সময়ের চাকা অবিরাম ঘুরছে। দিন, মাস ও বছরের পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে মানুষ এগিয়ে যাচ্ছে তার চূড়ান্ত গন্তব্যের দিকে। প্রতিটি নতুন বছর মানুষের জীবনে নতুন সম্ভাবনার বার্তা নিয়ে আসে, আবার স্মরণ করিয়ে দেয় জীবনের ক্ষণস্থায়িত্ব ও মৃত্যুর অনিবার্য বাস্তবতাকে। একজন মুসলমানের কাছে নতুন হিজরি বছরের আগমন শুধু ক্যালেন্ডারের পাতা পরিবর্তনের ঘটনা নয়; বরং এটি আত্মসমালোচনা, তাওবা, আত্মশুদ্ধি এবং আল্লাহর পথে নতুন উদ্যমে চলার এক মূল্যবান সুযোগ।
হিজরি সনের সূচনা জড়িয়ে আছে ইসলামের ইতিহাসের এক যুগান্তকারী ঘটনা—মহানবী (সা.)-এর হিজরতের সঙ্গে। এই হিজরত ছিল না শুধু ভৌগোলিক স্থানান্তর; বরং এটি ছিল সত্য ও ন্যায়ের পথে অবিচল থাকার, ত্যাগ-তিতিক্ষা ও আল্লাহর প্রতি পূর্ণ আস্থার এক অনন্য দৃষ্টান্ত। তাই নতুন হিজরি বছর আমাদের সামনে সেই মহান শিক্ষাগুলোকে নতুন করে স্মরণ করিয়ে দেয় এবং নিজেদের ঈমানি জীবনকে পুনর্গঠনের আহ্বান জানায়। মহান আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহর কাছে মাসের সংখ্যা বারোটি... এর মধ্যে চারটি সম্মানিত মাস।’ (সুরা : তাওবাহ, আয়াত : ৩৬)
নতুন হিজরি বছরের প্রথম মাস মহররম, যা ইসলামে বিশেষ মর্যাদাপূর্ণ একটি মাস। তাই একজন সচেতন মুমিনের উচিত এই বছরকে গুনাহ থেকে ফিরে আসা, নেক আমল বৃদ্ধি করা এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের দৃঢ় সংকল্পের মাধ্যমে বরণ করা।
মহররম : আল্লাহর সম্মানিত মাস
মহররম ইসলামের চারটি সম্মানিত মাসের অন্যতম। এই মাসে ইবাদত-বন্দেগির গুরুত্ব অন্যান্য সময়ের তুলনায় আরো বেশি। ইসলামের প্রাথমিক যুগ থেকেই এই মাস মুসলমানদের কাছে মর্যাদা ও সম্মানের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়ে এসেছে। মুফাসসিরগণ বলেন, সম্মানিত মাসগুলোতে নেক আমলের প্রতিদান বৃদ্ধি করা হয় এবং গুনাহের ভয়াবহতাও অধিক গুরুতর হয়। তাই এ মাসে পাপাচার থেকে দূরে থাকা এবং আল্লাহর আনুগত্যে জীবন পরিচালনা করা বিশেষভাবে জরুরি।
‘আল্লাহর মাস’ মহররম
মহররম মাসের বিশেষ মর্যাদা বোঝাতে মহানবী (সা.) একে ‘আল্লাহর মাস’ বলে উল্লেখ করেছেন। হাদিসে এসেছে, ‘রমজানের পর সর্বোত্তম রোজা হলো আল্লাহর মাস মহররমের রোজা।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ১১৬৩)
ইমাম ইবনে রজব হাম্বলি (রহ.) বলেন, কোনো কিছুকে আল্লাহর দিকে সম্বন্ধযুক্ত করা তার বিশেষ মর্যাদা ও সম্মানের প্রমাণ বহন করে। তাই মহররম মাসকে ইবাদত ও তাকওয়ার মাধ্যমে অতিবাহিত করা একজন মুমিনের দায়িত্ব।
আশুরা : মহররমের সর্বশ্রেষ্ঠ দিন
মহররম মাসের সবচেয়ে ফজিলতপূর্ণ দিন হলো ১০ মহররম বা আশুরা। মহানবী (সা.) মদিনায় এসে দেখলেন, ইহুদিরা আশুরার দিনে রোজা রাখে। কারণ এদিন আল্লাহ তাআলা মুসা (আ.) ও তাঁর অনুসারীদের ফেরাউনের অত্যাচার থেকে মুক্তি দিয়েছিলেন। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, ‘মুসা (আ.)-এর অনুসরণের ক্ষেত্রে আমি তোমাদের চেয়ে অধিক হকদার।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ২০০৪)
এরপর তিনি নিজেও রোজা রাখেন এবং সাহাবিদের রোজা রাখার নির্দেশ দেন। আশুরার রোজার ফজিলত সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘আমি আল্লাহর কাছে আশা করি, আশুরার রোজা পূর্ববর্তী এক বছরের গুনাহের কাফফারা হবে।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ১১৬২)
সুন্নাহ অনুযায়ী ৯ ও ১০ মহররম অথবা ১০ ও ১১ মহররম মিলিয়ে দুটি রোজা রাখা উত্তম।
নতুন হিজরি বছর বরণে মুমিনের করণীয়
