• ই-পেপার

হাদিসের বাণী

দান যেভাবে জীবনে প্রশস্ততা বয়ে আনে

হজের পর গুনাহমুক্ত জীবন লাভের সাত উপায়

ইসলামী জীবন ডেস্ক
হজের পর গুনাহমুক্ত জীবন লাভের সাত উপায়
সংগৃহীত ছবি

হজ শুধু একটি ইবাদত নয়; এটি একজন মুমিনের জীবনের সবচেয়ে বড় আত্মিক বিপ্লব। লাখো মানুষের সঙ্গে একই পোশাকে, একই ময়দানে দাঁড়িয়ে মানুষ উপলব্ধি করে— একদিন তাকে তার রবের সামনে এভাবেই উপস্থিত হতে হবে। তাই হজের প্রকৃত সফলতা শুধুমাত্র মক্কা-মদিনায় কয়েকটি দিন কাটানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং হজ থেকে ফিরে জীবনের প্রতিটি দিনকে আল্লাহর সন্তুষ্টির পথে পরিচালিত করার মধ্যেই এর প্রকৃত সার্থকতা। অনেকেই হজ থেকে ফিরে নতুন উদ্দীপনায় জীবন শুরু করেন। কিন্তু প্রকৃত হাজি তিনি, যার চরিত্র, আমল, চিন্তা ও জীবনাচরণে হজের প্রভাব স্থায়ীভাবে প্রতিফলিত হয়। হজের মাধ্যমে অর্জিত পবিত্রতা ও তাকওয়াকে ধরে রাখাই হলো হজ কবুল হওয়ার অন্যতম আলামত।

 হজের প্রতিদান: নবজাতকের মতো পবিত্রতা অর্জন করা। কবুল হজ মানুষের অতীতের গুনাহ মুছে দেয়। ফলে সে হজ থেকে ফিরে আসে এক নবজাতক শিশুর মতো পবিত্র, নির্মল ও গুনাহমুক্ত হয়ে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে হজ পালন করে এবং হজের সময় অশ্লীল কথা, কুকর্ম ও গুনাহ থেকে সম্পূর্ণ বিরত থাকে, সে এমন নিষ্পাপ অবস্থায় ফিরে আসে, যেমন ছিল সেদিন, যেদিন তার মা তাকে জন্ম দিয়েছিলেন।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস নং : ১৫২১)

এই হাদিস আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, হজ একজন মানুষকে গুনাহমুক্ত জীবনের নতুন সূচনা করার সুযোগ দেয়। আর হজের পর তাকওয়াই হজের মূল শিক্ষা।  আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমরা পাথেয় সংগ্রহ কর; আর সর্বোত্তম পাথেয় হলো তাকওয়া।’ (সুরা : বাকারা, আয়াত :  ১৯৭)

হজের প্রতিটি কর্মই তাকওয়ার শিক্ষা দেয়। তাই হজ থেকে ফিরে প্রথম দায়িত্ব হলো আল্লাহভীতিকে জীবনের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করা।

হজের পর গুনাহমুক্ত জীবন গড়ার সাত উপায়

১. ফরজ ইবাদতে অবহেলা না করা : হজের পর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো— পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ, রোজা, জাকাতসহ সব ফরজ বিধান যথাযথভাবে পালন করা। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘নিশ্চয়ই নামাজ অশ্লীলতা ও মন্দ কাজ থেকে বিরত রাখে।’ (সুরা : আনকাবুত, আয়াত : ৪৫)

২. অতীতের গুনাহ থেকে সম্পূর্ণ তওবা করা : যে গুনাহের জন্য হজের আগে অনুতপ্ত ছিলেন, হজের পর যেন আর কখনো সে পথে ফিরে না যান। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘হে মুমিনরা! তোমরা সবাই আল্লাহর কাছে তওবা কর, যাতে তোমরা সফল হতে পার।’ (সুরা আন-নূর: আয়াত ৩১)

৩. কোরআনের সঙ্গে স্থায়ী সম্পর্ক গড়ে তোলা : হজের পর প্রতিদিন কোরআন তিলাওয়াত ও অর্থ বোঝার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। কোরআনই একজন মুমিনের জীবন পরিচালনার সর্বোত্তম পথনির্দেশ।

