• ই-পেপার

মৌসুমের নতুন ফল খাওয়ার সময় পঠিতব্য দোয়া

ইসলামে হালালা নামক পরিকল্পিত বিয়ে নিন্দনীয়

মুফতি সায়্যিদ মুনিব মুর্শিদ
ইসলামে হালালা নামক পরিকল্পিত বিয়ে নিন্দনীয়
সংগৃহীত ছবি

মুসলিম সমাজের কিছু সংকট আছে, যেগুলো ইসলামের কারণে সৃষ্টি হয়নি; বরং ইসলামের বিধানকে না বোঝার কারণে সৃষ্টি হয়েছে। ‘হালালা’ সেগুলোর অন্যতম। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে উপমহাদেশের বিভিন্ন দেশে এমন বহু ঘটনা সংবাদমাধ্যমে এসেছে, যেখানে তিন তালাকের পর পুনরায় সংসার করার আকাঙ্ক্ষাকে কেন্দ্র করে নারীদের এমন এক পরিস্থিতির মুখোমুখি করা হয়েছে, যা তাদের ব্যক্তিসত্তা, মর্যাদা এবং মানবিক অনুভূতির জন্য গভীরভাবে অপমানজনক। কোথাও ধর্মের ভাষা ব্যবহার করে, কোথাও সামাজিক চাপে, কোথাও আবার অর্থনৈতিক লেনদেনের মাধ্যমে এই প্রক্রিয়াকে বৈধতার আবরণ দেওয়ার চেষ্টা হয়েছে। ফলে সাধারণ মানুষের মনে একটি ধারণা জন্মেছে—এ বুঝি ইসলামেরই নির্দেশ।

কিন্তু ইতিহাস, ফিকহ এবং হাদিসের সূত্রগুলো অন্য কথা বলে। কোরআন মাজিদের দ্বিতীয় সুরা বাকারার ২৩০ নম্বর আয়াতে যে বিধান বর্ণিত হয়েছে, তার পেছনে ছিল একটি বিশেষ সামাজিক বাস্তবতা। জাহেলী যুগে আরব সমাজে তালাককে অনেক পুরুষ খেলার বস্তুতে পরিণত করেছিল। তারা স্ত্রীকে তালাক দিত, আবার ফিরিয়ে নিত, আবার তালাক দিত। নারীর জীবন ঝুলে থাকত পুরুষের খেয়ালের ওপর। এই অনিশ্চয়তা, এই মানসিক নির্যাতন এবং এই অবিচারের অবসান ঘটাতেই ইসলাম তালাকের একটি সুস্পষ্ট কাঠামো প্রবর্তন করে। তালাকের সংখ্যা সীমিত করা হয়, পুনর্মিলনের সুযোগ নির্ধারণ করা হয় এবং চূড়ান্ত বিচ্ছেদকে এমন এক সিদ্ধান্তে পরিণত করা হয়, যার পরিণতি সম্পর্কে মানুষকে আগেই ভাবতে হবে। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, ‘অতঃপর সে যদি (তৃতীয়বার) তালাক দেয়, তবে সে নারী তার জন্য হালাল হবে না, যতক্ষণ না সে অন্য কোনো স্বামীকে বিবাহ করে।’ (সুরা : বাকারা, আয়াত : ২৩০)

এই আয়াতের উদ্দেশ্য ছিল পুরুষকে সতর্ক করা, তাকে দায়িত্বশীল করা এবং বিবাহকে খেলায় পরিণত করার প্রবণতা বন্ধ করা। অর্থাৎ বিধানটির লক্ষ্য ছিল পরিবারকে রক্ষা করা, পরিবার ভাঙা নয়।

কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে ইতিহাসের এক পর্যায়ে এসে কিছু মানুষ এই বিধানের উদ্দেশ্যকে বিকৃত করে ফেলে। তারা এমন এক পদ্ধতির প্রচলন করে, যেখানে শুরু থেকেই পরিকল্পনা থাকে—একজন নারীকে সাময়িকভাবে অন্য একজন পুরুষের সঙ্গে বিয়ে দেওয়া হবে, তারপর তালাকের মাধ্যমে তাকে পূর্ববর্তী স্বামীর কাছে ফিরিয়ে দেওয়া হবে। সমাজে এটিই ‘হালালা’ নামে পরিচিত হয়ে ওঠে। অথচ ইসলামী আইনশাস্ত্রে এই প্রক্রিয়ার নাম ‘নিকাহে তাহলিল’, এবং এ সম্পর্কে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর অবস্থান ছিল অত্যন্ত কঠোর। আবদুল্লাহ ইবন মাসউদ (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আল্লাহ মুহাল্লিল (যে হালাল করার উদ্দেশ্যে বিয়ে করে) এবং মুহাল্লাল লাহু (যার জন্য তা করা হয়)—উভয়ের ওপর লানত করেছেন।’ (সুনান আবু দাউদ, হাদিস : ২০৭৬, জামে তিরমিজি, হাদিস : ১১২০, সুনান ইবন মাজাহ, হাদিস : ১৯৩৬)

হাদিসের এই ভাষা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। ইসলামী শরিয়তে ‘লানত’ শব্দটি সাধারণ অপছন্দনীয় কাজের জন্য ব্যবহৃত হয় না। এটি এমন কর্মকাণ্ডের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়, যা শরিয়তের মৌলিক উদ্দেশ্যের পরিপন্থী। অর্থাৎ বিবাহকে যদি একটি কৌশল, একটি ফাঁকি কিংবা একটি পূর্বপরিকল্পিত নাটকে পরিণত করা হয়, তবে তা ইসলামের দৃষ্টিতে নিন্দনীয়।

প্রখ্যাত তাবেয়ি ইমাম সাঈদ ইবনুল মুসাইয়্যাব (রহ.) থেকে শুরু করে চার মাজহাবের অসংখ্য ফকিহ এই ধরনের পরিকল্পিত তাহলীলকে কঠোরভাবে অপছন্দনীয় বলে উল্লেখ করেছেন। হানাফি ফিকহের বিখ্যাত গ্রন্থ রদ্দুল মুহতার-এ আল্লামা ইবন আবিদিন (রহ.) লিখেছেন, যদি বিবাহের উদ্দেশ্যই হয় কাউকে পূর্ববর্তী স্বামীর জন্য হালাল করা, তবে তা মারাত্মকভাবে মাকরুহ এবং গুনাহের কাজ।

এখানে একটি বিষয় বিশেষভাবে লক্ষণীয়। কোরআন যে বিবাহের কথা বলেছে, তা একটি স্বাভাবিক, বাস্তব ও স্থায়ী বৈবাহিক সম্পর্ক। সেখানে সংসার করার ইচ্ছা থাকবে, পারিবারিক জীবন থাকবে, দাম্পত্য সম্পর্ক থাকবে। পরবর্তী সময়ে যদি স্বাভাবিক কারণে সেই বিবাহ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়, তখন ভিন্ন আলোচনা। কিন্তু শুরু থেকেই যদি বিচ্ছেদের পরিকল্পনা থাকে, তবে সেটি কোরআনের বর্ণিত বিবাহ নয়; বরং বিবাহের আবরণে একটি কৃত্রিম ব্যবস্থা।

আজকের সমাজে কোনো কোনো সময় দেখা যায়, এই বিকৃত ধারণার শিকার হচ্ছেন নারীরা। একজন পুরুষের আবেগপ্রসূত সিদ্ধান্ত, রাগের মাথায় উচ্চারিত কয়েকটি শব্দ কিংবা পারিবারিক অস্থিরতার মূল্য দিতে হয় একজন নারীকে। অনেক ক্ষেত্রে তার মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া হয় না; তাকে একটি প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে দেখা হয়। অথচ ইসলাম নারীকে কখনো কোনো পুরুষের ভুলের বোঝা বহনের জন্য সৃষ্টি করেনি। বস্তুত হালালা বিতর্ক আমাদের সামনে আরও বড় একটি প্রশ্ন তুলে ধরে। আমরা কি শরিয়তের বিধানগুলোকে প্রকৃত উদ্দেশ্যের আলোকে বুঝছি, নাকি শুধু শব্দগত ব্যাখ্যার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখছি?

