• ই-পেপার

স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বিরোধ লাগানো মহাপাপ

কোরআনের বাণী

কেয়ামতে আগে ইয়াজুজ-মাজুজের আত্মপ্রকাশ

ইসলামী জীবন ডেস্ক
কেয়ামতে আগে ইয়াজুজ-মাজুজের আত্মপ্রকাশ
সংগৃহীত ছবি

মহান আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন,

 حَتّٰۤی اِذَا فُتِحَتۡ یَاۡجُوۡجُ وَ مَاۡجُوۡجُ وَ هُمۡ مِّنۡ كُلِّ حَدَبٍ یَّنۡسِلُوۡنَ

সরল অনুবাদ : 
‘অবশেষে যখন ইয়াজুজ ও মাজুজকে মুক্তি দেয়া হবে, আর তারা প্রতিটি উঁচু ভূমি হতে ছুটে আসবে।’ (সুরা : আম্বিয়া, আয়াত : ৯৬) 

সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা : 
হুজায়ফা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একবার আমরা কয়েকজন সাহাবি একত্রিত হয়ে পরস্পর কিছু আলোচনা করছিলাম। ইতিমধ্যে মহানবী (সা.) আগমন করলেন। জিজ্ঞেস করলেন, তোমরা কি বিষয়ে আলোচনা করছো? আমরা বললাম, আমরা কেয়ামত সম্পর্কে আলোচনা করছি। তখন তিনি বললেন, যতক্ষণ পর্যন্ত দশটি আলামত প্ৰকাশ না পাবে, ততক্ষণ পর্যন্ত কেয়ামত সংঘটিত হবে না। (সহিহ মুসলিম, হাদিস নং : ২৯০১) তিনি দশটি আলামতের মধ্যে ইয়াজুজ-মাজুজের আত্মপ্রকাশের কথাও উল্লেখ করেছেন।

তারা হলো নবী নুহ (আ.)-এর বংশধর এবং অত্যন্ত শক্তিশালী ও ধ্বংসাত্মক মানবগোষ্ঠী। তারা বর্তমানে একটি প্রাচীরের আড়ালে বন্দী রয়েছে। প্রতিদিন তা ভাঙার চেষ্টা করছে। তারা প্রতিদিন দেয়াল খনন করে কিন্তু ‘ইনশাআল্লাহ’ বলে না। তাই আল্লাহ প্রতিদিন দেয়ালটি আগের চেয়েও শক্তিশালী করে দেন। তবে কিয়ামতের ঠিক আগে একদিন তারা ‘ইনশাআল্লাহ’ বলবে এবং দেয়াল ভেঙে তারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়বে। মুক্ত হওয়ার পর এই বিশাল দলটি পৃথিবীর সব জলাশয় ও নদী শুকিয়ে ফেলবে এবং সর্বত্র চরম বিশৃঙ্খলা ও ধ্বংসযজ্ঞ চালাবে। তখন হযরত ঈসা (আ.) ও তাঁর অনুসারীরা এদের হাত থেকে বাঁচতে আল্লাহর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করবেন। তারপর আল্লাহর হুকুমে ইয়াজুজ-মাজুজের ঘাড়ে এক ধরনের পোকা বা রোগ দেখা দেবে এবং এর ফলেই তারা সকলে একসঙ্গে মৃত্যুবরণ করবে। এরপর আল্লাহ বিশেষ পাখি বা বৃষ্টির মাধ্যমে তাদের মৃতদেহ পরিষ্কার করবেন। (

এ আয়াতে ইয়াজুজ-মাজুজের আত্মপ্রকাশের কথা উল্লেখ করতে গিয়ে فتحت শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। এর বাহ্যিক অর্থ হলো, সেই নির্ধারিত সময়ের পূর্বে তারা কোন বাধার সম্মুখীন হয়ে থাকবে।

 حدب শব্দের অর্থ প্রত্যেক উচ্চ ভূমি-বড় পাহাড় কিংবা ছোট ছোট টিলা। (ইবন কাসির) সুরা কাহফে ইয়াজুজ-মাজুজের আলোচনা থেকে তাদের বর্তমান অবস্থান কোন কোন পর্বতমালার পশ্চাতে তা জানা যায়। তাই আত্মপ্রকাশের সময় তারা পর্বত ও টিলাসমূহ থেকে বের হয়ে জমিনের মধ্যে ফাসাদ সৃষ্টি করবে। (ইবন কাসির, তাফসিরে জাকারিয়া)