৪. নেককারদের সান্নিধ্যে থাকা : মানুষ তার বন্ধু ও পরিবেশ দ্বারা প্রভাবিত হয়। তাই দ্বীনদার, আল্লাহভীরু মানুষের সঙ্গ গ্রহণ করা জরুরি। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘মানুষ তার বন্ধুর আদর্শের ওপর প্রতিষ্ঠিত থাকে।’ (তিরমিজি, হাদিস নং : ২৩৭৮)

৫. মানুষের হক আদায়ে সচেতন হওয়া : হজ কবুল হওয়ার অন্যতম আলামত হলো মানুষের প্রতি আচরণে পরিবর্তন আসা। পরিবার, আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশী ও সমাজের মানুষের হক যথাযথভাবে আদায় করতে হবে।

৬. নফল ইবাদতের অভ্যাস গড়ে তোলা : তাহাজ্জুদ, নফল রোজা, দান-সদকা ও অধিক জিকির বান্দাকে আল্লাহর নৈকট্য দান করে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আমার বান্দা নফল আমলের মাধ্যমে আমার নৈকট্য অর্জন করতে থাকে, অবশেষে আমি তাকে ভালোবাসতে শুরু করি।’ (সহিহ বুখারি, আয়াত : ৬৫০২)

৭. হজের স্মৃতি নয়, হজের শিক্ষা ধরে রাখা : অনেকেই হজের স্মৃতি সংরক্ষণ করেন, কিন্তু হজের শিক্ষা ভুলে যান। প্রকৃত সফলতা হলো হজের পরেও বিনয়, তাকওয়া, ধৈর্য ও ইখলাস বজায় রাখা। হজ কবুল হওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ আলামত।

হজ মানুষের জীবনে আল্লাহর পক্ষ থেকে পাওয়া এক মহান সুযোগ— নিজেকে নতুনভাবে গড়ে তোলার সুযোগ। হজ শেষে যদি আমরা আগের মতোই গুনাহে নিমজ্জিত হয়ে যাই, তাহলে হজের শিক্ষা অপূর্ণ থেকে যাবে। কিন্তু যদি আমরা নামাজ আদায়, কোরআন তিলাওয়াত, তওবা, নেক আমল ও তাকওয়ার মাধ্যমে জীবন পরিচালনা করি, তাহলে হজ আমাদের জন্য হবে জান্নাতের পথে এক উজ্জ্বল সূচনা।

বৃষ্টির জন্য মহানবী (সা.) যে দোয়া করেছেন

মুফতি ওমর বিন নাছির
বৃষ্টির জন্য মহানবী (সা.) যে দোয়া করেছেন
সংগৃহীত ছবি

আকাশে যখন মেঘ জমে, মাঠ-ঘাট শুকিয়ে যায়, নদী-নালা পানিশূন্য হয়ে পড়ে এবং মানুষ বৃষ্টির জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করে, তখন একজন মুমিনের হৃদয় সর্বপ্রথম মুখাপেক্ষী হয় আসমান-জমিনের মালিক মহান আল্লাহর দিকে। কারণ বৃষ্টি আল্লাহ তাআলার এক মহা রহমত, যার মাধ্যমে মৃতপ্রায় ভূমি পুনর্জীবন লাভ করে এবং মানুষের জীবন-জীবিকা সচল হয়। তাইতো মহানবী (সা.) যখন অনাবৃষ্টি লক্ষ্য করতেন, তখন তিনি আল্লাহর দরবারে বিনম্রভাবে হাত তুলে বৃষ্টির জন্য দোয়া করতেন। দোয়াটি হলো

اللَّهُمَّ اسْقِنَا غَيْثًا مُغِيثًا مَرِيئًا مَرِيعاً نَافِعًا غَيْرَ ضَارٍّ عَاجِلاً غَيْرَ آجِلٍ ‏

উচ্চারণ : ‘আল্লাহুম্মাসকিনা গাইসান মুগিসান মারিআন মারিয়ান নাফিয়ান গাইরা দাররিন আজিলান গাইরা আজিলিন।’