ইমাম আবু ইসহাক আশ-শাতিবি (রহ.) তাঁর আল-মুওয়াফাকাত গ্রন্থে দেখিয়েছেন যে শরিয়তের প্রতিটি বিধানের পেছনে একটি উদ্দেশ্য (মাকাসিদুশ শরিয়াহ) রয়েছে। ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা, মানবিক মর্যাদা রক্ষা, পরিবার সংরক্ষণ এবং সামাজিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা শরিয়তের গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্যগুলোর অন্যতম। কোনো ব্যাখ্যা যদি এই উদ্দেশ্যগুলোকে ক্ষতিগ্রস্ত করে, তবে সেই ব্যাখ্যা পুনর্বিবেচনার দাবি রাখে।

হালালার নামে আজ যে অপসংস্কৃতি সমাজে মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে, তা মূলত শরিয়তের ভাষাকে ব্যবহার করে শরিয়তের উদ্দেশ্যকে অস্বীকার করার একটি উদাহরণ। এখানে বিবাহের পবিত্রতা ক্ষুণ্ন হয়, নারীর মর্যাদা আহত হয় এবং ধর্মকে মানুষের কাছে একটি কঠোর ও অমানবিক ব্যবস্থারূপে উপস্থাপন করা হয়। অথচ ইসলাম এসেছে মানুষের জীবনকে সহজ, মর্যাদাপূর্ণ ও ন্যায়ভিত্তিক করার জন্য।

সবচেয়ে দুঃখজনক বিষয় হলো, ইসলামের সমালোচকরা প্রায়ই এই অপব্যবহারকেই ইসলামের প্রকৃত শিক্ষা হিসেবে তুলে ধরেন। ফলে একটি সমাজের অজ্ঞতা ও কিছু মানুষের স্বার্থপরতার দায় এসে পড়ে ধর্মের ওপর। অথচ ইসলামকে বিচার করতে হলে দেখতে হবে তার মূল উৎসগুলোকে—কোরআনকে, সুন্নাহকে এবং শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে গড়ে ওঠা ইসলামী আইনচিন্তার ঐতিহ্যকে।

তাই এখন সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন সঠিক উপলব্ধির। প্রয়োজন মানুষকে তালাকের বিধান সম্পর্কে সচেতন করা, আবেগের পরিবর্তে প্রজ্ঞার সঙ্গে পারিবারিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে উদ্বুদ্ধ করা এবং ধর্মের নামে চলা অপব্যাখ্যার বিরুদ্ধে জ্ঞানভিত্তিক অবস্থান তৈরি করা।

কারণ হালালার নামে যে অপমান আজ বিভিন্ন স্থানে দেখা যায়, তা ইসলামের নয়; বরং ইসলামের শিক্ষাকে ভুল বোঝার ফল। আর ইতিহাস বলে, যখনই মানুষ বিধানের মূল উদ্দেশ্য হারিয়ে ফেলে, তখন বিধান থেকে জন্ম নেয় জটিলতা, আর ধর্ম থেকে জন্ম নেয় ভ্রম ও ভ্রান্তি।

কোরআনের বাণী

কোরআনের ভাষায় যারা পৃথিবীর প্রকৃত উত্তরাধিকার

ইসলামী জীবন ডেস্ক
কোরআনের ভাষায় যারা পৃথিবীর প্রকৃত উত্তরাধিকার
সংগৃহীত ছবি

মহান আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, 

 وَ لَقَدۡ كَتَبۡنَا فِی الزَّبُوۡرِ مِنۡۢ بَعۡدِ الذِّكۡرِ اَنَّ الۡاَرۡضَ یَرِثُهَا عِبَادِیَ الصّٰلِحُوۡنَ

সরল অনুবাদ : 
‘আর উপদেশ দেওয়ার পর আমি কিতাবে লিখে দিয়েছি যে, আমার নেককার বান্দারাই পৃথিবীর উত্তরাধিকারী হবে।’ (সুরা : আম্বিয়া, আয়াত : ১০৫) 

সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা : 
আয়াতে زبور শব্দটি একবচন, এর বহুবচন হলো زبر। এর অর্থ কিতাব। দাউদ (আ.)-এর প্রতি নাজিলকৃত বিশেষ কিতাবের নামও জাবুর। তবে এখানে জাবুর বলে কি বোঝানো হয়েছে, এ সম্পর্কে বিভিন্ন উক্তি আছে। কারো কারো মতে ذكر বলে তাওরাত আর زبور বলে তওরাতের পর নাজিলকৃত আল্লাহর অন্যান্য গ্রন্থসমূহ বোঝানো হয়েছে; যথা ইঞ্জিল, জাবুর ও পবিত্র কোরআন। আবার কোন কোন মুফাসসিরের মতে ذكر বলে লাওহে মাহফুজ আর زبور বলে নবীদের ওপর নাজিলকৃত সকল ঐশী গ্রন্থই বোঝানো হয়েছে। (তাফসিরে কুরতুবি, ইবন কাসির, ফাতহুল কাদির)

কোন কোন মুফাসসির বলেন, এখানে পৃথিবী বলে বর্তমান সাধারণ দুনিয়ার জমিন ও জান্নাতের জমিন উভয়টিই বোঝানো হয়েছে। জান্নাতের জমিনের মালিক যে এককভাবে সৎকর্মপরায়ণরা হবে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। তবে এক সময় তারা এককভাবে দুনিয়ার জমিনের মালিক হবে বলেও প্রতিশ্রুতি আছে। পবিত্র কোরআনের একাধিক আয়াতে এই সুসংবাদ দেয়া হয়েছে। এক আয়াতে ইরশাদ হয়েছে, ‘পৃথিবী তো আল্লাহরই। তিনি তাঁর বান্দাদের মধ্যে যাকে ইচ্ছে সেটার উত্তরাধিকারী করেন। এবং শুভ পরিণাম তো মুত্তাকিদের জন্য।’ (সুরা : আরাফ, আয়াত : ১২৮)

অন্য আয়াতে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমাদের মধ্যে যারা ঈমান আনে ও সৎকাজ করে আল্লাহ তাদের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন যে, তিনি অবশ্যই তাদের পৃথিবীতে প্রতিনিধিত্ব দান করবেন।’ (সুরা : নুর, আয়াত : ৫৫) (ইবন কাসির, তাফসিরে জাকারিয়া)

নিশ্চয় আমার সৎকর্মশীল বান্দারা পৃথিবীর অধিকারী হবে। কোন কোন মুফাস্‌সির الأرض (পৃথিবী) বলতে জান্নাত অর্থ নিয়েছেন। আবার কেউ বলেছেন, তার অর্থ : কাফেরদের দেশ ও জমি-জায়গা। আয়াতের অর্থ হল, আল্লাহর সৎকর্মশীল বান্দারাই পৃথিবীর অধিকারী হবে। আর এতে কোন সন্দেহ নেই যে, মুসলিমরা যতদিন সৎকর্মশীল ছিল, ততদিন তারাই পৃথিবীর উপর ক্ষমতাসীন হয়ে উন্নতশির ছিল এবং ভবিষ্যতেও যখনই তারা এই গুণের অধিকারী হবে, আল্লাহর এই প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী পৃথিবীর শাসন-ক্ষমতা তাদের হাতেই আসবে। বলা বাহুল্য, মুসলিমদের পৃথিবীর শাসন-ক্ষমতা থেকে বঞ্চিত থাকার বর্তমান পরিস্থিতি দেখে মনে যেন কোন প্রকার সংশয় ও প্রশ্ন উদিত না হয়।

যেহেতু এ প্রতিশ্রুতি মুসলিমদের সৎকর্মশীলতার সাথে শর্ত-সাপেক্ষ। তাই যখন মুসলিমরা ঐ শর্ত পালনে অক্ষম হল, তখন তারা পৃথিবীর শাসন-ক্ষমতা ও আধিপত্য থেকে বঞ্চিত হল। সুতরাং এখানে শাসন-ক্ষমতা পাওয়ার উপায় ও পথ বলে দেওয়া হয়েছে, আর তা হল সৎকর্ম। অর্থাৎ, আল্লাহ ও তাঁর রসুলের বিধি-বিধান অনুসারে জীবন-যাপন করা এবং শরীয়তের নিয়ম-কানুন ও সীমা মেনে চলা। মুসলিমরা যেদিন নিজেদের জীবন ও পরিবারে ইসলামী সংবিধানকে বাস্তবায়িত করতে পারবে, সেদিনই ফিরে পাবে পৃথিবীর শাসন-ক্ষমতা। ইনশাআল্লাহ । (তাফসিরে আহসানুল বায়ান)