১. আন্তরিক তাওবা করা : নতুন বছরের সূচনায় অতীত জীবনের গুনাহ, অবহেলা ও ভুলত্রুটির জন্য মহান আল্লাহর কাছে খাঁটি তাওবা করা উচিত। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘হে মুমিনরা! তোমরা সবাই আল্লাহর কাছে তাওবা করো, যাতে তোমরা সফল হতে পারো।’ (সুরা : নুর, আয়াত : ৩১)
২. আত্মসমালোচনা ও আত্মশুদ্ধি করা : গত বছরের আমল পর্যালোচনা করা এবং নিজের ভুল-ত্রুটি সংশোধনের পরিকল্পনা গ্রহণ করা একজন মুমিনের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। ওমর (রা.) বলেছেন, ‘তোমাদের হিসাব নেওয়ার আগে তোমরা নিজেদের হিসাব গ্রহণ করো।’
৩. নামাজের প্রতি যত্নবান হওয়া : পাঁচ ওয়াক্ত নামাজকে জীবনের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করার দৃঢ় সংকল্প গ্রহণ করতে হবে। কারণ নামাজই বান্দা ও আল্লাহর মধ্যকার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক।
৪. কোরআনের সঙ্গে সম্পর্ক গভীর করা : নতুন বছরে প্রতিদিন নিয়মিত কোরআন তিলাওয়াত, অর্থ অনুধাবন এবং তার আলোকে জীবন পরিচালনার অঙ্গীকার করা প্রয়োজন। আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয়ই এই কোরআন এমন পথ প্রদর্শন করে যা সর্বাধিক সরল ও সঠিক।’ (সুরা : ইসরা, আয়াত : ৯)
৫. নফল রোজা ও ইবাদত বৃদ্ধি করা : মহররমের রোজা, তাহাজ্জুদ, জিকির, দোয়া ও অন্যান্য নফল ইবাদতের মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের চেষ্টা করা উচিত।
৬. দান-সদকা ও মানবসেবা করা : অসহায়, দরিদ্র ও অভাবগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানো এবং মানবকল্যাণমূলক কাজে অংশগ্রহণ করা ইসলামের অন্যতম শিক্ষা।
৭. আত্মীয়তার সম্পর্ক সুদৃঢ় করা : পিতা-মাতার সেবা, আত্মীয়-স্বজনের খোঁজখবর নেওয়া এবং পারিবারিক সম্পর্ক রক্ষা করা একজন মুমিনের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।
মনগড়া আমল ও বিদআত থেকে সতর্কতা জরুরি
হিজরি নববর্ষ উপলক্ষে সমাজে অনেক সময় বিশেষ নামাজ, নির্দিষ্ট দোয়া, উৎসব, মিছিল বা বিভিন্ন রীতিনীতি প্রচলিত দেখা যায়; কিন্তু এসবের অধিকাংশের কোনো সহিহ ভিত্তি কোরআন ও সুন্নাহতে পাওয়া যায় না। মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি আমাদের দ্বিনের মধ্যে এমন কিছু সংযোজন করবে, যা এর অংশ নয়, তা প্রত্যাখ্যাত।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ২৬৯৭, সহিহ মুসলিম, হাদিস : ১৭১৮)
অতএব, সকল ইবাদত ও আমল হতে হবে শুধুমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য এবং রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নাহ অনুসারে।
সুতরাং নতুন হিজরি বছর একজন মুমিনের কাছে শুধু নতুন তারিখের সূচনা নয়; বরং এটি আত্মশুদ্ধির নতুন অধ্যায়, তাওবার নতুন দরজা এবং আল্লাহর দিকে ফিরে আসার এক মূল্যবান আহ্বান। মহররমের মর্যাদা, আশুরার ফজিলত এবং হিজরতের মহান শিক্ষা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে প্রকৃত সফলতা দুনিয়ার চাকচিক্যে নয়; বরং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের মধ্যেই নিহিত।
তাই আসুন, নতুন হিজরি বছরকে আমরা উৎসব-আড়ম্বরের মাধ্যমে নয়, বরং আন্তরিক তওবা, বেশি বেশি ইবাদত, কোরআনের সঙ্গে গভীর সম্পর্ক, মানবসেবা এবং তাকওয়াপূর্ণ জীবনযাপনের দৃঢ় সংকল্পের মাধ্যমে বরণ করি। অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে নতুন বছরকে নেক আমল ও কল্যাণের বছরে পরিণত করি। মহান আল্লাহ আমাদের সবাইকে মহররমের বরকত অর্জন, আশুরার ফজিলত লাভ এবং কোরআন-সুন্নাহর আলোকে জীবন পরিচালনার তাওফিক দান করুন। আমিন।