অর্থ : ‘হে আল্লাহ! আমাদের বিলম্বে নয় বরং তাড়াতাড়ি ক্ষতিমুক্ত-কল্যাণময়, তৃপ্তিদায়ক, সজীবতা দানকারী, মুষলধারায় বৃষ্টি বর্ষণ করো।’

হাদিস : জাবির ইবনে আব্দুল্লাহ (রা.) বর্ণনা করে বলেন, একদিন মহানবী (সা.)-এর কাছে কিছু লোক (বৃষ্টি না হওয়ায়) কাঁদতে কাঁদতে আসলে তিনি তখন তীব্র গরম ও অনেক দিনের অনাবৃষ্টির কারণে বৃষ্টি প্রার্থনা করে এই দোয়া পাঠ করেন। বর্ণনাকারী সাহাবি বলেন, এরপর তাদের উপর আকাশ মেঘাচ্ছন্ন হয়। এবং প্রচুর বৃষ্টি বর্ষণ হয়। (আবু দাউদ, হাদিস নং : ১১৬৯)

আত্মকেন্দ্রিকতা আত্মার নীরব ব্যাধি

মুফতি মুহাম্মদ মর্তুজা
আত্মকেন্দ্রিকতা আত্মার নীরব ব্যাধি
সংগৃহীত ছবি

আত্মকেন্দ্রিকতা এমন এক মানসিক অবস্থার নাম, যেখানে ব্যক্তি নিজের চিন্তাভাবনা, অনুভূতি এবং চাওয়া-পাওয়াকে অধিক গুরুত্ব দেয়। অতিমাত্রায় আত্মকেন্দ্রিক মানুষরা নিজের দৃষ্টিভঙ্গি থেকেই শুধু পৃথিবীকে দেখেন এবং অন্যদের মতামত বা আবেগের প্রতি সংবেদনশীল হতে প্রায়শই ব্যর্থ হন। আত্মীয়স্বজনের খোঁজ নেওয়া, প্রতিবেশীর পাশে দাঁড়ানো কিংবা মানুষের উপকারে আসার চেয়ে নিজের জগতে সীমাবদ্ধ থাকতে পছন্দ করেন। অন্যের প্রয়োজন ও কষ্টের প্রতি উদাসীন হলেও কৌশলে নিজের স্বার্থসিদ্ধির ব্যাপারে থাকেন অত্যন্ত সচেতন, যা মূলত ইসলামবিরোধী নীতি।

ইসলামের দৃষ্টিতে নিজেকে ভালোবাসা নিষিদ্ধ নয়; এটা মানুষের স্বভাবজাত বিষয়। পবিত্র কোরআনে এ ব্যাপারে এসেছে, ‘এবং মানুষের মধ্যে কৃপণতা বিদ্যমান রয়েছে।’(সুরা : নিসা, আয়াত : ১২৮)

আর প্রতিটি ব্যক্তি সাধারণত নিজ নিজ স্বার্থের খাতিরে কৃপণ ও লোভী হয়ে ওঠে। কিন্তু এই আত্মপ্রেম বা স্বার্থসচেতনতা এমন মাত্রায় হতে দেওয়া যাবে না, যা অন্যের অধিকার গ্রাস করে ফেলবে। বরং ইসলামের শিক্ষা হলো, মানুষ যেমন স্বভাবজাত কারণে নিজের কল্যাণ চায়, তেমনি অন্য ভাইয়ের কল্যাণ চাইতে হবে। এটাই ঈমানের দাবি। রাসুল (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘তোমাদের কেউ পূর্ণ মুমিন হতে পারবে না, যতক্ষণ না সে নিজের জন্য যা ভালোবাসে, তার ভাইয়ের জন্যও তা ভালোবাসে।’ (বুখারি, হাদিস : ১৩)

আরো পড়ুন
রিজিকের সন্ধানে প্রচেষ্টা প্রশংসনীয়

রিজিকের সন্ধানে প্রচেষ্টা প্রশংসনীয়

 

লক্ষ্য করলে দেখা যায়, হাদিসে নিজের জন্য ভালোবাসাকে অস্বীকার করা হয়নি; বরং সেই ভালোবাসার পরিধি অন্যের কাছেও সম্প্রসারিত করতে বলা হয়েছে। এটাই ইসলামের সৌন্দর্য। অতিমাত্রায় আত্মকেন্দ্রিকতা ঈমানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। কেননা আত্মকেন্দ্রিক মানুষরা পৃথিবীর সবকিছুর ওপর নিজের ইচ্ছা-আকাঙ্ক্ষাকে সর্বোচ্চ প্রাধান্য দেয়।