হাদিসের বাণী

ইসলামে যোগ্যতার মাপকাঠি বয়স নয়

ইসলামী জীবন ডেস্ক
ইসলামে যোগ্যতার মাপকাঠি বয়স নয়
সংগৃহীত ছবি

ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ওমর (রা.) আমাকে বদরি বড় বড় সাহাবিদের মজলিসে নিতেন। তাঁদের মধ্যে কিছু লোক তখন মনে মনে মনখারাপ করতেন। ফলে কেউ বললেন, সে আমাদের সাথে মজলিসে কেন আসছে? তার বয়সি ছেলে তো আমাদেরও আছে! তখন ওমর (রা.) বললেন, ইবনে আব্বাস সম্পর্কে তো তোমাদের সবারই জানা আছে। 

এরপরে একদিন তিনি আমাকে বড়দের মজলিসে প্রবেশ করার জন্য বললেন। সেদিন আমি মনে করেছিলাম যে, আমাকে ডাকার কারণ হলো, সবার সামনে বোধ হয় আমার সম্মান বৃদ্ধি করবেন। কিন্তু ওমর (রা.) সবাইকে বললেন, তোমরা আল্লাহর এই বাণী: ‘যখন আল্লাহর সাহায্য ও বিজয় আসবে।’ (সুরা : নাসর, আয়াত : ১ ) এই আয়াতের ব্যাখ্যার ব্যাপারে তোমরা কী বলো? কেউ কেউ উত্তর দিল, আল্লাহ আমাদের ওপর কোনো বিজয় বা সাহায্য করলে আমরা যেন তাঁর প্রশংসা করি এবং তাঁর কাছে ক্ষমা চাই। এটাই এই আয়াতে বলা হয়েছে। আর কিছু লোক চুপ করে থাকলেন, কোনো কিছুই বললেন না। 

ইবনে আব্বাস (রাদি.) বলেন, তারপর ওমর (রা.) আমাকে বললেন, হে ইবনে আব্বাস, তোমার মতামত কী? তাদের মতোই কি বলছ? আমি বললাম, না। তিনি বললেন, তাহলে এর ব্যাখ্যা কী? তুমি বলো। আমি বললাম, সেটা হলো- রাসুল (সা.)-এর মৃত্যুসংবাদ, যা আল্লাহ তাঁকে জানিয়েছেন। আল্লাহ বলেন, ‘যখন আল্লাহর সাহায্য ও বিজয় আসবে।’ আর সেটা হলো তোমার মৃত্যুর পূর্বলক্ষণ। ‘তখন তুমি তোমার প্রভুর প্রশংসায় তাঁর পবিত্রতা বর্ণনা করো এবং তাঁর কাছে সমস্ত ত্রুটির জন্য ক্ষমা চাও। নিশ্চয়ই তিনি তাওবা গ্রহণকারী।’ (সুরা : নাসর, আয়াত : ৩) তারপর ওমর (রা.) বললেন, তুমি যে অর্থ বলেছো, আমি এই অর্থই জানি। (সহিহ বুখারি, হাদিস নং : ৪৯৭০, মুসনাদে আহমাদ, হাদিস নং : ৩১২৭)


শিক্ষা ও বিধান 
১.  ওমর (রা.) বয়সে প্রবীণ ও বদরি সাহাবিদের মজলিসে তরুণ ইবননে আব্বাস (রা.)-কে স্থান দিয়েছিলেন। এতে বোঝা যায়, ইসলামে মর্যাদার ভিত্তি কেবল বয়স নয়; বরং জ্ঞান, প্রজ্ঞা ও যোগ্যতা।

২. ইবনে আব্বাস (রা.) তখন বয়সে তরুণ ছিলেন, কিন্তু তাঁর অসাধারণ জ্ঞান ও কোরআন বোঝার ক্ষমতার কারণে তিনি বিশেষ মর্যাদা পেয়েছিলেন। তাই সমাজ ও রাষ্ট্র পরিচালনায় মেধাবী তরুণদের সুযোগ দেওয়া প্রয়োজন।