ইয়াজুজ-মাজুজের বিস্তারিত বিবরণ সুরা-কাহফের শেষে (৯৩-৯৮ আয়াতে) উল্লেখ করা হয়েছে। কিয়ামতের নিকটবর্তী সময়ে ঈসা (আ.)-এর বর্তমানে তাদের আত্মপ্রকাশ ঘটবে। এরা এত বেশি দ্রুত পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়বে যে, মনে হবে প্রতিটি উঁচু জায়গা হতেই তারা ছুটে আসছে। তাদের অনিষ্টতা ও অত্যাচারে মুসলিমরা অতিষ্ঠ হয়ে উঠবে। এমনকি ঈসা (আ.) মুসলিমদের নিয়ে তুর পাহাড়ে গিয়ে আশ্রয় নেবেন। তারপর ঈসা (আ.)-এর অভিশাপে তারা ধ্বংস হয়ে যাবে। তাদের শবদেহের দুর্গন্ধে সর্বদিক ভরে উঠবে। শেষ পর্যন্ত আল্লাহ তাআলা এক জাতীয় পাখি প্রেরণ করবেন; যারা তাদের লাশগুলো তুলে সমুদ্রে নিক্ষেপ করবে। তারপর প্রবল বৃষ্টি বর্ষন করবেন, যাতে সারা পৃথিবী পরিষ্কার হয়ে যাবে। (তাফসিরে আহসানুল বায়ান)

প্রচন্ড গরম থেকে বাঁচতে যে দোয়া পড়বেন

মুফতি ওমর বিন নাছির
প্রচন্ড গরম থেকে বাঁচতে যে দোয়া পড়বেন
সংগৃহীত ছবি

প্রচণ্ড গরম মানুষের জীবনকে অনেক সময় দুর্বিষহ করে তোলে। তীব্র রোদ, গরম বাতাস ও অসহনীয় তাপদাহে মানুষ শারীরিক কষ্টের পাশাপাশি মানসিক অস্বস্তিতেও ভোগে। কিন্তু একজন মুমিন জানে, পৃথিবীর প্রতিটি অবস্থা আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকেই আসে এবং প্রতিটি পরিস্থিতিতে তাঁরই আশ্রয় গ্রহণ করা উচিত। তাই ইসলামে কষ্ট, বিপদ, রোগব্যাধি কিংবা প্রাকৃতিক দুর্যোগের মতো তীব্র গরমের সময়ও আল্লাহর কাছে সাহায্য ও নিরাপত্তা কামনা করার শিক্ষা দিয়েছে। হাদিসে গরমকে আল্লাহর ক্রোধ বলা হয়েছে। আর আল্লাহর ক্রোধ থেকে বাঁচার জন্য মহানবী (সা.) যেমন দান সদকা করতে বলেছেন, তেমনি দোয়াও শিখিয়ে গেছেন। দোয়াটি হলো:-

اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنْ زَوَالِ نِعْمَتِكَ وَتَحَوُّلِ عَافِيَتِكَ وَفُجَاءَةِ نِقْمَتِكَ وَجَمِيعِ سَخَطِكَ

উচ্চারণ : আল্লাহুম্মা ইন্নি আউজুবিকা মিন জাওয়ালি নিমাতিকা ওয়া তাহাউলি আফিয়াতিকা ওয়া ফুজাআতি নিকমাতিকা ওয়া জামিয়ি সাখাতিকা।

অর্থ : হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে আশ্রয় চাই আপনার নেয়ামত (বা অনুগ্রহ) দূর হয়ে যাওয়া থেকে, আপনার দেওয়া নিরাপত্তা ও সুস্থতা পরিবর্তন হওয়া থেকে, আপনার আকস্মিক শাস্তি থেকে এবং আপনার যাবতীয় অসন্তুষ্টি ও ক্রোধ থেকে। (সহিহ মুসলিম, হাদিস নং : ২৭৩৯)