কিন্তু মুমিন বান্দারা নিজের স্বার্থ ও ইচ্ছার চেয়ে আল্লাহর হুকুম ও মহানবী (সা.)-এর সুন্নতকে প্রাধান্য দেয়। তাদের ভালোবাসার কেন্দ্রবিন্দু হয় আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের প্রেম। যেই প্রেম ছাড়া কোনো মানুষ প্রকৃত মুমিন হতে পারে না। মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘তোমাদের কেউ মুমিন হতে পারবে না, যতক্ষণ না আমি তার কাছে তার সন্তান, মা-বাবা ও সমস্ত মানুষের চেয়েও অধিক প্রিয় হই।’ (বুখারি, হাদিস ১৫)

আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের প্রতি এই অগাধ ভালোবাসা মানুষকে মানবিক করে তোলে। ফলে তারা আত্মকেন্দ্রিকার ধারালো জিঞ্জির ছিঁড়ে একজন সোনার মানুষে পরিণত হয়। যাদের হৃদয়ে সংকীর্ণতার স্থান নেই। যারা আল্লাহকে খুশি করার জন্য নিজের অভাব থাকা সত্ত্বেও অন্যকে অগ্রাধিকার দিতে দ্বিধাবোধ করে না। মহানবী (সা.)-এর সোহবতের বরকতে তাঁর সাহাবিরাও এ রকম সোনার মানুষে পরিণত হয়েছিলেন। যাদের সুনাম করতে গিয়ে মহান আল্লাহ বলেছেন, ‘আর মুহাজিরদের আগমনের পূর্বে যারা মদিনাকে নিবাস হিসেবে গ্রহণ করেছিল এবং ঈমান এনেছিল (তাদের জন্যও এ সম্পদে অংশ রয়েছে), আর যারা তাদের কাছে হিজরত করে এসেছে তাদেরকে ভালোবাসে। আর মুহাজিরদের যা প্রদান করা হয়েছে তার জন্য এরা তাদের অন্তরে কোনো ঈর্ষা অনুভব করে না। এবং নিজেদের অভাব থাকা সত্ত্বেও নিজেদের ওপর তাদের অগ্রাধিকার দেয়। যাদের মনের কার্পণ্য থেকে রক্ষা করা হয়েছে, তারাই সফলকাম।’ (সুরা : হাশর, আয়াত : ৯)

আরো পড়ুন
সফল হতে সকাল-সন্ধ্যায় পঠিতব্য দোয়া

সফল হতে সকাল-সন্ধ্যায় পঠিতব্য দোয়া

 

পবিত্র কোরআনের এই আয়াতে আত্মকেন্দ্রিকতা নিয়ন্ত্রণের উপকারিতা ফুটে উঠেছে। যারা আত্মকেন্দ্রিকতার মূল উপাদান মনের কার্পণ্য থেকে পবিত্র হতে পারবে, তারাই সফল হবে। সুবহানাল্লাহ! আর যারা তা থেকে বঞ্চিত হবে, তাদের আত্মা-প্রেতাত্মা হয়ে ওঠে, তাদের কাছে কোনো পাপই পাপ মনে হয় না। নিজেদের স্বার্থের জন্য তারা সব করতে পারে। নাউজুবিল্লাহ!

তাই মুমিনের উচিত, আত্মকেন্দ্রিকতামুক্ত হওয়ার চেষ্টা করা। আল্লাহর ভালোবাসাকে নিজের স্বার্থের ঊর্ধ্বে স্থান দেওয়া, আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করা, মানুষের উপকারে এগিয়ে আসা, নিয়মিত দান-সদকা করা, বাস্তব জীবনের সম্পর্ককে গুরুত্ব দেওয়া এবং নিজের কাছে প্রতিদিন এই প্রশ্ন করা ‘আজ আমি কার উপকার করেছি?’ কারণ আল্লাহর কাছে সবচেয়ে প্রিয় মানুষ সে, যে মানুষের উপকার করে।