৩. কিছু সাহাবি আয়াতের বাহ্যিক অর্থ ব্যাখ্যা করেছিলেন, কিন্তু ইবনে আব্বাস (রা.) এর অন্তর্নিহিত তাৎপর্য উপলব্ধি করেছিলেন। এটি প্রমাণ করে যে কোরআনের আয়াতের গভীর তাৎপর্য নিয়ে চিন্তা-গবেষণা করা গুরুত্বপূর্ণ।

৪. সুরা নাসরে বিজয়ের সুসংবাদের পর আল্লাহর প্রশংসা ও ইস্তিগফারের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তাই সফলতা অর্জনের পর অহংকার নয়, বরং কৃতজ্ঞতা ও তাওবা করা জরুরি।

৫. মৃত্যুর জন্য সর্বদা প্রস্তুত থাকা প্রয়োজন ইবনু আব্বাস (রা.) বুঝেছিলেন যে সুরা নাসর রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর ইন্তেকালের নিকটবর্তী হওয়ার ইঙ্গিত বহন করে। তাই দুনিয়ার সাফল্যের মধ্যেও আখিরাতের প্রস্তুতি অব্যাহত রাখতে হবে।

৬. ওমর (রা.) ইবনে আব্বাস (রা.)-কে প্রশ্ন করে তাঁর জ্ঞান সবার সামনে তুলে ধরেছিলেন। তাই শিক্ষক ও নেতাদের উচিত মেধাবীদের বিকাশে এভাবেই সহায়তা করা।

৭. ইবনে আব্বাস (রা.) প্রবীণ সাহাবিদের মতের সঙ্গে অন্ধভাবে একমত হননি; বরং দলিলভিত্তিক নিজের উপলব্ধি প্রকাশ করেছেন। তাই সত্য ও সঠিক জ্ঞান থাকলে তা সম্মানের সঙ্গে উপস্থাপন করা উচিত।

৮. নেতৃত্বের একটি গুণ হলো যোগ্য মানুষকে চিহ্নিত করা। ওমর (রা.) ইবনু আব্বাস (রা.)-এর প্রতিভা চিনতে পেরেছিলেন এবং তাকে যথাযথ মর্যাদা দিয়েছিলেন। 

অতএব, জ্ঞান ও প্রজ্ঞা বয়সের সীমাবদ্ধতায় আবদ্ধ নয়। কোরআনের গভীর অর্থ অনুধাবন, মেধাবীদের মূল্যায়ন, সফলতার পর আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা ও ইস্তিগফার, এবং মৃত্যুর প্রস্তুতি—এসবই একজন মুমিনের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা। ওমর (রা.) ও ইবনু আব্বাস (রা.)-এর এই ঘটনাটি ইসলামে জ্ঞানচর্চা ও যোগ্যতার মর্যাদার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।

বিশ্বকাপ ফুটবল ঘিরে তরুণদের উদাসীনতা কাম্য নয়

মুফতি তাহসীন শাকিল
বিশ্বকাপ ফুটবল ঘিরে তরুণদের উদাসীনতা কাম্য নয়
সংগৃহীত ছবি

​সবুজ গালিচার উপর একটা সিন্থেটিক লেদারের তৈরি গোলকের পেছনে ২২ জোড়া পায়ের অবিরাম ছুটে চলা, গ্যালারির চারপাশে হাজারো দর্শকের গগনবিদারী চিৎকার, আর রূপালী পর্দার সামনে উন্মুখ দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকা সহস্র কোটি তরুণ যুবকের কাটিয়ে দেয়া বিনিদ্র রাত— চার বছর অন্তর আয়োজিত বিশ্বকাপের বিশ্ব কাঁপানো ‘গ্রেটেস্ট শো অন আর্থ’ আয়োজনকে কেন্দ্র করে এমনই এক বৈশ্বিক উন্মাদনায় মেতে ওঠে উম্মাহর হৃদপিণ্ড মুসলিম যুবতরুণ। অথচ চোখ বন্ধ করে ভাবনার জানালা খুললেই দেখা যায় এই অদ্ভুত নান্দনিক উন্মাদনা শরীয়ত সমর্থিত বিনোদনের সীমা অতিক্রম করে সময়ের অপচয়, নৈতিক স্খলন ও কর্মমুখর জীবনের জন্য অভিশাপের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। 