হাদিসের বাণী

শুধু যে তিন ব্যক্তি অন্যের কাছে চাইতে পারবে

ইসলামী জীবন ডেস্ক
শুধু যে তিন ব্যক্তি অন্যের কাছে চাইতে পারবে
সংগৃহীত ছবি

আবু বিশর কাবিসাহ ইবনুল মুখারিক (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একবার আমার ওপর কিছু আর্থিক দণ্ড (হুদুদ জাতীয়) এসে বর্তায়, তাই আর্থিক কিছু সাহায্য নেয়ার জন্য আমি মহানবী (সা.)-এর কাছে আসলাম। মহানবী (সা.) বললেন, সাদাকাহের মাল আসার আগ পর্যন্ত তুমি অপেক্ষা কর। সাদাকাহের মাল এলে আমি তোমাকে দেওয়ার জন্য আদেশ করব। তারপর তিনি বললেন, হে কাবিসাহ, তিন ধরনের ব্যক্তি ব্যতীত আর কারো জন্য অন্যের কাছে কোনো কিছু চাওয়া বৈধ নয় : 

আরো পড়ুন
সদকায় মিলে সম্মান ও নিরাপত্তার জীবন

সদকায় মিলে সম্মান ও নিরাপত্তার জীবন

 


১. যে ব্যক্তি আর্থিক সংকটে পড়বে। তার জন্য অন্যের কাছে চাওয়া বৈধ। তবে যখনই তার প্রয়োজন ও সংকট শেষ হয়ে যাবে, তখন আর সে কখনো আর অন্যের কাছে কোনো আর্থিক সাহায্য চাইতে পারবে না। 
২. যে ব্যক্তি কোনো বিপদে পড়বে, তাহলে তার জন্য সচ্ছল অবস্থায় ফিরে আসার আগ পর্যন্ত অন্যের কাছে কোনো কিছু চাওয়ার অবকাশ আছে। 
৩. যে ব্যক্তি এমন অভাবগ্রস্ত হয়ে পড়বে এবং তার সম্প্রদায়ের তিনজন জ্ঞানী ব্যক্তি এ কথার সাক্ষ্য দেবে যে, অমুক লোক অভাবী, তখন তার জন্য অন্যের কাছে কোনো কিছু চাওয়ার সুযোগ আছে। হে কাবিসাহ, এ ছাড়া অন্য কারো জন্য কারো কাছে কোনো কিছু চেয়ে খাওয়া সুদ হবে। সে যা খাবে, তা তার জন্য সুদ হবে। (সহিহ মুসলিম, হাদিস নং : ২৪০৪, মুসনাদে আহমাদ, হাদিস নং : ১৫৯১৬)


শিক্ষা ও বিধান

১. অকারণে মানুষের কাছে হাত পাতা নিষিদ্ধ। তাই ইসলাম মানুষকে আত্মসম্মান ও আত্মনির্ভরশীলতার শিক্ষা দেয়। প্রকৃত প্রয়োজন ছাড়া মানুষের কাছে সাহায্য চাওয়া বৈধ নয়।

২. প্রয়োজনের ক্ষেত্রে সাহায্য চাওয়া বৈধ। যে ব্যক্তি বাস্তবিকই বিপদগ্রস্ত, ঋণগ্রস্ত বা অভাবী, তার জন্য প্রয়োজন অনুযায়ী সাহায্য চাওয়ার অনুমতি রয়েছে।

৩. ঋণ ও সামাজিক দায়িত্ব পালনে সহযোগিতা নেওয়া জায়েজ। তাই কোনো ব্যক্তি যদি মানুষের মধ্যে মীমাংসা, রক্তপণ বা অন্য কোনো সামাজিক দায়িত্ব পালনের কারণে আর্থিক সংকটে পড়ে, তবে সে সাহায্য চাইতে পারে।

৪. বিপদগ্রস্ত মানুষের প্রতি সমাজের দায়িত্ব রয়েছে। অগ্নিকাণ্ড, বন্যা, দুর্ঘটনা বা অন্য কোনো দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিকে সহযোগিতা করা সমাজের কর্তব্য।

৫. প্রকৃত অভাবীকে সহায়তা করা উচিত। যারা সত্যিকার অর্থে অভাবগ্রস্ত, তাদের প্রয়োজন পূরণে জাকাত, সদকা ও অন্যান্য সহায়তার ব্যবস্থা করা ইসলামের নির্দেশ।

