অনেকাংশেই নির্ভর করে আমাদের উপস্থিত হৃদয়ের ওপর, আমাদের মনোযোগের ওপর। এ ব্যাপারে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, বান্দা নামাজ আদায় করে, অথচ তার জন্য কখনো ১০ ভাগের এক ভাগ, কখনো ৯ ভাগের এক ভাগ, কখনো আট ভাগের এক ভাগ—এভাবে যতটুকু মনোযোগ ছিল, ততটুকুই সওয়াব লেখা হয়। (আবু দাউদ, হাদিস : ৭৯৬)

অন্য একটা হাদিস এসেছে, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যতক্ষণ বান্দা সালাতে এদিক-সেদিক না তাকায়, ততক্ষণ আল্লাহ তার দিকে মনোযোগ রাখেন। আর যখন সে মুখ ফিরিয়ে নেয়, আল্লাহও তার থেকে মনোযোগ ফিরিয়ে নেন।’ (তিরমিজি, হাদিস : ২৮৬৩)

বর্তমান সময়ে প্রযুক্তি আমাদের মনকে সব সময় ব্যস্ত রাখে। বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে, বারবার স্মার্টফোনের নোটিফিকেশন মানুষের মনোযোগ ভেঙে দেয় এবং দীর্ঘ সময় ধরে গভীরভাবে কোনো কাজে মনোযোগ ধরে রাখা কঠিন করে তোলে। এই অভ্যাস নামাজেও প্রভাব ফেলে। নামাজের আগে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সময় কাটানোর পর হঠাৎ সম্পূর্ণ মনোযোগ নিয়ে আল্লাহর সামনে দাঁড়ানো সহজ হয় না। অনেকেই নামাজ শুরু করার আগমুহূর্ত পর্যন্ত ফোন ব্যবহার করেন। আবার আরো ফোন সাইলেন্ট না থাকায় নামাজের মাঝেই রিংটোন বা নোটিফিকেশনের শব্দে মনোযোগ নষ্ট হয়ে যায়। অথচ রাসুলুল্লাহ (সা.) নামাজের আগে এমন সব বিষয় দূরে রাখতে নির্দেশ দিয়েছেন, যা মনোযোগ নষ্ট করে। তিনি বলেছেন, যখন খাবার উপস্থিত থাকে এবং পেশাব-পায়খানার চাপ থাকে, তখন নামাজ নয়। (মুসলিম, হাদিস : ৫৬০)

এ থেকে বোঝা যায়, মনোযোগ নষ্ট করে এমন বিষয় থেকে নিজেকে মুক্ত করে নামাজে দাঁড়ানো উচিত। তাই সম্ভব হলে নামাজের সময় মোবাইল দূরে রাখা, অন্তত কয়েক মিনিট আগে ফোন থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়া, রিংটোন ও নোটিফিকেশন বন্ধ করা এবং অজুর সময় থেকেই আল্লাহর স্মরণে মনকে প্রস্তুত করা—এসব ছোট অভ্যাস একাগ্রতা অর্জনে সহায়ক। পাশাপাশি তিলাওয়াতের অর্থ বোঝার চেষ্টা, সিজদার স্থানে দৃষ্টি রাখা। আজানের ধ্বনি শোনা মাত্রই দুনিয়ার সব ব্যস্ততা পেছনে ফেলে এমনভাবে আল্লাহর সামনে দাঁড়ানো উচিত, যেন এটাই জীবনের শেষ সালাত। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘এমনভাবে সালাত আদায় করো, যেন এটি তোমার জীবনের শেষ সালাত।’ (ইবনে মাজাহ, হাদিস : ৪১৭১)

আল্লাহ তাআলা আমাদের প্রতিটি সালাত হৃদয়ের প্রশান্তি, ঈমানের শক্তি ও আখিরাতের সফলতার পাথেয় হিসেবে কবুল করুন। আমিন।