সময়ের অপচয় ও কর্মের প্রতি অবহেলা 
তারুণ্য হলো জীবনের বসন্তকাল। যেকোনো জাতি ও সভ্যতার ভাগ্য পরিবর্তনের মূল চালিকাশক্তি হলো তার তরুণ সম্প্রদায়। তারুণ্যের এই সময়টা নিজেদের জীবন-ক্যারিয়ার, জ্ঞান-গবেষণা ও কর্মমুখর জীবনের ময়দানে ঈপ্সিত সাফল্যের উচ্চতায় আরোহনের জন্য ব্যয় করা উচিত। অথচ জীবনের সীমিত সময়ের এই সোনালী মুহুর্তগুলো করপোরেট দুনিয়ার বানিজ্যিক জুয়ার পেছনে নষ্ট করে দেয়া হচ্ছে। অবচেতন তরুণদের মনোজগতে বাসা বেঁধেছে দূরবর্তী অমুসলিম জাতি ও সংস্কৃতির প্রতি অসীম ভালোবাসা। যা তাদের খোদা প্রদত্ত সহজাত সুকুমারবৃত্তি নষ্ট করে অন্যায় অশ্লীলতার অবাধ স্রোতে ভাসিয়ে জীবনকে করছে কলুষিত। অথচ পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা সফল মুমিনদের বৈশিষ্ট্য বর্ননা করতে গিয়ে বলেছেন, (আর যারা অনর্থক ও অসার ক্রিয়াকলাপ থেকে মুখ ফিরিয়ে রাখে।’ (সুরা : মুমিনুন, আয়াত : ৩) 

আত্মপরিচয়ের সংকট 
বিশ্বকাপ মওসুম এলে মুসলিম যুবক-তরুণদের তৎপরতার মধ্য দিয়ে সবচেয়ে বেদনাদায়ক যে চিত্রটি ভেসে ওঠে, তা হলো—ভিনদেশী সংস্কৃতি, ভিনদেশী আদর্শ ও ভিনদেশী অমুসলিম সমাজ রীতিতে বেড়ে ওঠা খেলোয়াড়দেরকে নিজেদের আইডল বানানো ও তাদের অনুরক্ত হয়ে যাওয়ার প্রবণতা। শরীয়ত কর্তৃক নিষিদ্ধ ও নিজেদের আদর্শিক সীমা বহির্ভূত অমুসলিম খেলোয়াড়দের প্রতি এমন মাত্রাতিরিক্ত আসক্তি মূলত আমাদের নতুন প্রজন্মের ঈমানী অবক্ষয়ের প্রতিচ্ছবি। এমনকি পোশাক পরিচ্ছেদে,  চুল কাটার স্টাইলে ও জীবনযাপনের পদ্ধতিতে তাদের অন্ধ অনুকরণ মুসলিম যুব তরুণদের চরম আত্মপরিচয়ের সংকট-ও আমাদের চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় বটে। 

মুসলিম যুব-তরুণদের এই অধঃপতিত অবস্থা গভীর উদ্বেগের বিষয়। একজন মুসলিমের সবচেয়ে গর্বের পরিচয় হলো সে আল্লাহর বান্দা ও সর্বশেষ নবী মুহাম্মাদ সা. এর উম্মত। অথচ বিশ্বকাপে মওসুম আসলে দেখা যায় তারা অমুসলিম রাষ্ট্রের বিজয়ে উল্লাস করে, তাদের পতাকা গায়ে পেঁচিয়ে গর্ববোধ করে এবং তাদের জাতীয় প্রতীককে নিজেদের পরিচয়ের অংশ মনে করতেও দ্বিধা করে না। এ-সবই মুসলিম স্বাতন্ত্র্যবোধ ও ঈমানী আত্নমর্যাদাবোধের সাথে সাংঘর্ষিক। হাদিসের ভাষ্যে এসব কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে কঠোর হুঁশিয়ার বাণী উচ্চারিত হয়েছে। নবীজি সা. বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি কোনো জাতির সাদৃশ্য অবলম্বন করে, সে তাদেরই অন্তর্ভুক্ত।’ (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস নং :  ৪০৩১)