৬. মিথ্যা অভাব দেখিয়ে সাহায্য নেওয়া মহাপাপ। অভাবী না হয়েও মানুষের কাছে সাহায্য চাওয়া এবং তা ভোগ করা হারাম ও গুনাহের কাজ।

৭. সম্পদের ক্ষেত্রে সততা অবলম্বন করা আবশ্যক। তাই প্রত্যেক মুসলিমের উচিত নিজের আর্থিক অবস্থার ব্যাপারে সত্য বলা এবং প্রতারণার আশ্রয় না নেওয়া।

৮. সমাজের বিশ্বস্ত ও জ্ঞানী ব্যক্তিদের সাক্ষ্যের গুরুত্ব অপরিসীম। তাই কোনো ব্যক্তি প্রকৃত অভাবী কি না, তা নির্ধারণে সমাজের বিজ্ঞ ও বিশ্বস্ত ব্যক্তিদের সাক্ষ্য গ্রহণযোগ্য।

এই হাদিস আমাদের বিশেষভাবে শিক্ষা দেয় যে, ইসলাম আত্মমর্যাদা রক্ষা, পরিশ্রম ও আত্মনির্ভরশীলতাকে উৎসাহিত করে; তবে প্রকৃত অসহায়, ঋণগ্রস্ত ও বিপদগ্রস্ত মানুষের জন্য সাহায্য চাওয়ার সুযোগ রয়েছে। একই সঙ্গে মিথ্যা অভাব দেখিয়ে মানুষের সম্পদ গ্রহণকে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করেছে।
 

মা-বাবার অবহেলাকারীকে মহানবী (সা.)-এর অভিশাপ

ইসলামী জীবন ডেস্ক
মা-বাবার অবহেলাকারীকে মহানবী (সা.)-এর অভিশাপ
সংগৃহীত ছবি

পৃথিবীতে মানুষ যাদের ঋণ কোনো দিন শোধ করতে পারবে না, তারা হলেন মা-বাবা। সন্তান যখন নিজের অস্তিত্ব সম্পর্কেও সচেতন নয়, তখন মা তাকে নিজের রক্ত-মাংস দিয়ে গড়ে তোলেন। মায়ের গর্ভধারণের কষ্ট, প্রসবের যন্ত্রণা, রাতের পর রাত নির্ঘুম কাটানো এবং বাবার নিজের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য বিসর্জন দিয়ে সন্তানকে মানুষ করার প্রতিদান পৃথিবীর কোনো সন্তানই পূর্ণভাবে দিতে পারে না।


এ কারণেই ইসলাম আল্লাহর হকের পরপরই মায়ের হককে গুরুত্ব দিয়েছে। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ বলেছেন, “আর তোমার রব আদেশ দিয়েছেন যে তোমরা তাকে ছাড়া অন্য কারো ইবাদত করবে না এবং মা-বাবার সঙ্গে সদাচরণ করবে। তাদের একজন অথবা উভয়েই যদি তোমার নিকট বার্ধক্যে উপনীত হয়, তবে তাদেরকে ‘উফ’ বলো না এবং তাদেরকে ধমক দিও না। আর তাদের সঙ্গে সম্মানজনক কথা বোলো।’ (সুরা : বনি ইসরাঈল, আয়াত : ২৩)

অন্য আয়াতে মায়ের কঠিন ত্যাগের কথা স্মরণ করিয়ে দিতে গিয়ে মহান আল্লাহ বলেন, ‘আর আমি মানুষকে তার মা-বাবার ব্যাপারে (সদাচরণের) নির্দেশ দিয়েছি। তার মা কষ্টের পর কষ্ট ভোগ করে তাকে গর্ভে ধারণ করে।’ (সুরা : লুকমান, আয়াত : ১৪)

কোরআনের এই বাণী আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশি ত্যাগ স্বীকার করেছেন মা। অথচ আজ অনেক সন্তান বৃদ্ধা মাকে বোঝা মনে করে, তার প্রয়োজনের খোঁজ নেয় না, এমনকি কখনো কখনো বৃদ্ধাশ্রমে পাঠিয়ে দায়িত্ব শেষ হয়েছে বলে মনে করে। অথচ ইসলাম এটিকে ভয়াবহ অপরাধ হিসেবে গণ্য করেছে। হাদিস শরিফে এসেছে, আবু বকর (রা.) থেকে বর্ণিত, মহানবী (সা.) একদা তিনবার বললেন, আমি কি তোমাদের সবচেয়ে বড় কবিরা গুনাহগুলো সম্পর্কে অবহিত করব না? সবাই বলেন, হে আল্লাহর রাসুল! অবশ্যই বলুন। তিনি বলেন, আল্লাহর সঙ্গে শিরক করা এবং মা-বাবার অবাধ্য হওয়া।
(বুখারি, হাদিস : ২৬৫৪)