বস্তুত মানুষ তখনই পরিপূর্ণ হয় যখন সে নিজের কল্যাণের পাশাপাশি অন্যের কল্যাণও কামনা করে। আত্মপ্রেম মানবিক; কিন্তু আত্মকেন্দ্রিকতা ধ্বংসাত্মক। আর যে ব্যক্তি নিজের স্বার্থকে নিয়ন্ত্রণ করে মানুষের কল্যাণে নিজেকে নিবেদিত করতে পারে, কোরআনের ভাষায় সেই ব্যক্তিই প্রকৃত সফলকাম।

বিশ্ব পরিবেশ দিবস ও ইসলাম

মো. আলী এরশাদ হোসেন আজাদ
বিশ্ব পরিবেশ দিবস ও ইসলাম
সংগৃহীত ছবি

ইসলামের শিক্ষা হলো নৈতিকতা ও আধ্যাত্মিকতার Submissive (আত্মসমর্পিত-অনুগত) সমাজ বিনির্মাণ। প্রিয় নবী (সা.)-এর দর্শন ‘সহজ করো, জটিল করো না। সুসংবাদ দাও, ভয় দেখিয়ে তাড়িয়ে দিয়ো না।’ (বুখারি)
মরুর ঊষর-ধূসর প্রান্তরে প্রিয় নবী (সা.)-এর আগমনের প্রতীক্ষায় প্রকৃতি সেজে ছিল মায়াবী রূপসজ্জায়। গাছে গাছে সবুজের সমারোহ, ম ম গন্ধে খেজুরের ছড়াগুলো উঁকি দিচ্ছে আর পাখ-পাখালির কূজন, নদীর কলতান ও বাতাসের উদাসী গুঞ্জরণ ইসলামে পরিবেশের তাৎপর্য শিক্ষা দেয়। পরিবেশ সুরক্ষার জন্য বিশ্বব্যাপী সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য প্রতিবছর ৫ জুন বিশ্ব পরিবেশ দিবস পালিত হয়।

বিশ্ব পরিবেশ দিবস (WED) ১৯৭২ সালে মানব পরিবেশবিষয়ক স্টকহোম সম্মেলনের সময় জাতিসংঘ কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল এবং ১৯৭৩ সালে ‘একমাত্র পৃথিবী’ (Only One Earth) এ প্রতিপাদ্য নিয়ে প্রথমবার উদযাপিত হয়। ২০২৬ সালে আজারবাইজানের বাকু (Now For Climate) ‘এখন জলবায়ুর জন্য’ প্রতিপাদ্য নিয়ে বিশ্বব্যাপী উদযাপনের আয়োজন করেছে। জরুরি জলবায়ু পদক্ষেপ এবং পৃথিবী থেকে আসা সংকেত, যেমন ক্রমবর্ধমান তাপমাত্রা, চরম আবহাওয়া এবং বাস্তুতন্ত্রের অবক্ষয়ের প্রতি সাড়া দেওয়ার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেয়। এ প্রচারাভিযানটি সুস্থ বাস্তুতন্ত্র, জলবায়ু সহনশীলতা এবং টেকসই উন্নয়নের মধ্যে সংযোগ তুলে ধরে।

নিরাপদ ও বাসযোগ্য পৃথিবীর জন্য বৃক্ষের বিকল্প নেই। বৃক্ষ ও জীবজগৎ পরস্পর সম্পৃক্ত, কিন্তু নির্বিচার বৃক্ষ নিধনে পরিবেশ-প্রকৃতিতে দেখা দিচ্ছে বিরূপ প্রভাব। একদিকে খরা ও মরুময়তা, অন্যদিকে অতিবর্ষণ ও বন্যায় তৈরি হচ্ছে ভারসাম্যহীন, ঝুঁকিপূর্ণ বাস্তবতা।

