মুসলিম সমাজের কিছু সংকট আছে, যেগুলো ইসলামের কারণে সৃষ্টি হয়নি; বরং ইসলামের বিধানকে না বোঝার কারণে সৃষ্টি হয়েছে। ‘হালালা’ সেগুলোর অন্যতম। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে উপমহাদেশের বিভিন্ন দেশে এমন বহু ঘটনা সংবাদমাধ্যমে এসেছে, যেখানে তিন তালাকের পর পুনরায় সংসার করার আকাঙ্ক্ষাকে কেন্দ্র করে নারীদের এমন এক পরিস্থিতির মুখোমুখি করা হয়েছে, যা তাদের ব্যক্তিসত্তা, মর্যাদা এবং মানবিক অনুভূতির জন্য গভীরভাবে অপমানজনক। কোথাও ধর্মের ভাষা ব্যবহার করে, কোথাও সামাজিক চাপে, কোথাও আবার অর্থনৈতিক লেনদেনের মাধ্যমে এই প্রক্রিয়াকে বৈধতার আবরণ দেওয়ার চেষ্টা হয়েছে। ফলে সাধারণ মানুষের মনে একটি ধারণা জন্মেছে—এ বুঝি ইসলামেরই নির্দেশ।
কিন্তু ইতিহাস, ফিকহ এবং হাদিসের সূত্রগুলো অন্য কথা বলে। কোরআন মাজিদের দ্বিতীয় সুরা বাকারার ২৩০ নম্বর আয়াতে যে বিধান বর্ণিত হয়েছে, তার পেছনে ছিল একটি বিশেষ সামাজিক বাস্তবতা। জাহেলী যুগে আরব সমাজে তালাককে অনেক পুরুষ খেলার বস্তুতে পরিণত করেছিল। তারা স্ত্রীকে তালাক দিত, আবার ফিরিয়ে নিত, আবার তালাক দিত। নারীর জীবন ঝুলে থাকত পুরুষের খেয়ালের ওপর। এই অনিশ্চয়তা, এই মানসিক নির্যাতন এবং এই অবিচারের অবসান ঘটাতেই ইসলাম তালাকের একটি সুস্পষ্ট কাঠামো প্রবর্তন করে। তালাকের সংখ্যা সীমিত করা হয়, পুনর্মিলনের সুযোগ নির্ধারণ করা হয় এবং চূড়ান্ত বিচ্ছেদকে এমন এক সিদ্ধান্তে পরিণত করা হয়, যার পরিণতি সম্পর্কে মানুষকে আগেই ভাবতে হবে। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, ‘অতঃপর সে যদি (তৃতীয়বার) তালাক দেয়, তবে সে নারী তার জন্য হালাল হবে না, যতক্ষণ না সে অন্য কোনো স্বামীকে বিবাহ করে।’ (সুরা : বাকারা, আয়াত : ২৩০)
এই আয়াতের উদ্দেশ্য ছিল পুরুষকে সতর্ক করা, তাকে দায়িত্বশীল করা এবং বিবাহকে খেলায় পরিণত করার প্রবণতা বন্ধ করা। অর্থাৎ বিধানটির লক্ষ্য ছিল পরিবারকে রক্ষা করা, পরিবার ভাঙা নয়।
কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে ইতিহাসের এক পর্যায়ে এসে কিছু মানুষ এই বিধানের উদ্দেশ্যকে বিকৃত করে ফেলে। তারা এমন এক পদ্ধতির প্রচলন করে, যেখানে শুরু থেকেই পরিকল্পনা থাকে—একজন নারীকে সাময়িকভাবে অন্য একজন পুরুষের সঙ্গে বিয়ে দেওয়া হবে, তারপর তালাকের মাধ্যমে তাকে পূর্ববর্তী স্বামীর কাছে ফিরিয়ে দেওয়া হবে। সমাজে এটিই ‘হালালা’ নামে পরিচিত হয়ে ওঠে। অথচ ইসলামী আইনশাস্ত্রে এই প্রক্রিয়ার নাম ‘নিকাহে তাহলিল’, এবং এ সম্পর্কে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর অবস্থান ছিল অত্যন্ত কঠোর। আবদুল্লাহ ইবন মাসউদ (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আল্লাহ মুহাল্লিল (যে হালাল করার উদ্দেশ্যে বিয়ে করে) এবং মুহাল্লাল লাহু (যার জন্য তা করা হয়)—উভয়ের ওপর লানত করেছেন।’ (সুনান আবু দাউদ, হাদিস : ২০৭৬, জামে তিরমিজি, হাদিস : ১১২০, সুনান ইবন মাজাহ, হাদিস : ১৯৩৬)
হাদিসের এই ভাষা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। ইসলামী শরিয়তে ‘লানত’ শব্দটি সাধারণ অপছন্দনীয় কাজের জন্য ব্যবহৃত হয় না। এটি এমন কর্মকাণ্ডের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়, যা শরিয়তের মৌলিক উদ্দেশ্যের পরিপন্থী। অর্থাৎ বিবাহকে যদি একটি কৌশল, একটি ফাঁকি কিংবা একটি পূর্বপরিকল্পিত নাটকে পরিণত করা হয়, তবে তা ইসলামের দৃষ্টিতে নিন্দনীয়।
প্রখ্যাত তাবেয়ি ইমাম সাঈদ ইবনুল মুসাইয়্যাব (রহ.) থেকে শুরু করে চার মাজহাবের অসংখ্য ফকিহ এই ধরনের পরিকল্পিত তাহলীলকে কঠোরভাবে অপছন্দনীয় বলে উল্লেখ করেছেন। হানাফি ফিকহের বিখ্যাত গ্রন্থ রদ্দুল মুহতার-এ আল্লামা ইবন আবিদিন (রহ.) লিখেছেন, যদি বিবাহের উদ্দেশ্যই হয় কাউকে পূর্ববর্তী স্বামীর জন্য হালাল করা, তবে তা মারাত্মকভাবে মাকরুহ এবং গুনাহের কাজ।