ফরজ ইবাদতে উদাসীনতা 
খেলা দেখার সূচি রক্ষা করতে গিয়ে নামাজের সূচি বদলে ফেলার মতো স্পর্ধা দেখাতেও কুণ্ঠাবোধ করছে না তরুণদের বৃহৎ একটি অংশ। পছন্দের দলের খেলা দেখার বেপরোয়া নেশায় মোহগ্রস্ত হয়ে রাত জেগে থাকার পরে ফজরের নামাজে অবহেলা করে। কখনো নামাজ একেবারেই ছুটে যায়। অথচ ইসলামে নামাজ একটি ফরজ ইবাদত। নির্ধারিত সময়ে আদায় করা আবশ্যক। বিনা ওজরে কোনোভাবেই গাফলতি করার সুযোগ নেই। 

অবাক করার বিষয় হলো—যে তরুণ একটি গোল মিস হওয়ার আশঙ্কায় চোখের পলক ফেলে না, সেই একই তরুণ অবলীলায় ঈমানের পরে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ফরজ- নামাজ কাজা করে ফেলছে। অথচ নামা হলো মুমিনের জীবনের সফলতার চাবিকাঠি। সফল মুমিনদের গুণাবলি বর্ননা করতে গিয়ে আল্লাহ তাআলা সর্বপ্রথম নামাজের কথা উল্লেখ করেছেন, ‘নিশ্চয়ই সফলতা অর্জন করেছে মুমিনগণ। যারা তাদের নামাজে আন্তরিকভাবে বিনীত।’ (সুরা : মুমিনুন, আয়াত : ১-২)

অর্থনৈতিক অপচয় ও অকৃতজ্ঞতা
পছন্দের দলের জার্সি, পতাকা ও ব্যানার বানানোর পেছনে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করা, বাজি ধরা, রেলি করা ও খেলা দেখার জন্য অহেতুক বিভিন্ন  আয়োজন—ইত্যাদি সবই অর্থের অপচয়ের অন্তর্ভুক্ত। অথচ আর্থিক স্বচ্ছলতা আল্লাহর অন্যতম একটি অনুগ্রহ। আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনে—জীবনের প্রয়োজনীয় খাতে এবং সামাজিক ও জাতীয় জীবনের অর্থবহ আয়োজনে অর্থ ব্যয় করাই শরীয়তের দাবি। এর বিপরীতে অন্যায় কর্মকাণ্ডের পেছনে অর্থ ব্যয় করা শরীয়তের দৃষ্টিকোণ থেকে নাজায়েজ। অর্থ অপচয়কারীকে কোরআনে শয়তানের অনুসারী অভিধায় উল্লেখ করা হয়েছে। 

সারকথা হলো, নির্ধারিত সীমারেখার মধ্যে ইসলাম বিনোদনের অনুমতি দেয়। কিন্তু বর্তমান বিশ্ব বাস্তবতায় আন্তর্জাতিক ওয়ার্ল্ড কাপগুলো শরীয়তের নির্ধারিত সীমা থেকে যোজন যোজন দূরে। উপরন্তু এর সাথে জড়িত আছে নানান ক্যাটাগরির পাপাচার—নগ্নতা-অশ্লীলতা, বেহায়াপনা, মদ জুয়া, গান-বাজনা, নামাজে অবহেলা, বিদেশি সংস্কৃতির অন্ধ অনুসরণসহ অন্যান্য মুনকার কাজ এই আয়োজনের অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়েছে। সুতরাং একজন আত্মসচেতন মুসলিম তরুণের জন্য এজাতীয় আয়োজনে—যেকোনো অবস্থান থেকে অংশগ্রহণ করা কোনোভাবেই সমীচীন নয়।

লেখক : শিক্ষক, মাদরাসাতুত তাক্বওয়া আল-ইউসুফিয়্যাহ 

সরাইল বি.বাড়িয়া।