মানুষ ও প্রাণীর খাদ্যসহ নানা সুবিধার আয়োজন এবং সব প্রয়োজন পূরণের ব্যবস্থা রয়েছে প্রকৃতি ও পরিবেশে। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন, ‘আকাশ থেকে আমি পানি বর্ষণ করি উপকারী বৃষ্টি এবং তা দিয়ে আমি উদ্যান, শস্যরাজি সৃষ্টি করি ও সমুন্নত খেজুর বৃক্ষ—যাতে আছে গুচ্ছ গুচ্ছ খেজুর। আমার বান্দাদের জীবিকাস্বরূপ; বৃষ্টি দ্বারা আমি সঞ্জীবিত করি মৃতভূমিকে...।’(সুরা : কাফ, আয়াত : ০৯—১১)

তিনি আরো বলেন, ‘আর পানিতে যা আল্লাহ আকাশ থেকে বর্ষণ করেছেন, এরপর পৃথিবীকে সুজলা সুফলা করেছেন...।’ (সুরা : বাকারা, আয়াত : ১৬৪)

জলবায়ু পরিবর্তনের এমন অনাকাঙ্ক্ষিত বাস্তবতা প্রতিরোধে বৃক্ষরোপণই একমাত্র সমাধান। মহান আল্লাহ বলেন, ‘তিনিই লতা ও উদ্যান সৃষ্টি করেছেন এবং খেজুর বৃক্ষ, বিভিন্ন স্বাদবিশিষ্ট খাদ্যশস্য, জয়তুন ও ডালিম সৃষ্টি করেছেন। তারা একে অন্যের সদৃশ এবং সদৃশহীনও হয়ে থাকে, যখন তা ফলবান হয় তখন তার ফল আহার করবে আর ফসল উঠানোর দিন তার জাকাত (হক) প্রদান করবে এবং অপচয় করবে না। কারণ তিনি অপচয়কারীদের পছন্দ করেন না।’(সুরা : আনআম, আয়াত : ১৪১)

বৃক্ষরোপণ একটি ইবাদত তথা আমল ও জিকির। পৃথিবীর সব সৃষ্টি মহান আল্লাহর অনুগত ও ইবাদতরত, সুরা আর-রাহমানে  আছে—‘ওয়াস্সাজারু ইয়াসজুদান...অর্থাৎ সূর্য ও চাঁদ ঘোরে হিসাব মতো, তৃণলতা বৃক্ষ উভয়েই তাঁর অনুগত...।’ (আয়াত : ৫, ৬)

আরো পড়ুন
দরুদ পাঠের বিশেষ পাঁচ সময়

দরুদ পাঠের বিশেষ পাঁচ সময়

 

কোরআনে বলা হয়েছে, ‘আল্লাহর ইচ্ছা ছাড়া গাছের একটি পাতাও ঝরে না।’ (সুরা : আনআম, আয়াত : ৫৯) প্রিয় নবী (সা.) বৃক্ষরোপণকে সদকায়ে জারিয়া বা প্রবহমান দান তুল্য কল্যাণকর ইবাদত অবহিত করে বলেন, ‘যদি কোনো মুসলমান একটি বৃক্ষরোপণ করে অথবা শস্য ফলায় এবং তা থেকে মানুষ কিংবা পাখি অথবা পশু ভক্ষণ করে, তবে তা তার জন্য সদকাস্বরূপ গণ্য হব্যে।’ (বুখারি ও মুসলিম)

বিশ্ব পরিবেশ দিবসের লক্ষ্য হলো—
সচেতনতা বৃদ্ধি
সহযোগিতা বৃদ্ধি
বৃক্ষরোপণ
পরিচ্ছন্নতা অভিযান
শিক্ষামূলক কর্মশালা
টেকসই অনুশীলন
সৃজনশীল প্রচারাভিযান।
বস্তুত পরিবেশ সুরক্ষায় বৃক্ষরোপণ একটি ইবাদত ও আত্মরক্ষামূলক তৎপরতা এবং পরিকল্পিত বিনিয়োগ ও ভবিষ্যতের নিরাপত্তা সঞ্চয়। এ জন্য বর্ষাকাল খুবই উপযুক্ত এবং বাংলাদেশের বাস্তবতায় বৃক্ষরোপণ টিকে থাকার উপায় ও একান্ত জরুরি অগ্রাধিকারের বিষয়।

লেখক : সহযোগী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান
ইসলামিক স্টাডিজ, কাপাসিয়া ডিগ্রি কলেজ কাপাসিয়া, গাজীপুর