এখানে একটি বিষয় বিশেষভাবে লক্ষণীয়। কোরআন যে বিবাহের কথা বলেছে, তা একটি স্বাভাবিক, বাস্তব ও স্থায়ী বৈবাহিক সম্পর্ক। সেখানে সংসার করার ইচ্ছা থাকবে, পারিবারিক জীবন থাকবে, দাম্পত্য সম্পর্ক থাকবে। পরবর্তী সময়ে যদি স্বাভাবিক কারণে সেই বিবাহ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়, তখন ভিন্ন আলোচনা। কিন্তু শুরু থেকেই যদি বিচ্ছেদের পরিকল্পনা থাকে, তবে সেটি কোরআনের বর্ণিত বিবাহ নয়; বরং বিবাহের আবরণে একটি কৃত্রিম ব্যবস্থা।
আজকের সমাজে কোনো কোনো সময় দেখা যায়, এই বিকৃত ধারণার শিকার হচ্ছেন নারীরা। একজন পুরুষের আবেগপ্রসূত সিদ্ধান্ত, রাগের মাথায় উচ্চারিত কয়েকটি শব্দ কিংবা পারিবারিক অস্থিরতার মূল্য দিতে হয় একজন নারীকে। অনেক ক্ষেত্রে তার মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া হয় না; তাকে একটি প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে দেখা হয়। অথচ ইসলাম নারীকে কখনো কোনো পুরুষের ভুলের বোঝা বহনের জন্য সৃষ্টি করেনি। বস্তুত হালালা বিতর্ক আমাদের সামনে আরও বড় একটি প্রশ্ন তুলে ধরে। আমরা কি শরিয়তের বিধানগুলোকে প্রকৃত উদ্দেশ্যের আলোকে বুঝছি, নাকি শুধু শব্দগত ব্যাখ্যার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখছি?
ইমাম আবু ইসহাক আশ-শাতিবি (রহ.) তাঁর আল-মুওয়াফাকাত গ্রন্থে দেখিয়েছেন যে শরিয়তের প্রতিটি বিধানের পেছনে একটি উদ্দেশ্য (মাকাসিদুশ শরিয়াহ) রয়েছে। ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা, মানবিক মর্যাদা রক্ষা, পরিবার সংরক্ষণ এবং সামাজিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা শরিয়তের গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্যগুলোর অন্যতম। কোনো ব্যাখ্যা যদি এই উদ্দেশ্যগুলোকে ক্ষতিগ্রস্ত করে, তবে সেই ব্যাখ্যা পুনর্বিবেচনার দাবি রাখে।
হালালার নামে আজ যে অপসংস্কৃতি সমাজে মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে, তা মূলত শরিয়তের ভাষাকে ব্যবহার করে শরিয়তের উদ্দেশ্যকে অস্বীকার করার একটি উদাহরণ। এখানে বিবাহের পবিত্রতা ক্ষুণ্ন হয়, নারীর মর্যাদা আহত হয় এবং ধর্মকে মানুষের কাছে একটি কঠোর ও অমানবিক ব্যবস্থারূপে উপস্থাপন করা হয়। অথচ ইসলাম এসেছে মানুষের জীবনকে সহজ, মর্যাদাপূর্ণ ও ন্যায়ভিত্তিক করার জন্য।
সবচেয়ে দুঃখজনক বিষয় হলো, ইসলামের সমালোচকরা প্রায়ই এই অপব্যবহারকেই ইসলামের প্রকৃত শিক্ষা হিসেবে তুলে ধরেন। ফলে একটি সমাজের অজ্ঞতা ও কিছু মানুষের স্বার্থপরতার দায় এসে পড়ে ধর্মের ওপর। অথচ ইসলামকে বিচার করতে হলে দেখতে হবে তার মূল উৎসগুলোকে—কোরআনকে, সুন্নাহকে এবং শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে গড়ে ওঠা ইসলামী আইনচিন্তার ঐতিহ্যকে।
তাই এখন সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন সঠিক উপলব্ধির। প্রয়োজন মানুষকে তালাকের বিধান সম্পর্কে সচেতন করা, আবেগের পরিবর্তে প্রজ্ঞার সঙ্গে পারিবারিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে উদ্বুদ্ধ করা এবং ধর্মের নামে চলা অপব্যাখ্যার বিরুদ্ধে জ্ঞানভিত্তিক অবস্থান তৈরি করা।
কারণ হালালার নামে যে অপমান আজ বিভিন্ন স্থানে দেখা যায়, তা ইসলামের নয়; বরং ইসলামের শিক্ষাকে ভুল বোঝার ফল। আর ইতিহাস বলে, যখনই মানুষ বিধানের মূল উদ্দেশ্য হারিয়ে ফেলে, তখন বিধান থেকে জন্ম নেয় জটিলতা, আর ধর্ম থেকে জন্ম নেয় ভ্রম ও ভ্রান্তি।