নাউজুবিল্লাহ! মা-বাবাকে অবহেলা করা কতটা জঘন্য অপরাধ হলে এই হাদিসে শিরকের পরপরই মা-বাবার অবাধ্যতার কথা বলা হয়েছে। ইসলাম মা-বাবার অধিকারকে এতটাই প্রাধান্য দিয়েছে যে নফল ইবাদত রেখে তাদের আদেশ পালন করা বা তাদের খিদমত করাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

বনি ইসরাঈলের বিখ্যাত আবেদ জুরাইজের ঘটনা এ ক্ষেত্রে অত্যন্ত শিক্ষণীয়। তিনি নির্জনে ইবাদতে মগ্ন থাকতেন। একদিন তার মা তাঁকে ডাকলেন। তিনি নফল নামাজে ছিলেন। মা কয়েকবার ডাকলেও তিনি নামাজ ছেড়ে সাড়া দিলেন না। এতে মা কষ্ট পেয়ে বললেন, ‘হে আল্লাহ! তাকে মৃত্যু দিও না, যতক্ষণ না তাকে ব্যভিচারিণীদের মুখোমুখি করো।’ মায়ের এই কষ্টের পরিণতিতে জুরাইজ ভয়াবহ পরীক্ষার সম্মুখীন হন। এক ব্যভিচারিণী নারী তাঁর বিরুদ্ধে অপবাদ দেয় যে তার গর্ভের সন্তানের পিতা জুরাইজ। লোকেরা তাঁর ইবাদতখানা ভেঙে দেয়, তাঁকে অপমানিত করে এবং জনসমক্ষে হেয় করে। পরে আল্লাহ অলৌকিকভাবে নবজাতক শিশুর মুখ দিয়ে সত্য প্রকাশ করেন এবং জুরাইজ নির্দোষ প্রমাণিত হন। (বুখারি, হাদিস : ২৪৮২)

আরো পড়ুন
ইমাম তাবারি (রহ.) : জ্ঞান, সাধনা ও কর্মনিষ্ঠার এক উজ্জ্বল নক্ষত্র

ইমাম তাবারি (রহ.) : জ্ঞান, সাধনা ও কর্মনিষ্ঠার এক উজ্জ্বল নক্ষত্র

 

এই ঘটনা প্রমাণ করে যে কারো ইবাদত, ইলম, পদবি অনেক বড় থাকলেও মায়ের মনে কষ্ট দিয়ে দুনিয়া ও আখিরাতে সুরক্ষিত থাকা সম্ভব নয়। এর বিপরীতে কোনো ঈমানদার যদি তার মায়ের যত্ন নিতে পারে, তাহলে তা তার জন্য জান্নাতের দ্বার খুলে দিতে পারে। কেননা হাদিস শরিফে এসেছে, মায়ের পায়ের নিচে সন্তানের বেহেশত। (নাসায়ি, হাদিস : ৩১০৪)

অর্থাৎ যে সন্তান মায়ের সেবা করবে, তার জন্য জান্নাতের পথ সহজ হবে। আর যে ব্যক্তি সেই জান্নাত লাভের সুযোগ পেয়েও হাতছাড়া করবে, মা-বাবাকে অবহেলা করবে, সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও তাদের যত্ন নেবে না—তাদেরকে মহানবী (সা.) অভিশাপ দিয়েছেন। তারা সেই অভিশাপের আগুনে ছারখার হয়ে যাবে।

আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘সে ব্যক্তির নাক ধূলিমলিন হোক (সে ব্যক্তি ধ্বংস হোক), আবার সে ব্যক্তির নাক ধূলিমলিন হোক, আবার তার নাক ধূলিমলিন হোক।’ জিজ্ঞেস করা হলো, কার হে আল্লাহর রাসুল (সা.)। তিনি বললেন, ‘যে ব্যক্তি তার মা-বাবা উভয়কে কিংবা তাদের একজনকে বার্ধক্যজনিত অবস্থায় পেল, এরপরও সে জান্নাতে প্রবেশ করতে পারল না।’ (মুসলিম, হাদিস : ৬৪০৫)

আহ! কত হৃদয়বিদারক কথা! বৃদ্ধ মা-বাবা ঘরে থাকা মানে জান্নাত অর্জনের সুবর্ণ সুযোগ ঘরে থাকা। অথচ অনেকেই এই সুযোগকে বোঝা মনে করে। তাদের দূরে সরিয়ে দেয় এবং নিজেকে জান্নাত থেকে বঞ্চিত করে—নিজেকে দুনিয়াতে লাঞ্ছনাকর কঠিন শাস্তির সম্মুখীন করে। কেননা হাদিসের ভাষ্য মতে, যেসব পাপের সাজা মহান আল্লাহ দুনিয়ায়ও দেন, তার একটি হলো মা-বাবার অবাধ্যতা ও অবহেলা।

মা-বাবার অবাধ্যতার আরেকটি ভয়াবহ দিক হলো—এর শাস্তি শুধু আখিরাতে নয়, দুনিয়াতেও আসে। রাসুল (সা.) বলেন, ‘আল্লাহ তার মর্জিমাফিক গুনাহসমূহের মধ্যে যেকোনো গুনাহের শাস্তি প্রদান কিয়ামত পর্যন্ত বিলম্বিত করতে পারেন। কিন্তু তিনি বিদ্রোহ, মা-বাবার অবাধ্যাচরণ ও আত্মীয়তার বন্ধন ছিন্ন করার গুনাহর শাস্তি অপরাধীর মৃত্যুর আগেই এই দুনিয়াতে দিয়ে থাকেন।’ (আদাবুল মুফরাদ, হাদিস : ৫৯৪)

আরো পড়ুন
আল্লাহর প্রিয় বান্দাদের ১২ গুণ

আল্লাহর প্রিয় বান্দাদের ১২ গুণ

 

ইতিহাস সাক্ষী, যে সন্তান মায়ের চোখের পানি ঝরিয়েছে, তার জীবন থেকে বরকত উঠে গেছে; আর যে সন্তান মায়ের দোয়া অর্জন করেছে, আল্লাহ তার জন্য এমন দরজা খুলে দিয়েছেন, যা সে কল্পনাও করেনি।

তাই প্রত্যেক মুমিনের উচিত যদি মা-বাবা জীবিত থাকেন, তবে তাদের পাশে বসা, তাদের কথা শোনা, তাদের কষ্ট বোঝার চেষ্টা করা, তাদের জন্য সময় বের করা। আর যদি তারা পৃথিবী থেকে চলে গিয়ে থাকেন, তবে তাদের জন্য দোয়া করা, সদকা করা এবং তাদের আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখা।

মনে রাখতে হবে, পৃথিবীতে এমন অনেক মানুষ আছে, যারা কোটি কোটি টাকা খরচ করেও মায়ের একটি দোয়া ফিরে পাবে না। কিন্তু যার মা জীবিত আছেন, তার কাছে এখনো জান্নাতের একটি দরজা খোলা আছে। সে একটু চেষ্টা করলেই মা-বাবার খিদমতের মাধ্যমে সে দরজা অতিক্রমের চাবি সংগ্রহ করতে পারে।

তাই প্রত্যেক মানুষের কর্তব্য, মা-বাবাকে অবহেলা নয়, ভালোবাসা দেওয়া; বিরক্তি নয়, সম্মান দেওয়া; কষ্ট নয়, শান্তি দেওয়ার চেষ্টা করা। কারণ মা-বাবার সন্তুষ্টির মধ্যেই রয়েছে আল্লাহর সন্তুষ্টি, আর মা-বাবার চোখের পানির মধ্যেই লুকিয়ে থাকতে পারে দুনিয়া ও আখিরাতের অকল্যাণ। মহান আল্লাহ আমাদের সবাইকে সেসব অকল্যাণ থেকে রক্ষা করুন। মহানবী (সা.)-এর অভিশাপ থেকে বাঁচার তাওফিক দান করুন। আমিন।